প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

ইসলামী আরবী ক্যালেন্ডারের সর্বশেষ মাস হলো যুলহাজ্জ মাস। এ মাসেই হাজ্জীগণ হজ্জ আদায় করেন। এ মাসের ৮ তারিখ থেকে হজ্জের কার্যক্রম শুরু হয়। ৮ তারিখেকে ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বা পানি পানের দিবস বলে। এ দিবসেই হাজীগণ মক্কা থেকে মিনায় গমন করেন। পরদিন ৯ই যুলহজ্জা ইয়াওমু আরাফা বা আরাফাতের দিবস। এ দিবসে সকালে হাজীগণ মিনা থেকে আরাফাতের মাঠে গমন করেন এবং সারাদিন আরাফাতে অবস্থান করে আল্লাহর যিকর ও দুআয় রত থাকেন। রাতে তারা মুযদালিফায় ফিরে আসেন এবং পরদিন সকালে ১০ই যুলহাজ্জ তারা মিনায় জামারাতে কাঁকর নিক্ষেপ, মাথা মুণ্ডন, হজ্জের পশু জবাই বা হাদয়ী ও কুরবানী আদায়, তাওয়াফ-সায়ী ইত্যাদি হজ্জের আহকাম পালন করেন। পরবর্তী ২ বা ৩ দিন তারা মিনাতেই অবস্থান করেন।

যারা হজ্জে গমন করেন না, তাদের জন্যও যুলহাজ্জ মাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের দশ তারিখে আমরা ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ আদায় করি। এ ছাড়াও এ মাসের প্রথম দশটি দিন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফযীলতের দিন, যে বিষয়ে আমাদের অনেকেই সচেতন নই। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, যুলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয়। সহীহ বুখারী অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

مَا مِنْ أيًامٍ الْعَمَلُ الصاًلِحُ أحَبُ ﺇلَى الله مِنْ هَذِهِ اﻷيًامٍ يَعْنيِ أيًامٍ الْعِشْرِ قَالُوا يَا رَسُولَ الله وَلا الْجِهَادُ فِي سَبِيْلِ الله قَالَ وَلا الْجِهَادُ فِي سَبِيْلِ الله ﺇلا رَجُلّ خَرَجَ بِنَفْسِهش وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِك بِشَيْءٍ

“যুলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করা আল্লাহর নিকট যত বেশি প্রিয় আর কোনো দিনের আমল তাঁর নিকট তত প্রিয় নয়। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর পথে জিহাদও কি এ দশদিনের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট প্রিয়তর নয়? তিনি বলেন, না, আল্লাহর পথে জিহাদও প্রিয়তর নয়, তবে ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যে ব্যক্তি নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে রেরিয়ে গেল এবং কোনো কিছুই আর ফিরে এলো (সম্পদও শেষ হলো, সেও শহীদ হলো)।”
অন্য হাদীসে তিনি বলেন:

أفضَلُ أيًامِ الدُّنْيَا الْعَشْرُ يَعْنِيْ عَشْرَ ذِيْ الْحَجَّةِ

“দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ফযীলতের দিন হলো যুলহাজ্জ মাসের প্রথম এ দশ দিন।”
যয়ীফ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এই দশ দিনের প্রতি দিনের সিয়াম এক বৎসরের সিয়ামের তুল্য এবং প্রত্যেক রাতে নামায বা কিয়ামুল্লাইল লাইলাতুল কাদরের নামাযের তুল্য। অন্য একটি দুর্বল হাদীসে বলা হয়েছে, এই দশ দিনের নেক আমলের ৭০০ গুণ সাওয়াব প্রদান করা হয়। অন্য একটি যরীফ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেছেন, কথিত আছে যে, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন এক হাজর দিনের সমান এবং বিশেষত আরাফার দিন ১০ হাজার দিনের সমান।

