প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

উপরের উক্তিটি জার্মান নওমুসলিম যয়নাব কারীনের। জার্মানীর মুনস্টারের অধিবাসী তিনি। তেহরান থেকে প্রকাশিত মহিলা বিষয়ক সাময়িকী -পয়ামে যান- কে প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে তিনি হিজাব সম্পর্কে বলেন:
আমি একবার এক মুসলিম মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তিনি ওড়না দ্বারা মাথা ঢাকছেন কেন? জবাবে তিনি বললেন যে, একজন মুসলিম নারীকে ভাল মুসলমান হতে হলে তাকে অবশ্যই মাথা ঢাকতে হবে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তার এ জবাব আমার নিকট সন্তোষজনক ছিল না। অগত্যা আমি বিভিন্ন বই-পুস্তক পড়ে হিজাবের দর্শন সম্পর্কে জানতে পারি। এ অধ্যয়ন থেকে আমি বুঝতে পারলাম যে, হিজাবের পেছনে নারীর নিরাপত্তার দর্শন নিহিত রয়েছে। কেননা হিজাবের কারণে নারী সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে অধিকতর উপস্থিতির স্বাধীনতা লাভ করে এবং খুব সহজেই স্বীয় সামাজিক তৎপরতা চালাতে সক্ষম হয়, অথচ বাহ্যিক মূল্যবোধসমূহ সেক্ষেত্রে কোনই ভূমিকা পালনে সক্ষম হয় না। নারী হিজাবের কারণে যে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হয় আমি স্বীয় কর্মস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তা পুরোপুরি অনুভব করি। আমি প্রতিদিনই দেখতে পাই, যেসব নারী বাহ্যিক সাজগোজের ব্যাপারে চাপের মুখে থাকে তারা কিভাবে অসুবিধা ও করে সম্মুখীন হচ্ছে এবং লাঞ্ছিত হচ্ছে। বিভিন্ন পত্রিকা-সাময়িকী সব সময় তাদেরকে উপদেশ বিলায় তোমাকে এভাবে বা ঐভাবে পোশাক পরতে হবে এবং এভাবে বা ওভাবে সাজগোজ করতে হবে।
মোদ্দাকথা, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও মনোহারিত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করার ফলে নারীদের ওপরে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এর পেছনে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয় সে কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু মানসিক ও আত্মিক দিক থেকে তারা কোনরূপ নিরাপত্তাই অনুভব করে না, এমন কি কেউ যদি এর বিরোধীও হয়, তথাপি পরোক্ষ চাপের মাধ্যমে তাকেও এতে শামিল হতে বাধ্য করা হয়। কেননা অন্যথায় তাকে বিচ্ছিন্ন ও প্রত্যাখ্যান হতে হয়।
অবশ্য আমার নিকট সব সময়ই এই ফ্যাশন পূজা একটা দুঃসহ বোঝা বলে মনে হত। আমি সব সময়ই নিজেকে এ জিঞ্জির থেকে মুক্ত করার পথ খুঁজছিলাম।…..
আমি হিজাবকে আমার জীবনের অগ্রগতি বলে মনে করতাম। এ কারণেই আগেই যেমন বলেছি, আমার অনেক অসুবিধাই সমাজে দূরীভূত হয়ে যায়। হিজাব আমাকে সামাজিক তৎপরতা পরিচালনার জন্য অধিকতর স্বাধীনতা প্রদান করে। কিন্তু আমার আশপাশে যারা বসবাস করত তারা আমার হিজাব পরিধানকে পেছন দিকে বা অতীতে প্রত্যাবর্তন বলে মনে করতে লাগল। তাদের মতে হিজাব মানে মধ্যযুগে চলে যাওয়া, বন্দিত্ব এবং মুক্তি ও স্বাধীনতা হাতছাড়াকরণ। বলা বাহুল্য, তাদের এসব ধারণার সবটাই মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরিধানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বব্যপী নেতিবাচক প্রচারণার ফল ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। (৫০ জন উচ্চশিক্ষিত মহিলার ইসলাম গ্রহণের ঈমানদীপ্ত কাহিনী, কুরআন হাদীস রিসার্চ সেন্টার, পৃ.৬২-৭১)

