প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

প্রশ্ন-৮৪ : খাদ্যগ্রহণ ও বর্জন সম্পর্কিত রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসগুলোর সাথে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো বৈপরীত্য আছে কি? থাকলে আমাদের উদাহরণসহ বুঝিয়ে বলবেন কি?

উত্তর : খুব সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদ্যগ্রহণ সম্পর্কিত অভ্যাস বা খাদ্যাভ্যাসকে আমি এক কথায় Good Eating Practices (GEP) of the Prophet (SAWS) বলতে পারি। কারণ এ সুন্দর অভ্যাসগুলো সবই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানভিত্তিক। এসবের সাথে বিজ্ঞানের কোনো সংঘর্ষ, বিরোধ নেই। আমি অমুসলিম জগৎকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি যে, স্বাস্থ্য, সুস্থতা, ওষুধ, পানাহার সম্পর্কিত একটি হাদীসও কেউ খুঁজে পাবেনা, যা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক বা অবৈজ্ঞানিক। তিনটি উদাহরণ দিয়েই আমি সহজভাবে তা প্রমাণ করবো।

আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধপান করার পর কুলি করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধপান করলেন, অতঃপর তিনি পানি দিয়ে কুলি করলেন আর বললেন, এতে তৈলাক্ত পদার্থ আছে।’ (সহীহ আল বুখারী)

সুপ্রিয় পাঠক! দুধে যে তৈলাক্ত পদার্থ বা ভধঃ থাকে, তা আমরা জেনেছি অনেক গবেষণার ফলে, আনুমানিক কয়েক দশক আগে। আমরা সর্বদা ভধঃ বা চর্বি জাতীয় পদার্থ পানাহার থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি। কারণ, এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেক। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মরুভ’মির কোন্ গবেষণাগারে রিসার্চ করে বললেন যে, দুধে তৈলাক্ত পদার্থ আছে? কে তাকে এই গবেষণার ফল জানিয়ে দিলেন যে দুধে তৈলাক্ত পদার্থ থাকে।

এই হাদীসের ভেতর আরো একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য সুপ্ত অবস্থায় আছে। আমরা জানি, অর্থাৎ বিজ্ঞান আমাদের বলে যে, পানি ও তেল একত্রে মেশে না। তবু কেনো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি চাইলেন কুলি করার জন্য ? এর উত্তর হচ্ছে, দুধে যে তৈলাক্ত পদার্থ বা ভধঃ থাকে, দুধের পানি ও অন্যান্য দ্রব্যের তুলনায় তার পরিমাণ অনেক কম, এবং তা পানিতে দ্রবণীয় অন্যান্য কঠিন পদার্থের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। তাই যে সামান্য তৈলাক্ত পদার্থ দুধপান করার পর মুখের ভেতর থেকে যায়, তা পানিতে দ্রবণীয় অন্যান্য পদার্থের সাথে মিশ্রিত থাকে বলে সহজেই তা পানির সাহায্যে extract করে আনা যায়। কারণ পানি হচ্ছে all purpose solvent, যা সউদি আরবের মরুভূমিতে পাওয়া যেতো। Water immiscible বেশি পরিমাণ পানির ভেতর ঝেঁকে নিলে তা সামান্য পরিমাণ miscible হয়ে যায়। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখের অভ্যন্তরের তৈলাক্ত পদার্থ বেশি পরিমাণ পানির সাহায্যে কুলি করে দূর করলেন।

দ্বিতীয় উদাহরণটি আরো সহজ। গ্রামের মা-বোনেরা পর্যন্ত এটি জানেন। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ ও ভিনেগার একত্রে খেতেননা এবং খেতে নিষেধ করেছেন। এটি অনেক হাদীস গ্রন্থে এসেছে। এবার চলুন এই হাদীসটি বিজ্ঞানের আলোকে যাচাই করি।

