প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
তুফাইল ইবনে আমর আদ-দাউসী ‘দাউস’ গোত্রের জাহেলী যুগের সর্দার। আরবের চিহ্নিত সম্ভ্রান্ত লোকদের অন্যতম। সীমিত পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিবর্গের একজন …
তার ডেগ কখনো চুলা থেকে নামত না …, আগন্তুকের সম্মুখে তার দুয়ার কখনো রুদ্ধ হতো না …
খাবার দিতেন ক্ষুধার্তকে, নিরাপত্তা দিতেন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে, আশ্রয়প্রার্থীকে দিতেন আশ্রয়। এসবের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন তীক্ষè মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্যিক, সুক্ষ্ম আবেগ ও অনুভূতিজাত কাব্য-প্রতিভার অধিকারী কবি, কোনো বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে মধুময় ও জ্বালাময়ী ভাষণে তিনি এমনই পারঙ্গম যে, তার মুখ থেকে বেরোনো কথা শ্রোতার অন্তরে সৃষ্টি করত যাদুর প্রভাব।
*******
তুফাইল নিজ গোত্রের এলাকা ( লোহিত সাগরের নিকটবর্তী আরব উপদ্বীপের সমতলভূমি) তেহামা ত্যাগ করলেন, রওনা করলেন মক্কার উদ্দেশ্যে। সে সময় দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের চাকা ঘুরছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুফ্ফারে কুরাইশের মাঝে। তারা প্রত্যেকেই সংগ্রহ করতে চাচ্ছিলেন নিজের সাহায্যকারী আর আকর্ষণ করছিলেন নিজ নিজ দলেন সমর্থক….
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে দাওয়াত দিচ্ছেন আপন রবের পথে, হাতিয়ার তাঁর ঈমান-বিশ্বাস, হক-ইনসাফ।
পক্ষান্তরে কাফের কুরাইশরা তাঁর সেই আহবান প্রতিরোধের চেষ্টা চালাচ্ছে সকল প্রকার অস্ত্র দিয়ে, সকল পথ ও পন্থা অবলম্বন করে । তারা মানুষকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে সবরকম উপকরণ ব্যবহার করে। তুফাইল দেখলেন, বিনা প্রস্তুতিতে নিজেকে এই দ্বন্দ্ব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই ঝামেলায় সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়তে…
তিনি তো এই লক্ষ নিয়ে মক্কায় আসেননি। ইতিপূর্বে মুহাম্মাদ ও কুরাইশের এমন দ্বন্দ্বের কথা তাঁর জানাও ছিল না। এই দ্বন্দ্ব-যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তুফাইল ইবনে আমর আদ-দাউসীর জীবনে ঘটেছে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। চলুন, সবাই মিলে শুনি সেই বিরল কাহিনী।
*******
তুফাইল বর্ণনা করেন :
‘আমি এলাম মক্কায়। দেখামাত্র কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ছুটে এল আমার কাছে। আমাকে জানাল উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং স্থান করে দিল আরামদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ মেহমানখানায়।
তাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকেরা সমবেত হলো আমাকে ঘিরে। তারা উদ্বেগের সঙ্গে আমাকে জানাল,
‘হে তুফাইল! তুমি তো আমাদের এলাকায় এসেই পড়েছ, এখানে তোমাকে একটু সাবধানে থাকতে হবে। কারণ, এই যে লোকটি নিজেকে নবী বলে দাবি করে বেড়াচ্ছে, সে দুর্বল করে দিয়েছে আমাদের নেতৃত্ব, বিনষ্ট করে ফেলেছে আমাদের ঐক্য ও সংহতি। বিভক্ত করে দিয়েছে আমাদের সকলকে। আমাদের ভীষণ আশঙ্কা হচ্ছে যে তোমার ওপর এবং স্বজাতির মধ্যে তোমার নেতৃত্বের ওপরও আপতিত হবে সেই বিপদ যা হয়েছে আমাদের ওপর। অতএব, তুমি লোকটির সঙ্গে কোনো কথা বলতে যেয়ো না। কিছুতেই তাঁর কোনো কথা শুনতে যেয়ো না। কারণ, সে এমন কিছু বলে থাকে যা যাদুমন্ত্রের মতো দ্রুত অন্তরে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সে কথা পিতা-পুত্রের মাঝে, ভাইয়ে ভাইয়ে এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের দুর্ভেদ্য দেয়াল খাড়া করে দেয়।’
