প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

এপ্রিলের পরের অংশ

একবার খলীফা ’আবদুল মালিক হযরত আনাসসহ আরও চল্লিশজন আনসারী ব্যক্তিকে দিমাশকে ডেকে পাঠান। সেখান থেকে ফেরার পথে ‘ফাজ্জুন নাকাহ’ নামক স্থানে পৌঁছলে আসর নামাযের সময় হয়ে যায়। যেহেতু সফর তখনও শেষ হয়নি, এই কারণে হযরত আনাস দুই রাকা’আত নামায পড়ান (কসর করেন)। তবে কিছু লোক আরও দুই রাকা’আত পড়ে চার রাকা’আত পুরো করেন। একথা হযরত আনাস জানতে পেরে দারুণ ক্ষুদ্ধ হন এবং বলেন, আল্লাহ যখন কসরের অনুমতি দিয়েছেন তখন এ সুবিধা গ্রহণ করবে না কেন? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, এমন একটি সময় আসবে যখন মানুষ দ্বীনের ব্যাপারে অহেতুক বাড়াবাড়ি করবে। আসলে তারা দ্বীনের প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে থাকবে গাফিল।

সত্যকথা বলা এবং সত্যকে পছন্দ করা ছিল হযরত আনাসের চরিত্রের এক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। খিলাফতে রাশেদার প্রথম দুই খলীফার পর এমন অনেক যুবক সরকারের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয় যারা ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। এজন্য তাদের অনেক কাজই কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী হতো। যে সাহাবায়ে কিরাম জীবনের বিনিময়ে ইসলাম খরীদ করেছিলেন তাঁরা এটা সহ্য করতে পারতেন না। তাঁরা ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে সব সময় সত্য কথাটি স্পষ্টভাবে বলে দিতেন। হযরত আনাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনে বহু স্বৈরাচারী শাসকের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন যারা প্রকাশ্যে শরীয়াতের প্রতি অবহেলা করতো। হযরত আনাস এ অবস্থায় চুপ থাকেননি। তিনি প্রকাশ্যে জনসমাবেশে তাদের সতর্ক করে দিতেন।

ইয়াযীদের সময়ে আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ ছিলেন ইরাকের গভর্নর। তাঁর নির্দেশে হযরত ইমাম হুসাইনের পবিত্র মাথা সামনে আনা হলে তিনি হাতের ছড়িটি দিয়ে হযরত হুসাইনের চোখে টোকা দিয়ে তাঁর সৌন্দর্য সম্পর্কে কিছু অশালীন কটাক্ষ করেন। হযরত আনাস নিজেকে আর সম্বরণ করতে পারলেন না। ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে বললেন : এই চেহারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

উমাইয়া রাজবংশের বিখ্যাত স্বৈরাচারী গভর্নর হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস-সাকাফী নিজের ছেলেকে বসরার কাজী নিয়োগ করতে চায়। হাদীস শরীফে বিচারক অথবা আমীরের পদের আকাক্সক্ষী হবার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তাই হযরত আনাস হাজ্জাজের এই ইচ্ছার কথা জানতে পেরে বলেন : এমনটি করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।

উমাইয়া শাসকদের আর এক আমীর হাকাম ইবন আইউব। তাঁর নৃশংসতা মানুষের সীমা অতিক্রম করে জীব-জন্তু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একবার হযরত আনাস তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখেন, মুরগীর পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে তীরের নিশানা বানানো হচ্ছে। তীর লাগলে মুরগীটি ছটফট করছে। হযরত আনাস এ দৃশ্য দেখে খুবই মর্মাহত হলেন এবং মানুষকে তাদের এ কাজের জন্য ধিক্কার দিলেন। (সাহীহ মুসলিম – ২/১৫৮)

একবার কিছু লোক জুহরের নামায আদায় করে হযরত আনাসের সাক্ষাতের জন্য আসে। তিনি তখন চাকরের নিকট অজুর পানি চাইলেন। লোকেরা জানতে চাইলো, এ কোন নামাযের প্রস্তুতি? বললেন : আসর নামাযের। এক ব্যক্তি বললো : আমরা তো এখনই ‘জুহর’ পড়ে এলাম। হযরত আনাস আমীর উমরাহের দ্বীনের প্রতি উদাসীনতা এবং জনগণের দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা দেখে দারুণ ক্ষুদ্ধ হলেন। তিনি বললেন : এ তো হবে মুনাফিকদের নামায। মানুষ বেকার বসে থাকবে, তবুও নামাযের জন্য উঠবে না। যখন সূর্য অস্ত যেতে থাকবে তখন খুব তাড়াতাড়ি মোরগের মতো চারটি ঠোকর মেরে দেবে। সেই ঠোকরে আল্লাহর স্মরণ থাকবে অতি অল্পই।

