প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
রাশিয়ান এক তরুণী। জন্ম খৃষ্টধর্মের রক্ষণশীল এক পরিবারে।
রুশ এক ব্যবসায়ী তাঁকে উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো এক দেশে ব্যবসায়িক এক সফরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। বলে, সঙ্গে আরও অনেক তরুণী থাকবে। উদ্দেশ্য, সেখান থেকে কিছু বৈদ্যুতিক পণ্যক্রয় করে রাশিয়ার বাজারে বিক্রি করা। তরুণী এই প্রস্তাবে দেশ ভ্রমণের আনন্দ ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। তাই সানন্দে বলে ওঠে, ঠিক আছে আমিও যাব। একদিন রওনা হয়ে যায় সবাই।
গন্তব্যে পৌঁছার পর ব্যবসায়ীর আসল চেহারা উন্মোচন হয়। নিয়ে আসা তরুণীদের শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার প্রস্তাব দেয় সে। সঙ্গে সঙ্গে লোভও দেখায় অনেক। গাড়ি, বাড়ি ও বিশাল অর্থসম্পদের রঙিন স্বপ্ন দেখায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়ার উৎসাহ দেয়। তার এই লোভনীয় অফারে ভেসে যায় সব তরুণী।
কিন্তু স্বীয়ধর্মের কট্টরপন্থী তরুণী এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ঘৃণাভরে। ব্যবসায়ী তরুণীর এ প্রত্যাখ্যানে কোনো রাগ করে না। শুধু তাঁর দিকে তাকায় আড়চোখে। আর বলে, এই মেয়ে! এখানে তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। এখানে তোমার কোনো মূল্য নেই। এখানে গায়ের কাপড় ছাড়া তোমার সঙ্গে আছে কী আর? আমার কথায় রাজি না হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ তোমার সামনে খোলা নেই। একটু ভেবে দেখো ভালো করে!
এভাবে তরুণীর ওপর শুরু হয় চাপাচাপি। তাঁর থাকার ব্যবস্থাও করা হয় অন্য সব তরুণীর সঙ্গে খালি এক ফ্ল্যাটে। কু-প্রবৃত্তি চরিতার্থকারী এ অসভ্য সবার পাসপোর্টও ছিনিয়ে নেয়।
দেখতে দেখতে সব তরুণীই যৌনখেলায় ভাসিয়ে দেয় গা। ব্যতিক্রম শুধু ওই এক তরুণীই। নিজের ইজ্জত ও সতীত্ব নিরাপদ রাখার সংগ্রামে সে থাকে অনড়। তার পাসপোর্ট চায় সে ফেরত। বলে, তাঁকে রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যবসায়ী বলে, না, তা কক্ষনো হতে পারে না। তোমাকে থাকতে হবে এখানেই এবং মেনেও নিতে হবে সব শর্ত আমার।
এরপরও নিরাশ হয় না তরুণী। সে শুধু তাকে সুযোগের সন্ধানে। এসে যায় কাক্সিক্ষত সেই সুযোগ। ফ্ল্যাটে থাকা সব তরুণীই বের হয়ে যায় ঘুরতে। সে এই সুযোগে পুরো ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে তাঁর পাসপোর্ট খুঁজে। নিরাশ হতে হতে একসময় পেয়েও যায় পাসপোর্ট। মনে সাহস নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা উঁকি দিয়ে দেখে। ধরা পড়ার আশঙ্কা কম। এখন কেউ নেই। সুতরাং এখানে আর থাকার কোনো অর্থ হয় না। কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে গোপনে বেরিয়ে পড়ে। দ্রুত এসে যায় রাস্তায়। গায়ের কাপড় ছাড়া কিছুই নেই তাঁর সঙ্গে। কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ায়। বুঝে উঠতে পারছে না যাবে কোথায়। করবে কী!