তুফাইল কাহিনীর পরবর্তী অংশের বর্ণনায় বলেন :
‘আল্লাহর কসম! এভাবেই তারা আমাকে শোনাতে থাকল তাঁর চমকে দেওয়া ঘটনাবলী এবং আমাকে আতঙ্কিত করতে থাকল নিজের প্রতি ও নিজ কওমের প্রতি তাঁর ভীতি জাগানো কর্মকাণ্ডের বিবরণ দ্বারা। অবশেষে আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম, আমি তাঁর ধারে কাছেই যাব না, তাঁর সঙ্গে কোনো কথাই বলব না এবং শুনবও না তাঁর কোনো কথা।
আমি যখন কাবা-তাওয়াফের উদ্দেশ্যে এবং আমাদের পূজনীয় দেব-দেবীর বরকত লাভের উদ্দেশ্যে বের হলাম, তখন দুই কানে তুলা ভরে নিলাম যেন মুহাম্মাদের কোনো কথা আমার কানে ঢুকে না পড়ে।
কিন্তু যেইমাত্র আমি কাবা-প্রাঙ্গনে প্রবেশ করলাম, প্রথমেই আমার চোখে পড়ল কাবার নিকট দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদের নামায পড়ার অপূর্ব দৃশ্য। তিনি নামায পড়ছেন- সেটা আমাদের মতো নয়। তিনি ইবাদত করছেন- আমাদের ইবাদতের মতো নয়। তাঁর নামাযের দৃশ্যে আমি থমকে গেলাম। তাঁর ইবাদত একেবারে ওলট-পালট করে দিল আমার সব পূর্ব-পরিকল্পনা। জানি না, কেমন করে যেন একটু একটু করে আমি তাঁর দিকে এগুতে থাকলাম, তাঁর একেবারে নিকটে পৌঁছে গেলাম… আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর তেলাওয়াতের কিছু অংশ আমার কানে এল। আমি শুনতে পেলাম অসম্ভব সুন্দর, ভারি চমৎকার কিছু কথা । তখন আমি নিজেকে তিরস্কার করে মনে মনে বললাম, হায়রে হতভাগা তুফাইল! এত বড় পোড়া কপাল তোম! তুই একজন বিচক্ষণ কবি। ভালো-মন্দের পার্থক্য জ্ঞান তো তোর আছে। তাহলে লোকটির কিছু কথা শুনতে তোর বাধা কোথায়? তাঁর বক্তব্য ভালো হলে গ্রহন করবি, আর মন্দ হলে ত্যাগ করবি।
*******
তুফাইল বলেন :
‘এরপর আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদত শেষ করে আপন গৃহে রওনা হলেন। আমি তাঁর পিছু নিলাম। তিনি যখন নিজগৃহে প্রবেশ করলেন সেখানেই আমি তাঁর মুখোমুখি হলাম এবং তাঁকে বললাম-
‘হে মুহাম্মাদ! আপনার কওমের লোকেরা আমাকে আপনার সম্পর্কে একগাদা সতর্কবাণী দিয়েছে। আপনার ব্যাপারে তারা আমাকে এত আতঙ্কিত করে তুলেছিল যে, শেষ পর্যন্ত আমি তুলা দিয়ে দুই কান বন্ধ করে এসেছিলাম যেন আপনার কোনো কথা আমার কানে ঢুকতে না পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে আমাকে শুনিয়েছেন কিছু কথা, আহা! কী অপূর্ব সেই বাণী। … যার আকর্ষণে আপনার পিছু পিছু আমি এখানে হাজির হয়েছি। দয়া করে আপনার বক্তব্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আমার কাছে খুলে বলুন…’
তিনি আমার কাছে তাওহীদ ও রিসালাতের ব্যাখ্যা দিলেন। পাঠ করে শোনালেন সূরা ইখলাস ও সূরা ফালাক। আল্লাহর কসম! এরচেয়ে উত্তম কোনো বাণী সারাজীবনেও আমি শুনিনি। এত বাস্তবধর্মী, যুক্তি ও ইনসাফপূর্ণ দীন আর দেখিনি… সুতরাং আর কিসের বিলম্ব? তাঁর সামনে বাড়িয়ে দিলাম সমর্পণের হাত, পড়ে নিলাম তাওহীদ ও রিসালাতের ঘোষণা-সম্বলিত ঈমানের দৃপ্ত শপথের বাণী….