পর্দা এবং আমার বোনের ইসলাম গ্রহণ

॥আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক সামবীল কোল॥
আমার বোন এক সময় নারী অধিকার আন্দোলনের জাদরেল নেত্রী ছিল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রীপ্রাপ্ত আমার এই বোনের কথায় কথায় ঝরে পড়তো বিপ্লব ও বিদ্রোহের আগুন। ১৯৮৭ সালে তার জীবনে ঘটে যায় এক বিস্ময়কর রূপান্তর। কারণ, এ সালেই সে ইসলাম গ্রহণ করে। এখন সে পাকিস্তানের লাহোরে থাকে। সেখানে তার জীবন চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সে এখন এক পরিপূর্ণ মুসলিম ঘরণী। ছয় সন্তানের আদর্শ জননী।

কুরআনে তার অটল বিশ্বাস। কুরআনের কথামতো দিনে পাঁচবার নামায পড়ে। ঘরদোরের কোন ব্যস্ততাই তাকে নামাযের সময় আটকে রাখতে পারে না। ঘরের বাইরে যদি কখনো যায় আপাদমস্তক পর্দাবৃত থাকে। আসলে সে এখন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ।
পর্দাকে আরবীতে হিজাব বলা হয়। হিজাব অর্থ নিজেকে অন্যের দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। এক ঢিলেঢালা লম্বা কোর্তা, বড় ওড়না আর নেকাব বিশি এই পোশাকটি মুসলিম নারীরা পরিধান করে থাকে। বিশেষ এই পোশাকটি মুসলিম ও অমুসলিম নারীদের মাঝে সহজেই পার্থক্য বিধান করে। এই পোশাক তার ভিন্ন বিশ্বাস, চিন্তা ও আদর্শকে সকলের সামনে উজ্জ্বল করে তোলে, তেমনি তাকে রক্ষা করে পুরুষদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকেও।

রক্ষণশীল ঐতিহ্যবাহী মুসলিম খান্দানের অনেক নারীই নিজেকে পুরুষদের জগত থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখে। তারা নিজেদেরকে ঘর-সংসার আর সন্তানদের লালন-পালন ও গঠনের কাজে সর্বদা নিয়োজিত রাখে। তারা যে অন্য পুরুষদের সাথে খোলামেলা চলাফেরা করে না, নিজেদেরকে সংসারমুখী করে রাখে- এই কারণে অনেক আমেরিকান মনে করে, ইসলামে নারীদের প্রতি অবিচার করা হয়। নারীরা ইসলামে বঞ্চিত ও সংকীর্ণতার শিকার। চলমান এই ধারণা সত্ত্বেও আমেরিকায় ইসলাম দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আর এই দ্রুততার প্রতিযোগিতায় নারীরা ছাড়িয়ে যাচ্ছে পুরুষদেরকে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যেখানে একজন পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করছে, সেখানে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে চারজন। আমার বোনের কথা হলো, পর্দা নারীদের প্রতি নিশ্চয়ই কোন অবিচার নয়; বরং স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা।

কানাডার নওমুসলিম টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট নাহিদ মুসতাফা লিখেছেন: শরীর ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা ও হেদায়েতের প্রত্যাশায় মুসলিম যুবতীরা এখন পর্দার প্রতি ঝুঁকছে প্রবলভাবে। বিস্ময় জাগে আমেরিকানদের প্রতি, তারা যখন বলে, যে নবী নারীদের প্রতি এই শৃঙ্খল (পর্দা) আরোপ করেছেন, তিনি আবার মুক্তি ও স্বাধীনতার দূত হন কী করে? অথচ মুসলমানদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। কারণ, নারীদের সমাজের লোভীজনরা যে যৌন সামগ্রী হিসেবে দেখে- পর্দা মূলত নারীদেরকে এই লাঞ্ছনাকর দৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। তাকে যৌনদৃষ্টির এই ভয়াল বেষ্টন মুক্তি ও স্বাধীনতা দান করে এই পর্দা।
নাহিদ মুসতাফা আরো লিখেন: অমুসলিম নারীদেরকে ছোটকাল থেকেই এই মন্ত্র শেখানো হয়- নারীর শরীর যত আকর্ষণীয় ও লাস্যময়ী হবে, তার দাম হবে তত। আর এর বাস্তবতা প্রমাণের জন্য ম্যাগাজিনগুলোর কভার কিঙবা বিজ্ঞাপনচিত্রই যথে। উলঙ্গপনায় কতটা বাধ্য নারী, কতটা অসহায় তা সহজেই অনুমেয়।

