প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘সংখ্যায়

গৌরবময় ইসলামের ইতিহাসের সোনালী পাতা থেকে

মানব ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত শহরগুলোর ভেতর কনস্টান্টিনেপল তথা আজকের ইস্তাম্বুল শহরটি অন্যতম। শহরটির সৌন্দর্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য ইউরোপীয়দের নিকটও এ শহরের গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। বায়জেন্টাই সাম্রাজ্যের অহংকার হিসেবে বিবেচিত এ শহরটি অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিও বটে। ইউরোপীয়দের কাছে রোমের পরই ছিল এর গুরুত্ব। তাই কনস্টান্টিনেপল শহরটিকে ‘দ্বিতীয় রোমও’ বলা হতো।

অপূর্ব প্রকৃতি সুন্দর্যমণ্ডিত এবং ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ শহরটির মুসলিমদের হস্তগত হওয়ার আগাম ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

নিশ্চয়ই তোমরা কনস্টান্টিনেপল জয় করবে। তার নেতা কতই না চমৎকার/উত্তম আর তার বাহিনী কতই না উত্তম। (মুসনাদে আহমদ)

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভবিষ্যৎবাণীকে সত্যে পরিণত করেছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক মহান বীর সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ।

সময়টা ছিল ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দ। অটোমান সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ সুলতান ২য় মুরাদের মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহন করলেন তারই সুযোগ্য পুত্র সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ। সিংহাসনে আরোহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। যদিও সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ এর পূর্বে প্রায় সকল অটোমান সুলতানগণ কনস্টান্টিনেপল বিজয়ের আশা করতেন। কিন্তু কেউ তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হননি। তবে তারা বলকানের বিশাল এলাকা ইসলামি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সিংহাসনে আরোহন করেই সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ কনস্টান্টিনেপল বিজয়ের সংকল্প করেন। তাছাড়া বলকানের বার বার পরাজিত ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনেপলকে কেন্দ্র করেই অটোমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে মেতে উঠে। তাদের এসব কর্মকাণ্ড সুলতানকে কনস্টান্টিনেপল অভিযান ত্বরান্বিত করতে বাধ্য করে।

তৎকালীন সময়ে কনস্টান্টিনেপল ছিলো বায়জেন্টাইনদের দখলে। শহরটির শাসক ছিলেন গ্রিক সম্রাট কনস্টান্টাইন। তিনি শোষক হিসেবে খ্যাত ছিল কনস্টান্টিনেপল শহরটি ছিলো ত্রিকোণাকার। শহরটি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। এর দুদিকে ছিল সাগর আর একদিক পরিখা ও সুপ্রশস্ত উঁচু দেয়াল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। পরিখাগুলোর গভীরতা ছিল ৩০ ফুট। এছাড়া শহরটির বহিঃদেয়াল ছিল ১২ ফুট এবং অন্তঃদেয়াল ছিল ১৮ ফুট চওড়া।

কনস্টান্টিনেপল বিজয়ের লক্ষে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ সকল প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এবং সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে সুলতান বসবাকরাসের নিকট রুমেলিয়ায় এক দুর্ভেদ্য দূর্গ নির্মাণ করলেন।

এছাড়া কনস্টান্টিনেপলকে সুরক্ষা দানকারী প্রকাণ্ড দেয়ালগুলো ভাঙতে সুলতান কামান বানাবার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করলেন। তিনি হাঙ্গেরিয়ার প্রযুক্তিবিদ উরবানের সহায়তায় নির্মাণ করলেন শক্তিশালী কামান। কামানগুলো আকারে এতটাই বড় ছিলো যে তার প্রতিটিকে টানতে ৫০ জোড়া ষাড়ের প্রয়োজন হতো। তিনি ৩২০টি রণতরীর মাধ্যমে শক্তিশালী একটি নৌবাহিনীও গঠন করলেন। আর গঠিত হলো এক লক্ষ সত্তর হাজার সদস্যের বিশাল সেনাবাহিনী।

এই বিশাল বাহিনী নিয়ে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ ১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল কনস্টান্টিনেপল অবরোধ করলেন।

এদিকে গ্রিক সম্রাট কনস্টান্টিইনও বিপুল প্রস্তুতি শুরু করলেন। তিনি ইউরোপের সকল ক্রুসেডারদের তার পক্ষে যুদ্ধ করতে আহ্বান জানালেন।

সুলতান সম্রাটকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে শহরটি সমর্পন করার আহ্বান জানালেন কিন্তু সম্রাট তা প্রত্যাক্ষান করলে ৭ই এপ্রিল ফজর নামাজের পরে সুলতান গোলাবর্ষণ করার নির্দেশ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো অটোমানদের নির্মিত প্রকাণ্ড কামানগুলো হতে গোলাবর্ষণ। গোলার আঘাতে নগর দেওয়ালগুলোতে ভাঙন ধরতে শুরু করলো। আক্রমণের পর আক্রমণ করতে লাগলো মুসলিম সেনারা। কিন্তু কোনভাবেই নগর দেওয়ালগুলো তারা অতিক্রম করতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে ক্রসেডারদের পক্ষ থেকে জেনায়া হতে রণসম্ভারসহ সম্রাটের সাহায্যার্থে ৪টি যুদ্ধ জাহাজ আগমন করলো। কিন্তু সুলতানের নৌবাহিনী এ যাত্রায় জাহাজগুলো ধরতে ব্যর্থ হন। সুলতানের নৌবাহিনী নগরীর পোতাশ্রয়ে পৌঁছাতে সফল হচ্ছিলো না। নৌপথ ছিল শেকল এবং শত্রু দ্বারা অবরুদ্ধ। সুলতান উপলদ্ধি করলেন যে, যদি জাহাজগুলো পোতাশ্রয়ে না নেওয়া যায় তবে যুদ্ধ জয় অসম্ভব।

