প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
রসুন
সহীহ মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। হাদীসের ভাষা প্রায় একই। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বর্ণনা করেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেউ যদি কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন খায়, অথবা যার নিঃশ্বাসে পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ আছে, সে যেনো আমাদের কাছে তথা আমাদের মসজিদে না আসে।’ (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
অন্যদিকে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু পেঁয়াজ সম্পর্কে বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রসুন খাবে তার আমাদের মসজিদে প্রবেশ করা উচিত নয়।’ (সহীহ আল বুখারী)
রসুন সম্পর্কে আরও হাদীস আছে। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, ‘রান্না করা ছাড়া (কাঁচা) রসুন খেতে নিষেধ করা হয়েছে।’ (আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী)
আস্-সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেন। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে আলী! রসুন খাও। আমার নিকট যদি ফেরেশতা না আসতেন তবে আমি নিজেও রসুন খেতাম।’ (আস-সুয়ূতী, তারিখে আ্বাহান ও আখবারে আস্বাহান)
মুসনাদে আহমাদে আরেকটি হাদীস উদ্ধৃত করা আছে, যেখানে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেঁয়াজ-রসুন খেতে চাবে, সে যেনো তা উত্তমরূপে রান্না করে খায়, যাতে ওটার গন্ধ তিরোহিত হয়।’ (সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদ)
প্রশ্ন-৯২ : পেঁয়াজ-রসুনের উপর যেসব হাদীস বর্ণনা করলেন তা থেকে আমরা পেঁয়াজ-রসুন খাওয়ার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি? আধুনিক বিজ্ঞান পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া সম্পর্কে কী বলে?
উত্তর : যে সমস্ত হাদীস আলোচনা করলাম, তা থেকে এটি প্রমাণিত যে, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁচ পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া পছন্দ করতেন না। কারণ এর গন্ধ ভালো নয়। এমনকি আল্লাহর ফেরেশতাগণও এ গন্ধ পছন্দ করেন না। অপরদিকে পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে যাওয়া নিষেধ। কারণ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন।
এখন আমি সুপ্রিয় পাঠকমণ্ডলীকে জিজ্ঞেস করি, পেঁয়াজ খাওয়া জরুরি কি না? না খেলে চলবে কি না? কারণ এটি নেশার সৃষ্টি করেনা। সালাদে পেঁয়াজ না দিয়ে শসা, গাজর, টমেটো, লেটুস দিলে কি সালাদের গুণগত মান কমে যাবে? পেঁয়াজ-রসুন কি তরকারির কার্যকরী উপাদান? নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশ আছে যেখানে তারা তরকারিতে মসলা খায়না বললেই চলে। এসব প্রশ্নের উত্তর সামনে রেখে আপনি সিদ্ধান্ত দিন আপনি পেঁয়াজ খাবেন কি না?
আমি সরাসরি পেঁয়াজ-রসুন খেতে নিষেধ করছিনা, কারণ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিষেধ করেননি। আর যদি খেতেই হয় তাহলে পেঁয়াজ না খেয়ে রসুন খান। এবার দেখি বিজ্ঞান ও দুইটি সম্পর্কে কী বলে?
পেঁয়াজ সম্পর্কে আস্-সুয়ূতী বলেন, পেঁয়াজ মাথাব্যথা সৃষ্টি করে এবঙ দৃষ্টিশক্তি বাধাগ্রস্ত করে। অধিক পরিমাণে কাঁচা পেঁয়াজ খেলে স্মরণশক্তি কমে যায়। ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, পেঁয়াজের মিগ্রেইন আর পেটফাঁপা বাড়ায় এবং চোখে ঝাপসা দেখা যায়। অন্যদিকে রসুনের গুণাগুণ অনেক। রসুনের অপরকারিতা নেই বললেই চলে। আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে রসুন একটি আদর্শ antiseptic (পচনবিরোধী)। রসুনের রস কফ দূর করে এবং expectorant হিসেবে কাজ করে। যদি কোনো antibiotic হাতের কাছে না পাওয়া যায় তখন আহত স্থানে রসুনের রস লাগিয়ে দিলে এটি জীবাণু আক্রমণ প্রতিরোধ করে।
প্রতিদিন নিয়মিত রসুনের রস সেবন করলে বা ১টি করে রাসুনের কোয়া বা ছোট অংশ খেলে heart attack-এর ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং রক্তে চর্বি -এর আধিক্য কমায়। আধুনিক বিজ্ঞান আরো বলে যে, রসুন blood pressureকমিয়ে আনে এবং এটি stimulant, carminaive, antirheumatic and antihelmintic. It is useful in treating bronchial and asthmatic complaints.
