প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

৮৩. মিক্দাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা) হইতে বর্ণিত- আলী ইব্ন আবি তালিব (রা) মিক্দাদকে নির্দেশ দিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নিকট তাঁহার পক্ষে প্রশ্ন করার জন্য। প্রশ্নটি হলো এই- এক ব্যক্তি তাঁহার স্ত্রীর নিকট যাওয়ায় তাহার লিঙ্গাগ্রে মযী (তরল পদার্থ, শুক্র নহে) বাহির হইয়াছে, সে ব্যক্তির প্রতি কি ওযূ ওয়াজিব হইবে? আলী (রা) বলিলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা যেহেতু আমার স্ত্রী সেহেতু তাঁহাকে এই ধরনের প্রশ্ন করিতে আমি লজ্জাবোধ করি। মিকদাদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপরিউক্ত প্রশ্ন করিলে তিনি বলিলেনঃ তোমাদের কেউ অনুরূপ অবস্থার সম্মুখীন হইলে সে নিজের লজ্জাস্থান পানি দ্বারা ধৌত করিবে, তারপর নামাযের ওযূর ন্যায় ওযূ করিবে।

৮৪. আসলাম (রা) হইতে বর্ণিত- উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) বলিয়াছেনঃ আমার ভিতর হইতে উহা মুক্তদানার মত নির্গত হইতে আমি অনুভব করি। তোমাদের কেউ এই অবস্থা প্রাপ্ত হইলে সে তাহার লজ্জাস্থান ধুইয়া লইবে এবং নামাযের ওযূর মত ওযূ করিবে। তিনি (হযরত উমর) ইহা দ্বারা মযীর বিষয় বলিতে চাহিয়াছেন।

৮৫. জুনদাব (র) হইতে বর্ণিত- তিনি বলেনঃ আমি আবদুল্লাহ্ ইবন্ উমর (রা)- কে মযী সম্পর্কে প্রশ্ন করিলাম। তিনি বলিলেনঃ তুমি উহা প্রাপ্ত হইলে তোমার লজ্জাস্থানকে ধুইয়া লও এবং নামাযের ওযূর মত ওযূ কর।

৮৬. ইয়াহ্ইয়াহ্ ইব্স সাঈদ (র) শুনিয়াছেন- সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র)- কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করিতে সে বলিলঃ আমি নামায পড়িতেছি এই অবস্থায় আর্দ্রতা অনুভব করি। তবে আমি কি (নামায ছাড়িয়া) ফিরিয়া যাইব? সাঈদ বলিলেনঃ আমার রানের উপর দিয়া ভাসিয়া পড়িলেও আমি আমার নামায সমাপ্ত না করিয়া ফিরিব না। (মযী বা ওদী নির্গত হওয়া যাহার ওযরে পরিণত হয় অর্থাৎ প্রায় সময় নির্গত হয় সেইরূপ ব্যক্তি নামাযের সময় ওযূ করার পর মযী নির্গত হইলে তাহার ওযূ নষ্ট হইবে না, সে নামায সমাপ্ত করিবে। আর যাহার জন্য ইহা ওযরে পরিণত হয় নাই তাহার যখন মযী বা ওদী নির্গত হইবে তখন ওযূ নষ্ট হইয়া যাইবে। -আওজায।)

৮৭. সাল্ত ইব্ন যুয়ায়দ (র) বলেনঃ আমি সুলায়মান ইব্ন ইয়াসার (র)- কে আর্দ্রতা সম্পর্কে প্রশ্ন করিলাম; যা আমি অনুভব করি অর্থাৎ মনে সন্দেহ জাগে হয়তো আর্দ্রতা আছে। তিনি বলিলেনঃ তোমার কাপড়ের (লুঙ্গি অথবা পায়জামা) নিচে পানি ছিটাইয়া দাও। তারপর উহার ফিকির ছাড়।

