প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭ হিজরী, অগ্র-পৌষ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
আমি এহইয়াউস সুনান ও রাহে বেলায়াত পুস্তকদ্বয়ে মীলাদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, আলিমগণের মতামত ও সুন্নাত পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।(দেখুন: এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৫১৬-৫৫৫; রাহে বেলায়াত, পৃ. ৬৩৮-৬৪০) আমরা দেখেছি যে, মীলাদ মাহফিলের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মীলাদ, সীরাত, শামাইল ও হাদীস আলোচনা করা, দরুদ-সালাম পাঠ করা, মহব্বত বৃদ্ধি করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত-সম্মত ইবাদত পালন করা হয়। নাম ও পদ্ধতিগত কারণে বিভিন্ন মতভেদ দেখা দিয়েছে। তবে পক্ষ-বিপক্ষ সকলেই একমত যে, ইসলামের প্রথম শতাব্দীগুলাতে মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম পালনের প্রচলন ছিল না। মীলাদুন্নবীর সমর্থক কয়েকজন প্রসিদ্ধ আলিমের বক্তব্য দেখুন:
নবম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ আল্লামা ইবনু হাজর আসকালানী (৮৫২ হি) মীলাদুন্নবী উদযাপন সমর্থন করেছেন। তিনি লিখেছেন: মাওলিদ পালন মূলত বিদআত। ইসলামের সম্মানিত প্রথম তিন শতাব্দীর সালফে সালেহীনের কোনো একজনও এই কাজ করেন নি। (শামী, মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ, সুবুলুল হুদা (সীরাহ শামিয়্যাহ) ১/৩৬৬)
এ শতকের অন্য একজন প্রসিদ্ধ আলিম আল্লামা আবুল খাইর মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রহমান সাখাবী (৯০২ হি)। তিনিও মীলাদুন্নবী উদযাপনের সমর্থক। তিনি লিখেছেন: ইসলামের সম্মানিত প্রথম তিন যুগের সালফে সালেহীনের কোনো একজন থেকেও মাওলিদ পালনের কোনো ঘটনা খুঁজে পাওয়া যায় না। মাওলিদ পালন বা উদযাপন পরবর্তী যুগে উদ্ভাবিত হয়েছে। এরপর থেকে সকল দেশের ও সকল বড় বড় শহরের মুসলিমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মমাস পালন করছেন… বরকত লাভ করছেন। (শামী, সীলাহ শামিয়্যাহ ১/৩৬২)
- নবম-দশম মীলাদের হিজরী শতকের প্রসিদ্ধতম মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী মীলাদের সমর্থনে অনেক পুস্তিকা রচনা করেন। হুসনুল মাকদাস ফী আমালিল মাওলীদ পুস্তিকায় তিনি মীলাদের সমর্থনে বলেন: মীলাদ পালন হলো: মানুষদের একত্রিত হওয়া, সাধ্যমত কুরআন তিলাওয়াত করা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম এবং জন্মের সময় যে সকল অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছিল তা আলোচনা করা, এরপর দস্তরখান বিছানো হলে খাদ্য গ্রহণ করে প্রস্থান করা। এর অতিরিক্ত কিছুই করা হয় না। আমার মতে এরূপ কর্ম বিদআতে হাসানা, এর জন্য সাওয়াব পাওয়া যাবে; কারণ এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাযীম, তার পবিত্র জন্মে খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা হয়। সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি এ বিষয়টি উদ্ভাবন করেন তিনি ইরবিলের শাসক আল-মালিকুল মুযাফ্ফর আবু সায়ীদ কুকবূরী (মৃত্যু ৬৩০ হি.)…। (সুয়তী, আল-হাবী ফিল ফাতাওয়া ১/১৮১-১৮২।)
- দশম হিজরীর অন্যতম প্রসিদ্ধ সীরাতুন্নবী ও মীলাদুন্নবী গবেষক মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ইউসূফ সালিহী শামী (৯৪২ হি.)। তিনি তার সুপ্রসিদ্ধ সীরাহ শামিয়্যাহ গ্রন্থে মীলাদুন্নবী উদযাপনের গুরুত্ব প্রমাণের জন্য আলিমগণের বক্তব্য, যুিক্ত, স্বপ্ন ও কাশফ উদ্ধৃত করে দীর্ঘ অধ্যায় রচনা করেছেন। তিনিও সুস্পষ্টত উল্লেখ করেছেন যে, মীলাদুন্নবী পূর্ববর্তী যুগে ছিল না, সর্বপ্রথম ইরবিলের শাসক কুকবূরী তা প্রচলন করেন। (শামী, সীরাত শামিয়্যাহ ১/৩৬২)
- মীলাদের সমর্থক লাহোরের প্রখ্যাত আলিম সাইয়্যিদ দিলদার আলী (১৯৩৫ খৃ.) মীলাদের পক্ষে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন: মীলাদের কোনো আসল বা সূত্র প্রথম তিন যুগের কানো সালফে সালেহীন থেকে বর্ণিত হয় নি; বলে তাদের যুগের পরে এর উদ্ভাবন ঘটেছে। (সাহিয়িদ দিলদার আলী, রাসূলুল কালাম ফির মাওলিদ ওয়ালকিয়াম, ১৫ পৃ.)