এ আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে রসুন খুবই উপকারী। বিজ্ঞান রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার প্রতিধ্বনি করছে মাত্র। কারণ এ রিওয়ায়াতে জানা যায় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, রসুন ৭০টি রোগের উপশমে কাজ করে। তিনি রসুনের সাহায্যে চিকিৎসা নেয়ার উপদেশও দিয়েছেন। আর যে ভাইয়েরা নিয়মিত মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়ে থাকেন, তাদের জন্য সহজ নিয়ম শিখিয়ে দিই। প্রতিদিন ফজর ও ইশার জামায়াতে নামাযের পর অর্থাৎ পরবর্তী জামায়াতে নামাযের ৫-৬ ঘণ্টা আগে রসুন খান আর তা চিবিয়ে খাবেন না। কারণ চিবিয়ে খেলে রসুনের গন্ধে খুব ভরে যাবে। রসুনের গন্ধ এতোই তীব্র যে একমাত্র মৃগনাভি কস্তুরি ছাড়া অন্য কিছু এ গন্ধ Suppress করতে পারেনা।
রসুনের একটি ক্ষুদ্র অংশ বের করে নিয়ে এ দুই সময়ে পানির সাহায্যে গিলে খান। তাহলে আপনি ওষুধ হিসেবে রসুন নিয়মিত খেতে পারবেন, আবার জামায়াতে নামাযও ঠিকমতো আদায় করতে পারবেন। ফলে ফেরেশতাগণ আপনাকে ভালোবাসবে। My humble request is that you must respect the Prophetic tradition and at the same time you must offer your obligatory prayers in congregation regularly.
সর্বশেষে বলবো, রসূলের হাদীস অনুযায়ী আমরা যদি পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করি বা কমিয়ে দিই, তবে নিশ্চয়ই পেঁয়াজের দামও কমে যাবে। এতে গরীব মানুষের উপকার হবে। আশা করি রসুন-পেঁয়াজ সম্পর্কে আপনার প্রশ্নের উত্তর বিশদভাবে দিতে পেরেছি।
প্রশ্ন-৯৩ : একত্রে পানাহার সম্পর্কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুনির্দিষ্ট উপদেশগুলো কী?
উত্তর : হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সচরাচর একাকী খাদ্য গ্রহণ করেতেন না। তিনি সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের সাথে একই দস্তরখানে একত্রে খাবার খেতেন এবং খাওয়াতেন। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস বর্ণনা করছি। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছয়জন সাহাবী নিয়ে খানা খাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে একজন বেদুঈন এসে তাদের সাথে খানায় যোগ দিয়ে কয়েক লোকমাতেই সব খাবার শেষ করে ফেললো। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এই ব্যক্তি যদি আল্লাহর নামে শুরু করতো, তবে তোমাদের সকলের জন্য এই খাবারই যথেষ্ট হতো।’ (আত-তিরমিযী)
অনেক সাহাবীই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছে। হযরত ওয়াহশী ইবনে হারব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় সাহাবী আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা পানাহার করি কিন্তু তৃপ্তি পাই না বা তৃপ্তি মিটেনা।’ তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সম্ভবত তোমরা পৃথক পৃথকভাবে খাও।’ তারা উত্তর দিলেন, ‘জি, হ্যাঁ।’ অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা একত্রে খানা খাও এবং আল্লাহর নামে খাও। আল্লাহ পাক এতে তোমাদের বরকত দেবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য হলো সেই খাদ্য, যার মধ্যে অধিক হাত শরীক হয়।’ (আল-মুজামূল আওসাত)
আমাদের দেশে একত্রে খাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। বিশেষ করে পবিত্র রমযান মাসে এটি বেশি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। দেখা যায় প্রায়ই কোনো বাড়িতে, অফিসে বা ভালো কোনো খোলা জায়গায় বা স্কুল-কলেজে ইফতার পার্টি হয়। এতে অনেক লোক একত্রে খানা খান। সত্যি কি সুন্দর নিয়ম। অনেক পরিবারের পিতা-মাতা তাদের ছেলেমেয়দেরকে ডেকে নিয়ে একত্রে খানা খান। এটি সত্যি সুন্দর অভ্যাস এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। সাহাবায়ে কিরাম বলেছেন, একত্রে খাওয়া মহৎ চরিত্রের পরিচয় বহন করে।
প্রশ্ন-৯৪ : খানা শেষ করে হাত ধোয়ার আগে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী করতেন? এ ব্যাপারে তার কী উপদেশ ছিলো?