আর এটা আশ্চর্যের বিষয় নয়, আমেরিকান নারীরা কোটি কোটি ডলার শুধু চুলের ঠাঁট আর সাজসামগ্রীতে ব্যয় করে। প্লাস্টিক সার্জারি থেকে শুরু করে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত এক কঠিন শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। কৃত্রিমতার এই অনুশীলন জীবনে যেমন হতাশার সৃি করে, তেমনি সৃি করে ক্ষুধামন্দা থেকে শুরু করে নানা রকম মানসিক ও শরীরিক জটিল ব্যাধি। আলো নয়, আলেয়ার পেছনে ছুটছে অবিরাম। পানি নয়, ছুটছে মরিচিকার পিছনে। এই প্রাণহীন ফ্যাশনের জীবন তাদেরকে অবসাদ ও ক্লান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারছে না।

পর্দা মুসলিম নারীকে এক অনাকাঙ্খিত চাপ ও পীড়ন থেকে মুক্তি দেয়। ঘরের বাইরে যাবার সময় তাদেরকে মেকাপ করতে হয় না, চুলের ফ্যাশন ফাঁদতে হয় না। রঙিন পাউডার মাখাতে হয় না গণ্ডদেশে। মুখের লোম তুলতে হয় না। এমনকি গোসলহীন শরীর নিয়ে বেরুতেও তার বাধা নেই। কারণ, তাকে এই ভেবে আতংকিত থাকতে হয় না, আমার শরীর থেকে আমার অগোছালো কেশ, ছন্দহীন শরীর দেখে মানুষ কী ভাববে।

নাহিদ মুসতাফা আরো লিখেন: পর্দা প্রথা মুসলিম নারীদের মতে তাদের শারীরিক ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথেও কোন অন্তরায় না। কারণ, পর্দার কারণে মুসলিম নারীগণের শরীর সত্ত্বা অন্তরালে থাকে। তখন তাদের মর্যাদার বিচার হয় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। তখন তাদের শারীরিক অস্তিত্ব ও সৌন্দর্যই বিচার ও আকর্ষণের প্রধান মাপকাঠি বলে বিবেচিত হয় না। তাদের প্রধান বৈশ্যি ও গুণ হয় মেধা ও যোগ্যতা। আর শারীরিক আকর্ষণ সৃষ্টির নেশায় যারা রূপচর্চায় ডুবে থাকে আকণ্ঠ, তারা যে শুধু বিভিন্ন ব্যধির শিকার হয় তাই নয়, তারা সীমাহীন এবং মারাত্মক পর্যায়ে যৌন হয়রানিরও শিকার হয় যত্রতত্র, যখন তখন।

জরিপে দেখা গেছে আমেরিকায় প্রতি চারজন নারীর মধ্যে একজন জীবনে একবার হলেও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। কানাডার মতো শান্তিপূর্ণ দেশেও যেখানে কোন উগ্রতা নেই বলে দাবী করা হয়- সেখানে প্রতি ছয় মিনিটের মাথায় একজন নারী ধর্ষিতা হয়। আমাদের নারীদেরকে একথা বিশ্বাস করতেই হয়, যে কোন সরুগলিতে তার সম্ভ্রম নিরাপদ নয়। তাকে ভয়ে ভয়ে পা চলতে হয়। এটা নিশ্চয়ই একটা কঠিন নির্যাতন। আর এটা এমন নির্যাতন, যার ভিত্তিতে নারীদেরকে একমাত্র যৌনসামগ্রী ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না।