- মীলাদের সমর্থনে বিগত ৮০০ বছরে অনেক প্রসিদ্ধ আলিম অনেক দলিল, যুক্তি, মত, কাশফ, স্বপ্ন ইত্যাদির কথা লিখেছেন। তবে তারা সকলেই উল্লেখ করেছেন যে, নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগে মীলাদ ছিল না। এজন্য তা বিদআতে হাসানা।
- মীলাদের সমর্থক সকল আলিমই আনুষঙ্গিক দলিলের উপর নির্ভর করেছেন। যেমন, মীলাদের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ-সালাম পাঠ, দান-সাদকা ইত্যাদি নেক আমল করা হয়, কাজেই তা মন্দ হবে কেন? আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সংবাদ পেয়ে খুশি হয়ে তার দাসীকে মুক্ত করে, এজন্য তিনি কাফির হয়েও কবরে উপকার লাভ করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন বিষয়ক কুরআনের আয়াত পাঠ করতেন… কাজেই মীলাদ-কিয়াম কুরআন-সুন্নাহ সম্মত…। আমরা স্বভাবতই বুঝি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ মীলাদুন্নবী পালন করেছেন মর্মে কোনো একটি যয়ীফ বা জাল হাদীসও যদি থাকতো তাহলে কেউই এ সকল আনুষঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক দলিল দিয়ে মীলাদ প্রমাণের চেষ্টা করতেন না। বরং সরাসরি উক্ত দলিল পেশ করতেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, হিজরী ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে ঈদ মীলাদুন্নবী উদ্ভাবন ও প্রচলন হওয়ার পরে বিগত প্রায় ৮০০ বছর যাবৎ মুসলিম উম্মাহর অগণিত আলিম মীলাদকে পছন্দ করেছেন এবং এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলিল-প্রমাণ পেশ করেছেন। কিন্তু তারা কেউই এর পক্ষে জালিয়াতি করেন নি। বরং মীলাদের সমর্থক আলিমগনও মীলাদ প্রসঙ্গে জাল হাদীস বর্ণনা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে কিছু নির্লজ্জ জালিয়াত এ বিষয়ে জাল হাদীস ও জাল পুস্তক প্রকাশ করেছে।
জাল বইয়ের জাল হাদীস
হিজরী দশম শতকের প্রসিদ্ধ আলিম ইবন হাজার হাইসামী মাক্কী (৮৯৯-৯৭৪/১৪৯৪-১৫৬৬ হি.)-এর নামে তুরস্কের মাকতাবাতুল হাকীকাহ নামক একটি প্রকাশনা সংস্থা গত ১৯৯৩ খৃ. (১৪১৪ হি.) আন-নিমাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়িদি ওয়ালাদি আদাম (বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত আদম সন্তানদের নেতার জন্মের মধ্যে) নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। এ বইটির মধ্যে মীলাদের পক্ষে সাহাবীগণের নামে অনেকগুলো সনদ বিহীন জাল হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। এ জাল বইটির প্রথম অধ্যায় নিম্নরূপ: প্রথম পরিচ্ছেদ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্যাদা বর্ণনায়। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী পাঠের জন্য এক দিরহাম ব্যয় করবে সে জান্নাতে আমার সাথী হবে। উমার (রা.) বলেন: যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তাযীম করবে সে ইসলামকে জীবিত করবে। উসমান (রা.) বলেন : যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী পাঠের জন্য এক দিরহাম ব্যয় করবে সে যেন বদর বা হুনাইনের যুদ্ধে যোগদান করলো। আলী (রা.) বলেন: যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তাযীম করবে এবং মিলাদুন্নবী পাঠের কারণ হবে, সে দুনিয়া হতে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাসান বসরী (রাহ.) বলেন: আমার কামনা হয় যে, যদি আমার উহদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তবে আমি তা মীলাদুন্নবী পড়ার জন্য ব্যয় করতাম।… ইমাম শাফিয়ী (রাহ.) বলেন: যদি কেউ মীলাদুন্নবীর জন্য বন্ধুদেরকে জামায়েত করে, খাবার প্রস্তুত করে, স্থান খলি করে দেয়, দান-খয়রাত করে এবং তার কারণে মীলাদুন্নবী পড়া হয় তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সিদ্দীক, শহীদ ও সালিহগণের সাথে উত্থিত করবেন এবং সে জান্নাতে থাকবে।…
এভাবে আরো অনেক তাবিয়ী, তাবি তাবিয়ী ও পরবর্তী বুজুর্গগণের নামে মীলাদুন্নবী পড়া-র ফযীলতে অনেক বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এখানে দুটি বিষয় আলোচনা করব: (১) বইটি ইবন হাজার হাইসামীর নামে একটি জাল বই এবং (২) এ সকল হাদীস ও বক্তব্য সবই নির্লজ্জ জালিয়াতদের বানানো মিথ্যা কথা।
নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন :
- আল্লামা ইবনু হাজার হাইসামীর পুরা নাম: আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাজার শিহাবুদ্দীন মাক্কী শাফিয়ী। তিনি তার রচিত একটি গ্রন্থের নাম ইতমামুন নিমাতিল কুবরা আলাল আলাম বিমাওলিদি সাইয়িদি ওয়ালাদি আদাম সংক্ষেপে: আন-নিমাতুল কুবরা। গ্রন্থটি প্রসিদ্ধ। বিগত ৪০০ বছরে অনেক আলিম এ গ্রন্থের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন এবং গ্রন্থটির অনেক পাণ্ডুলিপি বিশ্বের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে বিদ্যমান।