উত্তর : হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানা শেষ করে তিনটি আঙ্গুল চাটতেন।’ (আত-তিরমিযী)
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙ্গুল ও বর্তন চেটে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি আরো বলেছেন, তোমরা জানো না যে খাদ্যের কোন অংশে কল্যাণ (বরকত) নিহিত আছে।’ (সহীহ মুসলিম)
কা’ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু তার পিতার থেকে জেনে বলেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার তিন আঙ্গুল দ্বারা খানা খেতেন এবং খানা খাওয়ার পর আঙ্গুলগুলো চেটে খেতেন।’ (সহীহ মুসলিম)
হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার আঙ্গুল চেটে পরিষ্কার না করা পর্যন্ত রুমাল দ্বারা স্বীয় হাত সাফ বা পরিষ্কার করবেনা, কারণ কোন খানার ভেতর কি বরকত আছে তা জানা নেই।’ (সহীহ মুসলিম ও আত-তিরমিযী)
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ খানা খেলে ঐ পর্যন্ত আঙ্গুল মুছবেনা, যতোক্ষণ পর্যন্ত সে নিজে চেটে না নেয় অথবা অন্য কারো দ্বারা না চাটায়।’ (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
সুপ্রিয় পাঠক! রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাওয়া শেষ করার পর প্লেট মুছে খেতেন এবং পানি দিয়ে ধৌত করার পূর্বে আঙ্গুল চেটে নিতেন। এতে খানায় বরকত হয়। খানার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। কারণ রিযিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’য়ালার বড় নিয়ামত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি খানা খাওয়ার পর প্লেট চেটে খায়, ঐ প্লেট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)
তাছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে যে আঙ্গুল চোষে খাওয়া পরিপাকের জন্য উপকারী। আঙ্গুল চাটা মানুষের স্বভাবজাত অভ্যাস। শৈশব থেকে দেখা যায় যে শিশুরা আঙ্গুল চোষে।
আজকাল আমাদের মাঝে অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে যে প্লেটে কিছু খাবার রেখে দেয়া। এটি নাকি ভদ্রতা? তবে কী ধরনের ভদ্রতা বা কোন্ দেশীয় ভদ্রতা তা জানা যায় না। আমি কোনো মুসলিম দেশে এটা দেখিনি। অনেকে তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার ইচ্ছে করলেই প্লেটে নিয়ে নেয়। আর সামান্য কিছু খেয়ে বেশির ভাগ খাবার প্লেটে রেখে দেয়। কার জন্য? সম্ভবত শয়তানের জন্য। তার কি মনে হয, তার এই কালচার দেখে কেউ তাকে প্রশংসা করবে! ! Is it the latest fashion? Indeed it is the devil’s culture বা শয়তানের সংস্কৃতি।
সুধী দর্শক! খানা অপব্যয় করা গুনাহের কাজ। কুরআনের সূরা আল আ’রাফের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘কুলূ ওয়াশরাবু অরাতুসরিফূ, ইন্নাহু লা যুহিব্বুল মুসরিফীন।’
‘তোমরা খাও এবং পান করো। তবে অপব্যয় করোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’য়ালা অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (আল আ’রাফ ৭:৩১)
‘Eat and drink, but waste not by extravangence, for Allah does not love those who are extravagant or prodigals.’ (Al Araf 7:31)
