প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ ۖ وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِنْ دُونِهِ ۚ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ
আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নন? অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্যদের ভয় দেখায়। আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।
(সূরা যুমার : আয়াত ৩৬)
৫
কুফরের পৃথিবী দুর্দশায় আক্রান্ত
আমেরিকার মেয়ো ক্লিনিকের একজন ডাক্তার আমেরিকান এসোসিয়েশন অফ ফিজিশিয়ান এন্ড সার্জেনস এর কাছে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যারা শিল্প প্রতিানের ওপর গবেষণা করে থাকেন, তিনি ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে ৭৬টি বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের সবার বয়স তখন ৪৪ বছরের কাছাকাছি। অনুসন্ধান রিপোর্টে বের হয়ে আসে যে, তাদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশই নিম্নোক্ত তিনটি রোগের যে কোনো একটিতে আক্রান্ত হন। যার সব কয়টাই হতাশার লক্ষণ, প্রধানত হার্টের অসুখ, পাকস্থলীতে ঘাঁ এবং উচ্চরক্তচাপ।
তাদের মধ্যে অনেকেরই বয়স ৪৫ পর্যন্ত পৌঁছায় না। একজন মানুষকে কি সফল বিবেচনা করা যায় যাদের পাকস্থলিতে ছিদ্র অথবা হার্টের অসুখ থাকে? এই অসুখ মানুষটিকে কী দিতে পারে যদি সে সমগ্র পৃথিবী অর্জন করে কিন্তু আস্থা হারিয়ে ফেলে? এমনকি যদি একজন মানুষ সমগ্র পৃথিবীর মালিকও হয় তবু সে শুধুমাত্র একটি খাটে ঘুমাতে পারে, এবং তিনবেলার চেয়ে বেশি এক বেলাও খেতে পারে না। তাহলে এই ব্যক্তির সাথে এবং একজন মাটি খোঁড়া দিনমজুরের সাথে পার্থক্য কী? দিনমজুর সম্ভবত সমাজের উচ্চস্থানের লোকের চেয়ে বেশি।
W.S. Alvarez বলেন : এটা খুবই পরিষ্কার প্রতি পাঁচটি রোগের চারটি শারীরিক কারণে হয় না; বরং এইগুলো আসে ভয়, দুঃশ্চিন্তা, ঘৃণা, কার্পণ্য থেকে এবং মানুষ অক্ষম হয় জীবনে এটার সাথে খাপ খাওয়াতে।
আমরা অতীতকে মুছে ফেলতে পারি না এবং আমাদের চাওয়া অনুযায়ী ভবিষ্যৎও আকঁতে পারি না। কেন অনুতাপ দ্বারা আমরা আমাদের হত্যা করা উচিত যা আমরা পরিবর্তন করতে পারি না।
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বলল : আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন : তুমি রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার তা বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বারেই বললেন : রাগ করো না। (বুখারী : ৬১১৬)
৬
জীবন সঙ্গীর মানসিকতা
একজন সঠিক ঈমানদার নারী তার স্বামীর প্রচুর অনুনয়ের পরেও তাকে শেষ করতে পারে না। আল্লাহ যা তার ওপর নির্দেশ করেছেন তাতেই সে সন্তুষ্ট। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবার যার উদাহরণ। উরওয়া তার খালা থেকে বর্ণনা করেন, আয়েশা (রা) বলতেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আল্লাহর রহমতে একটি নতুন চাঁদ আসে। তারপর, দুইমাসে তিনটি চাঁদ আসে (অর্থাৎ তিন মাস শেষ হয়ে যায়) কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে চুলায় আগুন জলেনি।