এখানে নেই কোনো স্বজন, নেই কোনো পরিবার-পরিজনের কেউ।
নেই টাকা-পয়সা।
নেই খাবার-দাবার।
নেই মাথা গুঁজার একটুখানি ঠাঁই।
কিন্তু এত কিছুর পরও সে থাকে শান্ত। কারণ, সে পেরেছে তাঁর সতীত্ব রক্ষা করতে। সে পেরেছে বিজয় লাভ করতে। বিজয় আসার ব্যাপারে সে ছিল সম্পূর্ণ নিশ্চিত। যার যত থাকে নৈতিক শক্তি, সে তত বেশি অনুভব করে প্রশান্তি। ঝড়ের কবলে পড়েও সে থাকে প্রশান্ত। এখন কি তাঁর জীবনে বয়ে যাচ্ছে না ঝড়! তবুও সে প্রশান্ত। মানুষ নামের এক জানোয়ার থেকে সে নিজের সতীত্ব রক্ষা করতে পেরেছে। সামনে হয়তো আরও আসবে ঝড়! আর সেই ঝড় পারবে কি তাঁকে কাবু করতে? না, পারবে না।
তরুণী দেখতে থাকে উদ্বেগমাখা চোখে এদিক-সেদিক। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি পড়ে এক যুবকের ওপর। যার সঙ্গে আছে তিনজন মহিলা কালো বোরকায় আবৃত। সম্ভবত এরা তার মা-বোন। এদের নিয়ে কোথাও যাচ্ছে যুবক। তরুণীর মন বলে, মোটামুটি নির্ভর করার মতোই এক যুবক। তাই এগিয়ে যায় ধীর পায়ে তাঁর দিকে।
রাশিয়ান ভাষায় কিছু বলে। কিন্তু যুবক বলে তাঁর ভাষা সে বুঝতে পারছে না। তখন তরুণী বলে, আপনি কি ইংরেজি জানেন?
যুবক বলে, হ্যাঁ, জানি।
মেয়েটি এবার কেঁদে কেঁদে বলে, আমি এক অসহায় প্রবাসিনী। আমার বাড়ি রাশিয়ায়। তারপর জড়িয়ে আসা কণ্ঠে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বলে তাঁকে। সবশেষে বিনয়ের সঙ্গেবলে, এখন আমি আমার দেশে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু আমি এখন নিঃস্ব। কোনো টাকা-পয়সা নেই আমার কাছে। থাকার কোনো জায়গা নেই আমার। আমি আপনাদের কাছে কিছুই চাই না, চাই শুধু একটুখানি থাকার আশ্রয়। তাও দুই তিন দিনের জন্য। এর মধ্যেই আমি আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা উপায় বের করে নিব।
যে চারজনের কাছে তরুণী আশ্রয় প্রার্থনা করছে, তারা মা-ভাই ও দুই বোন। যুবকের নাম খালেদ। তরুণীর অশ্রুভরা মিনতি খালেদের মনে দাগ কেটে যায়। তারও চোখের পাতা আসে ভিজে। ভাবে, এ যদি রাশিয়ান কোনো মেয়ে না হয়ে আমার বোন হতো! তাহলে আমি কী করতাম? কিন্তু আবেগে ভেসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না তাঁর। তাই সহজেই তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে না খালেদ। ভাবে, সে যদি কোনো প্রতারক হয়! একটু নীরব থেকে মা ও বোনদের সঙ্গে পরামর্শ করে সে। মেয়েটি তখন খালেদের দিকে মিনতিভরা চোখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। আর চোখ থেকে ঝরতে থাকে শুধু অশ্রু আর অশ্রু। এ অবস্থা দেখে বাসায় নিয়ে যাওয়ার পক্ষেই মত দেয় সবাই। এবং তাঁকেসহ সবাই রওনা হয়ে যায় বাসার দিকে।
একটু আগের মিনতিভরা চোখে এখন কৃতজ্ঞতার ছায়া নেমে আসে। আশ্রয় পাওয়া মানুষের কৃতজ্ঞ চাহনি, যা সতীত্ব রক্ষার মহিমায় ভাস্কর। বাসায় এসে তরুণী রাশিয়ায় নিজের পরিবারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। একবার, দুবার, বারবার। কিন্তু পাওয়া যায় না কোনো সাড়া। হয়তো টেলিফোন খারাপ, না হয় টেলিফোনের কাছে কেউ নেই। তারপরও সে অব্যাহত রাখে চেষ্টা।