৮৮. আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন আমার ইব্ন হাযম (র) হইতে বর্ণিত- তিনি উরওয়াহ্ ইব্ন যুবায়র (র)- কে বলিতে শুনিয়াছেনঃ আমি মারওয়ান ইব্ন হাকাম (র)- এর নিকট গেলাম, আমরা উভয়ে ওযূ কিসে ওয়াজিব হয় সেই বিষয়ে আলোচনা করিলাম। মারওয়ান বলিলেনঃ জননেন্দ্রিয় স্পর্শ করিলে ওযূ করিতে হইবে। উরওয়াহ্ বলিলেনঃ আমি তো ইহা জানি না। মারওয়ান বলিলেনঃ বুসরা বিন্ত সফওয়ান (রা) আমাকে খবর দিয়াছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে বলিতে শুনিয়াছেনঃ তোমাদের কোন ব্যক্তি জননেন্দ্রিয় স্পর্শ করিলে ওযূ করিবে। (জননেদ্রিয় স্পর্শ করিলে হানাফী মতানুসারে ওযূ নষ্ট হয় না। – আওজায।)

৮৯. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- যখন জানাবত- এর গোসল করিতেন, সর্বপ্রথম উভয় হাত ধৌত করিতেন। অতঃপর নামাযের ওযূর মত ওযূ করিতেন। তারপর আঙুলসমূহ পানিতে দাখিল করিতেন, আঙুল দ্বারা চুলের গোড়ায় খিলাল করিতেন। অতঃপর উভয় হাত দিয়া তিন আঁজলা পানি তাঁহার শিরে ঢালিতেন। অতঃপর সর্বশরীরে পানি ঢালিতেন।

৯০. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন পাত্র হইতে, যাহাতে দুই অথবা তি সা’ (প্রায় চার অথবা ছয় সের পরিমান) পানি ধরিত, জানাবতের গোসল করিতেন।

৯১. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) যখন জানাবতের গোসল করিতেন, তিনি সর্বপ্রথম ডান হাতে পানি ঢালিতেন এবং উহাকে ধৌত করিতেন, অতঃপর লজ্জাস্থান ধুইতেন। তারপর কুলি করিতেন এবং নাক পরিস্কার করিতেন। তারপর মুখমন্ডল ধুইতেন এবং উভয় চক্ষুতে পানি ছিটা দিতেন। অতঃপর পুনরায় ডান হাত, তারপর বাম হাত ও মাথা ধুইতেন। তারপর (পূর্ণাঙ্গ) গোসল করিতেন এবং তাঁহার (দেহের) উপর পানি ঢালিয়া দিতেন।

৯২. মালিক (র) বলেনঃ তাঁহার নিকট রেওয়ায়ত পৌঁছিয়াছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)- কে মেয়েদের জানাবতের গোসল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইল। তিনি বলিলেনঃ স্ত্রীলোক তাহার মাথায় তিন চুল্লু পানি ঢালিবে এবং উভয় হাত দ্বারা মাথা (মাথার চুল) কচলাইবে।

৯৩. সাঙ্গদ ইব্ন মুসায়্যাব (র) হইতে বর্ণিত- উমর ইব্ন খাত্তাব, উসমান ইব্ন আফ্ফান (রা) ও নবী করীম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সহধর্মিণী আয়েশা (রা) বলিতেনঃ যখন (পুরুষের) লজ্জাস্থান (স্ত্রীর) লজ্জাস্থান স্পর্শ করিল তখন অবশ্য গোসল ওয়াজিব হইয়া গেল।

৯৪. আবূ সালমা ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন আউফ (র) বলেনঃ আমি নবী করীম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর পত্নী ‘আয়েশা (রা)- কে প্রশ্ন করিলামঃ কোন কাজ গোসলকে ওয়াজিব করে? তিনি বলিলেনঃ হে আবূ সালমা ! তুমি জান, তোমার দৃষ্টান্ত কি? তোমার দৃষ্টান্ত হইতেছে মুরগীর বাচ্চার মত, (আবূ সালমা (রা) শুধু মিলনে নয় শুক্র নির্গত হইলেই কেবল গোসল ওয়াজিব হইবে- এই মত পোষণকারীদের একজন।) যে মোরগকে যখন ডাক দিতে শোনে, তখন সেও মোরগের সহিত ডাক দেয়। শোন, (পুরুষের) লজ্জস্থান (স্ত্রীর) লজ্জাস্থান অতিক্রম করিলে গোসল ওয়াজিব হইবে।