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং এটাও যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
এবং এভাবে আমি দীক্ষিত হলাম ইসলামে।’
তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
‘এরপর কিছুকাল আমি অবস্থান করলাম মক্কায়, শিখে নিলাম ইসলামের শিক্ষাগুলো। সাধ্যমতো মুখস্থ করে নিলাম কুরআনের কিছু অংশ। যখন স্বগোত্রে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেললাম, তখন প্রিয় নবীর নিকট গিয়ে বললাম-
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি নিজে গোত্রে একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব, আজ তাদের কাছে ফিরে যাব এবং আমি তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করব। আপনি দয়া করে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে দান করেন কোনো নিশানা-যা হবে এই দাওয়াতি কাজে আমার সহায়ক।
তিনি বললেন :
‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে দান করো কোনো নিশানা।’
এরপর আমি বের হলাম আমার কওমের উদ্দেশ্যে। যখন আমি তাদের এলাকার কাছাকাছি একটি উঁচু স্থানে পৌঁছি তখনই আমার দু’চোখের মাঝখানে প্রকাশ পেল বাতির মতো উজ্জ্বল আলো। আমি প্রার্থনা করলাম-
‘হে আল্লাহ! দয়া করে এই আলো আমার মুখমণ্ডল থেকে অন্য কোথাও স্থানাস্তর করে দাও! কারণ আমি আশঙ্কা করছি, তারা বলবে আমার কপালে আগুন জ্বলছে- তাদের ধর্ম ত্যাগের কারণে আমার জন্য এই শাস্তির ব্যবস্থা হয়েছে। সেই অলৌকিক আলো স্থানান্তরিত হলো আমার চাবুকের মাথায়। লোকেরা আমার চাবুকের মাথায় ঝুলন্ত প্রদীপের ন্যায় উজ্জ্বল সেই নূরের দিকে তাকাতাকি করতে লাগল। তখন আমি পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামছিলাম। যখন নিচে পৌঁছলাম, আমার কাছে এগিয়ে এলেন আমার পিতা-তিনি ছিলেন এক অতিবৃদ্ধ মানুষ। আমি তাকে বললাম,
‘বাবা! তুমি আমার কাছ থেকে দূরে থাক। কারণ আমি তোমার কেউ নই, তুমিও আমার কেউ নও।’
‘কেন রে ব্যাটা?….’
‘আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, মুহাম্মাদের দীনের অনুসারী হয়ে গেছি।’
‘ব্যাটা, তুমি যে দীন গ্রহণ করেছ, আমিও সেটা গ্রহণ করলাম।’
‘তাহলে তুমি গোসল করে পবিত্র হও, পবিত্র পোশাক পরে এসো। তোমাকে শিখিয়ে দেই সেই বিষয় যা শেখানো হয়েছে আমাকে।’
তিনি যথারীতি গেলেন, গোসল করলেন এবং পবিত্র পোশাক পরে এলেন। তখন আমি তার কাছে ইসলামের বাণী তুলে ধরলাম। তিনি সানন্দে ইসলাম কবুল করে নিলেন।
এরপর এল আমার স্ত্রী। আমি বললাম, ‘একটু দূরত্ব বজায় রাখো। কারণ, এখন আর তোমার-আমার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই।’
সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী কারণে এমন হলো? আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য উৎসর্গিত। এই বিচ্ছেদের কারণটি কি জানতে পারি?’
আমি বললাম, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, দীনে মুহাম্মাদের অনুসারী হয়েছি। ইসলাম কোনো মুসলিম-পুরুষকে মুশরিক-স্ত্রী রাখার অনুমতি দেয় না। ইসলাম তোমার আমার সম্পর্ককে ছিন্ন করে দিয়েছে।’
সে বলল, ‘তাহলে তোমার দীন ইসলামকেই আমি আমার দীন হিসাবে মেনে নিলাম।’
আমি বললাম, ‘তাহলে এক্ষুণি যাও, ঐ যীশ্শারা’র (দাউসের দেবী মন্দির) পার্শ্ববর্তী পাহাড়ী ঝরনার নির্মল পানিতে গোসল করে পবিত্র হয়ে এসো।’
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত তোমার জন্য। তুমি কী দেবী ‘যীশ্শারা’র দিক থেকে শিশুদের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা করছ? সে কারণেই কি সেখানে গোসলের জন্য পাঠাচ্ছ?’
