প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

প্রশ্ন-৯৯ : মুহতারাম, পানি বা পানীয়দ্রব্য পান করার বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমোদিত সাধারণ বিধি-নিষেধ সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর : আপনাকে ধন্যবাদ। গত কয়েকটি পর্বে খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ ও বর্জনের উপর আলোচনার এক পর্যায়ে আমি পানীয়দ্রব্য গ্রহণের ব্যাপারে ইসলামের বিধি-বিধানসমূহ নিয়ে সামান্য আলোকপাত করেছিলাম। আজ খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও উপদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশা’আল্লাহ।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে বসে পানি পান করতেন, ডানহাতে পানির গ্লাস বা কাপ ধরে তিনি অল্প অল্প করে তিন চুমুকে পানি পান করতেন এবং পান করার পূর্বে ‘বিস্মিল্লাহির রহ্মানির রহীম’ এবং পানি পান করার পর ‘আলহামদু লিল্লাহ্’ বলতেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো সোনা-রূপার পানির পাত্র ব্যবহার করতেন না। তিনি পানির পাত্র খোলা রাখতে এবং ফুঁক দিয়ে পানীয় পান করতে নিষেধ করেছেন। আর এগুলোই হচ্ছে, Good Drinking Practices of the Prophet Muhammad (SAWS). বস্তুত পানি পান করার এসব নিয়ম-কানুন, পদ্ধতি ও সুন্দর অভ্যাসগুলো সবই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানীয় জিনিসের মধ্যে ঠাণ্ডা ও মিষ্টি পানীয় পছন্দ করতেন। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় পানীয় ছিলো ঠাণ্ডা, মিষ্টি পানীয়।’ (মুসতাদরাকে হাকিম)

হযরত আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা আরো বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ঠাণ্ডা ও মিঠা পানি ছাকায়ার কূপ থেকে আনা হতো।’ ছাকায়া একটি বস্তির নাম, যা মদীনা মুনাওয়ারা থেকে প্রায় দুই দিনের পথ। অপরদিকে হযরত সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘স্মরণ রেখো, দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে পানি হলো পানীয় জিনিসের সর্দার।’ এ হাদীসটিও মুসতাদরাকে হাকিম-এ উদ্ধৃত আছে। অর্থাৎ যতো প্রকার পানীয় দ্রব্য আছে তার মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে পানি।

পানি পান ও পানির গুরুত্ব সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘কিয়ামতের দিবসে বান্দার নিকট থেকে সর্বপ্রথম যে হিসাব নেয়া হবে, তা হলো আল্লাহ তা’য়ালা তার সুস্থতা ও ঠাণ্ডা পানি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন।’
এ হাদীসটিও মুসতাদরাকে হাকিম হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। এসব হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠাণ্ডা পানিকে আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত মনে করতেন।

প্রশ্ন-১০০ : আচ্ছা মুহতারাম, কিভাবে পানি পান করা মোটেই উচিত নয়? এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত বাণী কি?

উত্তর : ইবনে আবু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি পানি পান করে সে যেনো আস্তে আস্তে ঢোক গিলে পান করে এবং এক নিঃশ্বাসে যেনো পানি পান না করে।’ (শু’আবুল ঈমান)

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘উটের মতো এক দমে গটগট করে পানি পান করোনা বরং দুই বা তিন দমে (নিঃশ্বাসে) পান করো। পান করার সময় আল্লাহর নাম লও (অর্থাৎ বিস্মিল্লাহির রহ্মানির রহিম বলো), আর পান করার পর আল্লাহর প্রশংসা করো।’ (আত-তিরমিযী)
অর্থাৎ ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলো। আর প্রশংসার সর্বাপেক্ষা উত্তম বাক্য হলো, ‘আলহামদু লিল্লাহ’।

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি পৃথক নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন এবং বলতেন, এ নিয়মে পানি পান করলে তৃষ্ণা ভালোভাবে নিবারণ হয়, খাদ্য ভালোভাবে হজম হয় এবং এটি অধিক আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেন, পান করার সময় আমিও তিনবার শ্বাস নিয়ে থাকি।’ (সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী)

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা যখন পানি পান করবে তখন এক নিঃশ্বাসে পান করোনা।’ (আত-তিরমিযী)

