প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

১৩২. বিশাল বাহিনী মাটির নীচে ধসে যাবে

১. কাবাঘরে আশ্রয় নেয়া ইমাম মাহদীকে হত্যা করতে কোন এক মুসলিম রাষ্ট্র থেকে বিশাল বাহিনী প্রেরণ করা হবে। আল্লাহ পাক -বাহিনীর সকল সদস্যকে মাটির নীচে ধ্বসে দেবেন। নিয়ত অনুযায়ী সবার পুনরুত্থান হবে।

২. উবাইদুল্লাহ কিবতীয়্যা বলেন- হারেস, আব্দুল্লাহ বনি সাফওয়ান এবং আমি -তিনজন মিলে উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালমা (রাঃ) এর কাছে গেলাম। উভয় তাকে ধ্বসিত বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। ঐ সময় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং খলীফা আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) এর মধ্যে প্রচন্ড সংঘাত চলছিল। হাজ্জাজের আগ্রাসন ঠেকাতে আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর তখন কাবা ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। উম্মে সালমা (রাঃ) বলতে লাগলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “একজন আশ্রিত -কাবা ঘরে আশ্রয় নেবে। তাকে হত্যার জন্যে বিশাল বাহিনী প্রেরিত হবে। বায়দা প্রান্তরে পৌছা মাত্রই সম্পূর্ন বাহিনী মাটির নিচে ধ্বসে দেয়া হবে। আমি বললাম- হে আল্লাহর রাসূল! যাদেরকে জোরপূর্বক বাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে, তাদের কি দশা হবে? নবীজী বললেন- সবাইকে-ই ধ্বসে দেয়া হবে। হাশরে -নিয়ত অনুযায়ী সবার পুনরুত্থান হবে।” (মুসলিম)

৩. “সৎ সংশ্রবে স্বর্গে বাস, অসৎ সংশ্রবে সর্বনাশ-” স্বতঃসিদ্ধ একটি প্রবাদ। বায়দা প্রান্তরে তখন যারাই উপস্থিত থাকবে – বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত হোক বা না হো- সমূলে ধ্বসে দেয়া হবে। হাশরের ময়দানে অন্তরিচ্ছা অনুযায়ী সবার হিসাব হবে।

৪. অন্যান্য বর্ণনায় ঘটনার ধারাবহিকতায় বুঝা যায় যে, কাবা ঘরে আশ্রিত ব্যক্তিটি ইমাম মাহদী হবেন। নাম তার -মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ। বাহিনী ধ্বংস করে আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করবেন।
উম্মুল মুমেনীন আয়েশা (রাঃ) বলেন- একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিদ্রাবস্থায় কেমন যেন করছিলেন। (জাগ্রত হওয়ার পর) জিজ্ঞেস করলাম-এমন করছিলেন কেন হে আল্লাহর রাসূল? বললেন-“খুব-ই আশ্চর্যের বিষয়- আমার উম্মাতের কিছু লোক কাবা ঘরে আশ্রিত কুরায়শী ব্যক্তিকে হত্যার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। বায়দা প্রান্তরে পৌঁছা মাত্র সবাইকে মাটির নীচে ধ্বসে দেয়া হবে। আমরা বললাম- পথে তো অনেক মানুষের সমাগম থাকে!! নবীজী বললেন-হ্যাঁ…। দর্শক অপরগ এবং পথিক সকলেই একত্রে ধ্বসে দেয়া হবে। তবে অন্তরিচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহ তাদের পুনরুত্থান করবেন।” (মুসলিম)
ইমাম মাহদী সংক্রান্ত আলোচনায় পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত বিবরণ আসবে ইনশাল্লাহ।

১৩৩. কাবা ঘরে মানুষের হজ্জ ত্যাগ

১. শেষ জমানায় ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং ফিতনার আধিক্যের দরুন এমন পরিস্থিতি আসবে, যখন হজ্ব বা উমরাহ করতে কেউ-ই মক্কায় আসবে না। কাবা ঘর বিরান পড়ে থাকবে।

২. আবু সাইদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-“ কিয়ামাত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না কাবা ঘরের দিকে মানুষের হজ্জ বন্ধ হয়ে যায়।” (মুস্তাদরাকে হাকিম)

৩. নিদর্শনটি অনেক বিলম্বে ঘটবে। কারণ, ইয়াজূজ-মাজূজের পর-ও হজ্জের কথা হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত আছে।
আবু সাইদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ ইয়াজূজ- মাজূজ ধ্বংস পরবর্তী সময়ে-ও কাবা ঘরে মানুষ হজ্জ করতে আসবে।” (বুখারী)
হতে পারে-যুদ্ধ -বিগ্রহ এবং অধিক সংঘাতের ফলে সাময়িকভাবে মানুষের হজ্জে আসা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু সংঘাত শেষ হতে-ই পুনরায় হজ্জ পালন শুরু হয়ে যাবে।

আলামতে কুবরা বা কিয়ামাতের বৃহত্তর আলামত

১. ক্ষুদ্রতর ও বৃহত্তর দু-ভাগে কিয়ামাতের আলামতগুলো বিভক্ত হওয়ার বিষয়টি পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। ক্ষুদ্রতর আলামাতগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাকী রইলো বৃহত্তর আলামতগুলো, যেগুলো সংঘটিত হওয়ার পরপর-ই কিয়ামাত আপতিত হবে।

২. হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আমরা কিয়ামাত সম্পর্কে পরস্পর আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ তোমরা কি আলাপ-আলোচনা করছিলে ? আমরা বললামঃ আমরা এতক্ষণ কিয়ামাত সম্পর্কেই আলাপ-আলোচনা করছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ কিয়ামাত কায়িম হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি বড় বড় আলামত অবলোকন করবে। অতঃপর তিনি উল্লেখ করেনঃ ধোঁয়া, দাজ্জাল, একটি বিশেষ পশু, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠা, ঈসা (আঃ) এর অবতরণ, ইয়াজূজ-মাজূজ, তিন প্রকারের ভূমি ধ্বস পূর্ব দিকে ভূমি ধ্বস, পশ্চিম দিকের ভূমি ধ্বস, আরব উপদ্বীপে ভূমি ধ্বস। সর্বশেষ নিদর্শনটি হচ্ছে ইয়েমেনের আগুন যা সকল মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিবে। (মুসলিম, ২৯০১)

৩. অন্য বর্ণনায় রয়েছে কিয়ামাত আসবে না যতক্ষান না দশটি আলামত পরিলক্ষিত হয়; পূর্ব দিকে ভূমি ধস, পৃথিবীর একটি বিশেষ পশু, ইয়াজূজ-মাজূজ, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠা, আদানের গভীর অঞ্চল থেকে এমন এক আগুন বের হবে যা সকল মানুষকে (হাশরের মাঠের দিকে ) পরিচালিত করবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, দশম নিদর্শন হচ্ছে ঈসা (আঃ) এর অবতরণ। (মুসলিম ২৯০১)

৪. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ তোমরা তাড়াতাড়ি আমল করো ছয়টি নিদর্শন আর্বিভূত হওয়ার পূর্বেই। সেগুলো হচ্ছে; পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠা, ধোঁয়া, দাজ্জাল, একটি বিশেষ পশু, তোমাদের কারোর মৃত্যু অথবা কিয়ামাত। (মুসলিম ২৯৪৭)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তোমরা তাড়াতাড়ি আমল করো ছয়টি নিদর্শন আবির্ভূত হওয়ার পূর্বেই সেগুলো হচ্ছে; দাজ্জাল, ধোঁয়া, পৃথিবীর একটি বিশেষ পশু, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠা, কিয়ামাত অথবা তোমাদের কারোর মৃত্যু। (মুসলিম ২৯৪৭)

৫. বড় আলামতগুলোর ক্রম ধারাবাহিকতার নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ নেই। কারণ উপরোক্ত হাদীসগুলোতে নিদর্শনসমূহ উল্লেখের যে ধারাবাহিকতা রয়েছে তা পরস্পর বিরোধী। তবে যে ব্যাপারটি জানা সম্ভব তা হচ্ছে, কিছু কিছু বর্ণনায় কয়েকটি আলামতের সংঘটন ধারাবাহিকতা উল্লিখিত হয়েছে। যার দ্বারা সে কয়েকটির ধারাবাহিকতা তো অবশ্যই বুঝা যায়। যেমনঃ নাওয়াস্ বিন্ সাম্‘আনের হাদীসে এসেছে, দাজ্জাল বেরুবে। অতঃপর ঈসা (আঃ) ওকে হত্যা করার জন্য অবতরণ করবেন। এরপর ইয়াজূজ -মাজূজ বের হবে। ‘ঈসা (আঃ) তাদের ধ্বংসের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার নিকট দো‘আ করবেন।

৬. এ ছাড়াও কোন কোন হাদীসে বলা হয়েছে, এটিই সর্বপ্রথম নিদর্শন আবার অন্য হাদীসে অন্য আরেকটিকে সর্বপ্রথম নিদর্শন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে । এ জাতীয় দ্বন্ধ সাহাবাদের যুগ থেকেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে।

৭. একদা মারওয়ান বিন্ ’হাকামের নিকট তিন জন লোক বসলে তারা শুনতে পায় যে, মারওয়ান বলছেঃ সর্বপ্রথম দাজ্জালই বের হবে। তখন আব্দুল্লাহ্ বিন্ আমর (রাঃ) বলেনঃ মারওয়ান কিছুই বলতে পারেনি। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি যা আমি এখনো ভুলিনি তিনি বলেনঃ সর্বপ্রথম নিদর্শন হচ্ছে, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠা এবং দুপুরের আগেই এক বিশেষ পশু বের হওয়া। দু‘টোর যেটিই সর্বপ্রথম বের হবে অন্যটি এর পরপরই বের হবে। (মুসলিম ২৯৪১)

৮. তবে আল্লামা ইব্নু হাজার (রাঃ) বলেনঃ এ জাতীয় সকল হাদীস একত্রিত করলে বুঝা যায় যে, ভূমন্ডলের পরিবর্তন সর্বপ্রথম দাজ্জাল বের হওয়ার মাধ্যমেই শুরু হবে এবং শেষ নবী ‘ঈসা (আঃ) এর মৃত্যুর মাধ্যমেই শুরু হবে এবং শেষ হবে কিয়ামাত সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমেই। এমোনো হতে পারে যে, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠার দিনই সে বিশেষ পশুটি বের হবে।

তিনি আরো বলেনঃ পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠলেই তো তাওবার দরোজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর তখনই সে বিশেষ পশুটি বের হয়ে মু’মিনকে কাফির থেকে পৃথক করে ফেলবে।

[চলমান]