প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
প্রশ্ন-৫৩ : মুহতারাম, আমরা জানি প্লেগ এক প্রকার সংক্রামক ব্যাধি ও ছোঁয়াচে রোগ। এই প্লেগ রোগ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সুনির্দিষ্ট statement বা বক্তব্য আছে কি ?
উত্তর : প্লেগ যে একটি ভয়ানক সংক্রামক ব্যাধি তা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন ৭ম শতাব্দীতে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যখন সংক্রামক ব্যাধি আবিষ্কার করেছে, তার প্রায় দেড় হাজার বছর আগে তিনি প্লেগ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। আমি এখানে প্লেগ রোগ সম্পর্কে একটি বিখ্যাত হাদীস আলোচনা করবো যা সহীহ মুসলিম ও বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে। হযরত উসামা ইবনে যায়িদ (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন জানতে পারবে যে অমুক জায়গায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে, অর্থাৎ প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, তখন সেখানে তোমরা যাবেনা। আর তোমরা যেখানে আছো সেখানে যদি প্লেগের আবির্ভাব হয়, তাহলে ঐ স্থান থেকে পলায়ন করবেনা। (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
সম্মানিত পাঠক! এই হাদীসটির মর্মার্থ খুবই ব্যাপক। এখানে চিকিৎসা সম্পর্কিত দুটো শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। যারা মেডিকেল সায়েন্স সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন। প্রথম দিকটি হলো, প্লেগ বা pestilence নামক রোগটি যদি কোনো এলাকায় প্রবেশ করে বা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে গিয়ে নিজে রোগটিকে আমন্ত্রণ জানিওনা। অর্থাৎ এ ধরনের ব্যাধি থেকে নিজেকে দূরে রাখো এবং জেনে-শুনে নিজকে ধ্বংসের মধ্যে ফেলে দিওনা।
দ্বিতীয় দিকটি হলো, যদি নিজে এ ব্যাধি থেকে বাঁচতে না পারো তবে কমপক্ষে অপরকে বাঁচাতে চো করো। কেননা যেভাবে কোনো মারাত্মক ব্যাধি থেকে নিজকে রক্ষা করা প্রয়োজন, তদ্রƒপ অন্যকে রক্ষা করাও প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। বস্তুত এধরনের আদেশের উপর ভিত্তি করেই quarantine (No in No out) নামক medical concept আবিষ্কৃত হয়েছে।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, প্লেগ রোগ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য শাহাদাত। (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ প্লেগে মৃত্যুবরণ করা মুসলমানগণ শাহাদাতের মর্যাদা পাবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি সুপরিচিত হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় জীবন উৎসর্গ ছাড়াও শহীদ হওয়ার আরো পাঁচটি উপায় আছে। তন্মধ্যে প্রথমটি হলো প্লেগ। (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ প্লেগ রোগে মৃত্যুবরণকারী প্রত্যেক মুসলমানই শহীদের মর্যাদা পাবে।
প্লেগ সম্পর্কে আরো Prophetic statements রয়েছে, যা সময় স্বল্পতার কারণে আলোচনা করা সম্ভব হলোনা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কলেরা বা পেটের দাস্ত ও প্লেগ রোগে মারা গেলে (সে মুসলমান) শাহাদাত লাভ করবে। (সহীহ আল বুখারী)
আবু হুরায়রা (রা.) আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন মদীনায় মসীহে দাজ্জাল ও প্লেগ রোগ ঢুকতে পারবেনা। (সহীহ আল বুখারী)
প্রশ্ন-৫৪ : রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধের গুরুত্ব বেশি এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সুনির্দি বক্তব্য আছে কি ?