আমি ক্রদ্ধ হয়ে বললাম, ‘চুলোয় যাক তোর দেবী ‘যীশ্শারা’, চুলোয় যাক তোর শেরেকী চিন্তা-ভাবনা… আামি সেখানে গিয়ে গোসল করতে বলেছি- সেটা লোকালয় থেকে দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে বলে। আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এই বধির পাথুরে মূর্তির ভালো-মন্দ কিছুই করার ক্ষমতা নেই।’
সে গেল। গোসল করে আমার সম্মুখে এসে হাজির হলো। আমি তার কাছে ইসলাম তুলে ধরলাম, সে কবুল করে নিল।
এরপর আমি দাওয়াত পেশ করলাম ‘দাউস’ গোত্রের সামনে। একমাত্র আবু হুরাইরা ছাড়া সকলেই সে দাওয়াতে সাড়া দিতে বিলম্ব করল।
*******
তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
‘আমি মক্কায় এলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবু হুরাইরাকে সঙ্গে নিয়ে।’
তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘হে তুফাইল, তোমার কওমের অন্যদের কী অবস্থা?’
আমি হতাশার সুরে বললাম,
‘তাদের অন্তরগুলো তীব্র কুফরীর আবরণে আচ্ছাদিত… তাদের মধ্যে বিরাজ করছে প্রবল পাপাচার আর অবাধ্যতা।’
একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে পড়লেন, ওযূ করে এসে নামায পড়লেন। এরপর তাঁর মুবারক হাত উঁচু করলেন আকাশের দিকে…
আবু হুরাইরা বলেন, ‘আমি এইসব দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়লাম, হয়তো তিনি আমার কওমের বিরুদ্ধে বদ-দুআ করবেন আর তারা ধ্বংস হয়ে যাবে… আমি মনে মনে বললাম, হায়রে আমার কপাল পোড়া জাতি!… কিন্তু রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলতে শুরু করলেন,
হে আল্লাহ! তুমি দয়া করে দাউস গোত্রের লোকদের হেদায়াত দাও, হেদায়াত দাও, হেদায়াত দাও।
এরপর তিনি তুফাইলের প্রতি ঘুরলেন এবং বললেন,
‘ তোমার কওমের কাছে ফিরে যাও, তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করবে আর ন¤্র ভাষায় ইসলামের দিকে আহ্বান জানাবে।’
*******
তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
‘আমি অব্যাহতভাবে দাউস জনগোষ্ঠীকে ইসলামের দিকে ডাকতে থাকলাম। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] হিজরত করে মদীনায় চলে গেলেন। পেরিয়ে গেল আরও বহু সময়। ঘটে গেল বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ। এরপর আমি হাজির হলাম প্রিয় নবীর [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] খেদমতে। এবার আমার সঙ্গে হাজির হলো দাউস গোত্রের আশিটি পরিবার; যারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে খাঁটি মুসলিমের পরিচয় দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] ভারি খুশি হলেন। আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াই মুজাহিদদের সঙ্গে আমাদেরকেও খায়বার যুদ্ধের গনিমত প্রদান করলেন। আমরা তখন বললাম,
‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! পরবর্তী প্রতিটি জিহাদে আমাদেরকে আপনার ডান দিকের সৈনিক হিসাবে নির্ধারণ করুন আর ‘মাবরুর’ শব্দটি আমাদের সংকেত হিসাবে নির্ধারণ করুন।’
তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
‘এরপর আমি মক্কা বিজয় পর্যন্ত রয়ে গেলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে। পরে আমি নিবেদন করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে আমার এলাকার আমর ইবনে হামামা’র দেবী ‘যুলকাফফাইন’কে জ্বালিয়ে ধ্বংস করার অনুমতি প্রদান করুন….’
