প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
কুরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা তার মূল কাঠামো ও বিষয় নিয়ে আজও বর্তমান। কুরআন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান উপহার দিয়েছে। কুরআনের শিক্ষায় অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সমাজনীতির সকল বিষয় বিধৃত আছে। তিনি সকল মুসলামানকে ইসলাম প্রচারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন। -শরীফ
শ্রীলংকার অধিবাসী মুহাম্মদ শরীফ একজন অতিপরিচিত ইসলাম প্রচারক। তিনি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেই পারিবারিক গণ্ডির মধ্যেই বড় হন। তার পিতা ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক। মা ছিলেন রোমান ক্যাথলিক। তাই মায়ের আশা ছিল ছেলেকে তিনি রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক হিসেবে গড়ে তুলবেন। ছেলেও সেভাবেই গড়ে উঠেন। একজন খ্রিস্টান পণ্ডিত হিসেবে তিনি কলম্বোতে বহু ধর্মীয় বক্তব্য প্রদান করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি এ কাজে ব্যাপৃত থাকেন। ছোট বেলায় পড়াশুনা এবং ধর্ম প্রচারের সময় শরীফ দেখতে পেলেন, বাইবেলের মধ্যে বহু বিতর্কিত বিষয় বর্তমান রয়েছে। তাই তিনি ১৯৭০ সাল থেকেই পোপের নিকট তার সব সন্দেহ নিয়ে লিখতে থাকেন। কিন্তু পোপের পক্ষ থেকে কোনই উত্তর তিনি পাননি। ছয় বছর পর তিনি রোমান ক্যাথলিকের সংস্পর্শ ত্যাগ করেন এবং খ্রিস্টানদের প্রোটেস্ট্যান্ট Grup এর সাথে যোগ দেন। তিনি প্রোটেস্ট্যান্টদের একত্রিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে তিনি ব্যর্থ হন।
পরিশেষে তিনি তার নিজ পথেই অবিচল থাকেন এবং মিশনারী তৎপরতা চালাতে থাকেন। ইতোমধ্যে সৌদী আরবের দাহরানে তিনি একটি চাকুরীও পেয়ে যান। অথচ সেখানেও তিনি তার মিশনারী তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। আরবদের মধ্যে মুহাম্মদ শরীফ খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে সচেষ্ট হন। তিনি যখন যীশুখ্রিস্টকে মুসলমানদের কাছে তুলে ধরতেন তখন মুসলমানরা বলত, দেখ, আমরা ইতোমধ্যেই যীশুকে গ্রহণ করেছি।
তখন থেকে শরীফ বুঝলেন যে, মুসলমানরা যীশুকে একজন নবী হিসেবে গ্রহণ করে, তারা তাঁকে আল্লাহর পুত্র মনে করে না। তিনি আরও অনুধাবন করলেন, পবিত্র কুরআনে যীশুখ্রিস্টের নাম ২৫ বার উল্লেখ্য করা হয়েছে অথচ মুহাম্মদের নাম মাত্র ৪ থেকে ৫ বার বলা হয়েছে। শরীফ বিশ্বের ১৬টি ধর্ম ও ধর্মমতের উপর পড়াশোনা করেছেন। এক সময় তিনি পবিত্র কুরআনও পড়েন। তবে তখন তার উদ্দেশ্য ছিল কুরআনের ভুলত্রটি এবং এর মধ্যকার বৈপরিত্য খুঁজে বের করা। এসব ত্রটি বিচ্যুতি মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করে মুসলমানদের খ্রিস্টান ধর্মের দিকে আহবান করার জন্যই শরীফ কুরআন পাঠ করতেন। ইতোমধ্যে মুহাম্মদ শরীফ রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দুরে মাযমায় একটি চাকুরীর কাজে গমন করেন। তিনি তার নতুন কাজটি লাভ করেন একজন পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে। ইঞ্জিনিয়ার একদিন শরীফকে তার বাসায় রাতের খাবার খেতে দাওয়াত দেন। শরীফ ড্রইং রুমে গিয়ে বসেন। সেখানে তিনি ইংরেজীতে অনুদিত একটি কুরআন শরীফ দেখতে পান। শরীফ কুরআন শরীফটি হাতে তুলে নেন এবং পড়তে থাকেন। এমন সময় পাকিস্তানী ইঞ্জিনিয়ার শরীফকে বলেন, আপনি কুরআন শরীফটি আমার পক্ষ হতে উপহার হিসেবে নিতে পারেন। কুরআন শরীফের প্রথম চাপটার আল ফাতিহা পড়লেন মুহাম্মদ শরীফ। তারপর তিনি দ্বিতীয় অধ্যায় পড়ারও অনূপ্রেরণা লাভ করেন। এতে তিনি তার যাবতীয় প্রশ্নের জবাব খুঁজে পান। কুরআনের প্রথম দুটি অধ্যায় পড়েই শরীফ জানতে পারলেন, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নতুন কোন ধর্ম নিয়ে আসেন নি। বরং তার আনীত শিক্ষা ঈসা (আ) ও তার পূর্ববর্তী নবী রাসূলদেরই ধারাবাহিকতা মাত্র।