- এখানে আরব বিশ্বের কয়েকটি গ্রন্থাগার ও পাণ্ডুলিপি নম্বর উল্লেখ করছি। (ইরাকের সুলাইমানিয়া প্রদেশের ওয়াকফ গ্রন্থাগার (মাকতাবাতুল আওকাফ), নং-১৩/৪৫৬-আইন এবং পাণ্ডুলিপি নং তা/মাজামী/২১৫-২১৮। সৌদি আরবের রিয়াদস্থ বাদশাহ ফয়সল গবেষণা কেন্দ্র, পাণ্ডুলিপি নং-০২৬৩৩, ১৫২২-ফা-কাফ এবং পাণ্ডুলিপি বিষয়ক অধিদফতর, পাণ্ডুলিপি গ্রন্থাগার, নং-১৫৮৫, ৭০৩০, ১৪৪৬। মরক্কোর খাযানাতু তাতওয়ান গ্রন্থাগারে, পাণ্ডুলিপি নং-১৩/৪৫৬-আইন। ইয়ামানের সানআ শহরের বড় মসজিদের প্রাচীন গ্রন্থাগার; মাকতাবাতুল জামিয়িল কাবীর, পাণ্ডুলিপি নং ২২-মীম-জীম। সিরিয়ার দামেশকে শহরের যাহিরিয়অ গ্রন্থাগার, পাণ্ডুলিপি নং-৮৭২২, ৮১৬৪, ১১৩০১, ১১৩৪১, ৮৫৭১, ১১৩৬১, ৯৪৮৩, ৯৫৫৩। এ সকল পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে এ বইটি ইদানিং বৈরুত থেকে ছাপা হয়েছে।
- তুরস্কের মাকতাবাতুল হাকীকাহ পাণ্ডুলিপি আন-নিমাতুল কুবরা গ্রন্থটির সাথে এ সকল পাণ্ডুলিপির কোনোরূপ মিল নেই। বস্তুত বইটির কভারের নাম ও লেখকের নাম ছাড়া ভিতরের সবই জাল।
- আন-নিমাতুল কুবরা-র মূল পাণ্ডুলিপিগুলোর বক্তব্য নিম্নরূপ: ‘আল্লাহর প্রশংসা করছি সকল পরিপূর্ণ প্রশংসা এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সর্বোত্তম ও পূর্ণতম কৃতজ্ঞতা… মীলাদুন্নবী পালনের মূলভিত্তি বর্ণনা করার জন্য আমি একটি পুস্তিকা লেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম….। এটি লিখতে আমি উদ্বুদ্ধ হলাম তার কারণ মীলাদ পালনের মূলভিত্তি বিষয়ে মানুষেরা মতভেদ করেছে যে তা বিদআত কি না। আর গল্পকার বক্তা ও ওয়ায়িজগণ ব্যাপকভাবে জাল হাদীস এবং ভিত্তিহীন গল্প ও কবিতা বলছেন। তারা আল্লাহ এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটুও লজ্জাবোধ করেন না-নির্লজ্জভাবে তাদের নামে মিথ্যা বলেন-কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এবং কখনো মুুর্খতার কারণে। এজন্যই ইমামগণ বলেছেন; প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব দায়িত্ব হাত দিয়ে, জিহ্বা দিয়ে বা অন্তর দিয়ে এদের প্রতিবাদ করা।…প্রথম পরিচ্ছেদ মীলাদ পালনের মূল ভিত্তি বর্ণনার জন্য। পাঠক জেনে রাখুন যে, মীলাদ পালন বিদআত; কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তিন যুগের কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন সে তিন যুগের সালফ সালিহীন কোনো ব্যক্তি থেকে এ কর্ম বর্ণিত হয় নি। তবে তা বিদআতে হাসানা বা ভাল বিদআত। কারণ এর মধ্যে অনেক ভাল কাজ অন্তর্ভুক্ত। যেমন দরিদ্রদের ব্যাপক কল্যাণ ও সহযোগিতা করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, বেশি বেশি যিকর ও দরুদ পাঠ….। ক্রুশের অনুসারী খ্রিস্টানগণ যদি তাদের নবীর জন্মের রাতকে সবচেয়ে বড় ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তবে এ কাজে ইসলামের অনুসারীদের অধিকার অধিকতর…। (ইবন হাজার হাইসামী, আন-নিমাতুল কুবরা (মিসরের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি, নং-৪৪৯) পৃষ্ঠা ১-২।)
- আমরা দেখছি যে, মূল নিমাতুল কুবরা গ্রন্থের প্রথমেই ইবন হাজার হাইসামী সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছেন যে, সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবিতাবিয়গণের যুগের একজন মানুষও মীলাদুন্নবী পালনের কথা জানতেন না। খ্রিস্টান সম্প্রদায় ২৫ ডিসেম্বর যীশুখৃস্টের জন্মদিনকে বড়দিন বা ঈদে মীলাদুল মাসীহ হিসেবে পালন করেন। বিশেষত ৫ম হিজরী শতকের শেষে ৪৯১ হি/১০৯৭ খ্রি. থেকে খ্রিস্টান ক্রুসেডারগণ সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক ও মিসরের বিভিন্ন দেশ দখল করে খ্রিস্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এ সকল দেশে দখলদার খ্রিস্টানগণ মহাসমারোহে বড়দিন বা ঈদে মীলাদুল মাসীহ পালন করতেন। বিষয়টি মুসলিমদেরকে ঈদে মীলাদুন্নবী পালনের প্রেরণা দেয়। শতবর্ষ পরে ষষ্ঠ হিজরী শতকের শেষ প্রান্তে এসে মুসলিম সমাজও ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করে।
- পক্ষান্তরে জাল নিমাতুল কুবরা বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদের মূল বক্তব্য যে, খুলাফায়ে রাশদীন সকলেই মীলাদ পালন করতেন এবং মীলাদ পালনকেই দীনের সবচেয়ে বড় বিষয় বলে প্রচার করতেন। চার খলিফা যখন এভাবে মীলাদের মহাগুরুত্ব প্রচার করতেন তখন স্বভাবতই তাদের যুগের সকল সাহাবী-তাবিয়ী প্রতিদিনই মহাসমারোহে তা পালন করতেন!!