কুরআনের এ আয়াত আমাদের এ শিক্ষাই দেয় যে খাদ্যদ্রব্য নষ্ট বা অপচয় করা গুনাহ। এ জন্য দেখা যায়, গ্রামের মহিলারা চাইল বাছাই করার সময় প্রতিটি চাউল মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে কুড়িয়ে নেন। একটি চাউলও ফেলে রাখেণ না। অপরদিকে লক্ষ্য করা যায় যে বড় বড় হোটেলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে খাবার নষ্ট হয়। আমার বিশ্বাস, এসব হোটেলে যে পরিমাণ খানা নষ্ট হয়, তা দিয়ে ঢাকা শহরের ফুটপাথের সকল অভুক্ত লোককে খাওয়ানো সম্ভব। স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্যর মন্ত্রণালয় এদিকে দৃষ্টি দেবেন কি?
প্রশ্ন-৯৫ : খানা খাওয়ার পর হাত ধৌত করা সম্পর্কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো উপদেশ বা বাণী আছে কি?
উত্তর : হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি তাওরাতে পড়েছি যে খাওয়ার আগে উযু করলে খাদ্যের মধ্যে বরকত হয়।’ আমি একথা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললে তিনি বলেন, ‘খাওয়ার মধ্যে বরকত হলো খাদ্য গ্রহণের আগে ও খাওয়ার শেষে উযু করাতে।’ (আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী)
অপরদিকে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় যে আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা তার ঘরের বরকত বৃদ্ধি করে দেবেন, তার উচিত যখন খানা সামনে আসে তখন এবং দস্তরখান যখন উঠিয়ে নেয়া হয় (অর্থাৎ যখন খানা শেষ হয়ে যায়) তখন হাত-মুখ উত্তমরূপে ধৌত বা উযু করা।’ (ইবনে মাজাহ)
উযুর আভিধানিক অর্থ ধৌত করা বা পবিত্র করা। আমরা তিন প্রকারের উযু সম্পর্কে জানতে পারি।
১. নামাযের উযু, এখানে হাত-মুখ ধোওয়া, মাথা মাসেহ করা এবং পা ধোওয়া ফরয। কুলি করা ও নাকে পানি দেয়া সুন্নাত; ২. ঘুমের উযু, (ঘুমের উযু নামাযের উযুর ন্যায়) এ উযুতে হাত-মুখ ধৌত করতে হয় এবং তার আগে প্রস্রাব করা উচিত। কারণ এতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না এবং ৩. খাওয়ার উযু, এ উযুতে হাত ধোওয়া ও কুলি করা সুন্নাত।
সুপ্রিয় পাঠক! খাবার পূর্বে হাত-মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নেয়ার পর কোনো রুমাল বা তোয়ালে দিয়ে পানি না মোছা সুন্নাহ। এর মেডিক্যাল কারণ হচ্ছে, খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার পর হাত মোছার কাজে যদি রুমাল বা তোয়ালে ব্যবহার করা হয়, তবে তোয়ালে বা রুমালে লেগে থাকা জীবাণু হাতের মাধ্যমে খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে। তাই খাবার আগে হাত ধোয়ার পর রুমাল বা তোয়ালে ব্যবহার করলে হাত ধোয়ার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে। তবে খাওয়ার পর হাত ধুয়ে রুমাল বা তোয়ালে ব্যবহার করায় কোনো দোষ নেই।
প্রশ্ন-৯৬ : একত্রে আহারের ক্ষেত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী কী শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন? অথবা আমরা কী কী শিষ্টাচার কুরআন-সুন্নাহ থেকে জানতে পারি?