অতঃপর শরীফ ১৯৮৪ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তিনি জানতেন না কিভাবে অজু করেেত হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে হয়। অজু শেখার আগে তিনি প্রতি নামাযের পূর্বে গোসল করে নিতেন। তিনি প্রথম চুপে চুপে তার অফিস রুমেই নামায আদায় করতেন। একদিন অফিসে নামায পড়ার সময় একজন সৌদী মুসলিম জনাব শরীফের অফিস রুমে ঢুকে পড়েন। তাকে নামায পড়তে দেখে সৌদী লোকটি বিস্মিত হন। তিনি তাকে অফিসে নামায না পড়ে বরং মসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের পরামর্শ দেন।
মসজিদের ইমাম সাহেব জনাব শরীফের মুসলমান হবার ঘটনা শুনে খুব খুশী হলেন। তিনি তার মুসলমান হবার ঘোষণা দেন। শরীফের মতে, এটা ছিল তার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। ইসলাম গ্রহণের পর শরীফ তার অতীত জীবন নিয়ে ভাবতেও কষ্টবোধ করেন। কেননা, এর আগে তিনি প্রচার করতেন খ্রিস্টান ধর্ম। তার অতীতের এ কাজের মাশুল দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করেন। এ কাজে নিজের জ্ঞানকে সম্দ্ধৃ করার জন্য তিনি উত্তর আমেরিকা এবং লন্ডন হতে বহু ইসলামী বই ক্রয় করেন। তার দাওয়াতী কাজের বদৌলতে বহু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। আজও তিনি অব্যাহত গতিতে ইসলামের দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ইসলামী দাওয়াতী কাজের জন্য কোন বিশেষ ধরনের লোক নেই। প্রতিটি মুসলমানই হচ্ছে ধর্মের প্রচারক। এ প্রসঙ্গে তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিদায় হজ্বের ভাষণের কথা উল্লেখ করেন। নবীজী বলেছিলেন, তাঁর আজকের বক্তব্য যেন ঐসব লোকের কাছে পৌঁছে দেয়া হয় যারা বিদায় হজ্জে সমাবেশে উপস্থিত হতে পারেন নি। তাই শরীফ বলেন, যদি আমরা মুসলমান হই তাহলে রাসূলের বাণীকে অপরের নিকট পৌঁছে দেয়া আমাদের কর্তব্য।
শরীফ বহু ভাষায় কথা বলতে পারেন। যেমন সিংহলী, তামিল, উর্দু, হিন্দী, স্পেনিশ, পর্তুগীজ, জার্মান, গ্রীক এবং হিব্র। তিনি মনে করেন, পৃথিবীর অনেক মানুষ এসব ভাষায় কথা বলে। তাই এসব ভাষায় দাওয়াতী কাজ করা সহজ। শরীফের সবচেয়ে বড় সফলতা হল তার বাবা-মা ও ভাইদের ইসলামের পথে নিয়ে আসা। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে শরীফের বাবা প্রথমে ইসলাম কবুল করেন। বাবার অক্লান্ত চেষ্টায় মাও ইসলাম গ্রহণ করেন। এর সাথে তার দু ভাই মুসলমান হয়ে ধন্য হন।
শরীফ বলেন, রোমান ক্যাথলিকদের যে বাইবেল রয়েছে তা ৭৩ টি সংস্করণে এবং অর্থডক্সদের বাইবেল ৮০ ধরনের সংস্করণে বিরাজমান । কিন্তু পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন। এটি একই ধরনের বিষয় নিয়ে বিরাজমান। তিনি বলেন, খ্রিস্টান, হিন্দু, এবং বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মমত ভিত্তিতেই তিনি আল্লাহর একত্ব এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত প্রমাণ করতে সক্ষম। তিনি জনান, হিব্রতে লেখা ওল্ড টেস্টামেন্টে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম রয়েছে। তিনি একথাও বলেন যে, গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যায়, বৌদ্ধদের শিক্ষাও ইসলামের উপর প্রতিতি। শরীফের ভাষায়, খ্রিস্টানরা মনে করে যীশু হচ্ছেন মানব জাতির রক্ষাকারী বা ত্রাণকর্তা। তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে যীশুর পূর্বে মানব জাতির ত্রাণকর্তা কে ছিলেন?
মুহাম্মদ শরীফ অন্যান্য ধর্মের সকল অনুসারীদের প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য আহবান জানান। তিনি বলেন, কুরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা তার মূল কাঠামো ও বিষয় নিয়ে আজও বর্তমান। কুরআন মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান উপহার দিয়েছে। কুরআনের শিক্ষায় অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সমাজনীতির সকল বিষয় বিধৃত আছে। তিনি সকল মুসলমানকে ইসলাম প্রচারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন।