এভাবে আমরা দেখছি যে, যুলহাজ্জ মাসের এ দশটি দিন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিনগুলিকে অবহেলায় নষ্ট করার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছুই হতে পারে না। প্রত্যেক মুমিনের চেষ্টা কর দরকার এদিনগুলিতে বেশি বেশি নেক আমল করার। সকল প্রকার ইবাদতই নেক আমল। ফরয ইবাদত তো সঠিক সময়ে সঠিকভাবে করতেই হবে। ফরযের জন্য ফযীলতের সময় খোঁজা মুশকিল। এজন্য নেক আমল বলতে সাধারণত সকল প্রকারের নফল আমলই বুঝানো হয়। যিকর, দুআ, ইসতিগফার, নফল নামায, রোযা, কুরআন তিলাওয়াত, সালাত, সালাম, দান, পরোপকার, মানুষকে সাহায্য করা, সৃষ্টির সেবা করা, অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাওয়া, সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা ইত্যাদি সবই নেক আমল। আমাদের সকলেরই উচিত এ দিনগুলিতে এ সকল নেক আমলের মধ্য থেকে যা কিছু সম্ভব বেশি বেশি পালন করা। হাদীস শরীফে বিশেষ করে তিন প্রকার ইবাদত এ দিনগুলিতে পালনের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে: কিয়ামুল্লাইল বা রাতের নামায, সিয়াম ও যিকর। কিয়াম ও সিয়ামের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। সারা বৎসরই রাতে নফল কিয়াম ও দিবসে নফল সিয়াম পালনের জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। বিশেষত যুলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ রাতে কিয়ামুল্লাইল বা নফল সালাত আদায় করতে হবে এবং ৯ দিন নফল সিয়াম পালনের চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে যুলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখে যেদিন হাজীগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করেন, সে দিন যারা হজ্জে যান না তাদেরকে সিয়াম পালন করতে বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেন:

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أحْتَسِبُ عَلى الله أنْ يُكَفَّرَ السَّنَةُ وَ الَّتَيِ قَبْلَهُ وَالسَّنَةُ الَّتيِ بَعْدَهُ

“আমি আশা করি আরাফার দিবসের সিয়াম বিগত বছর ও আগামী বছরের কাফ্ফারা হবে।”
তৃতীয় যে ইবাদতটি এ দিনগুলিতে পালনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহ দিয়েছেন তা হলো “যিক্র”। তাবারানী, বাইহাকী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস সংকলিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

مَا مِنْ أيًامٍ أغظَمُ عِنْدَ الله وَلاَ أحَبَ ﺇلَى الله الْعَمَلُ فِيْهِن مِن أيًامٍ الْعَشْرِ فَأكْثْرِوُافِيْهِن مِنَ التًسْبِيْحِ وَالتَّحْمِيْدِ وَالَّتهْلِيلِ وَالتَّكْبِيْرِ وَفِى رِوَايةٍ (فَأكْثْرِوُافِيْهِن مِن وَالَّتهْلِيلِ وَالتَّكْبِيْرِ وَذِكْرِ الله)

“যুলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাময় কোনো দিন নেই এবং নেক আমল করার জন্য এগুলির চেয়ে বেশি প্রিয় দিন আর নেই। অতত্রব তোমরা এদিন গুলিতে বেশি বেশি তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাকবীর (আল্লাহু আকবার) আদায় করবে। অন্য বর্ণনায় : বেশি বেশি তাহলীল, তাকবীর ও আল্লাহর যিকর করবে।”
এ মাসের পরবর্তী তিন দিন ১১,১২ ও ১৩ তারিখে যিকরের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন :

وَاذْكُرُوا لله أيًامٍ مَعْدُودَاتٍ فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلا ﺇثْمَ عَلَيْهِ وَمَنْ تَأخَّرَ فَلاﺇثْمَ عَلَيْهِ لِمَنْ اتَّقَى

“তোমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনগুলিতে আল্লাহর যিক্র করবে। যদি কেউ তড়াতাড়ি করে দুদিনে চলে আসে তবে তার কোনে পাপ নেই, আর যদি কেউ বিলম্ব করে তারও কোনো পাপ নেই, এ তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করে।

এ নির্দেশের ভিত্তিতে হাজীগণ ৯ তারিখে আরাফার মাঠে, ১০ তারিখে মুযদালিফা ও মিনার মাঠে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আল্লাহর যিক্র করেন। আর যারা হজ্জে যান না অর্থাৎ সারা বিশ্বের সকল মুসলিম এ আয়াতের নির্দেশ অনুসারে যুলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখ আরাফার দিবস থেকে ১৩ তারিখে পর্যন্ত প্রত্যেক সালাতের পরে আল্লাহর যিক্র করেন। আল্লাহর যিক্র অর্থ ইচ্ছামত আল্লাহর নাম জপ করা নয়। বরং যেখানে যেভাবে যিকর করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন সেভাবে যিকর করা। সুন্নাতের শিক্ষা অনুসারে এ ২৩ ওয়াক্ত সালাতের শেষে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। ওয়া আল্লাহু আকবার, আল্লাহ আকবার ওয়ালিল্লাহিদ হামদ” বাক্য একবার সশব্দে বলতে হবে।