উত্তর : এ বিষয়ে একটি বিখ্যাত proverbial statement হচ্ছে An ounce of prevention is better than one ton of treatment. অর্থাৎ এক আউন্স রোগ প্রতিরোধ এক টন রোগ নিরাময় থেকে উত্তম। এ উক্তিটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলে ইন্টারনেটে তথ্য পেয়েছি। কিন্তু হাদীস গ্রন্থে কোনো রেফারেন্স পাইনি। যাহোক, আমি বেশ কয়েকজন সম্মানিত হাদীসশাস্ত্র বিশারদকে জিজ্ঞেস করেছি। তাঁরা বলেছেন যে এ উক্তিটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয়।
আমরা আরো জানি যে Prevention is better than cure রোগ প্রতিরোধ রোগ নিরাময়ের চেয়ে শ্রেয়। বর্তমানে আরো এ কথাও শোনা যায় যে Prevention is cheaper than cure অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ হচ্ছে রোগ নিরাময়ের চেয়ে সস্তা।
বর্তমানে আরো শোনা যাচ্ছে যে A stitch in time saves nine অর্থাৎ সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। উদাহরণস্বরূপ, যক্ষ্মা রোগ প্রতিরোধের জন্য BCG Vaccine নেয়া আর যক্ষ্মা রোগ হবার পর অহঃর ঞই ওষুধের মাধ্যমে ছয় মাসব্যাপী চিকিৎসা গ্রহণ করা, এর মধ্যে কোনটি কম ব্যয়বহুল? নিশ্চয়ই ইঈএ নেয়ার জন্য সম্ভবত কোন টাকা-পয়সাই খরচ হবে না। কারণ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটা বিনামূল্যে সরবরাহ করে থাকে।
এসব কারণেই ইসলাম এসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। যাহোক, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগ প্রতিরোধের চেয়ে রোগ প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দিতেন তা আমরা বিভিন্ন হাদীস থেকে জানতে পারি। The Prophet (SAWS) advised the Muslim Ummah that one should try to prevent disease instead of just curing them তিনি রোগ প্রতিরোধের বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। যেমন প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাওয়া। হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে তাকে ওই দিন কোন বিষ বা যাদু ক্ষতি করতে পারবে না। (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
তা ছাড়া রমযানের রোযা রাখা, নিয়মিত সলাত বা নামায আদায় করা, পাঁচবার উযূ করা, পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত হালাল খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করা ও হারাম খাদ্য বর্জন করা, দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন বৈধ নিয়ম-নীতি মেনে চলা, ব্যক্তিগত জীবনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা ইত্যাদির মাধ্যমেও রোগ প্রতিরোধ করা যায়। আমরা এগুলোকে ধাপে ধাপে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
পরিমিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ
হযরত মিকদাম ইবনে মাদীকারব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মানুষ পেটের তুলনায় নিকৃ কোনো পাত্র পূর্ণ করেনা। আদম সন্তানের জন্য কয়েক লোকমা খাদ্যই যথে যা তার মেরুদণ্ড সোজা রাখে। তবে যদি এর অতিরিক্ত গ্রহণ করতে হয় তাহলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে। (মুসনাদে আহমাদ ও আত-তিরমিযী)
বিখ্যাত আরবীয় চিকিৎসক ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রখ্যাত সাহাবী হারিস ইবনে কালাদাহ (রা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, What is the best medicine ? সর্বোৎকৃ ঔষধ কী ? তিনি উত্তর দিয়েছেন, প্রয়োজন। অর্থাৎ necessity , hunger বা ক্ষুধা। আর যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, What is a disease ? অর্থাৎ রোগ কী? তিনি উত্তর দিলেন, entry of food upon food অর্থাৎ আগের খাবার হজম হবার আগেই পুনরায় খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করা । ইবনে সীনাও একই কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, Never have a meal until the one before it has been digested অর্থাৎ আগের খাবার হজম হবার পূর্বে পুনরায় খাদ্য গ্রহণ না করাই শ্রেয়। অপরদিকে চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক Hippocrates বলেন All excess is contrary to the law of Nature. Let your eating, your drinking, your sleeping and your sexual intercourse all be in moderation. (As Suyuti) অর্থাৎ সকল প্রকার বাড়াবাড়ি বা অতিরিক্ততাই প্রকৃতির স্বভাব বিরুদ্ধ। তোমার পানাহার, তোমার ঘুম, তোমার নারী সম্ভোগ, সবকিছুই পরিমিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। (আস-সুন্নতী)
আর আমরা তো প্রায়ই বলে থাকি, Excess of everything is bad.(সবকিছুর অতিরিক্তই খারাপ) একজন প্রখ্যাত কবি বলেছেন, O! you who eat whatever you feel like and then curse medicine and doctors, you can only reap what you have sown. Prepare yourself for the illness that is coming to you. (হে মানুষ তোমার যা মন চায় তাই তুমি খাও এবং পরে চিকিৎসক এবং পরে চিকিৎসক এবং ওষুধকে দোষারোপ করে থাক। তুমি যে বীজ রোপণ করবে সে অনুযায়ী তুমি ঘরে ফসল তুলবে। তোমার যে অসুস্থতা তোমার দিকে ধেয়ে আসছে তা থেকে তুমি সতর্কতা অবলম্বন করো।)
অতএব মন যা চায় সেরকম নিষিদ্ধ কোন খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পরে অন্যকে দোষারোপ করা উচিত নয়। Therefore we should not eat the prohibited food items and fall sick.
রোগ রাখলে কী কী medical benefits পাওয়া যাবে তা অন্য কোনো পর্বে আলোচনা করা যাবে। মূলকথা হলো বর্তমান বিশ্বেও ভধংঃরহম-কে রোগ নিরাময়ের অন্যতম উপায় মনে করা হয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা জুস fasting করে। আবার কোনো কোনো fasting- এ partial abstinence এর কথা বলা হয়, যেখানে শুধু পানি পান করা যাবে। আবার অনেক fasting-G total abstinence from food and drinkএর কথা বলা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তা শিথিলযোগ্য। তবে ইসলামের বর্ণিত রোযা যুগ যুগ ধরে তার স্বাতন্ত্র বৈশ্যি অক্ষুন্ন রেখে সমাজে পালিত হয়ে আসছে। কোনো কিছু যোগ-বিয়োগ করার সুযোগ বা প্রয়োজন এতে নেই। হিন্দু ধর্মে রোযাকে উপবাস বলা হয়ে থাকে।