ভিনেগারে কী থাকে? এর প্রধান উপাদান এসিড। কোন্ এসিড? এসিটিক এসিড, সম্ভবত ৩-৬% এসিড যদি দেয়া হয়, তখন কী হয়? দুধ কি তখন দুধ থাকে? দুধ কি তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয় না? অনেকে লেবু বা সাইতৃক এসিড দুধে দিয়ে ছানা তৈরি করেন। ভিনেগার দিলেও তো ছানা হবে। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ ও ভিনেগার একত্রে খেতেন না এবং খেতে নিষেধ করেছেন, যা পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত।

প্রশ্ন-৮৫ : খাদ্য গ্রহণের জন্য বসার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কিত হাদীসে কোনো বর্ণনা এসেছে কি?

উত্তর : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদা এক গ্রাম্য লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাঁটুতে ভর দিয়ে (নামাযের ভঙ্গিতে) বসে খেতে দেখে বলল, এটি কেমন বসা? লোকটির কথা শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘মহান আল্লাহ আমাকে উদার, দয়াশীল করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে অবাধ্য, হঠকারী ও উদ্ধত করেননি। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা বর্তনের একপার্শ্ব হতে খাও এবং উপরের অংশ বাদ রেখো। কারণ আল্লাহ এটি থেকে তোমাদের জন্য বরকত নাযিল করেন।’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
এই হাদীসটি আমার সেই ভাইদের জন্য প্রযোজ্য যারা তাবলীগে গিয়ে একত্রে বসে বড় থালে খানা খান। আবু জুহায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমি তাকিয়া লাগিয়ে (ঠেঁস দিয়ে বসে) খাইনা।’ (সহীহ আল বুখারী ও আবু দাউদ)

অর্থাৎ কখনো হেলান দিয়ে আহার করিনা। অন্যভাবে বলা যায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো হেলান দিয়ে আহার করতেন না।

হেলান দিয়ে খাদ্য গ্রহণ অহংকারী ব্যক্তিদের কাজ। এভাবে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সোজা হয়ে খাদ্য গ্রহণ করলে খাদ্যদ্রব্য সরাসরি খাদ্যানালী দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে এবং সহজে হজম হয়।

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন, যখন তিনি হেলান দিয়ে খাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি সোজা হয়ে বসলেন। এরপর তাকে আর কোনো দিন হেলান দিয়ে বসতে দেখা যায়নি।’ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি আল্লাহর একজন গোলাম মাত্র। আমি খানা খাই সেভাবে যেভাবে একজন গোলাম খানা খায় এবং আমি পান করি সেভাবে যেভাবে একজন গোলাম পান করে।’ এ হাদীসটি ইবনে আদি রচিত আল-কামিল ফী দুয়াফা ইর-রিজাল হাদীস গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।

হাদীসটিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয়, নম্রতা, বন্দেগি ও দাসত্বের উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
অন্যদিকে আমাদের মধ্যে অনেকেই খাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকে ফ্যাশন মনে করে উদ্ধত ও বাবুয়ানায় লিপ্ত থাকে, তাদের জন্য এটি একটি অনুকরণীয় বিষয়। তবে অসুস্থতা বা অন্য কোনো অপরাগতার কারণে কখনো তাকিয়া লাগিয়ে খানা খেলে তাতে কোনো দোষ নেই। একজন সুস্থ সমর্থ ব্যক্তির হেলান দিয়ে বা তাকিয়া লাগিয়ে খাওয়ার অনুমতি নেই।
In fact eating is a good pactie. It is a kind of ibbadah. It is not a fun, fashion or play.

হযরত আলিম যুহরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ‘ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যক্তিকে উপুড় হয়ে শুয়ে খানা খেতে নিষেধ করেছেন।’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহা)

এ হাদীসটির শিক্ষা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শারীরিক সুস্থতার জন্য এই উপদেশ মেনে চলা জরুরি। কারণ উপুড় হয়ে খেলে এটি হজমশক্তি ও পরিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়।