এভাবে আমরা দেখছি যে, যুলহাজ্জ মাসে প্রথম ১৩ দিন বিশেষভাবে আল্লাহর যিকরের জন্য নির্ধারিত। এ উপলক্ষ্যে আমরা আল্লাহর যিকরের গুরুত্ব সম্পর্কে দু একটি কথা বলতে চাই। ‘যিক্র’ অর্থ স্মরণ করা বা স্মরণ করানো। যে কোনো প্রকারে মনে, মুখে, অন্তরে, কর্মের মাধ্যমে,চিন্তার মাধ্যমে, আদেশ পালনের মাধ্যমে বা নিষেধ মান্য করার মাধ্যমে আল্লাহর নাম, গুণাবলী, বিধিবিধান, তাঁর পুরস্কার, শাস্তি ইত্যাদি স্মরণ করা বা এ সকল বিষয়ে ওয়াজ, দাওয়াত বা আলোচনা করে অন্যকে স্মরণ করানো সবই আল্লাহর যিক্র। তবে কুরআন ও হাদীসে বিশেষ ইবাদত হিসাবে যিকরের আউড়ানোর মাধ্যমে আল্লাহর যিক্র করা। যেমন সকল দুআ বা প্রার্থনাকেই আরবীতে সালাত বলা হয়, তবে সাধারণ দুআর মাধ্যমে “সালাত” নামক পারিভাষিক ইবাদত পালন হবে না।
যিকরের গুরুত্ব সম্পর্কে এখানে অল্প কয়েকটি সহীহ হদীস উল্লেখ করছি:

مِنْ صَلَّى الْغَداةَ فِى جَمَاعَةٍ ثُمًً قَعَدَ يَذْكُرُ الله حَتَّى تَطْلُعَ الشِّمْسُ ثُمً صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَاتَتْ لَهُ كَاجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ…تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ

“যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতে আদায় করবে, এরপর বসে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর যিকরে রত থাকবে। অতঃপর দুই রাক’আত সালাত আদায় করবে, সে একটি হজ্ব ও একটি ওমরার সাওয়াব পাবে, পরিপূণ, পরিপূর্ণ (হজ্ব ও ওমরার সাওয়াব)।

ألا أنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أعْمالِكُمْ وَأزْكَاهَا عِنْدَ مَلِيككُمْ وَأرْفَعِهَا فِى دَرَجاَتِكُمْ وَخَيْرٍ لَكُمْ مِنْ ﺇنْفَاقِ الذَّهَبِ وَالْوَرِقِ وَخَيْرٍ لَكُمْ مِنْ أنْ تَلْقَوْا عَدُوكُمْ فَتََضْرِبُوا وَيَضْربُوا أعْنَاقَكُم؟ قَالُوا وَذَلِكَ مَا هُوَ يَا رسُولَ اللهِ قَالَ ذِكْرُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ قالَ مُعَاذُ بْن جَبَلٍ رضِيَ اللهُ عَنْهُ مَا شَىْءّ أنْجَى مِنْ عَذَاب الله مِنْ عَذَابِ اللهِ مِنْ ذِكْرِاللهِ

“আমি কি তোমাদেরকে বলব না তোমাদের জন্য সর্বোত্তম কর্ম কোনটি? তোমাদের প্রভুর নিকট সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের জন্য সবচেয়ে উঁচু মর্যাদার, স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করার চেয়েও উত্তম, জিহাদের ময়দানে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে শত্রু নিধন করতে করতে শাহাদাত বরণ করার থেকেও উত্তম কর্ম কি তা-কি তোমাদের বলব? সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, সেই কর্মটি কী? তিনি বললেন : ‘আল্লাহর যিক্র।’ মা’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) বলেন : “আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর যিকরের চেয়ে উত্তম ইবাদত আর কিছুই নেই।”