এ পরিস্থিতিতে সুলতান মুহাম্মাদ এমন এক সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন যা মানব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

তিনি জলপথ বন্ধ থাকায় স্থলপথে জাহাজগুলো পোতাশ্রয়ে নেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। সিদ্ধান্ত মতো পাহাড়ি বনজঙ্গল পরিষ্কার করে তাতে গাছের তক্তা বিছিয়ে প্রায় ১০ মাইল দীর্ঘ রাস্তা তৈরি করলেন। তক্তাগুলো মেষ ও গরুর চর্বি দিয়ে পিচ্ছিল করা হলো। রাতের আধারে ওসমানীয় বীর সৈনিকগণ প্রায় ৮৮টি যুদ্ধ জাহাজ সেই রাস্তা দিয়ে পোতাশ্রয়ে নামালো। শিকলটি অতিক্রম করতে তুর্কি সেনারা এরূপ চরম ত্যাগ স্বীকার করলেন।

এবার সুলতান স্থলপথেও প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করলেন। তুর্কিদের কামানের গোলায় চুর্ণ বিচূর্ণ হতে শুরু করলো নগর রক্ষাকারী দেওয়ালগুলো। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে এভাবেই শহরের দুদিক হতে আক্রমণ শুরু হলো।

প্রথম আক্রমণ ব্যর্থ হলে আনাতোলিয়ার সেনাদল দ্বিতীয়বার আক্রমণ করলেন। এবারও বিশেষ সফলতা না আসায় সুলতান নিজে তার সুদক্ষ জেনিসারি বাহিনী নিয়ে চরম আঘাত হানলেন। দু ঘণ্টা ধরে গ্রিকগণ প্রতিরোধ গড়লেও অবশেষে তারা ব্যর্থ হলো। সেনাপতি বোয়াসটিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রে মারাত্মক আহত হয়ে রণাঙ্গন ত্যাগ করেন। সৈন্যদের মনোবল ঠিক রাখতে সম্রাট যুদ্ধক্ষেত্রে আগমণ করেন। কিছু সময় পর সম্রাট সুলতানের বাহিনীর আক্রমণে নিহত হলেন। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ক্রসেডাররা পলায়ন শুরু করলো। মহাবীর “উলুবাতলে হাসান” ইসলামের পতাকা হাতে করে নগর দুর্গের মূলফটকে পৌঁছলেন। প্রায় ২৭টি তীর তার শরীরে বিদ্ধ হলো। ইসলামের পতাকা প্রধান ফটক প্রাচীরে গেঁথে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

এদিকে তুর্কি সেনাগণ বীরদর্পে নগরীতে প্রবেশ করতে শুরু করলেন। অল্প সময়ে তারা পুরো নগরীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। সেই সাথে পূরণ হলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত ভবিষ্যৎবাণী। কনস্টান্টিনেপল মুসলিমদের পূর্ণ অধিকারে চলে আসলো। সুলতান ফাতিহ মাহমুদ নগরমুক্ত করেই শহরের প্রধান কেন্দ্র আয়াসোফিয়ায় প্রবেশ করলেন এবং শুকরিয়া স্বরূপ নামাজ আদায় করলেন। তিনি নগরীর সকল মানুষের জীবন ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেবার অঙ্গীকার করলেন। তিনি কনস্টান্টিনেপলের নতুন নাম দিলেন ইসলামবুর তথা ইসলামের শহর। (তুর্কি ভাষায় ইস্তাম্বুল)। তিনি রাজধানী আদ্রিয়ানোপল হতে ইস্তাম্বুলে স্থানান্তর করলেন। এ শহরকে তিনি জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, ধর্ম ও দর্শনের তীর্থকেন্দ্রে পরিণত করেন।

মহান এ বিজয়ের পর তিনি ‘ফাতিহ’ তথা ‘বিজয়ী’ খেতাবপ্রাপ্ত হন।
কনস্টান্টিনেপল বিজয় ছিল ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয়। মহান এ বিজয় অর্জনের ফলে সুলতান মাহমুদ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে নিজ নাম স্থাপন করেন। তাঁর প্রজ্ঞা ও সাহসিকতাপূর্ণ নেতৃত্বের মাধ্যমই বাস্তবায়িত হয়েছিল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যৎবাণী।

মহান বিজয় হতে আমাদের শিক্ষা

* সফলতা অর্জনের সেরা সময় যৌবনকাল।
* প্রজ্ঞা এবং সাহসিকতা সফলতার পূর্বশর্ত।
* প্রত্যয়, ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমেই সফলতার আগমন ঘটে।
* মুসলিমদের এগিয়ে যাবার জন্য জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে হবে।
* সর্বোপরি আল্লাহর ওপর প্রবল বিশ্বাস স্থাপন করে চরম আত্মপ্রত্যয়ের সাথে এগিয়ে গেলে সফলতা অবশ্যম্ভাবি।