প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
স্মরণ কর, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে; তখন তিনি তোমাদেরকে জবাব দিয়েছিলেন, আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক সহস্র ফিরিশ্তা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে। (সূরা আনফাল : আয়াত -৯)
৬
জিহ্বাকে বিশ্রাম দিন
ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন। একদিন খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়াহ (রা) আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রা) কে গাল-মন্দ করছিলেন, যিনি বনী উমাইয়ার ঘোর শত্র ছিলেন। তিনি অনেক দুঃখীও ছিলেন। তার স্ত্রী রামলাহ বিনতে যুবায়ের, আব্দুল্লাহর বোন যিনি সেখানে বসা ছিলেন কিন্তু তিনি নীরব রইলেন এবং কোনো কথা বলেননি। খালিদ বলল, কেন তুমি কিছু বলছ না?, তিনি বললেন, কোনো নারীর উচিত হবে না পুরুষের কোনো ব্যাপারে নাক গলানো; বরং আমরা ফুলের সুগন্ধ এবং শুভেচ্ছার মতো, কেন আমরা তোমাদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করব?। খালিদ তার কথায় অভিভূত হলো এবং তার চোখে চুমো খেল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোরালোভাবে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। আহমদ ইবনে হাম্বল বর্ণনা করেন, আসমা বিনতে ইয়াযিদ বলেন, তিনি বললেন সম্ভবত পুরুষটি বলল, সে তার স্ত্রীর সাথে কিছু করেনি, অথবা সম্ভবত নারীটি বলল, সে তার স্বামীর সাথে কিছু করেনি। লোকজন নীরব রইল এবং কোনো উত্তর দিল না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা কর না। এই জন্য যে, যেন একটি পুরুষ শয়তান এবং একটি নারী শয়তান রাস্তায় সাক্ষাত করে এবং পরস্পরে মিলিত হয় যখন লোকেরা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছু মুফাসসির এটাকে হাফিজাত শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ আল্লাহ তাদেরকে একে অপরের ওপর শ্রেত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে, পুরুষ তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ যা সংরক্ষিত করতে বলেছেন, তা হিফাযত করে। স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সৎ উপদেশ দাও। তারপর তাদের বিছানা পরিত্যাগ কর এবং তাদের মৃদু প্রহার কর। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অন্বেষণ কর না। নিশ্চয় আল্লাহ মহান, শ্রেষ্ঠ। (সূরা নিসা : আয়াত-৩৪)
তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার হতে একজন ও তার (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন বিচারক নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।
সেই নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে এবং তার স্বামীর মধ্যকার ঘটনা গোপন রাখে।
আল্লাহর রহমতকে স্মরণ কর তোমার সমস্যাকে নয়
জীবন অনেক ছোট, দুঃখ দ্বারা জীবনকে আরো ছোট করো না
৭
সালাতের মাধ্যমে দুঃশ্চিন্তার সাথে যুদ্ধ কর
প্রথম মুসলিম নারী যিনি জেনেছিলেন যে, সালাত হলো বান্দা এবং আল্লাহর মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম বা সেতু। তাই যারা খুব একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করে তারা সফলকাম।
অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মমিনগণ। যারা বিনয়-নম্র নিজেদের সালাতে। (সূরা মুমিন : আয়াত ১-২)
যারা রাত্রে জাগ্রত থাকে, বিনয় এবং ধ্যানসহকারে আল্লাহর ইবাদত করে, তারা জানে যে, ভবিষ্যতে কঠিন পরীক্ষা আসছে। আর সালাত হলো বান্দার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম এবং সালাত মানুষকে এমন ক্ষমতা দান করে যা সকল সমস্যার সমাধান এবং কঠিন দুঃখের মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। তারা আরো জানতো যে, কিয়াম আল লাইল- এর নামায হলো ইবাদতের মধ্যে অন্যতম একটি কাজ, যা মানুষকে আল্লাহর খুব নিকটবর্তী করে দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম যেই দোয়া বললেন, আর রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিতি করবেন প্রশংসিত স্থানে। (সূরা বনী ইসরাইল : আয়াত -৭৯)