কারণ এভাবে পানি পান করলে বুকে বেদনা হয়। চলুন, এ হাদীস দুটো বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আমরা আলোচনা করি।
প্রথমত, পানিতে মুখ ডুবিয়ে পানি পান করা পশুর স্বভাব। এতে নাক ও মুখের দূষিত পদার্থ ও নিঃশ্বাস পানিকে দূষিত ও নষ্ট কর ফেলে। দাড়ি-গোঁফের চুল ও ময়লা পরিস্কার পানিকে নোংরা ও দূষিত করে থাকে। এটা আধুনিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে প্রমাণিত। যাদের গোঁফ বড়, পানি পান করার সময় তাদের গোঁফের সংস্পর্শে পানি দূষিত হয়। চুলে যেমন ধুলাবালি লেগে থাকে, তেমনি গোঁফেও ধুলা ও ময়লা লেগে থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অধৈর্য হয়ে, বাস্তবতার সঙ্গে, দৌড়ে এসে বিশ্রাম না নিয়ে দাঁড়িয়ে পানি পান করা সঠিক নয়। এটা উটের স্বভাব। এতে বেশ কয়েক প্রকার অসুবিধাও আছে, যা বিজ্ঞানে প্রমাণিত। দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি ব্যস্ততার সাথে পানি পান করলে পানি হলকুমে আটকে যেতে পারে এবং হৃদযন্ত্রের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। অপরদিকে এভাবে পানি পান করলে পিপাসাও ঠিকমতো মেটেনা এবং পরিতৃপ্তিও আসে না।

প্রশ্ন-১০১ : পানি পান করার সুন্দর অভ্যাসগুলো সম্পর্কে এবার কিছু আলোকপাত করুন, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত।

উত্তর : পানি পান করার ব্যাপারে তিনটি সুন্দর অভ্যাস নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন। প্রথম সুন্দর অভ্যাসটি জানতে পারি আমরা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস থেকে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পানি পান করতেন তখন তিন ঢোকে পানি পান করতেন, প্রত্যেক ঢোকে আল্লাহর প্রশংসা করতেন এবং সবশেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।’ (আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলা, ইবনুস সুন্নি)

সুমামা ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু দুই কিংবা তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন এবং তার ধারণা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন।’ (সহীহ আল বুখারী)
নওফল ইবনে মুআবিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একই ধরনের হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো পানীয় পান করতেন, তিনি তিনবার থেমে নিঃশ্বাস নিতেন এবং যখনই পানি পান করা শুরু করতেন তখন আল্লাহর নাম নিতেন এবং যখন থামতেন, তখনই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।’ (আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলা ও জামে সগীর)

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন। তিনি আরো বলেন যে ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন।’ (ইবনে মাজাহ)

তৃতীয় সুন্দর অভ্যাসটি হচ্ছে, ‘পান করার সময় পানিতে বা পানীয়তে নিঃশ্বাস না ফেলা।’ এ ব্যাপারে তিনটি হাদীস রয়েছে, যা আমি পরে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

আল্লামা হাফিয ইবনুল কাইয়িম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, যখন পানি বিরতির সাথে গরম ও তৃষ্ণার্ত পেটে বা পাকস্থলীতে ধীরে ধীরে পৌঁছে, তখন সাধারণত দ্বিতীয় ও তৃতীয় চুমুকেই পরিপূর্ণভাবে তৃষ্ণা নিবারণ হয়ে যায়। এক নিঃশ্বাসে পানি পান করলে পানির ঠাণ্ডা প্রকৃতি ও স্বভাব সহসা পাকস্থলীতে আক্রমণ করে বসে। এতে তৃষ্ণা আংশিকভাবে নিবারণ হয়। আস সুয়ূতী রহমাতুল্লাহ আলাইহি বর্ণনা করেন, কেউ যদি এক চুমুকেই পানি পান শেষ করে, তাহলে তার বুকে ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে, যাকে আরবিতে ‘আল-কারব’ বলা হয়।

হাফিয ইবনুল কাইয়িম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক চুমুকে বা এক নিঃশ্বাসে পানি পান করা তাদের জন্য মোটেই উচিত নয়, যাদের instinctive heat দুর্বল এবং যারা বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় বাস করেন। তাছাড়া এক চুমুকে অধিক পরিমাণ পানি পান করলে তা হুলকুমে আটকে গিয়ে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।