উত্তর : আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একত্রে খাবার গ্রহণ বা শেষ করার ক্ষেত্রে সুন্দর শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন এবং সম্ভবত এই সুন্দর উপদেশটিই যুগ যুগ ধরে মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ‘খানা একত্রে খেলে এতে বরকত নিহিত রয়েছে।’
জাফর ইবনে মুহাম্মদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার সাহাবী ও অন্যান্যদের সাথে খেতেন তখন সবাই খাওয়া শেষ করার পর তিনি খাওয়া শেষ করতেন।’ (মিশকাত)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘দস্তরখান (কোন মজলিসে একত্রে খাওয়া শুরু করার সময় যে কাপড় বা তদ্রƒপ জিনিস) বিছানো হলে তা পুনরায় তুলে না নেয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি যেনো উঠে না যায় এবং সে আহারে পরিতৃপ্ত হলেও হাত গুটিয়ে না নেয়, যতোক্ষণ না অন্য সকলের আহার শেষ হয়। একান্তই যদি উঠার প্রয়োজন হয় তবে সে যেনো অপরাগতা প্রকাশ করে। কারণ সে হাত গুটিয়ে নিলে খেতে বসা তার অন্যান্য সাথীরা লজ্জিত হবে, এবং হয়তবা তাদের আরো খাদ্যের প্রয়োজন থাকতে পারে।’ (ইবনে মাজাহ)
সম্ভবত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ উপদেশের জন্যই আমাদের এই উপমহাদেশে এ ঐতিহ্য যে মুরুব্বিগণ খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার জন্য না দাঁড়ালে যুবকরা বা অল্পবয়স্ক লোকেরা দাঁড়ায় না এবং মুরুব্বিগণই প্রথম খানা শুরু করে থাকেন।
প্রশ্ন-৯৭ : খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের পুর্বে বা খানা খাওয়ার সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কি দু’য়া পাঠ করতেন এবং পাঠ করতে উপদেশ দিয়েছেন? খাওয়া শেষ হবার পর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী দু’য়া পাঠ করতেন বা কী বলতেন?
উত্তর : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদ্য গ্রহণের পূর্বে ‘বিসমিল্লাহি ওয়া বারাকাতিল্লাহি’ বলে দু’য়া করতেন। ‘আমি আল্লাহর নামে এবং তার অনুগ্রহে শুরু করছি।’ (মুসতাদরাক)
উমর ইবনে আবু সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তত্ত্বাবধানে থাকতাম। খানা খাওয়ার সময় আমার হাত (বরতনের) চারদিক হাতড়াতো। তখন তিনি বললেন, ‘ হে বৎস! আল্লাহর নাম নিয়ে খানা শুরু করো এবং ডানহাত দিয়ে খানা খাও।’ আর থালের ভেতর তোমার সামনের নিকটবর্তী জায়গা থেকে খাও।’ (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও আত-তিরমিযী)
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম উম্মাহকে নিম্নোক্তভাবে উপদেশ দিয়েছেন, ‘তোমাদের ভেতর যে কেউ খাওয়া শুরু করবে, সে যেনো আল্লাহর নামে খানা শুরু করে, অর্থাৎ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। আর যদি কেউ আল্লাহর নাম বলতে ভুলে যান, তখন যখনই তার মনে হবে, তখন সে যেনো পাঠ করে, ‘বিসমিল্লাহি আওআলাহু ওয়া রাখিরাহু (আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করছি, প্রথমে এবং শেষে)।’ (আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী)
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি নবী করীম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দিয়ে এবং খানা খাওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করে খাওয়া শুরু করে, তখন শয়তান তার সঙ্গী-সাথীদের বলতে থাকে, ‘এটি আমাদের জন্য রাত কাটাবার এবং খানা খাবার স্থান নয়। পক্ষান্তরে কোনো ব্যক্তি যদি ঘরে প্রবেশের সময় সালাম না দেয় ও খানা খাওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ না পড়ে, তখন শয়তান তার সঙ্গী-সাথীদের বলতে থাকে যে ‘তোমাদের জন্য রাত যাপন করা ও খানা খাওয়ার স্থান উভয় মিলে গেছে।’ (সহীহ মুসলিম)