যিনি কিয়াম-আল-লাইল পড়েন আল্লাহ তায়ালা তার প্রশংসা করেন কুরআনে এভাবে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রাবস্থায় অতিবাহিত করত। (সূরা আয-যারিয়াত : আয়াত – ১৭)
আনাস (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং বললেন, এই দড়ি কিসের? তারা বললেন, এটি যয়নবের দড়ি, যখন ক্লান্ত হয়ে যান তখন এটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দড়িটি খুলে ফেল। তোমাদের যতক্ষণ শক্তি আছে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে নামায পড় এবং যখন ক্লান্ত হয়ে যাও তখন বসে পড়। ঈমানদার নারীরা নিজেদেরকে রাত্রে সালাত পড়ার জন্য জোর দেন। এবং আল্লাহর শক্তি প্রার্থনা করে, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ক্ষমতার চেয়ে বেশি রাত্রি জেগে ইবাদত করতে নিষেধ করেছেন। সবচাইতে উত্তম হলো সেটাই যা প্রতিদিন করা হয়, এমনকি তা অল্প হলেও।
আমরা জানি যে, আধুনিক নারীরা তাদের সময়গুলো দুনিয়াবী কাজে কাটিয়ে দেয়। কিন্তু তাদের কাছে কমপক্ষে দুরাকাত নামায আশা করা হয়, যা তাদের কাছ থেকে শয়তানকে বিতাড়িত করে দেয়। তাদের জন্য সবচাইতে আধুনিক ব্যাপার হলো এই যে, তারা অত্যন্ত সর্বনাশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন –
যদি তুমি সচেতন হও তাহলে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখ এবং তুমি যদি তওবাকারী হও তাহলে আগামীকাল আনন্দ কর।
ধৈর্য মুক্তির চাবি
৮
একজন সফল নারীর উপদেশ
একজন আধুনিক মা তার সন্তানকে হাসি এবং কান্নার সাথে নিম্নোক্ত উপদেশগুলো প্রদান করেন।
হে আমার কন্যা! তুমি একটি নতুন জীবনে যাত্রা করতে যাচ্ছ- এমন জীবন যেখানে তোমার বাবা-মায়ের অবস্থান নেই এবং তোমার ভাই, বোন, সাথে নেই। তোমার এই নতুন জীবনে, একমাত্র তোমার স্বামী হবে সঙ্গী, যে তোমার ভাগ অন্য কাউকে দিতে চাইবে না। এমনকি তোমার রক্ত, মাংসও না। সে যেন বুঝতে পারে যে, তুমি তার জীবনের শেষ সন্ধান। সর্বদা মনে রাখবে মানুষই সব বড় বড় শিশুর মতো। তোমার একটি মিষ্টি কথা তাকে সুখী করবে। এটা তাকে বুঝতে দিবে না যে, বিয়ের কারণে তুমি তোমার নিজের পরিবার থেকে বঞ্চিত ও বড় একা, এবং সেও যেন মনের মধ্যে একই ধরনের অনুভূতি অনুভব করে। কেননা, সেও তোমার সুখের জন্য তার পিতা-মাতা, বাড়ি, পরিবার সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু তুমি এবং তার মধ্যে পার্থক্য হলো তুমি পুরুষ আর সে নারী। একজন নারী জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত সে তার পরিবার এবং বাড়িতে থাকে। কিন্তু তাকে তার সবকিছু পরিত্যাগ করতে হয়েছে নতুন জীবনের জন্য এবং একটি মানুষের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য যিনি তার স্বামী এবং তার সন্তানের পিতা হবে…. এটাই তোমার নতুন জীবন।
হে আমার কন্যা! এটাই তোমার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। এটাই তোমার পরিবার যা তুমি এবং তোমার স্বামী মিলে গড়ে তুলবে। আমি তোমার কাছে চাইব না যে, তুমি তোমার বাবা-মা ভাই বোনকে ভুলে যাও। কেননা, তারা তোমাকে ভুলবে না। কিভাবে একজন মা তার সন্তানকে ভুলে যায়, যে একদিন তার চোখের মণি ছিল? কিন্তু আমি তোমার কাছে চাই তুমি তোমার স্বামীকে ভালবাস এবং তার সাথে সুখে শান্তিতে বসবাস কর।
আসিয়া (আ) থেকে ধৈর্য শিখ,
খাদিজা (রা) থেকে আনুগত্য শিখ,
আয়েশা (রা) থেকে একনিতা শিখ,
এবং ফাতেমা (রা) থেকে অধ্যায়বসায় শিখ।
তাদের পূর্বে কোনো মানুষ অথবা জ্বিন তাদের স্পর্শ করেনি। (সূরা আর-রাহমান : আয়াত -৭৪)