أحَبُ الأََعْمَالِ ﺇلَى الله أنْ تَمُوْن وَلَسَانُكَ رَطَِبّ مِنْ ذكْرِ الله

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কর্ম যে, তুমি যখন মৃত্যু বরণ করবে তখনো তোমরা জিহবা আল্লাহর যিকরে আর্দ্র থাকবে।” অর্থাৎ, সর্বদা মুমিন মুখে আল্লাহর যিকর করবে। আল্লাহর যিকরে তাঁর জবান সর্বদা আর্দ্র থাকবে। তাহলে তাঁর যখন মৃত্যু হবে তখনো তাঁর জবান যিকরেই ব্যস্ত থাকবে।
একব্যক্তি বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ইসলামের বিধানাবলী আমার জন্য বেশি হয়ে গিয়েছে। আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যা আমি দৃঢ়ভাবে আকঁড়ে ধরে থাকব। অর্থাৎ সকল প্রকার নফল আমলের স্থান পূরণ করার মত একটি আমল আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

لايَزَالُ لِسانُكَ رَطْباً مِنْ ذِكْرِ اللهِ

“তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর যিকরে আর্দ্র থাকে।”
এ মহান ফযীলত অর্জনের জন্য কোন্ কোন্ বাক্য মুখে আউড়াতে বা জপ করতে হবে তাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন। তাঁর শেখানো চারটি যিকর উপরে আমরা দেখেছি, সেগুলি হলো (১) সুবহানাল্লাহ, (২) আলহামদু লিল্লাহ, (৩) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, (৪) আল্লাহু আকবার। মাসনূন যিকরের অন্যান্য বাক্যের মধ্যে রয়েছে : সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর, লা হাওলা ওয়াল কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, ইত্যাদি।

এ সকল বাক্য দ্বারা নিজের জিহবাকে সর্বদা আর্দ্র রাখা শুধু সর্বশ্রেষ্ঠ নফল ইবাদতই নয়, উপরন্তু এগুলির প্রত্যেকটির জন্য রয়েছে অফুরন্ত সাওয়াব। কয়েকটি সহীহ ও হাসান হাদীস শুনুন : ইবনু মাস’উদ, সালমান ফরেসী, আবু হুরাইরা ও ইবনু আব্বাস বর্ণিত বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, এই বাক্য চারিটির প্রতিটি বাক্য একবার বললে জান্নাতে একটি বৃক্ষ রোপন করা হয়। (তারগীব) আবু যার (রাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এই বাক্যগুলির প্রত্যেক বাক্য একবার যিকির করা একবার আল্লাহর ওয়াস্তে দান করার সমতুল্য।” (মুসলিম) আবু সালমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এই বাক্যগুলি কেয়ামতের দিনে বান্দার আমল নামায় সবচেয়ে বেশি ভারী হবে।”(নাসাঈ)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “এই বাক্যগুলি হলো জাহান্নামের আগুন থেকে মুমিনের ঢাল।” (হাকিম) হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “গাছের ডালে ঝাকি দিলে যেমন পাতাগুলি ঝড়ে যায় অনুরূপভাবে এই যিকিরগুলি বললে বান্দার গোনাহ ঝরে যায়।” (আহমদ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু উমর বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :”এই চারিটি বাক্য বাক্যর প্রতিটি অক্ষরের জন্য ১০টি করে সাওয়াব লাভ করবেন।” (তাবারানী) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) উভয়ে নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন : “আল্লাহ এই চারটি বাক্যকে বেছে পছন্দ করে নিয়েছেন। এই বাক্যগুলি যে কোনো একটি বাক্য একবার বললে ২০টি সাওয়াব প্রদান করবেন এবং ২০টি গোনাহ ক্ষমা করবেন। আর এভাবে যে বেশি বেশি যিকির করবে সে মুনাফিকী থেকে মুক্তি লাভ করবে।” (আহমদ)

এ সকল বাক্যের যিকির দু ভাবে করতে হবে বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন। প্রথমত সকালে ফজরের সালাতের পর, বিকালে আসরের সালাতের পর, সন্ধ্যায় মাগরিবের সালাতের পর এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে বিছানায়। এ সকল সময়ে এ সকল যিকির নির্ধারিত সংখ্যায় পাঠ করলে অফুরন্ত সাওয়াব পাওয়া যাবে বলে বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়, সদাসর্বদা সকল কর্মের মধ্যেই যত বেশি সম্ভব এ বাক্যগুলি পাঠ করা। এভাবে যিকির করতেও বারংবার নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