- আলিমদের উদ্ধৃতিও জাল নিমাতুল কুবরা-র জালিয়াতি প্রমাণ করে। সীরাহ হালাবিয়্যাহর লেখক আল্লামা হালাবী (১০৪৪ হি.), তাফসীর রুহুল বায়ানের লেখক আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী (১১২৭ হি.), জা-আল হক্ক গ্রন্থের লেখক মুফতি আহমাদ ইয়ার খান প্রমুখ আলিম মীলাদের পক্ষে ইবন হাজার হাইতামী থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি তা বিদআতে হাসানা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মীলাদের পক্ষে সাহাবী-তাবিয়ীগণ থেকে কোনো হাদীস উদ্ধৃত করেছেন বলে কেউই উল্লেখ করেন নি। পাণ্ডুলিপির বর্ণনায় রচিত গ্রন্থগুলোতেও উপরে উদ্ধৃত মূল পাণ্ডুলিপির বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। (হালাবী, আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ ১/১৩৭: ইসমাঈল হাক্কী, রুহুল বায়ান ৯/২, ৪৭।)
- এভাবে আমরা নিশ্চিত যে, মাকতাবাতুল হাকীকাহ প্রকাশিত এ বইটি ইবন হাজার হাইসামীর নিমাতুল কুবরার নাম চুরি করে প্রকাশিত একটি জাল বই। তবে লক্ষ্যণীয় যে, এ জাল বইটি যদি জাল না হয়ে ইবন হাজার হাইসামী মাক্কী শাফিয়ীর নিজের লেখা বলে প্রমাণ হতো তাতেও এ গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসগুলোর বিশুদ্ধতা প্রমাণ হতো না। ইবন হাজার মাক্কী শাফিয়ী তো দূরের কথা, স্বয়ং ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইদরীস মাক্কী শাফিয়ীও বা অন্য কোনো ইমাম, মুজাহিদ, পিড়ানে পীর বা বুজুর্গও যদি এভাবে সনদবিহীন কোনো কথা উদ্ধৃত করেন তবে তা সনদ অনুসন্ধান ও যাচাই না করে কোনো মুসলিম কখনোই গ্রহন করবেন না। ইমাম শাফিয়ী উদ্ধৃত অনেক হাদীস পরবর্তী শাফিয়ী ফকীহগণ দুর্বল বা জাল বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হানাফী, মালিকী, হাম্বালী, কাদিরী, চিশতী, শাযিলী… সকল মাযহাব ও তরীকার আলিমগণ একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। প্রথম পর্বে আমরা এ সকল বিষয় আলোচনা করেছি।
- রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের হাদীসের ভাষা, শব্দ ও পরিভাষা সম্পর্কে যার সামান্যতম জ্ঞান আছে তিনিও বুঝতে পারবেন যে, এগুলো সবই জাল কথা। কোনো ইংরেজি ডকুমেন্ট জাল করতে গিয়ে পানি খাওয়ার ইংরেজি (বধঃরহম ধিঃবৎ), অথবা আরবী ডকুমেন্ট জাল করতে যেয়ে নামায পড়া-র আরবী লিখলে কোনো যাচাই ছাড়াই বুঝা যায় যে, ডকুমেন্টটি জাল এবং জালিয়াত একজন বাঙালি। তেমনি মীলাদ পাঠের আরবী ( ) শুনলে কুরআন-হাদীসের আরবী বিষয়ে অভিজ্ঞ যে কেউ নিশ্চিত বুঝবেন যে, কথাটি কখনোই সাহাবীদের যুগের কারো কথা নয়; বরং সুনিশ্চিত জাল কথা এবং এ জালিয়াত তুর্কী বা তুর্কী যুগের তুর্কী ভাষা দ্বারা প্রভাবিত কোনো আরব জালিয়াত। ৬০০ হিজরীর দিকে মীলাদ উদযাপন শুরু হলে প্রথম কয়েক শত বছর একে মীলাদ উদযাপন, ( ) মীলাদ পালন ইত্যাদি বলা হতো। বিগত ২/৩ শত বছর যাবৎ মধ্যপ্রাচ্যে মীলাদ মাহফিলে মীলাদ বিষয়ক পুস্তিকা পাঠের প্রচলন হয়েছে। এজন্য বিগত ১/২ শত বছর যাবৎ মীলাদ অনুষ্ঠানকে অনেক সময় মীলাদুন্নবী পাঠ বলা হয়। জালিয়াতগণ এ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। (ইসমাঈল পাশা বাবাতী বাগদাদী, ইঈষাহুল মাকনুন ২/৬৬১; হাদিয়্যাতুল আরিফীন ১/৭৮; মুফতি আহমাদ ইয়ার খান, জা-আল হক (অনুবাদ অধ্যাপক লুৎফুর রহমান, মোহাম্মাদী কুতুবখানা, চট্টগ্রাম ১৯৮৮), দ্বিতীয়াংশ ৩৯-৪০)
আরো কয়েকটি জাল হাদীস
মীলাদ পালনের পক্ষে জালিয়াতদের বানানো আরো দুটি হাদীস:
ইবন আব্বাস বলেন, একদিন তিনি নিজ বাড়িতে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের ঘটনাবলি বর্ণনা করছিলেন। তখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেন এবং বলেন: তোমাদের জন্য আমার শাফাআত পাওনা হলো। (জালিয়াত লক্ষ্য করে নি যে, ইবন আব্বাসের বয়স ৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল হয়। তিনি কি ৫/৬ বছর বয়সে ছেলেমেয়েদের হাদীস শুনাচ্ছিলেন!)