৯৫. সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র) হইতে বর্ণিত- আবূ মূসা আশ‘আরী (রা) নবী করীম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সহধর্মিণী আয়েশা (রা)- এর নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি বলিলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহাবাদের মতানৈক্য আমার নিকট খুব ভারী ও কষ্টদায়ক হইয়াছে এবং তাহা এমন একটি বিষয়ে যাহা আপনার সমীপে উল্লেখ করা আমি মহাব্যাপার মনে করি। ‘আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বলিলেনঃ কি বিষয় উহা? তুমি যে বিষয় তোমার মাতার নিকট প্রশ্ন করিতে পার, সেই বিষয়ে আমার নিকটও প্রশ্ন করিতে পার। তারপর আবূ মূসা (রা) বলিলেনঃ কোন লোক তাহার স্ত্রীর সহিত সহবাস করার পর সে ক্লান্ত হইয়াছে এবং বীর্য নির্গত হয় নাই। সে কি করিবে? তিনি বলিলেনঃ (পুরুষের) লজ্জাস্থান (স্ত্রীলোকের) লজ্জাস্থান অতিক্রম করিলে গোসল ওয়াজিব হইবে। আবূ মূসা (রা) বলিলেনঃ আপনাকে জিজ্ঞাসা করার পর আমি এই বিষয় অন্য কাহারও নিকট আর কখনও জিজ্ঞাসা করিব না।

৯৬. মাহমুদ ইব্ন লবীদ আনসারী (রা) (মাহমুদ ইবনে লবীদ সাহবী কিনা এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম বুখারী (র)- এর মতে তিনি সাহাবী, ওফাত ৯৬ হিজরী।) যায়দ ইব্ন সাবিত আনসারী (রা)- এর নিকট প্রশ্ন করিলেন, সেই লোক সম্পর্কে যে লোক নিজের স্ত্রীর সহিত সহবাস করিয়াছে, তারপর ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে, বীর্য বাহির হয় নাই। তিনি বলিলেনঃ সে গোসল করিবে। মাহমুদ (রা) বলিলেনঃ উবাই ইব্ন কা‘ব (রা) গোসল (এই অবস্থায়) জরুরী মনে করিতেন না। যায়দ (রা) বলিলেনঃ মৃত্যুর পূর্বে উবাই ইব্ন কা‘ব (রা) এই মত প্রত্যাহার করিয়াছিলেন।

৯৭. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) বলিলেনঃ (পুরুষের) লজ্জাস্থান স্ত্রীলোকের লজ্জাস্থান অতিক্রম করিলে গোসল ওয়াজিব হইবে।

৯৮. আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- সমীপে উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) উল্লেখ করিলেন- রাত্রিতে তাঁহার জানাবত অর্থাৎ অপবিত্রতা হয় (স্বপ্নদোষ বা স্ত্রী সহবাসের দরুন)। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁহাকে বলিলেনঃ তুমি ওযূ কর এবং জননেন্দ্রিয় ধুইয়া ফেল, তারপর ঘুমাও।

৯৯. নবী করীম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সহধর্মিণী ‘আয়েশা (রা) বলিতেনঃ তোমাদের কেউ স্ত্রী সহবাস করিলে, অতঃপর গোসলের পূর্বে ঘুমাইতে ইচ্ছা করিলে সে নামাযের ওযূর মত ওযূ না করিয়া ঘুমাইবে না।

১০০. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) জানাবত হালতে ঘুমাইতে অথবা আহার করিতে ইচ্ছা করিলে তিনি মুখমণ্ডল ও উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধুইতেন এবং মাথা মসেহ করিতেন। তারপর আহার করিতেন অথবা ঘুমাইতেন।

১০১. ইসমাঈল ইব্ন আবি হাকীম (র) হইতে বর্ণিত- ‘আতা ইব্ন ইয়াসার (র) তাঁহাকে বলিয়াছেনঃ কোন এক নামাযে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তকবীর বলিলেন। অতঃপর হাত দিয়া তাঁহাদের (নামাযে শরীক উপস্থিত সাহাবীদের) দিকে ইশারা করিলেনঃ তোমরা নিজ নিজ স্থানে অবস্থানকর। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্থান করিলেন। অতঃপর প্রত্যাবর্তন করিলেন (এমন অবস্থায় যে), তাঁহার (পবিত্র) দেহের উপর পানির আলামত বিদ্যমান ছিল।

