প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
হযরত হামযা (রা.) নবীজীকে খুব ভালো করে জানতেন। জানতেন, তিনি কখনো মিথ্যা বলেন না। তিনি কাউকে ধোঁকা দেন না। কষ্ট দেন না। তাঁর চরিত্র সূর্যের মতো উজ্জ্বল। জীবনের কোথাও কলঙ্ক নেই। তাঁর প্রতি হযরত হামযা (রা.)-এর কোন সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ করবেন? হযরত হামযা শৈশব থেকে এক সাথে হেসে-খেলে বড় হয়েছেন। এখন তো টগবগে যুবক! কিন্তু এই বিশাল জীবনে কখনো কি তাঁকে রাগ হতে দেখেছেন? কঠোর হতে দেখেছেন? অনর্থক কথা বলতে দেখেছেন? দেখেননি!
হযরত হামযা তাকে ভালোবাসেন। হযরত হামযা তাঁকে বিশ্বাস করতেন!
তবে হামযা ছিলেন মুশরিক! বাপ-দাদার ধর্মের উপর ছিলেন হামযা। বাপ-দাদাদের ধর্ম ছেড়ে দেয়া কি সহজ! বিশেষ করে বীর হামযার জন্যে! মানুষ বলবে না, বাপ-দাদাদের ধর্ম ছেড়ে দিয়ে ভাতিজার ধর্ম ধরেছো? এতে হামযার আঘাত লাগবে! নেতা আবদুল মুত্তালিবের পুত্রের জন্যে এটা বড় মন্দ দেখায় না! এই লোকের ভয়েই হামযা পারছিলেন না- আমি মুহাম্মদকে বিশ্বাস করি। বলতে পারছিলেন না, মুহাম্মদের ধর্মই সত্য। বলতে পারছিলেন না, হাতের তৈরি ওই মূর্তিগুলোকে ভক্তি দিয়ে লাভ কি?
কিন্তু তাঁর ভাগ্য ছিল ভালো! তাঁর কপালে হেদায়াত ছিল! তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ছিল!
আচ্ছা, আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে কি কেউ অন্ধ করে রাখতে পারে? আটকে রাখতে পারে ওই মূর্তির খোঁয়াড়ে? পারে না! অবশেষে তাই হলো! এবং কিভাবে হলো সেই কথাই বলি, মন দিয়ে শোন!
মক্কায় একটি পাহাড় ছিল! ‘সাফা’ পর্বত তার নাম!
এই পর্বতের পাশেই বসে আছেন আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি সর্বদায়ই চিন্তা করেন, সারা জাহানের সবগুলো মানুষকে কিভাবে ‘মানুষ’ করা যায়। আজও সে কথা-ই ভাবছেন কোলাহলমুক্ত, নিবিড়-শান্ত সাফা পর্বতের পাশে বসে!
মক্কায় একজন ভয়ংকর খারাপ মানুষ ছিল! নামে মানুষ হলেও কাজে শয়তানের গুরু! নাম ছিল ‘বুদ্ধির বাবা’ আবুল হাকাম।
অবশেষে সে-ই হলো ‘মূর্খতার বাবা’ – আবু জাহেল।
আল্লাহর দ্বীনের সাথে বেঈমানী করলে এমনই হয়।
কী মতলবে যেন এই সাফা পাহাড়ের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল আবু জাহেল। নজর পড়ল আমাদের নবীজীর প্রতি। কপালপোড়া বেঈমানটি করল কি জানো! এগিয়ে গেল নবীজীর প্রতি। নবীজীকে খুব বকা-ঝকা করল। পবিত্র ইসলামকে পর্যন্ত যা-তা বলল! নবীজী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব! মুখ দিয়ে একটি কথাও বেরুচ্ছে না। কী বলবেন!
‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়,
তাই বলে কুকুরে কামড়ানো সে কি, মানুষের শোভা পায়?’
যারা ইতর তারা গালি দেয়!
ভদ্রলোকেরা শুনে থাকে, কিছু বলে না!
নবীজীও কিছুই বললেন না! তাকিয়ে রইলেন…
তারপর অমানুষটি করলো কি- একটি পাথর হাতে নিয়ে নবীজীর মাথায় ছুঁড়ে মারল! দরদরিয়ে বেরুতে লাগল তাজা টকটকে লহু। লহুতে ভিজে যাচ্ছে পবিত্র চাঁদের মতো মায়ামাখা মুখখানা! কী যে রহমতের ঢেউ ছিল বুকে তাঁর! তিনি একটি কটু কথাও বললেন না। বদ-দু’আও করলেন না!