এর-ই মধ্যে খালেদের পরিবার জানতে পারে, তরুণী খৃষ্টান। অবশ্য এতে ব্যবহারে কোনো ধরনের পার্থক্য হয় না; বরং ‘বিজাতীয় অতিথি’ হিসেবে ওর সঙ্গে তাঁদের ব্যবহার হয়ে ওঠে আরও সৌজন্যমূলক। বোনেরা ওঁকে বানিয়ে নেয় নিজেদের গল্পসঙ্গিনী। তরুণীও সবাইকে গ্রহণ করে নেয় আপনজন করে। সবার নিবিড় সখ্যতায় মুগ্ধ হয়ে পড়ে সে। পরের বাড়িকেই মনে করতে থাকে নিজের বাড়ি।
মুসলমানদের কাজ মানুষদের ইসলামের দিকে আহ্বান করা। খালেদের পরিবারও তরুণীকে ইসলামের দিকে ডাকে। কিন্তু সাড়া দেয় না সে। ধর্ম নিয়ে কোনো বিতর্কেও জড়াতে চায় না সে। কেননা, সে ছিল মনেপ্রাণে কট্টরপন্থী এক খৃষ্টান। ধর্ম পরিবর্তন করা তাঁর জন্য কঠিন। তবে খালেদের পরিবারও হাল ছাড়তে রাজি নয়। খালেদ ছুটে যায় স্থানীয় এক ইসলামি দাওয়া সংস্থার অফিসে। সেখান থেকে নিয়ে আসে রুশ ভাষায় লিখিত ইসলাম সম্পর্কীয় কিছু গ্রন্থ। সেসব গ্রন্থ পড়তে দেয় তরুণীকে। এবার আর না বলতে পারে না সে। বরং শুরু করে পড়া। পড়তে পড়তে দেখে, খারাপ লাগছে না তো! ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি তার কৌতূহল বাড়তে থাকে। আর প্রভাবিত হতে থাকে।
এভাবে গড়াতে থাকে সময়। সঙ্গে চলতে থাকে পরিবারের পক্ষ থেকে চেষ্টা, সাধনা, কৌশল ও দোয়া। অবশেষে তরুণীর মন যায় গলে। ‘ইসলাম’ কবুল করে হয় ধন্য! ইসলাম-ই এখন তাঁর ভালোবাসা। ইসলাম-ই এখন তাঁর অনুরাগ। ইসলাম-ই এখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। আমুল বদলে যায় তাঁর জীবন।
এখন সে দীন শেখায় হয়ে ওঠে একজন নিবেদিত প্রাণ। পুণ্যবতী নারী-সংশ্রব তাঁর কাছে এখন লোভনীয়।
দেশে ফিরে যেতে এখন আর মন চায় না তাঁর। দেশে গেলে মা-বাবা জোর করে ওঁকে খৃষ্টধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে আবার। কে চায় আলো থেকে আঁধারে যেতে? কিন্তু এ অবস্থায় আরেকজনের গৃহেইবা থাকা যায় কয়দিন? তাঁর চেহারায় ফুটে ওঠে দুশ্চিন্তার বিষাদময় রেখা। এ দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ কি তাঁর সামনে আছে খোলা? না, সে জানে না। কিছুই জানে না সে।
বিবাহ
অবশেষে তাঁর সামনে সবচেয়ে প্রশস্ত পথটি খুলে যায়। আর সেই পথে-ই ঘুরতে থাকে এখন তাঁর জীবনের চাকা। কিছুদিন পর বিবাহ হয়ে যায় তাঁর খালেদের সঙ্গে। অবসান হয় সকল দুশ্চিন্তার। এমন স্ত্রী পেয়ে খালেদ যেমন খুশি, তেমনি হাবুডুবু খাওয়া দরিয়ার তীর খুঁজে পাওয়ার আনন্দে তরুণীও বেশ খুশি। জীবনের অঙ্ক এত চমৎকারভাবে সাধারণত কখনো মিলে না। তবে মিলে তখনই যখন থাকে কুদরতের ইশারা! এখানেও ছিল আসমানি সেই ইশারা! সতীত্ব ও সম্মানকে যারা সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর, কুদরতের সহযোগিতাও হয় নিত্যসঙ্গী তাঁদের। না হয়, সে রাশিয়ান তরুণীর হওয়ার কথা ছিল অন্যের শয্যাসঙ্গিনী, কেন হবে সে একজন ইসলাম প্রচারিনী?