মুমিনের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, ওযুসহ ও ওযূ ছাড়, গোসলসহ বা গোসল ছাড়া, পোশাক পরে বা খালি গায়ে, শুয়ে, বসে, হাটতে, চলতে, বাজারে, মাঠে, দোকানে সর্বাবস্থায় যিকির করা যায় এবং সর্বাবস্থায় যিকির করাই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের সুন্নাত। আমরা কত সময় অলস চিন্তা করে বা গল্প করে নষ্ট করি। অথচ এ সময়ে এ যিকরের বাক্যগুলি কয়েকবার পাঠ করলে আমাদের আমল নামায় অনেক সাওয়াব জমা হতো, অনেক গোনাহ মাফ হতো। সর্বোপরি বান্দা যতক্ষণ আল্লাহর যিক্র করতে ততক্ষণ শয়তান তার অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। আর অলস চিন্তা বা গল্প করে সময় নষ্ট করার ক্ষতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

لَمْ يَتَسًرْ أهْلُ الْجَنَّةِ ﺇلاَّ عَلَى سَاعَةِ مَرَّتْ بِهِمْ لَمْ يَذْكُرُوا للهَ تَعَالَى فِيْهَا

“জান্নাতের অধিবাসীগণ দুনিয়ার কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবেন না, শুধুমাত্র যে মুহূর্তগুলি আল্লাহর যিকর ছাড়া অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে, সেগুলির জন্য তাঁরা আফসোস করবেন।”

مَا جَلَسَ قَوْمّ مَجْلسِاً لَمْ يَذْكُرُوْا للهَ فِيْه ﺇلاَّ كَانَ عَلَيْهِمْ تِرَةً وَمَا مَشًيِ (طَرٍيْقًا) لَمْ يَذْكُرِ الله فِيْهِ ﺇلاَّ كَانَ عَلِيْهِ تِرِةً وَمَا أوَى أحَدّ ﺇلََى فِرَاشِهِ ولَمْ يَدْكُرِ الله فِيْهِ ﺇلاَّ كَانَ عِلَيْهِ تَرِةً

“যদি কয়েকজন মানুষ কোথাও একত্রে বসে কিন্তু সে বৈঠকে তারা আল্লাহর যিকর না করে তবে তা তাদের জন্য ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হবে। যদি কোনো মানুষ সামান্য পরিমাণও হাঁটে এবং সেই হাঁটার মধ্যে সে আল্লাহর যিকর না করে, তাহলে তা তার জন্য ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হবে। যদি কোনো মানুষ বিছানায় শোয় এবং শোয়া অবস্থায় আল্লাহর যিকর না করে তাহলে তা তার জন্য ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হবে।”

যিকিরের অন্যতম প্রকার হলো সালাত ও সালাম। সালাত ও সালামের মধ্যে মুমিন আল্লাহর যিকর করেন, কারণ তিনি আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর সালাত ও সালাম পাঠানোর আবেদন করেন। এছাড়া সালাত ও সালামের জন্য রয়েছে অভাবনীয় ও অফুরন্ত সাওয়াব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য হাদীসে তাঁর উপর দরুদ ও সালামের নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং সালাত ও সালামের অতুলনীয় পুরস্কারের বর্ণনা দিয়েছেন। হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, কোন উম্মত তাঁর উপর সালাত ও সালাম পাঠ করলে আল্লাহ তাকে অগণিত পুরস্কার প্রদান করেন, তার গোনাহ ক্ষমা করেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, তার উপর রহমত বর্ষণ করেন, ফিরিশতাগণ তার জন্য দু’আ করেন, তার সালাত ও সালাম তার নাম ও পিতার নামসহ ফিরিশতাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাওযা মুবারাকায় পৌঁছে দেন, তিনি তার জন্য দু’আ করেন। সর্বোপরি যে ব্যক্তি যত বেশি সালাত ও সালাম পাঠ করবে সে কিয়ামতে ততবেশী তাঁর নৈকট্য পাবে। অধিক পরিমাণে সালাত পাঠকারীর সকল সমস্যা আল্লাহ মিটিয়ে দিবেন।

সর্বাস্থায় দরুদ-সালাম পাঠ করবেন। হাটতে, চলতে, শুয়ে, বসে, কর্মব্যস্ততার ফাঁকে যে কোনো সময় সুযোগ পেলে বা খেয়াল হলে ওযু-সহ বা ওযু ছাড়া সর্বাবস্থায় দরুদ পাঠ করতে পারেন। এ ছাড়াও প্রতিদিন এক বা একাধিক সময়ে নির্ধারিত সংখ্যায় দরুদের একটি নির্ধারিত ওযীফা রাখবেন। ফজর বাদ, আসর বাদ বা অন্য যে কোনো সময়ে দরুদের ওযীফা পালন করা যায়। তবে সুন্নাতের নির্দেশনা অনুসারে দরুদের বিশেষ সময় রাত। সম্ভাব হলে তাহাজ্জুদের পরে, না হলে ইশার সালাতের পরে যথাসম্ভব বেশি করে (দরুদ) পাঠ করবেন। সম্ভব হলে ৫০০ বার সালাত বা দরুদ শরীফ পাঠ করবেন। না হলে অন্তত ১০০ বার দরুদ পাঠ করবেন।