১০২. যুয়ায়দ ইব্ন সালত (র) বলেনঃ আমি উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)- এর সহিত বাহির হইলাম জুরুফ- এর (মদীনা হইতে তিন মাইল দূরের একটি পল্লী) দিকে। তাঁহার স্বপদোষ হইল এবং তিনি গোসল না করিয়া (ভুলে) নামায পড়িলেন। অতঃপর তিনি বলিলেনঃ কসম আল্লাহ্র! আমার মনে হয়, আমার অবশ্য ইহ্তিলাম (স্বপ্নদোষ) হইয়াছে অথচ আমি খবর রাখি না এবং আমি গোসল না করিয়া নামায পড়িয়াছি। তারপর তিনি গোসল করিলেন এবং কাপড়ে যা চিহ্ন দেখিলেন উহা ধুইলেন, যেখানে চিহ্ন নাই সেইখানে পানি ছিটাইয়া দিলেন। তারপর আযান ও ইকামত বলিলেন। অতঃপর দিবসের প্রথমাংশ সূর্য উচ্চতায় পৌঁছার পর নামায পড়িলেন।

১০৩. সুলায়মান ইব্ন ইয়াসার (র) হইতে বর্ণিত- উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) দিনের প্রথমাংশে জুরুফ নামক স্থানে অবস্থিত তাঁহার জমির দিকে গমন করিলেন। তিনি তাঁহার কাপড়ে স্বপ্নদোষ আলামত দেখিতে পাইলেন। তিনি বলিলেনঃ যখন হইতে লোকের দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করা হইয়াছে, তখন হইতে আমি ইহ্তিলামে লিপ্ত হইয়াছি। তারপর তিনি গোসল করিলেন এবং তাঁহার কাপড়ে স্বপ্নদোষের যা আলামত দেখিলেন উহা ধুইলেন। তারপর সূর্য ওঠার পর তিনি নামায পড়িলেন।

১০৪. সুলায়মান ইব্ন ইয়াসার (র) হইতে বর্ণিত- উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) লোকের সহিত (জামাতে) ফজরের নামায পড়িলেন, অতঃপর সকালবেলা ‘জুরুফ’- এ অবস্থিত তাঁহার জমির দিকে গমন করিলেন। তারপর তাঁহার কাপড়ে ইহ্তিলাম (চিহ্ন) এর চি‎হ্ন দেখিতে পাইলেন। তিনি বলিলেনঃ আমরা চর্বি (চর্বিযুক্ত খাদ্যদ্রব্য) যখন হইতে আহার করিতেছি তখন হইতে আমাদের শিরাসমূহ কোমল হইয়াছে। তারপর তিনি গোসল করিলেন এবং কাপড় হইতে ইহ্তিলাম (এর চিহ্ন) ধুইয়া ফেলিলেন এবং নামায পুনরায় পড়িলেন।

১০৫. ইয়াহ্ইয়াহ ইব্ন আবদুর রহমান (র) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)- এর সঙ্গে ‘উমরাহ’ করিলেন একই কাফেলায়। আর সেই কাফেলায় আমর ইব্নুল আস্ (রা)- ও ছিলেন। উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) কোন পানির (চশমা বা কূপ) নিকটবর্তী এক রাস্তায় (রাস্তার পাশে) রাত্রির শেষাংশে অবতরণ করিলেন। উমর (রা)- এর ইহ্িতলাম হইল। (এই দিকে) ফজর হইতে লাগিল কিন্তু কাফেলার সহিত পানি পাওয়া গেল না। তিনি সওয়ার হইয়া পানির নিকট আসিলেন। অতঃপর তিনি ইহ্তিলামের যা চিহ্ন দেখিলেন উহা ধুইতে লাগিলেন, তখন ফরসা হইয়া গিয়াছে। ‘আমার ইব্নুল ‘আস (রা) তাঁহাকে বলিলেনঃ আপনি ভোর করিলেন অথচ আমাদের সহিত কাপড় রহিয়াছে, আপনি আপনার বস্ত্র রাখিয়া দিন, (পরে) ধোয়া হইবে। উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) বলিলেনঃ ইব্নুল ‘আস্ ! আশ্চর্য তোমার প্রতি ! তোমার যদিও অনেক বস্ত্র আছে, কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট কি তদ্রুপ আছে? আল্লাহ্র কসম, আমি যদি ইহা করি তবে ইহা সুন্নতে পরিণত হইবে। আমি বরং যাহা আলামত দেখিব উহা ধুইব, আর যাহা দেখা না যায় উহাতে পানি ছিটাইয়া দিব।