এই হিজাব-ই প্রকৃত হিজাব
তরুণী স্বামী খালেদের সঙ্গে যায় এক বিপণিবিতানে। সেখানে সে দেখে এক হিজাবপরা মহিলাকে, যার চেহারা সম্পূর্ণ আবৃত ছিল। এ প্রথম সে কোনো এক পূর্ণ হিজাবপরা মহিলাকে দেখে। তাই হিজাবের অচেনা আকৃতি দেখে ভীষণ অবাক হয় সে।
বলে, খালেদ! এ ভদ্র মহিলা এমন করে পুরো মুখ ঢেকে রেখেছে কেন? তাঁর চেহারা কি এসিড দগ্ধ? যা প্রকাশ করতে লজ্জা পাচ্ছে সে?
খালেদ বলে, না না, ইনিই পরেছেন আসল হিজাব। এ হিজাব-ই প্রকৃত হিজাব! এমন হিজাবেরই নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তরুণী বলে, ও হ্যাঁ, আমার কাছে আগে এত স্পষ্ট ছিল না ব্যাপারটা। মূলত এটাই ইসলামি হিজাব হওয়া উচিত। এমন হিজাব-ই চান আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে।
খালেদ বলে, তুমি বুঝলে কি করে?
শোনো! আমি এখানে আসার পর যে মার্কেটেই গিয়েছি, দেখতে পেয়েছি; একদল মানুষ হাঁ করে আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে। অবনত দৃষ্টি হয়-ই না। যেন ওরা গোগ্রাসে খেয়ে ফেলবে আমার চেহারাকে। এতে আমি বুঝতে পেরেছি আমার চেহারা সম্পূর্ণরূপে ঢেকে রাখতে হবে। স্বামী ও নিকটাত্মীয় ছাড়া আর কেউ আমার মুখাবয়ব দেখতে পারবে না। আজ থেকে আমি পূর্ণ ইসলামি হিজাব না পরে আর কোনো মার্কেটে যাবো না। বাইরেও বের হবো না। বলো, কোথায় পাওয়া যাবে এই হিজাব?
খালেদ বলে, আমার মা-বোনদের মতো মুখ খোলা হিজাব-ই তুমি আপাতত পরো!
তরুণী বলে, না না, তা হয় না। আমি এখন মুসলমান। পূর্ণ মুসলমান। তাহলে আমার হিজাব কেন হবে, অপূর্ণ? ওই হিজাবই পরতে চাই আমি, যা পছন্দ করেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এভাবেই গড়িয়ে যায় সময়। তরুণীর ইমান-আমলও বাড়তে থাকে দিন দিন। খালেদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি দয়া ও দরদের এবং প্রেম ও ভালোবাসার ছিল না কোনো কমতি।
স্ত্রীও খালেদের মনের ঠিকানা করে নেয়। আনুগত্য ও ভালোবাসার পাপড়ি ছড়িয়ে ছড়িয়ে। স্বামীর সরব ও নীরব অনুভূতির সঙ্গে কথা বলে বলে। খালেদের পরিবার ভীষণ খুশি। তারা ভাবে, সেদিন রাস্তায় আমরা রাশিয়ান কোনো এক তরুণী আবিষ্কার করেছিলাম, নাকি পেয়েছিলাম জীবন্ত কোনো এক হীরকখণ্ড?