আবু দারদা (রা.) বলেন, আমি রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমির আনসারীর (রা.) বাড়ির পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তার সন্তান ও পরিবারের মানুষদের তার জন্মের ঘটনাবলি শেখাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন; আজই সেই দিন। তখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য রহমতের দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন এবং ফিরিশতাগণ তোমাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছে।
বর্তমানে মীলাদের পক্ষের কোনো কোনো আলিম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৯১১ হি.), আব্দুল হক্ক ইলাহাবাদী ও অন্যান্য আলিমের নামে এ সকল হাদীস উদ্ধৃত করছেন। এগুলোর কোনোরূপ সনদ কেউ উল্লেখ করেন নি। এমনকি ইসলামের প্রথম ৫০০ বছরে সংকলিত কোনো গ্রন্থে এগুলো সনদসহ বা সনদ ছাড়া সংকলিত হয়েছে বলেও কেউ প্রমাণ বা দাবি করেন নি।
৬০০ বছর যাবৎ সকল ইমাম ও বুজুর্গই কি মীলাদ বিরোধী ?
সম্মানিত পাঠক, ইহুদী-খ্রিস্টানগণ তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি কিতাবের নামে জালিয়াতি করে তাদের ধর্মকেই বিকৃত করতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিম উম্মাহও ইহুদী-খ্রিস্টানদের হুবহু অনুকরণ করে বিভ্রান্তির গভীরে নিমজ্জিত হবে বলে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতকে বারবার সাবধান করেছেন। (খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃ. ৫৪১-৫৬০।) আমরা দেখি যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে হাদীসের নামে জালিয়াতির প্রবণতা ইহুদী-খ্রিস্টানদের মতই ব্যাপকতা লাভ করে। তবে মহান আল্লাহ দ্বীন ইসলামকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছেন। সাহাবীদের যুগ থেকে উম্মাতকে সনদ সংরক্ষণ ও সনদ-যাচাইয়ের তাওফীক দিয়ে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার পথটি রক্ষা করেছেন। ইহুদী-খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। অন্যান্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলোতে সনদ সংরক্ষণ ও বিচারের ব্যবস্থা না থাকায় সহীহ ও জাল এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, পার্থক্য করার কোনো যুক্তিসম্মত পদ্ধতি নেই, ফলে প্রত্যেকে নিজ নিজ যুক্তি-বুদ্ধি ও পছন্দ অনুসারে কিছু সহীহ ও কিছু জাল বলে দাবি করেন। আর ইসলামের মধ্যে জালিয়াতগণ অনেক জালিয়াতি করলেও যাচাই করার পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু যদি কেউ জালিয়াতি করতে চান বা জাল কথা গ্রহণ করতে চান তবে তার কথা ভিন্ন।
সম্মানিত পাঠক, ন্যূনতম পর্যায়ের সাধারণ জ্ঞানের যে কোনো মুসলিম বুঝতে পারেন যে, এ কথাগুলো জাল। কারণ এগুলোর কোনো সনদ নেই। ইসলামের প্রথম ৬/৭ শত বছরের মধ্যে লিখিত কোনো গ্রন্থে সনদ-বিহীনভাবেও এ মিথ্যা কথাগুলো উল্লেখ করা হয় নি। তবে এ সকল হাদীসকে সহীহ বলে গ্রহণ করা আরো ভয়ঙ্কর বিষয়।
নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:
- মীলাদের সমর্থকগণ নিশ্চিত করেছেন। যে, প্রথম তিন প্রজন্মের কেউ মীলাদ উদযাপন করেন নি। পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ গবেষক প্রফেসর ড. তাহির কাদিরী রচিত মীলাদুন্নবী গ্রন্থটি পাঠ করলে পাঠক দেখবেন যে, তিনি নিজেও নিশ্চত করেছেন যে, বাদশাহ কুকবূরী (মৃত্যু ৬৩০ হি.) প্রথম মীলাদ উদযাপন শুরু করেন। এছাড়া তিনি মীলাদের সমর্থনে গত ৮০০ বছরের অনেক প্রসিদ্ধ আলিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তারা সকলেই বলেছেন, প্রথম তিন প্রজন্মের কেউ মীলাদ পালন করেন নি। (ড. তাহির কাদিরী, মীলাদুন্নবী (লাহোর, মিনহাজুল কুরআন পাবলিকেশন্স ২০০৪) পৃ. ৫০৩, ৬১৫, ৬২৬-৬৩১, ৬৩৮-৬৩৯, ৯২৬।) এখন উপরের জাল হাদীসগুলোকে সহীহ বলে দাবি করার অর্থ সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী তিন প্রজন্মের সকলকে বিভ্রান্ত বলে দাবি করা (নাউযু বিল্লাহ)। কারণ রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের এতগুলো বক্তব্য জানার পরেও যারা মীলাদ পালন করেন নি তাদের চেয়ে হতভাগা-বদকার ও রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদার শত্র আর কে হতে পারে!! (নাউযু বিল্লাহ)
- এ সকল হাদীসকে সহীহ বলে মানতে হলে হাজার বছরের সকল হাদীস সংকলক মুহাদ্দিসকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুশমন (!!) বলে গণ্য করতেই হবে। কারণ, ইবন আব্বাস (রা.), আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত মীলাদের মর্যাদা বিষয়ক রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস এবং আবু বকর (রা.), উমার (রা.), উসমান (রা.) ও আলী (রা.) থেকে বর্ণিত মীলাদের হাদীসগুলো তারা গোপন করেছেন। এ সকল সাহাবী (রা.) থেকে সহীহ, যয়ীফ বা জাল সনদে বর্ণিত অতি সাধারণ বিষয়ে অগণিত হাদীস তারা সংকলন করলেন, অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ হাদীসগুলো তারা কেউ কোনোভাবে সংকলন করলেন না!!
- ইসলামের প্রথম হাজার বছরে সংকলিত হাদীসগ্রন্থগুলোতে হাঁটাচলা, পানাহার, মলমূত্র ইত্যাদি বিষয়ে অগণিত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ও অনুচ্ছেদ বিদ্যমান। কিন্তু কিরাআতুল মাওলিদ (মীলাদ পাঠ), আমালুল মাওলিদ (মীলাদ পালন), ইহতিফালুল মাওলিদ (মীলাদ উদযাপন) ইত্যাদি নামে এ সকল হাদীসের গ্রন্থে একটি অধ্যায় তো দূরের কথা, একটি পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদও তারা লিখেন নি এবং একটি হাদীসও তারা সংকলন করেন নি।
- ইমাম আবু হানীফাসহ চার ইমাম ও ইসলামের প্রথম ৬০০ বছরের সকল ফকীহ একইভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা ও মীলাদের দুশমন বলে গণ্য হবেন। কারণ, তারা তাদের ফিকহী গ্রন্থগুলোতে অতি সামান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাদের কারো গ্রন্থে কিরআতুল মাওলিদ; (মীলাদের তাযীম) ইত্যাদি নামে কোনো একটি অধ্যায়, পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ বা মাসআলা তারা লিখলেন না। এর গুরুত্বও বললেন না!
- উম্মাতের প্রথম ৬০০ বছরের সকল আলিমই মীলাদ-বিরোধী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদার দুশমন (!!!) বলে গণ্য হবেন। কারণ, ৬০৪ হিজরী সালে মীলাদুন্নবী পালনের উদ্ভব হওয়ার পর থেকে বিগত ৮০০ বছরের উম্মাতের আলিম ও বুজুর্গগণ মীলাদুন্নবী বিষয়ে হাজার হাজার পুস্তক-পুস্তিকা রচনা করেছেন। কিন্তু এর আগের ৬০০ বছরে একজন আলিম বা বুজুর্গ মীলাদুন্নবী বিষয়ে একটি পুস্তিকাও রচনা করেন নি। মীলাদের সমর্থক আলিমগণও বারবার উল্লেখ করেছেন যে, মীলাদ বিষয়ক প্রথম বই রচনা করেন আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবনু দেহিয়া (৬৩৩ হি.)। তার রচিত এ বইয়ের নাম; আত-তানবীর ফী মাওলিদিল বাশির আন নাযীর। (ইবন খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান ৩/৪৪৯; সুয়ূতী, আল-হাবী (শামিলা) ১/২৭২) পূর্ববর্তী ৬০০ বছরের ইমাম, ফকীহ, মুজতাহিদ, পীরানে পীর, বুজুর্গ কেউ মীলাদ বিষয়ে একটি পুস্তিকাও লিখেন নি। তারা অনেক বই লিখেছেন, কিন্তু তাদের লেখা বইয়ের মধ্যে কিরাআতুল মাওলিদ (মীলাদ পাঠ) বা আমালুল মাওলিদ (মীলাদ পালন) বিষয়ে একটি ছোট্ট অনুচ্ছেদ বা বাক্যও লিখেন নি!