হযরত আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাওয়ার পর কতিপয় শব্দ দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও দু’য়া করার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আলহামদু লিল্লাহিল্ লাযী আত্ব’আমানা ওয়াসাকানা, ওয়াজা’আলানা মিনাল মুসলিমীন।’
‘সমস্ত প্রশংসা ও শুকরিয়া আল্লাহর যিনি আমাকে আহার করিয়েছেন ও পান করিয়েছেন এবং মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।’ (আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)
হযরত আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে থেকে দস্তরখান ওঠানো হলে তিনি বলতেন, ‘আলহামদু লিল্লাহি হামদান কাছীরান, ত্বয়্যিবান মুবারকান ফীহি, গয়রা মাগফিয়্যিন অলা মুসতাগনীন ‘আনহু রব্বানা’।’
‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, পবিত্র ও বরকতময় অনেক প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তা কখনো ত্যাগ করতে পারবো না এবং তা থেকে অমুখাপেক্ষীও হতে পারবো না।’ (আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)
আবু ঈসা তিরমিযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এ হাদীসটি হাসান ও সহীহ।
প্রশ্ন-৯৮ : লৌকিকতা বলতে আমরা কী বুঝি? আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী লৌকিকতা দেখাতে নিষেধ করেছেন? মেহেমানদারীর সীমার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
উত্তর : কষ্টের সাথে এমন কাজ করা বা এমন কোনো বিষয়, যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নিহিত নেই এবং যাতে কোনো উপকারও হয়না, তাকে লৌকিকতা বলে।
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে ‘আমরা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ছিলাম। তখন তিনি বললেন, অযথা কষ্ট করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।’ (সহীহ আল বুখালী)
সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমাদের নিকট যা নেই, মেহমানদের খাতিরে তা জোগাড় করতে গিয়ে অযথা কস্ট করবে না, (বরং যা কিছু উপস্থিত আছে তাই তাদের সামনে দেবে)।’ (শু’আবুল ঈমান)
আবু শুরাইহ কা’বী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেনো অবশ্যই তার মেহমানের সম্মান করে। একদিন ও একরাত পর্যন্ত তাকে উত্তম খাদ্য পরিবেশন করতে হবে। আর মেহমানদারী হলো তিন দিন। এর বেশি হলে হবে সদকাহ। আর মেজবানের কষ্ট হতে পারে এমন দীর্ঘ সময় কোনো মেহমানের তথায় অবস্থান করা বৈধ নয়।’ (সহীহ আল বুখারী)
ইমাম আত-তাবারানী লিখিত হাদীস গ্রন্থে দু’একটি শব্দের পরিবর্তন সাপেক্ষে শু’য়াবুল ঈমানে উদ্ধৃত হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে-‘আমাদের নিকট যা নেই, মেহমানদের খাতিরে তা নিয়ে লৌকিকতা করতে আমাদেরকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।’ (আল মু’জামুল কাবীর)
সুপ্রিয় দর্শক! এই হাদীস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে আমাদের হাতের কাছে যা নেই তা জোগাড় করতে দৌড়াদৌড়ি করা, কোথাও কিছু না পাওয়া গেলে প্রতিবেশীদের বাসায় গিয়ে ধরনা দেয়া, টাকা-পয়সা ধার-কর্জ করে জিনিসপত্র কিনে আনা ইত্যাদি করা অনুচিত। অনেক সময় এসব কারণে মেহমানও লজ্জায় পড়ে যায় এবং আমরা খামাখাই পেরেশান হই। আর এ কারণে রহমতের ফেরেশতা তথা মেহমানকে বিপদের কারণ মনে করি। কারণ এত লোকে মেহমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে। ফলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। কারণ যে মেহমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে আল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।