চলে এলো আবু জাহেল!
পবিত্র কাবাঘরের সম্মুখে মক্কার কুরাইশদের যে বৈঠক বসে-সেখানে চলে এলো। মূর্খ নেতাদের অন্যতম আবু জাহেল। তাকে দেখেই তো সকলের সে কি খুশী!
তার সামান্য পরে…
এ পথেই ফিরছিলেন হামযা! শিকার থেকে ফিরছিলেন। কাঁধে ধনুক ঝুলছে। বীর-বিক্রমে হেঁটে চলেছেন কুরাইশী যুবক! শিকার মেলেনি বুঝি। তাই শিকারীর মন গাম্ভীর্যে শীতল! হাঁটছেন আনমনে!
এই পাহাড়েই থাকতো এক অবলা নারী!
নাম-ধাম নেই তার। কারণ সে দাসী! আবদুল্লাহ ইবন জুদআনের দাসী! সে লক্ষ্য করল হামযা আসছেন। মুহাম্মদের চাচা আসছেন। ভেতরটা তার মোচড় দিয়ে উঠল। কষ্ট ও ক্ষোভের যন্ত্রণাগুলো কূটকুট করে কলজেটায় কামড়াতে লাগল। আহা, বিনা অপরাধে মুহাম্মদকে কী অত্যাচারটা করে গেল বেঈমান আবু জাহেল।
সে ভাবল, ঘটনাটা হামযাকে বলা দরকার।
বীর হামযাকে বলা দরকার।
হোক না সে মুশরিক! নবীজীর চাচা না?
না, কথাটা হামযাকে বলতেই হবে।
নিচে নেমে এলো সে। হামযার একেবারে কাছে এসে ডাকল : ও উমারার বাবা!
‘আবু উমারা’ মানে উমারার বাবা। এটা হামযার ডাক না। পরিচিতজনরা তাকে এ নামেই ডাকে। ডাক শুনে হামযা মহিলার দিকে তাকালেন! অনেকটা চমকে ওঠার মতো!
কী, আমাকে ডাকছো?
হ্যাঁ, তোমাকেই তো!
কেন, কী হয়েছে!
যা হয়েছে তা যদি দেখতে…
আহা, বল না হয়েছেটা কি…
তারপর রাসূলুল্লাহ’র সাথে আবু জাহেল যে কাণ্ড ঘটিয়েছে সব খুলে বলল সে! শুনে তো হামযার মাথায় আগুন! রাগে রোষে ক্রোধে শরীর তাঁর কাঁপছে। এত্তো বড় সাহস! অবশেষে আমার ভাতিজার গায়ে হাত তুলল আবু জাহেল!
‘তাহলে তোমারও রক্ষে নেই আবু জাহেল।’ মনে মনে স্বগতোক্তি করলেন হামযা এবং তীরের বেগে হনহন করে ছুটলেন কাবার দিকে। পাষণ্ডটাকে ওখানেই পাওয়া যাবে। আর পাষণ্ডদের আড্ডায়! যেতে যেতে হামযার মনে পড়ল- ক’দিন পূর্বে একদিন নেতাদের আড্ডায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা তিনি শুনেছেন। সে দিনই হামযা সর্বপ্রথম লক্ষ্য করেছিলেন
ওদের কথায় কেমন যেন হিংসা, ভয় ও অস্থিরতা নড়ে-চড়ে উঠছিল। তাহলে কি ওরা এমন একটা কিছুর-ই চিন্তা করছিল। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কেমন যেন ভেতরটা আরও বিদ্রোহী হয়ে উঠল। এক রকমের সিদ্ধান্ত ও রূপান্তরের গন্ধও পেল সে তার ভেতরটার মধ্যে। হামযা এখন কাবার সম্মুখে।
চোখের তারা দুটো পাঞ্জেরীর মতো সতর্কতার সাথে গিয়ে পড়ল নেতাদের আড্ডায়। কোন বেগ পেতে হলো না আবু জাহেলকে খুঁজে বের করতে। তারপর সরাসরি গিয়ে দাঁড়ালেন আবু জাহেলের ঘাড়ের উপর। বসে আছে আবু জাহেল। সুতরাং কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ধনুকটি নামিয়ে এনে বেদম প্রহার। অপ্রস্তুত আবু জাহেল তো বেত্রাঘাতে দিশেহারা হতভম্ব। মজলিসের সকলেই ঠাডাপড়া মানুষের মতো বেকুব মুখ করে তাকিয়ে রইল হামযার প্রতি। কারও মুখেই কথা নেই। অতঃপর চিৎকার করে উঠলেন হামযা-ই।
আবু জাহেল! তুমি আমার ভাতিজাকে বকা-বাদ্যি করেছো!