- আমরা যখন বলি যে, ইসলামের প্রথম ৬০০ বছর মীলাদ পালন ছিল না, পরে উদ্ভব হয়েছে তখন বিষয়টি খুবই সহজ হয়ে যায়। যেহেতু তাদের সময়ে কেউ মীলাদ পালন করার বিষয়টি জানতই না সেহেতু তারা এ বিষয়ে কিছু লিখেন নি। কিন্তু যখন প্রমাণ হয় যে, হাদীসে নববী এবং সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্যে মীলাদের গুরুত্ব বিদ্যমান তখন বিষয়টি ভিন্ন হয়ে যায়। হাদীসে মীলাদের এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা মীলাদের বিষয়ে একটি লাইন লিখলেন না! জীবনে মীলাদ পালন করলেন না! তারা কেমন মুসলমান???
বিষয়টি কী প্রমাণ করে? স্বভাবতই প্রমাণ করে যে, উম্মাতের প্রথম ৬০০ বছরে মুসলিমগণ কিরাআতুল মাওলিদ (মীলাদ পাঠ), আমালুল মাওলিদ (মীরাদ পালন) ইত্যাদি কিছুই জানতেন না। কিন্তু যদি কেউ উপরের হাদীসগুলোকে সহীহ বলে দাবি করেন তবে তাকে মানতেই হবে যে, উম্মাতের প্রথম ৬০০ বছরের সকল ইমাম, মুজাদ্দিদ, পীরানে পীর, বুজুর্গ সকলেই মীলাদ বিরোধী ছিলেন। শুধু তাই নয়, উপরন্তু তারা মীলাদ বিষয়ক হাদীস গোপনের মত মহাপাপ করেছেন।
ইমাম শাফিয়ীর প্রতিটি বক্তব্য সংকলন ও আলোচনা করেছেন বাইহাকী, নাবাবী ও অন্যান্য শাফিয়ী মুহাদ্দিস-ফকীহ। ইবন হাজার হাইসামী শাফিয়ীর নামে জালকৃত এ বইয়ে মীলাদের গুরুত্ব বিষয়ে তার এ মহান বক্তব্যটি তারা সকলেই গায়েব করে দিয়েছেন! শাফিয়ী মাযহাবের কোনো গ্রন্থে এ বক্তব্য নেই। এমনকি ইবন হাজার হাইসামীর লেখা শাফিয়ী মাযহাবের বড় বড় ফিকহী গ্রন্থেও তিনি মীলাদ বিষয়ে ইমাম শাফিয়ীর এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন নি। আমাদের মানতে হবে যে, এ বক্তব্য জাল অথবা নাবাবী, বাইহাকী, গাযালী, সুয়ুতী, ইবন হাজার আসকালানী, ইবন হাজার হাইসামী ও সকল শাফিয়ী ফকীহ তাদের ঈমানী ত্রুটির কারণে মীলাদের প্রসঙ্গ গোপন করেছেন!! (১/১৮১-১৮২; ইবন হাজার হাইসামী, তুহফাতুল মুহতাজ ী শরাহিল মিনহাজ (শামিলা) ৩১/৩৭৬-৩৭৭, ৩৮১; মুফতি আহমাদ ইয়ার খান, জা-আল হক ২/৪০-৪১।)
৮০০ বছরের সকল মীলাদ-পন্থীই কি সত্যগোপনকারী?
সম্মানিত পাঠক, এখানে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ৮০০ বছর যাবৎ অগণিত আলিম মীলাদের পক্ষে বইপত্র লিখেছেন। তারা সকলেই মীলাদকে বিদআতে হাসানা বলেছেন এবং ইসলামের প্রথম তিন যুগে কেউ মীলাদ পালন করেন নি বলে বারবার নিশ্চিত করেছেন। উপরের জাল হাদীসগুলোকে সহীহ মানতে হলে আমাদের মানতে হবে যে, তারা সকলেই সত্য গোপন করেছেন এবং মীলাদের অবমর্যাদা করেছেন। তারা আবু লাহাবের আমল দিয়ে মীলাদ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুস্পষ্ট হাদীসগুলো গোপন করেছেন। হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, ইতিহাস, তাসাউফ ইত্যাদি বিষয়ে সকল দু®প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ ও অধ্যায়ন করে পানাহার, শয়ন-নিদ্রা, মলমূত্র এবং অন্যান্য অতি সাধারণ বিষয়ের হাদীসগুলো তারা সংগ্রহ, সংকলন ও যাচাই-বাছাই করলেন, অথচ মীলাদের গুরুত্ব বিষয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ হাদীসগুলো তারা সংকলন বা মূল্যায়ন কিছুই করলেন না!!