আমি বলেছিলাম, হে ফুপি! আপনি কিভাবে বেঁচেছিলেন? তিনি বললেন, দুটি খেজুর এবং পানি পান করে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু আনসার প্রতিবেশী যাদের ছাগল দুধ দিত এবং সেখানে থেকে কিছু দুধ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পান করার জন্য পাঠাতেন।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে থাকাই হলো জীবনের মূল্য দেয়া জীবনের মূল্য হলো প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে থাকা।
ধৈর্যই সাহায্য আনে
৭
এই পৃথিবীতে কোনো কিছুর অনুতাপ কর না
যে কেউ ভাবতে পারে জীবন এতো ছোট হয় কীভাবে এবং এই পৃথিবীতে আনন্দ এত সংক্ষিপ্ত হয় কীভাবে! এটা কত অকল্পনীয় এবঙ কত দ্রুত পরিবর্তন হয় এই সকল চিন্তা তাদের জন্য যাদের এই পৃথিবী প্রধান চিন্তার বিষয়। এই পৃথিবীর কোনো কিছুর জন্য তারা অনুতপ্ত হবে না। তারা অতীতের কোনো বিষয় নিয়ে হতাশ হবে না অথবা যা তাদের হারিয়ে গেছে তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করবে না। অতএব আমাদের যা আছে তাই বেশি ভালো এবং বেশি টেকসই। তাই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আপনাকে ঈমান দান করেছেন, যাতে আপনি পরকালে আল্লাহর সাথে একত্রিত হতে পারেন।
অপরদিকে অমুসলিম নারী যারা সেই দিনের ওয়াদার কথা বিশ্বাস করে না। অভিনন্দন তাদের জন্য যারা পরকালকে বিশ্বাস করে এবং তার জন্য প্রস্তুত থাকে। সর্বনাশ ও ধ্বংস তাদের জন্য, যাদের বিশ্বাস দুর্বল এবং যারা পরকালের কথা বেমালুম ভুলে যায়। অন্যথায় যারা তাদের প্রাসাদ, ঘর-বাড়ি, সম্পদ এবং সস্তা চাকচিক্য যা মন আকৃষ্ট করে এতে বিভর থাকে। কী মূল্য আছে এই বাড়ি, প্রাসাদ, স্বর্ণালংকার, যদি কোনো বিশ্বাস না থাকে। কী মূল্য আছে তোমার এই সামাজিক অবস্থানের যদি আল্লাহকে ভয় না পাও? যদি ক্ষমতা এবঙ সম্পদ শান্তি আনতে পারত তাহলে আমরা কেন দেখি যে, অনেক রাজা, শাসক এবঙ ব্যবসায়ী দুর্বিসহ জীবন যাপন করে, তাদের এই দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে কী কষ্টকদায়ক অভিযোগ!
গতকাল হলো স্বপ্ন যা চলে গিয়েছে এবং আগামী কাল নিছক একটি আশা ছাড়া আর কিছু নয়। শুধুমাত্র আজই হলো বাস্তবতা
নারীই এই পৃথিবীতে মহামানব জন্ম দিয়েছে
৮
সবচাইতে আশ্চর্যজনক সৌন্দর্য আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে নিহিত
মানুষের দিকে তাকাও কী আশ্চর্যজনকভাবে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন ধরনের গোষ্ঠী, ভাষা এবং উচ্চারণ। আল্লাহ সবচাইতে বড় এবং তিনি মানুষকে সবচাইতে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন হে মানুষ! কোনো জিনিসটি তোমাকে তোমার মহামহিম মালিকের ব্যাপারে ধোকায় ফেলে রাখল? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাকে সোজা সুঠাম করেছেন এবং তোমাকে সুসামঞ্জস্য করেছেন। (সূরা ইনফিতার : আয়াত ৬-৭)
অবশ্যই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি। (সূরা আত তীন :আয়াত ৪)