বেশ কিছুদিন পরের কথা। তরুণী নিজের ‘পাসপোর্ট’ বের করে দেখে, মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। অতিসত্তর নতুন ‘পাসপোর্ট’ তৈরি করতে হবে। এবং রাশিয়ায় গিয়ে নিজের জেলা শহর থেকে তা করে আনতে হবে। অতএব রাশিয়ায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাঁর সামনে। অন্যথা এখানে বসবাস হয়ে যাবে অবৈধ তাঁর। স্বামী-স্ত্রী পরামর্শ কর্ েখালেদও সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর সঙ্গে যাওয়ার। কারণ, মহিলাদের মাহরাম ব্যতীত একাকী সফর করার বা দূরে কোথাও যাওয়ার ‘ইসলামি শরিয়ত’ অনুমোদন দেয় না।
রাশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে রাশিয়ার উদ্দেশে উভয়ে রওনা হয়ে যায়। পূর্ণ ইসলামি হিজাবে আবৃত হয়ে-ই বিমানে ওঠে তরুণী। বসে আছে স্বামীর পাশে বুকভরা এক গর্ব নিয়ে। আর পর্দা তো এখন তাঁর কাছে গর্বেরই এক বিষয়।
খালেদ স্ত্রীর পাশে গিয়ে বলে, তোমার পর্দার কারণে এখানে সমস্যায় পড়তে পারি আমরা। এরপর স্ত্রী বলে, তবে কি তুমি চাও আমি আল্লাহর বিধানকে অমান্য করি? না আমি কিন্তু কখনো আল্লাহর হুকুমকে অমান্য করতে পারব না। আমি কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা করি না।
সত্য হয় খালেদের শঙ্কাই। বিমান আরোহীরা বাঁকা চোখে ওর স্ত্রীর দিকে তাকাতে থাকে। বিমানবালা খাবার পরিবেশন করে। খাবারের সঙ্গে দেয় মদ। মদ খেয়ে মদ্যপরা শুরু করে মাতলামি। এদিক-ওদিক থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে করতে থাকে বিভিন্ন কটুক্তি। কেউ তিরস্কার করে। কেউ মুখ টিপে হাসে। কেউ ঠাট্টা-বিদ্রƒপে মেতে ওঠে। কেউ তাঁর পাশে ঢুলতে ঢুলতে এসে দাঁড়ায়।
কিন্তু খালেদ কিছুই বুঝতে পারছে না, কী করবে সে! কারণ, সব কিছুই বলা হচ্ছে রুশ ভাষায়। সে মনে মনে ক্ষুদ্ধ হচ্ছে, ফুঁসে উঠছে। অথচ তাঁর স্ত্রী মৃদুভঙ্গিতে হাসছে। ওদের কিছু কিছু কথা তরুণী খালেদকে অনুবাদ করে শোনায়। অনুবাদ শুনে খালেদের শরীর আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কিন্তু স্ত্রী তাঁকে শান্ত থাকতে বলে। আরও বলে, সাহাবায়ে কেরাম দীনের জন্য যে কষ্ট সহ্য করেছেন এবং যে নিপীড়ন সয়েছেন, সেই তুলনায় আমরা কী করছি বা কী সইছি?
এরপর উভয়ে ধৈর্য ধরে। এবং ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। একসময় বিমান আপন গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
রাশিয়ায়
এর পরের ঘটনা শুনি আমরা খালেদের মুখে, বিমানবন্দরে নামার পর ধারণা ছিল তাঁর মা-বাবার কাছেই যাব আমরা এবং সেখানেই অবস্থান করব। এর মাঝে ‘পাসপোর্ট’ নবায়নের যাবতীয় কাজ সেরে আবার আপন ঠিকানায় ফিরে আসব। কিন্তু আমার স্ত্রী ভিন্ন কিছু ভাবে। সে আমাকে বলে, আমার পরিবার কট্টরপন্থী খৃষ্টান। তাই সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না। আমরা বরং একটা ভাড়া বাসা নিই। সেখান থেকেই আমাদের যাবতীয় কাজ সেরে নিব। ফিরে যাওয়ার পূর্বে তাঁদের খোঁজখবর জেনে যাব।
আমি দেখি তাঁর পরামর্শ-ই যুক্তিযুক্ত। তাই আমরা ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিই। এবং সেখানে উঠি।