কোনো কোনো দীনদার মানুষ যিকির ইবাদতকে অবহেলা করেন। আন্দাজে বলেন, যিকির ফযীলতের হাদীস সব যয়ীফ, এর কোনো গুরুত্ব নেই। অথবা বলেন, কর্মই তো যিকির, মুখে বারবার আউড়ালে কী হয়? ইত্যাদি। অথচ সহীহ হাদীস থেকে আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের সুন্নাত হলো, দাওয়াত, জিহাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক ও সামাজিক সকল কর্মের সাথে, কর্ম ও ওয়াজ-নসীহতের যিকরের পাশাপাশি সকল সময় তাসবীহ, তাহলীল ইত্যাদি মুখে আওড়ে বা জপ করে অনবরত যিক্র করা। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে, বিশেষত ফজর, আসর ও মাগরিবের পরে, বিছনায় শুয়ে, হাঁটতে-চলতে, বাজার-ঘাটে সর্বদা ও সর্বঅবস্থায় তারা মনে মনে বা অত্যন্ত মৃদু শব্দে এ সকল মাসনূন যিকির গুলি মুখে জপ করতেন।

তাকওয়া অর্জনের জন্য, বাতিলের বিরুদ্ধে ঈমানী শক্তির জন্য, দুনিয়ার বহুমুখি প্রলোভন থেকে আত্মরক্ষার শক্তি অর্জনের জন্য, আত্মার শান্তির জন্য, জান্নাতের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ও সর্বোপরি আল্লাহর বেলায়াত ও মহব্বত অর্জনের জন্য সুন্নাত পদ্ধতিতে সুন্নাত বাক্যে আল্লাহর যিকির সহজতম ও শ্রেষ্ঠতম ইবাদত।

অন্যদিকে অনেক মুমিন যিকির ভালবাসেন, যিকির করেন এবং নিজেদেরকে যাকির বলে মনে করেন। কিন্তু তাদের যিকির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের যিকরের সাথে মিলে না। যিকরের শব্দ পদ্ধতি সবই আলাদা। যিকির শব্দটিই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী শব্দে, কী-ভাবে, কখন, কোন পদ্ধতিতে যিকর করলেন বা করতে বললেন সে বিষয়টি তাদের কাছে ধর্তব্য নয়। তাদের যিকরের ধরণ-পদ্ধতি এবং যিকিরে ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যগুলো অধিকাংশই সুন্নাত বিরোধী। বিভিন্ন যুক্তি, তর্ক বা দলীল দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ বলেন নি বা করেন নি এমন সব শব্দ, বাক্য ও পদ্ধতিতে তারা যিকর করেন।

সকল যুক্তিতর্ক বাদ দিয়ে সুন্নাতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করুন। সুন্নাত থাকতে যুক্তি তর্কের দরকার কী? সুন্নাতের অনুসরণে যখন পরিপূর্ণ সাওয়াব ও বেলায়াত, তখন সুন্নাতের বাইরে যাওয়ার দরকার কী? মহান আল্লাহ নির্দেশ মত মনের মধ্যে বিনয়, আকুতি ও ভয়ভীতির সাথে অনুচ্চ শব্দে আল্লাহর যিকির করুন। অমনোযোগী হবেন না। যথাসাধ্য অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখুন। শুধু মুখের বা শুধু মনের যিকরও যিকর। তবে অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে মন ও মুখের একত্র যিক্র হলো সর্বোত্তম যিকর।

আল্লাহর যিকির আমাদের অন্যতম সম্বল ও পাথেয়। যুলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন অন্যান্য নফল ইবাদতের পাশাপাশি বেশি বেশি আল্লাহর যিকর করুন। এছাড়া সারা বৎসরই সদা সর্বদা নিজের মন ও জবানকে আল্লাহর যিকরে আর্দ্র রাখুন। আল্লাহর আমাদেরকে তাওফীক দিন। আমীন।