এই সুন্দর আকাশ এবং তারকার দিকে দৃষ্টি দাও, উজ্জ্বলদীপ্ত সূর্য এবং চাঁদের দিকে তাকাও। কি বিশাল পৃথিবী। এই বিশ্ব ভ্রহ্মাণ্ডের দিকে তাকাও এবং কীভাবে এটা সম্প্রসারিত হয়। কীভাবে তা থেকে পানি এবং পশু চারণভূমি বের হয়ে আসে। পাহাড়গুলোর দিকে তাকাও কীভাবে তারা পরস্পর শক্তভাবে লেগে আছে। এই সাগর এবং নদীর কথা চিন্তা কর। এই দিন এবং রাত্রি, এই আলো। এই ছায়া আর এই মেঘমালা। এই পৃথিবীর মধ্যে কত সাদৃশ্য রয়েছে তার চিন্তা কর। এই ফুলের দিকে তাকাও, এই পাকা ফলের দিকে তাকাও, এই সুস্বাদু দুধ, মিষ্টি মধু, পাম গাছ, নাইটিংগেল পাখি, এই সরীসৃপ প্রাণী, এই পশুপাখি, এই অফুরন্ত সৌন্দর্য এবং আলোকিত চোখ।
অতএব (দিবাশেষে) যখন তোমরা সন্ধ্যা কর তখন আল্লাহ তায়ালার মাহাত্ম ঘোষণা কর, (ঘোষণা কর) যখন সকাল (বেলার মাধ্যমে দিনের শুরু) কর তখনও।
আসমানসমূহ ও যমীনের যাবতীয় প্রশংসা তো একমাত্র তাঁরই জন্যে, (তাঁর মহাত্ম ঘোষণা কর) যখন তোমরা (দিনের) দ্বিতীয় প্রহর (শুরু) কর, আবার যখন (দিনের) তৃতীয় প্রহর (শুরু) কর, (তখনো তার মহত্ম ঘোষণা কর)।
তিনিই মৃত থেকে জীবন্ত কিছুর আবির্ভাব ঘটান, একইভাবে জীবন্ত কিছু থেকে মৃতকে বের করে আনেন। তিনিই (সেই সত্তা, যিনি এ যমীনকে তার নির্জীব অবস্থায় পর পুনরায় জীবন দান করেন; (ঠিক) এভাবেই তোমাদেরও (আবার) পুনরুত্থিত করা হবে। (সূরা ৩০ আয়াত : ১৭-১৯)
জীবনের কোনো নেতিবাচক বিষয়ের দিকে তাকিয়ো না: আনন্দ এবং সৌন্দর্য দ্বারা পরিতৃপ্ত হও।
এবং তোমরা যখন ঘরে অবস্থান করবে, পূর্বেকার জাহেলিয়াতের যমানার (নারীদের) মতো নিজেদের প্রদর্শনী করে বেড়াবে না (সূরা আল আহযাব : আয়াত-৩৩)
৯
পরম সম্মান এবং নিরেট ভদ্রতা
বাইজান্তিন কিছু মুসলিম নারীকে বন্দী করেছিল। মানসুর ইবনে আম্মার এই খবর শুনতে পেল। তারা তাকে বলল : কেন তুমি খলিফার কাছে যাও না এবং তার নিকট বস না। সে হারুনুর রশিদের নিকট গেল এবং তার কাছে বসল।
যখন শায়েখ মানসুর জনগণকে জিহাদ করার জন্য আকৃষ্ট করছিলেন, একটি মুখ বন্ধ বান্ডিল এবং একটি চিঠি তার নিকট আসল। মানসুর চিঠির মুখ খুললেন এবং পড়লেন, আমি আরব উপনিবেশে বসবাসকারী একজন নারী, আমি শুনেছি বাইজানতিন মুসলিম নারীদের সাথে কী রকম আচরণ করে এবং আরো শুনেছি বাইজানটিন মুসলিম নারীদের সাথে কী রকম ব্যবহার করে এবং আরো শুনেছি যে, আপনি জনগণকে তার বিরুদ্ধে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত করছেন। আমি আমার দেহের সবচেয়ে সম্মানিত জিনিস খুঁজে যা পেয়েছি তা হলো দুটি চুলের বেণী। তাই আমি তা কেটে ফেলি এবং বান্ডিলে পেঁচিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমি আপনাকে প্ররোচিত করছি এবং আমার বেণী দুটি যেন যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়ার লাগাম টানতেও কাজে লাগে।
যখন মানসুর এই পবিত্র পত্রটি পড়ছিলেন তখন তার অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। তিনি কেঁদে ফেললেন এবং তার সাথে সকল মানুষ কেঁদে ফেলল। অতঃপর খলিফা হারুনুর রশীদ এক সাধারণ সভায় দুপুরের খাবার খেলেন এবং তিনি নিজেও মুজাহিদদের সাথে যুদ্ধে নেমে পড়লেন এবং মহান প্রশংসাময় আল্লাহ তায়ালা তাদের বিজয় দান করলেন।
অতীতের জন্য কেঁদো না। এবং কোনো কারণ ছাড়া অশ্র ঝরিও না, কেননা, তুমি কখনো অতীতকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