পরদিন যাই ‘পাসপোর্ট’ অফিসে। অফিসারের নিকট আমাদের সব বিষয় খুলে বলি। তিনি আমাদের বলেন, পুরোনো পাসপোর্ট দিতে ও সদ্যতোলা ছবি অফিসারের সামনে বের করে দিই। সর্বাঙ্গ হিজাবে ঢাকা, শুধু চেহারা ব্যতীত। অফিসার বলে, না। এ ছবি চলবে না। রঙিন ছবি দিতে হবে। সেই ছবিতে চেহারা, চুল ও কাঁধ খোলা থাকতে হবে। কিন্তু আমার স্ত্রী সাদাকালো ছবি ছাড়া অন্য কোনো ছবি দিতে রাজি হয় না। তাই প্রথম অফিসারের কাছে আমরা হই ব্যর্থ। তারপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় অফিসারের কাছে যাই। কিন্তু কাজ হয় না কোনো অফিসারের নিকটেই। সবাই অনাবৃত রঙিন ছবি চায়। এ অবস্থায় আমার স্ত্রী বলে, আমি কোনো অবস্থাতেই অনাবৃত রঙিন ছবি দিতে পারব না।
তখন অফিসার বলে, তাহলে পাসপোর্টও নবায়ন করতে পারবেন না আপনি।
এরপর আমরা শরণাপন্ন হই বিভাগীয় প্রধানের কাছে। তিনি ছিলেন একজন মহিলা অফিসার। আমার স্ত্রী তাঁকে অনুরোধ করে, এ ছবিই গ্রহণ করতে। কিন্তু তিনিও না করে দেন। তবে আমার স্ত্রী হাল ছাড়তে রাজি নয়। বরং তাঁকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে। বলে, আপনি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না? যে ছবি আপনাকে দিলাম, তার সঙ্গে আমাকে একটু ভালো করে মিলিয়ে নেন না, চেহারাই তো আসল। চুল একসময় বদলে যায়, চেহারা তো আর দ্রুত বদলায় না। আমি মনে করি, এ ছবিই তো যথেষ্ট। অনাবৃত রঙিন ছবির কোনো প্রয়োজন নেই।
পরিচালক তবু না-ই করে দিলেন। বললেন, প্রশাসন এটা অনুমোদন করবে না। আমাদের কিছুই করার নেই। আমার স্ত্রী বলে, আমি এ ছবি ছাড়া অন্য ছবি দিতে পারব না। এবার বলুন, এর সমাধান কী?
পরিচালক বলেন, আমার নিকট এ সমস্যার কোনো সমাধান নেই। এর সমাধান দিতে পারবে একমাত্র মস্কোর প্রধান ‘পাসপোর্ট অফিসে’র মহাপরিচালক। সেখানে গিয়ে আপনি চেষ্টা করতে পারেন।
এরপর আমরা ‘পাসপোর্ট অফিস’ থেকে বেরিয়ে আসি। আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বলে, খালেদ! চলো আমাদের মস্কো যেতে হবে! আমি বলি, মস্কো যাওয়ার দরকার নেই, তুমি বরং হিজাববিহীন রঙিন ছবি তুলেই ওদের দিয়ে দাও। মানুষকে নিজের ওপর সাধ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দিতে নিষেধ করেছেন আল্লাহ। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো! যতটুকু পারো সাধ্যের মধ্যে থেকে করো। এটা তো একটা প্রয়োজন। তা ছাড়া তোমার পাসপোর্ট তো আর সবাই দেখবে না; নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া। তাও দেখবে আবার প্রয়োজনের খাতিরে। তারপর তুমি নিজের পাসপোর্ট রেখে দিও নিজের কাছেই। মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ আর তা দেখতে চাইবে না তোমার কাছে। অতএব তুমি ব্যাপারটা সহজভাবে নাও, তাহলে আর মস্কো যাওয়া লাগবে না।
কিন্তু সে নিজের সিদ্ধান্তে থাকে অনড়।
না! হিজাবহীন ছবি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, এখন আমি দীন বুঝি! পর্দার মাহাত্ম্য বুঝি! পর্দা আল্লাহর হুকুম! একদল বেইমানের কারণে আমি আমার রব-এর হুকুম অমান্য করতে পারি না। আর করবও না কখনো-ই। ফলাফল যা হয় হোক।
[চলমান]