প্রকৃত দ্বীনদারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘আমর বিল মা’রূফ’ – সৎ কাজের আদেশ দান করা। আর এজন্যই কুরআন মজীদে উম্মাতে মুসলিমাকে সর্বোত্তম উম্মাত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। হযরত আনাসের মধ্যে এই গুণটির বিশেষ বিকাশ ঘটেছিল। একবার ’উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের একটি মজলিসে হাউজে কাওসার প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। উবাইদুল্লাহ এর বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন। একথা হযরত আনাসের কানে গেল। তিনি সরাসরি উবাইদুল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেন : তোমার এখানে কি ‘হাউজে কাওসার’ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা হয়েছিল? বললেন : হ্যাঁ। কেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এ সম্পর্কে কিছু বলেছেন? হযরত আনাস (রা.) হাউজে কাওসার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস তাঁকে শুনিয়ে ফিরে আসেন।

হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইর (রা.) একজন আনসারী ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের রিপোর্ট পেলেন। এই অপরাধের জন্য তিনি লোকটিকে পাকড়াও করার চিন্তা করলেন। লোকেরা হযরত আনাসকে কথাটি জানালেন। তিনি সোজা মুস’য়াবের কাছে গিয়ে বললেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের প্রতি ভালো ব্যবহার করার জন্য আমীরদের অসীয়াত করেছেন। তাঁদের ভালো লোকদের সাথে উত্তম আচরণ এবং খারাপ লোকদের ক্ষমা করতে বলেছেন। এই হাদীস শুনামাত্র মুস’আব ইবন ’উমাইর (রা.) খাট থেকে নীচে নেমে এসে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশের স্থান আমার চোখের ওপর। আমি লোকটিকে ছেড়ে দিচ্ছি।

সাবিত আন-নাবানী বলেন : একদিন আমি বসরার ‘যায়িবা’ নামক স্থানে আনাসের সঙ্গে চলছিলাম। এমন সময় আযান শোনা গেল। সাথে সাথে আনাস মন্থর গতিতে চলতে শুরু করলেন এবং এভাবে আমরা মসজিদে প্রবেশ করলাম। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন :

তুমি কি বলতে পার কেন আমি এভাবে হেঁটে মসজিদে এলাম? তারপর নিজেই বললেন : নামাযের জন্য আমার পদক্ষেপ যাতে বেশি হয়, সেই জন্য। (হায়াতুস সাহাবা – ৩/১০৪)

হযরত আনাস ’ইলম হাসিলের চেয়ে অর্জিত ’ইলম অনুযায়ী ’আমলের ওপর বেশি জোর দিতেন। তিনি বলতেন : যত ইচ্ছা ’ইলম বা জ্ঞান হাসিল কর। তবে আল্লাহর কসম, ’আমল না করলে সে সব ’ইলমের প্রতিদান দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলতেন : প্রকৃত আলেমের কাজ বুঝা ও সেই অনুযায়ী কাজ করা। আর মুর্খদের কাজ শুধু বর্ণনা করা। (হায়াতুস সাহাবা – ৩/২৪১, ২৪৪)

তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের প্রতি অপরিসীম গুরুত্ব দিতেন। এ সম্পর্কে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে আমার সুন্নাত ছেড়ে দেবে সে আমার উম্মাতের কেউ নয়। তিনি আরও বলেছেন : যে আমার সুন্নাত অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত। (হায়াতুস সাহাবা – ১/৩৫)

হযরত আনাস (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিস স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করেছিলেন। যেমন- জুতো, একটি চাদর, একটি পিয়ালা, তাঁবুর কয়েকটি খুঁটি ইত্যাদি। আনাস বলতেন : আমার মা উম্মু সুলাইম মৃত্যুকালে আমার জন্য রেখে যান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি চাদর, একটি পিয়ালা যাতে তিনি পানি পান করতেন, তাঁবুর কয়েকটি খুঁটি এবং একটি শীলা যার ওপর আমার মা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘাম মিশিয়ে সুগন্ধি পিষতেন। (তারীখে ইবন আসাকির – ৩/১৪৪, ১৪৫)

এভাবে হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) সম্পর্কে টুকরো টুকরো তথ্য হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা খুবই চমকপ্রদ এবং মুসলিম সমাজের জন্য কল্যাণকরও বটে।