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিলে তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজ কওমের ছোট্ট একটি বাহিনী নিয়ে রওনা হলেন সেই দেবী মূর্তির উদ্দেশ্যে…
যখন সেখানে পৌঁছে গেলেন এবং মূর্তির গায়ে আগুন ধরানোর আয়োজন করলেন, তখন তার আশ-পাশে বহু নারী-পুরুষ আর শিশু দর্শক জমে গেল। তারা সকলেই অপেক্ষা করছিল কখন তার ওপর বিপদ নামবে। তারা নিশ্চিত ছিল যে, দেবী ‘যুল-কাফফাইনে’র সঙ্গে বেয়াদবি করলে অবশ্যই বজ্রপাতে তার মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্ভিক গতিতে এগিয়ে গেলেন, মূর্তিটির সম্মুখে দাঁড়ালেন এবং একদল অন্ধ-ভক্ত পূজারীর বিষ্ময়ভরা দৃষ্টির সামনে দেবীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন আর ছন্দে-ছড়ায় গাইতে লাগলেন,
রে যুল-কাফফাইন, ফুরালো তোর দিন,
তোর পূজা করি না, জানি তুই শক্তিহীন।
জন্মেছি আগে তোর জন্মের,
রাখব না কোনো পথ শিরকের।
জ্বালিয়ে দিলাম তোর আস্তানা
গায়রুল্লাহর পূজা চলবে না।
আগুন জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে, সে আগুন দেবী মূর্তিকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিল। এরই সঙ্গে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেল দাউস গোত্রে মূর্তিপূজা ও শিরকের শেষ চিহ্নটুকুও। এরপর সেখানে নারী-পুরুষ সকলেই ইসলাম গ্রহন করল এবং সেই ইসলাম গ্রহণ নিখুঁত ও নিখাদ প্রমাণিত হলো।
*******
এরপর তুফাইল ইবনে আমর আদ-দাউসী রাযিয়াল্লাহু আনহু আঁকড়ে ধরলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংশ্রব এবং এই ধারা চলতেই থাকল প্রিয় নবীর ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত।
তাঁর পরে খেলাফতের দায়িত্ব যখন আরোপিত হলো তারঁই ঘনিষ্ঠতম সাহাবী আবু বকর সিদ্দীকের প্রতি, তখন তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু নিয়োজিত করলেন নিজেকে, নিজের সন্তান ও তরবারিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফার আনগত্যে।
রিদ্দতের যুদ্ধ যখন শুরু হলো মুসাইলামাতুল কাযযাবের বিরুদ্ধে। মুসলিম সৈনিকদের শীর্ষস্থানীয় হিসাবে বের হলেন তুফাইল এবং তাঁর পুত্র আমর… ইয়ামামার এই সফরে তিনি এক স্বপ্ন দেখলেন । স্বপ্ন দেখে তিনি সাথীদের ডেকে বললেন,
‘আমি এক স্বপ্ন দেখেছি, তোমরা এর তাবির (ব্যাখ্যা) বলো।’
তারা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী দেখেছেন?’
তিনি বললেন, ‘দেখলাম আমার মাথা মুণ্ডন করা হয়েছে, একটি পাখি আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল আর এক মহিলা আমাকে তার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। আমার পুত্র আমার নিরন্তর চেষ্টা করতে লাগল আমাকে উদ্ধারের, কিন্তু তার ও আমার মাঝে (দেয়ালের মতো) আড়াল তৈরি হয়ে গেল।’
তারা বললেন, ‘ভালো স্বপ্ন দেখেছেন…’
তখন তিনি বললেন, ‘আমি এর যে ব্যাখ্যা বুঝেছি, তা হলো :
আমার মাথা মুণ্ডন করা- এর মানে তা কর্তিত হবে… অর্থাৎ আমি শহীদ হয়ে যাব। আর যে পাখিটিকে দেখেছি আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, সেটা আমার রূহ… আর যে মহিলা আমাকে নিজের পেটে ঢুকিয়ে নিল, সেটা সেই জমিন যা আমার জন্য খনন করা হবে এবং তার পেটের মধ্যে আমাকে দাফন করা হবে…. আমি আশাবাদী যে, আমার শাহাদতের মৃত্যু হবে ইনশাআল্লাহ…