যদিও অনেক মুসলমান দেশেরও কুরআনের সাথে শক্ত বন্ধন নইে, তবুও কোন কোন মুসলিম সমাজ যেখানে কুরআনের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, সেখানে কিন্তু নারীরা এই জাতীয় পীড়ন ও নির্যাতনের শিকার নয়। এই ধরুন মিসর। পশ্চিমা ভাবধারার র্রা। দেশের প্রশাসন ধর্মমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক। অথচ ১৯৯০ সালের এক জরিপে মাত্র ১৭টি ধর্ষণের ঘটনার কথা রেকর্ড করা হয়েছে। আর একই বছরে ইসরাইলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৯টি।

আমার বোন আমাকে বলল, পাকিস্তানের গলি পথে যখন সে একজন মুসলিম নারী হিসেবে ঘুরে বেড়ায়, তখন সে যে নিরাপত্তা ও সম্মান অনুভব করে, তার আমেরিকার তিরিশ বছরে কখনো কল্পনাই করিনি। এটা সত্য, ইসলাম কোন কোন ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে পার্থক্য করে। তবে ইহুদী-খৃানদের মত নয়। তবে কুরআন বলেছে, নারী-পুরুষ উভয়কেই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং সৃগিতভাবে উভয়ই সমান মর্যাদার অধিকারী, তাদের সামাজিক মর্যাদাও বরাবর।

দুর্ভাগ্য, আমরা ইসলামকে আত্মহত্যার ধর্ম মনে করে বসে আছি। আমরা মনে করি, ইসলাম হলো দাড়িওয়ালা কিছু চরমপন্থীদের ধর্ম। মনে করি তারা আমাদেরকে পাথরের যুগের সভ্যতার দিকে নিয়ে যেতে চায়। এটা ইনসাফ বহির্ভূত চিন্তা আমাদের। সকল ধর্মেই কিছু লোক থাকে যারা সীমানা মানে না। তবে দ্রুত সম্প্রসারণ ও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে ইসলাম সর্বশ্রে তাওহিদী ধর্ম। সেই সাথে নারীকে দেয়ার মতো অনেক কিছুই আছে ইসলামে।

পাইরী ফ্রাইবাইটিস ছিলেন একজন আমেরিকান বিচারপতি। তিনি এখন থেকে প্রায় একশ বছর আগে বলেছিলেন, তেরশ বছর পূর্বে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারী, জননী, বিধবা ও কন্যাদেরকে যে মর্যাদা সম্মান ও অধিকার দান করেছেন, পাশ্চাত্যের আইন আজও তা নারীদেরকে দিতে পারেনি।

আমার বোনের ইসলাম গ্রহণ বছরের পর বছর আমাকে যন্ত্রনা দিয়েছে। সেই সাথে এটা আমার কাছে ছিল এক গভীর রহস্য। কারণ, আমি ভাবতে পারিনি, নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকারের আন্দোলনের একজন বিপ্লবী দুঃসাহসী নেত্রী কিভাবে এমন একটি ধর্মের কাছে নিজেকে সপে যে ধর্ম নারী বিরোধী। আর সে তো কোন অত্যাচার-নিপীড়ন কিংবা লোভের সামনেও মাথানত করার মতো মেয়ে নয়।

কিন্তু আমার বোনের সদ্য আগত কিছু পত্র পড়ে বুঝলাম, ইসলাম গ্রহণ করে সে মূলত এমন একটি সভ্যতাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে, যে সভ্যতা নারীকে পুরুষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। আর তার বিপরীতে সে এমন একটি সভ্যতার আশ্রয় নিয়েছে, যেখানে নারীকে নার হিসেবেই পুরুষের সমান মর্যাদা দান করা হয়। বলি: বোন সুখী হও। (বেদার ডাইজেস্ট, ফেব্রয়ারী ২০০৫ ঈ. মাসিক রহমত, মার্চ ২০০৫ ইং, পৃ.৪২)