৯
যে আল্লাহর কাছে শান্তি পায় না
সে আর কোথাও শান্তি পাবে না
যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং তার কথা মান্য করে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য শান্তি ও আনন্দের উৎস। আল্লাহ তায়ালার কাছে সে সবচেয়ে বেশি প্রিয়, যে তাঁর ইবাদত করে। যেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে শান্তি খুঁজে পাবে সেই সুখী হবে এবং জীবনকে উপভোগ করবে। তার মন শান্তি এবং আল্লাহর ভালবাসায় পরিপূর্ণ হবে। যে তার সচেতনতার সাথে জীবন্ত বলে গণ্য হবে সে সর্বদা আল্লাহর নাম মনে রাখবে। তাঁর গুণাবলিকে বিবেচনা করবে। তার মন আল্লাহর গুণের চিন্তায় ভরে উঠবে। যেমন আর রহমান (পরম করুণাময়), আর রাহীম (পরম দয়ালু), আল-হামীদ (প্রশংসাযোগ্য), আল-আলীম (ধৈর্য ধারণকারী), আল-বার, (ভালোর উৎস), আল-লতিফ (পরম সূক্ষ্ম এবং ভদ্র), আল-মুহসিন (লাভজনক), আল-ওয়াদুদ (প্রিয়), আল-কারীম (পরম দয়ালু), আল আযীম (মহা ক্ষমতাধর) এবং সবচেয়ে কাছে অনুভব করে আল-আলীম (সর্বজ্ঞানী)।
যখন বান্দা আল্লাহর তত্ত্বাবধানে চলে আসে তখন আল্লাহ তার বান্দার সবচেয়ে কাছে চলে যান এবং তার জন্য আনন্দ এবং শান্তি এনে দেন।
আর যখন আমার বান্দাগণ আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে তখন তাদেরকে বলে দাও, নিশ্চয় আমি অতি সন্নিকটে, কোন আহবানকারী যখনই আমাকে ডাকে তখনই আমি তার আহবানে সাড়া দিয়ে থাকি। সুতরাং তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমাকে বিশ্বাস করে। এতে করে তারা সঠিক পথে চলতে পারবে। (সূরা বাকারা : আয়াত -১৮৬)
কিন্তু চেষ্টা এবং কষ্ট ছাড়া আল্লাহর কাছে শান্তি পাওয়া যায় না, এটা বান্দার নমনীয় হওয়ার ফল, এটা বান্দার ভালবাসার ফল, যে আল্লাহর কথা মানবে, তার হুকুম-আহকাম পালন করবে, তিনি যা নিষেধ করেছেন তা পরিত্যাগ করবে, তাহলে সে আল্লাহর কাছে আনন্দ এবং শান্তি খুঁজে পাবে।
সত্যিকারের সৌন্দর্য থাকে, সুন্দর ব্যবহার,
আচরণ এবং মানসিকতায়
আমি তোমাকে দয়ালু নারী হওয়ার জন্য জোর দিচ্ছি
১০
যিনি দুটি জীবনের বন্ধন
আসমা বিনতে আবু বকর, যাতি আন-নিতাকান, যিনি ক এবং তীব্র হতাশার সময় ধৈর্য ধারণ করার ভালো এবং জ্বলন্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। যিনি তার স্বামীকে অত্যধিক ভালবাসেন এবং তাকে সন্তু রাখার আপ্রাণচেষ্টা করেন। এটা সহীহ হাদীস থেকে বর্ণিত।
যখন যুবায়ের আমাকে বিয়ে করে, তাঁর একটি ঘোড়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না, যা দ্বারা আমার ভরণ-পোষণ দিতেন। আমি তার উটকে শুকনো খেঁজুর এবং পানি পান করাতাম। আমি পানি আনতাম এবং ময়দার খামির তৈরি করতাম। একদিন আমি আয-যুবায়েরের বাগান থেকে শুকনো খেঁজুর এনেছিলাম, যেই বাগান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। তার সাথে একদল লোক ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকলেন। কিন্তু আমার লজ্জা লাগল এবং যুবায়েরের অহংকারের কথা মনে পড়ল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলতে লাগলেন, আল্লাহর রহমতে, তোমার শুকনো খেজুর বহন করা আমার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উটে চড়ার চেয়ে অনেক কঠিন ছিল। অতঃপর আবু বকর (রা) আমার জন্য একজন দাসী পাঠালেন, যা আমার কষ্ট লাঘব করল। ধৈর্যের পরে রহমত আসে। আসমা এবং তার স্বামীর সংসারে রহমত আসল। কিন্তু তিনি যেহেতু ধৈর্যহারা হননি যার ফলে তাদের স্বচ্ছলতা আসল। সে খুবই সাধারণ নেক ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সকল দাসীকে মুক্ত করে দেন। তিনি তার কন্যা এবং পরিবারকে বলেন, সম্পদ দান করতে উদার হও, যতক্ষণ তোমার কাছে অতিরিক্ত কিছু আছে ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
জীবন ঈমানদারদের জন্য সুন্দর,
পরকালে ধার্মিকরা আল্লাহর প্রিয় হবেন