আর আমার পেছনে পুত্রের নিরন্তর প্রচেষ্টার অর্থ, আমি আল্লাহর ইচ্ছায় যে শাহাদাত খুব শিগগির পেয়ে যাচ্ছি, সেই শাহাদাতের জন্য তারও অবিরাম চেষ্টা থাকবে, কিন্তু সে তা পাবে পরবর্তী কোনো জিহাদে। (এই যুদ্ধে সে শহীদ হতে পারবে না)’
ইয়ামামার জিহাদের ময়দানে বিখ্যাত সাহাবী তুফাইল ইবনে আমর আদ-দাউসী রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুর বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর লড়াই করলেন, বীর বিক্রমে লড়তে লড়তে এক সময় তাঁর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।
ওদিকে তাঁর পুত্র আমর শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করতে থাকলেন, এক সময় শত্রুর আঘাতে তার ডান হাতের তালু কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি শক্তিহীন-দুর্বল হয়ে পড়লেন। ফলে তিনি ইয়ামামার প্রান্তরে শহীদ পিতা আর নিজের শহীদ হাত ফেলে মদীনায় ফিরে এলেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন আমর ইবনে তুফাইল। সেদিন খলীফার দরবারে আরও অনেক রাষ্ট্রীয় মেহমান হাজির ছিলেন। সকলের জন্য খাবার আনা হলে খলীফা সবাইকে দস্তরখানে আমন্ত্রণ জানালেন। আমর ইবনে তুফাইল খাবার গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন,
‘কেন? কী হয়েছে তোমার? তুমি সম্ভবত তোমার হাতের কারণে লজ্জায় খাবারে শরিক হতে চাচ্ছ না’।
তিনি জবাব দিলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন ঠিকই বুঝেছেন।’
খলীফা বললেন,
‘আল্লাহর কসম! এই খাবার আমি কিছুতেই মুখে দেব না, যতক্ষণ না তুমি এতে তোমার কাটা হাতের ছোঁয়া লাগাবে। এই মজলিসে তুমি ছাড়া এমন আর একজন মানুষও নেই, যার একটি অঙ্গ ইতিমধ্যেই জান্নাতে পৌঁছে গেছে।’
পিতাকে হারানোর পর থেকে আমর ইবনে তুফাইলের চোখে অবিরাম জ্বলতে থাকে শাহাদাতের স্বপ্ন। তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন শহীদ হওয়ার জন্য। অবশেষে ইয়ারমুকের যুদ্ধ যখন সংঘটিত হলো, (তখনকার অন্যতম সেরা শক্তিশালী রোম সা¤্রাজ্যের বিরুদ্ধে পনেরো হিজরীতে সংঘটিত ইতিহাসের বিখ্যাত যুদ্ধের নাম ইয়ারমুক। যেখানে মুসলিমবাহিনী লাভ করেছিল বিশাল বিজয় ।) আমর সেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সর্বাগ্রে। বীরবিক্রমে লড়াই করতে করতে একসময় তিনি সেই শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁর পিতা।
*******
আল্লাহ তাআলা তুফাইল ইবনে আমর আদ-দাউসীর প্রতি বর্ষণ করুন রহমতের বৃষ্টিধারা। তিনি নিজেও আল্লাহর পথে জীবন দানকারী শহীদ এবং শহীদ পুত্রের পিতাও।
তথ্যসূত্র : ………………………………………….
১. আল-ইসাবা, ২য় খ-, ২২৫ পৃষ্ঠা। অথবা আত্তারজামা, ৪২৫৪।
২. আল-ইসতীআব, ২য় খ-, ২৩০ পৃষ্ঠা।
৩. উসদুল গাবাহ, ৩য় খ-, ৫৪-৫৫ পৃষ্ঠা।
৪. সিফাতুস সফওয়াহ, ১ম খ-, ২৪৫-২৪৬ পৃষ্ঠা।
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১ম খ-, ২৪৮-২৫৭ পৃষ্ঠা।
৬. মুখতাসার তারীখি দিমাশক, ৭ম খ-, ৫৯-৬৪ পৃষ্ঠা।
৭. আল-বিদায় ওয়ান-নিহায়া, ৬ষ্ঠ খ-, ৩৩৭ পৃষ্ঠা।
৮. শুহাদাউল ইসলাম, ১৩৮-১৪৩ পৃষ্ঠা।
৯. সীরাতু বাতাল, মুহাম্মদ ইবনে যায়দান, সৌদি সংস্করণ, ১৩৮৬ হিজরী।