তাহলে শোন! আজ থেকে আমিও তার সাথে আছি!
সে যা বলে আমিও তাই বলব!
যদি শক্তি থাকে, তাহলে আমাকে কিছু কর দেখি!
হামযার কথায় ঘোর কাটল সকলের। আবু জাহেলের গোত্রের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল। হামযার দিকে এগিয়ে গেল। আবু জাহেলের প্রতিশোধ নিতে। তারা বলে উঠল- হামযা! তুমি কি ছোট ছেলে হয়ে গেলে? বোকা হয়ে গেলে তুমি? কী সব বকছো?
হামযা (রা.) বললেন : আমি এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এবং তিনি যা বলেন তা সত্য! তোমরা যদি সত্যবাদী হও তাহলে আমাকে ঠেকাও দেখি!
আবু জাহেল বলল : আবু উমারাকে বলতে দাও! খোদার কসম! আমি তার ভাতিজাকে খুব মন্দ রকমের গালি দিয়েছি।
* * * * *
আবু জাহেলকে শায়েস্তা করতে পেরে রাগটা এখন ঠাণ্ডা।
ধীর কদমে ঘরে ফিরে এলেন হামযা (রা.)।
রাজ্যের যতো ভাবনা আছে সবই এখন তাঁর চিন্তার আকাশে। বলা যায়, হামযার ভাবনার আকাশে এখন এক বিশাল মেলা বসেছে। ভাবনার মেলা। চিন্তার মেলা। দুশ্চিন্তার মেলা। এই মেলার সকলের সাথে এসেছে শয়তানটাও। ভাবনার পোশাক পরে। আত্মমর্যাদার জামা-কাপড় গায়ে দিয়ে। সে হামযাকে বলছে : হামযা! তুমি তো কুরাইশদের নেতা! মুহাম্মদ একজন ছেলে মানুষ। তোমার-ই ভাতিজা! তার কথায় পড়ে বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে দিবে? আর ওই সারি সারি ভগবানই বা কি ভাববে। অভিশাপ দেবে না।
শয়তানের কথায় আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের মতো মূর্তির সারিবদ্ধ ছায়াগুলো হামযার স্মৃতিতে ভেসে উঠল! আসলেই কি ওরা কিছু করতে পারে? চিন্তায় পড়ে গেল হামযা।
‘এর চাইতে বরং মরে যাওয়াই ভালো।’ শয়তান শুধাল।
হামযা স্বগতোক্তি করলেন-
আমি কি করছি…
কোন দিকে যাচ্ছি আমি…
আমি কি মুসলমান হয়ে গেলাম…
কখন…
কিভাবে…
আত্মমর্যাদাবোধের এক কঠিন আঘাতে জ্বলে উঠেছিল হামযা।
তিনি মেনে নিতে পারেননি, তাঁর ভাতিজাকে কেউ মারবে আর তাঁর কোন সাহায্যকারী থাকবে না! তাছাড়া হাশেমী বংশেরও তো একটা মর্যাদা আছে। এ কারণেই আবু জাহেলের মাথাটা লাল করে দিয়েছে। নিজেকে মুসলমান বলে আবু জাহেলের আত্মাটাকে পিষে ফেলেছে।
অবশ্য এতে কোন সন্দেহ নেই, হামযা বিশ্বাস করতেন তাঁর ভাতিজা মিথ্যা বলেন না। তাঁর কোন উদ্দেশ্য ও মতলব নেই।
হামযা শুধু বীর-ই ছিলেন না। ছিলেন বুদ্ধিমান।
তাঁর অন্তরটা কাঁচের মতো পরিষ্কার ছিল।
তাই রাগের মাথায় যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো এখন তাঁকে প্রচণ্ডভাবে দোলা দিচ্ছে। ভাবতে বাধ্য করছে। সারা জীবন ভরে যে ধর্মকে মেনে এসেছেন তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কি সহজ?
হামযা এখন বিব্রত।
অথচ সিদ্ধান্ত একটা নিতেই হবে তাঁকে। অবশেষে আকাশের দিকে হাত তুলে মুনাজাত করলেন-
‘হে আল্লাহ! ইসলাম যদি সত্য হয় তাহলে আমার অন্তরে তার সত্যতা স্পষ্ট করে দাও! আর যদি তা না হয় তাহলে আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা কর।’
হামযা হাত তুলে কাঁদছেন।
দরদর করে চোখের পানি ঝরছে।
বুক ভেসে যাচ্ছে…