মালিক (র) বলেনঃ যে ব্যক্তি তাহার কাপড়ে ইহ্তিলামের আলামত দেখিতে পায়, কোন সময় ইহ্তিলাম হইয়াছে সে তাহা জানে না, স্বপ্নে যা দেখিয়াছে তাহাও স্মরণ নাই, তবে সে সদ্য যে নিদ্রা হইতে জাগিয়াছে উহাতে ( ইহ্তিলাম হইয়াছে বলিয়া গণ্য করিয়া) গোসল করিবে। যদি সে এই নিদ্রার পর নামায পড়িয়া থাকে তবে সেই নামায পুনরায় পড়িবে। কারণ লোকের (অনেক সময়) ইহ্তিলাম হয় কিন্তু কোন কিছু (স্বপ্নে) দেখে না, আবার কোন সময় স্বপ্ন দেখে কিন্তু ইহতিলাম হয় না। তাই কাপড়ে যদি পানি দেখে (ইহতিলাম স্মরণ না থাকিলেও) তবে তাহার উপর গোসল ওয়াজিব হইবে। কারণ উমর ইব্ন খাত্তাব (রা) এই ঘটনায় শেষ বারের নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইবার পর যে নামায পড়িয়াছিলেন তিনি সেই নামায পুনরায় পড়িয়াছেন, উহার পূর্ববর্তী নামায অর্থাৎ ঐ নিদ্রার পূর্বেও নামায তিনি কাযা করেন নাই।

১০৬. উরওয়াহ ইব্ন যুবায়র (র) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নিকট উম্মু সুলায়ম বিনতে মিলহান (রা) বলিলেনঃ স্ত্রীলোক স্বপ্নে দেখিলে যেমন (স্বপ্ন) দেখিয়া থাকে পুরুষ, (সেই) স্ত্রীলোক গোসল করিবে কি? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁহাকে বলিলেনঃ হ্যাঁ, সে গোসল করিবে। ‘আয়েশা (রা) তাঁহাকে (উম্মু সুলায়মকে) বলিলেনঃ উঃ তোমার সর্বনাশ হোক ! স্ত্রীলোকও কি উহা দেখে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁহাকে (আয়েশা (রা)- কে) বলিলেনঃ ‘তোমার ডান হস্ত ধূলিধূসরিত হোক’। (স্ত্রীলোকের উহা না হইলে) তবে (সন্তান-এর) সাদৃশ্য আসে কোথা হইতে? অর্থাৎ সন্তান মায়ের মত হয় কিরূপে?

১০৭. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সহধর্মিনী উম্মু সালমা (রা) বলেনঃ আবূ তালহা আনসারী (রা)- এর স্ত্রী উম্মু সুলায়ম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর খিদমতে হাজির হইলেন এবং আরজ করিলেনঃ হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ হক কথা বলতে লজ্জা করেন না, স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হইলে তাহার উপর গোসল ওয়াজিব হইবে কি? হযরত বলিলেনঃ হ্যাঁ, পানি দেখিলে।

১০৮. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) বলিতেনঃ স্ত্রীলোকের গোসলের অবশিষ্ট পানি দ্বারা গোসল করাতে কোন দোষ নাই (অর্থাৎ ইহা জায়েয)। যদি স্ত্রীলোক ঋতুমতী অথবা জুনুবী না হয়।

১০৯. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ ইব্ন উমর (রা) পরিধানের কাপড়ে ঘর্মাক্ত হইতেন অথচ তখন তিনি জুনুবী। অতঃপর সেই কাপড়েই গোসলের পর তিনি নামায পড়িতেন।

১১০. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ ইব্ন উমর (রা)- এর বাঁদিগণ তাঁহার পদদ্বয় ধৌত করিত এবং তাঁহাকে খুমরা ছোট মুসল্লা বা জায়নামায প্রদান করিত, অথচ তাহারা তখন ঋতুমতী।

মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইল এক ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী ও বাঁদী রহিয়াছে, সেই ব্যক্তি গোসলের পূর্বে সকলের (স্ত্রী ও বাঁদিগণের) সঙ্গে সহবাস করিতে পারিবে কি? (উত্তরে) তিনি বলিলেনঃ জানাবতের গোসলের পূর্বে বাঁদীর সহিত সহবাস করা দোষের বিষয় নয় (অর্থাৎ ইহা জায়েয)। কিন্তু স্বাধীন স্ত্রীগণের ব্যাপারে মাস‘আলা এই- কোন ব্যক্তির পক্ষে নিজের স্ত্রীর (অধিকারের) দিনে (নিজের) আর এক স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হওয়া মাকরূহ। তবে কোন লোকের জন্য (তাঁহার) এক বাঁদীর সহিত সহবাস করিয়া অতঃপর আর এক বাঁদীর সহিত জুনব থাকা অবস্থায় মিলিত হওয়া দোষের ব্যাপার নহে।
মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইল এমন এক জুনুবী ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তির জন্য পানি রাখা হইয়াছে যাহা হইতে সে ব্যক্তি ফরয গোসল করিবে, তারপর সে ভুলবশত সেই পানিতে তাহার আঙ্গুল দাখিল করিয়াছে যাহাতে ঠাণ্ডা ও গরমের (মাত্রা) নির্ণয় করিতে পারে। (উত্তরে) মালিক (র) বলেনঃ তাহার আঙুলসমূহে কোন নাপাকী না পৌঁছিয়া থাকিলে তবে তাহার এই কাজে পানি নাপাক হইবে বলিয়া আমি মনে করি না।

১১১. উম্মুল মুমিনীন ‘আয়েশা (রা) বলিয়াছেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সঙ্গে সফওে গমন করিলাম। যখন আমরা বায়দা অথবা (তিনি বলিয়াছেন) যাতুল-জাইশ (নামক স্থান)- এ পৌঁছিলাম, তখন আমার একটি মালা হারান গেল। উহা অনুসন্ধানের জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- (সেখানে) াবস্থান করিলেন এবং লোকজনও তাঁহার সহিত অবস্থান করিলেন। তাঁহার কোন পানির (কুপ বা নহর) কাছে ছিলেন না এবং তাঁহাদেও সঙ্গেও পানি ছিল না। লোকজন আবূ বকর সিদ্দীক (রা)- এর নিকট উপস্থি হইলেন এবং ঘটনা বিবৃত করিলেন। তাঁহারা বলিলেনঃ ‘আয়েশা (রা) কি করিয়াছেন তাহা কি আপনি জানেন না? (তিনি) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে এবং অন্য লোকদিগকে অবস্থানে বাধ্য করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা পানির কাছে নহেন এবং তাঁহাদের সঙ্গে পানিও নাই। ‘আয়েশা (রা) বলেনঃ তারপর আবূ বকর (রা) আমার নিকট আসিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- তাঁহার (পবিত্র) শির আমার ঊরুর উপর স্থাপন করিয়া ঘুমাইতেছিলেন। তিনি (আবূ বকর (রা)) বলিলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং লোকদিগকে তুমি আটকাইয়া রাখিয়াছ। অথচ তাঁহারা পানির পার্শ্বে নহেন এবং তাঁহাদেও সাথে পানিও নাই। ‘আয়েশা (রা) বলিলেনঃ তারপর আবূ বকর (রা) আমার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করিলেন এবং আমাকে তিরস্কার করিলেন। আর তাঁহার হাত দিয়া আমার কোমরে খোঁচা মারিতে লাগিলেন।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর (পবিত্র) শির আমার ঊরুর উপর স্থাপিত থাকার দরুণ আমি (খোঁচা মারা সত্ত্বেও) নড়াচড়া করিতে ছিলাম না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর ঘুমাইয়া পড়িলেন এমন কি এই পানিহীন অবস্থায় ভোর হইল। তারপর আল্লাহ্ তা’আলা তাইয়াম্মুমের আয়াত নাযিল করিলেন। তারপর তাঁহারা সকলে তাইয়াম্মুম করিলেন। উসায়দ ইব্ন হুযায়র (রা) বলিলেনঃ হে আবূ বকরের পরিজন! ইহা (অর্থাৎ তাইয়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ হওয়া) আপনাদের প্রথম বরকত নহে। (অর্থাৎ মুসলিমগণ আপনাদের দ্বারা নানাভাবে উপকৃত হইয়াছেন।) ‘আয়েশা (রা) বলিলেনঃ তারপর আমি যে উটের উপর আরোহণ করিয়াছিলাম উহাকে উঠাইলাম এবং উহার নিচে মালা পাইলাম।