সম্মানিত পাঠক, খ্রিস্টান প্রচারক বাংলাদেশের মুসলিমদের নানাবিধ প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করছেন। জালিয়াতিতে ভরা কিতাবুল মোকাদ্দস, ইঞ্জিল শরীফ ইত্যাদিকে আল্লাহর কালাম হিসেবে পেশ করে তারা মুসলিমদের প্রতারণা করছেন। আমরা যখন ময়দানে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে জালিয়াতি প্রমাণ করতে যাই তখন তারা বিভিন্ন অযুহাতে পালিয়ে যান বা এড়িয়ে যান। কিন্তু ময়দান ফাঁকা হলেই তারা সরল মুসলিমদের বলেন, কুরআনেই তো আছে তাওরাত-ইঞ্জিল আল্লাহর কালাম, সেগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে। আর আমাদের হাতের এগুলোই আদি-অকৃত্রিম তাওরাত-ইঞ্জিল। কাজেই এগুলো বিশ্বাস না করলে মুসলমান থাকা যাবে না!!
জাল হাদীসের বিষয়টিও একইরূপ। বিগত দেড় হাজার বছর যাবৎ যত জাল হাদীস ও জাল পুস্তক প্রকাশ পেয়েছে, উম্মাতের আলিমগণ সেগুলার জালিয়াতি উন্মোচন করেছেন। কিন্তু যারা যে কোনোভাবে নিজের মত প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর তারা জালিয়াতির এ সকল প্রমাণ খণ্ডনের চেষ্টা না করে, এর হাদীসগুলোর সনদ অনুসন্ধান না করেই সাধারণ মুসলিমদের সামনে এগুলোকে হাদীস হিসেবে পেশ করে নিজেদের মত প্রমাণের চেষ্টা করছেন। জাল নিমাতুল কুবরা গ্রন্থের ও মীলাদ বিষয়ক অন্যান্য জাল হাদীসের একই অবস্থা।
জালিয়াতি ও বিকৃতির অগণিত অকাট্য প্রমাণ জানার পরেও ইহুদী-খ্রিস্টানগণ বিভিন্ন অজুহাতে তাদের জাল ধর্মগ্রন্থগুলো প্রচার করে চলেছেন। মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও কিছু মানুষ এরূপই করছেন। তুরস্কের মাকতাবাতুল হাকীকাহ প্রকাশিত এ জাল বইটির জালিয়াতি সুস্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও এবং এতে উল্লেখিত হাদীসগুলো সনদবিহীন ও ভিত্তিহীন হওয়া সত্ত্বেও মীলাদ সমর্থক কিছু আলিম এ বইটির অনুবাদ ও প্রচার করছেন। হাদীসগুলোর সনদ অনুসন্ধানের কোনোরূপ চেষ্টাও করছেন না। ইহুদী-খ্রিস্টান ধর্মে জাল কথাগুলো সহীহ কথার সাথে মিশে গিয়েছে। তবে সনদ ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহ উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য যাচাইয়ের পথ খোলা রেখেছেন। হাজার বছর চলে গেলেও এবং হাজার হাজার প্রসিদ্ধ ইমাম আলিমের নামে জালিয়াতি করলেও কোনো জাল কথাই ইসলামের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে পারে না। সত্যানুসন্ধানীর জন্য নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ যাচাইয়ের পথ উন্মুক্ত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বা সাহাবী-তাবিয়ীগণের নামে মীলাদের পক্ষে এতগুলো হাদীস দেখে মুমিনের জন্য আনন্দিত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তার ঈমানের দাবি যে, তিনি প্রথমেই এগুলো সনদ ও সূত্র উদ্ধার করার চেষ্টা করবেন। নয়শত বা হাজার বছর পরে একজন আলিম একটি হাদীস বলছেন, তাহলে নিশ্চয় পুরাতন কোনো গ্রন্থে তা রয়েছে। মীলাদের পক্ষের বা বিপক্ষের প্রত্যেক আলিমের দায়িত্ব এগুলোর সনদ অনুসন্ধান ও যাচাই। যদি সনদ পাওয়া যায় ও গ্রহণযোগ্য হয় তবে সেগুলো মেনে নেওয়া প্রত্যেক মুমিনের ঈমানের দাবি। আর যদি সনদ না পাওয়া যায় বা সনদ জাল বলে প্রমাণ হয় তবে এগুলোকে প্রত্যাখান করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। ইবন হাজার হাইসামী এবং অন্যান্য ইমাম ও মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসের সনদ না জেনে বা অন্তত হাদীসের কোন গ্রন্থে তা সংকলিত তা নিশ্চিত না হয়ে সনদ-বিহীন হাদীস উল্লেখ করা ভয়ঙ্কর হারাম কর্ম বেং কোনো খতীব, ওয়ায়িজ বা লেখক এরূপ করলে তাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে শাস্তি দেওয়া জরুরি। (ইবন হাইতামী, আল-ফাতাওয়া আল-হাদীসিয়্যাহ (বৈরুত, তুরাস), পৃষ্ঠা ৬৩-৬৪ ও ১২১-১২২।)
সম্মানিত পাঠক, মীলাদ ও অন্য যে কোনো বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ভিন্ন মত পোষণ করা, ইজতিহাদ করা ও প্রমাণ পেশ করার অধিকার সকলেরই রয়েছে। কিন্তু তাই বলে জালিয়াতি!! মহান আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।