মালিক (রা)- কে প্রশ্ন করা হইল এক ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তি উপস্থিত নামাযের জন্য তাইয়াম্মুম করিয়াছে। অতঃপর পরবর্তী নামায উপস্থিত হইয়াছে, ঐ লোক কি সেই নামাযের জন্য (আবার) তাইয়াম্মুম করিবে, না সেই (পূর্ববর্তী) তাইয়াম্মুম তাঁহার জন্য যথেষ্ট হইবে? উত্তরে তিনি বলিলেনঃ প্রত্যেক (ফজর) নামাযের জন্য তাইয়াম্মুম করিবে। কারণ (সময় উপস্থিত হইলে) প্রত্যেক নামাযের জন্য পানির অনুসন্ধান করা তাহার ওয়াজিব। যে ব্যক্তি পানির অনুসন্ধান করিল কিন্তু পানি পাইল না, সে তাইয়াম্মুম করিবে।

মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইল এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তি তাইয়াম্মুম করিয়াছে এবং তাহার সাথিগণ যাহারা ওযূ করিয়াছেন সে তাহাদের ইমামতি করিতে পারিবে কি? (উত্তরে) তিনি বলিলেনঃ সেই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ ইমামতি করিলে তাহা আমার কিট পছন্দনীয়, আর যদি সে তাহাদের ইমামতি করিয়া থাকে, তবে তাহাতেও আমি কোন দোষ দেখি না।
মালিক (র) বলিয়াছেন, এক ব্যক্তি পানি না পাইয়া তাইয়াম্মুম করিয়াছে, তারপর সে নামাযে দাঁড়াইয়াছে এবং তকবীর বলিয়া নামায আরম্ভ করিয়াছে। অতঃপর একজন লোক পানিসহ তাহার নিকট আগমন করিল। তিনি বলেনঃ সে নামায ছাড়িবে না, বরং তাইয়াম্মুম দ্বারা সেই নামায পূর্ণ করিবে এবং আগামী নামাযের জন্য ওযূ করিবে।

মালিক (র) বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি নামাযের (প্রস্তুতির) জন্য দাঁড়াইয়াছে; কিন্তু সে পানি না পাইয়া আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক তাইয়াম্মুমের আমাল করিয়াছে তবে সেই ব্যক্তি মহান আল্লাহ আনুগত্যই করিয়াছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পানি পাইয়াছে (ও ওযূ করিয়াছে) তাহা (উপরিউক্ত তাইয়াম্মুমকারী ) অপেক্ষা সেই ব্যক্তি বেশি পবিত্র ও নামাযের পূর্ণতাকারী বলিয়া গণ্য হইবে না; কারণ তাহারা উভয়েই নির্দেশপ্রাপ্ত এবং প্রত্যেকে মহিমান্বিত আল্লাহ্র পক্ষ হইতে যাহা নির্দেশ পাইয়াছে সেই মুতাবিক আমল করিয়াছে। যে ব্যক্তি পানি পাইয়াছে সেই ব্যক্তির আমল হইল ওযূ, যেমন আল্লাহ্র তা‘আলা তাহাকে নির্দেশ করিয়াছেন, আর যে ব্যক্তি নামায শুরুর পূর্বে পানি পায় নাই সেই ব্যক্তির জন্য (নির্দেশ) হইল তাইয়াম্মুম।

মালিক (র) বলিয়াছেন, জুনুবী ব্যক্তি তাইয়াম্মুম করিবে এবং কুরআন হইতে তাহার নির্ধারিত অংশ তিলাওয়াত করিবে এবং নফল নামায পড়িবে যতক্ষণ পর্যন্ত পানি না পায়। তবে ইহা সেই স্থানের জন্য যে স্থানে তাহার ন্য তাইয়াম্মুম দ্বারা নামায পড়া বৈধ।