প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

‘দুলুকুশ শাম্স ও গাসাকুল লাইল’-এর বর্ণনা

১৯. নাফি’ (রহ.) হইতে বর্ণিত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলিতেন, ‘দুলুকুশ শাম্স’ হইতেছে (মধ্যাকাশ হইতে) সূর্য পশ্চিমে হেলিয়া পড়া।

২০. আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলিতেন, ‘দুলুকুশ শাম্স’ যখন ছায়া (পশ্চিম দিকে) ঝুঁকে আর ‘গাসাকুল লাইল’ হইতেছে রজনী ও উহার অন্ধকার।

নামাযের সময় সম্পর্কীয় বিবিধ রেওয়ায়ত

২১. নাফি’ (রহ.) হইতে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলিয়াছেন, যাহার আসরের নামায ফাউত হইয়াছে, তবে যেন তাহার পরিবার-পরিজন ও সম্পদ ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছে (অর্থাৎ পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ হারাইলে যেমন ক্ষতি হয় তদ্রƒপ ক্ষতি হইয়াছে)।

২২. ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহ.) হইতে বর্ণিত, আসরের নামায হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে উমর ইবন খাত্তাব (রা.)-এর এমন এক ব্যক্তির সহিত সাক্ষাৎ হইল যিনি আসরের নামাযে হাজির হন নাই। হযরত উমর (রা.) বলিলেন : আসরের নামায হইতে তোমাকে কোন বস্তু বিরত রাখিল? লোকটি তাঁহার (হযরত উমরের) নিকট ওজর ব্যক্ত করিলেন। ওজর শোনার পর উমর (রা.) বলিলেন : (জামা’আতে হাজির না হওয়ায়) তোমার পুণ্য কমিয়াছে।
মালিক (রহ.) বলেন : বলা হইয়া থাকে “প্রত্যেক বস্তুর পূর্ণতা এবং ক্ষতি বা লোকসান রহিয়াছে।”

২৩. ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহ.) বলিতেন : মুসল্লি এমন সময়ে নামায পড়িবে, যখন তাঁহার নামাযের ওয়াক্ত ফাউত হয় নাই, তাহা অতি উত্তম, কিন্তু মুসল্লির নামাযের যে সময় ফাউত হইয়া গিয়াছে (অর্থাৎ মুস্তাহাব সময় ফাউত হইয়া মাকরূহ ওয়াক্ত উপস্থিত হইয়াছে) তবে সেই (ফাউত হওয়া মুস্তাহাব) সময় তাঁহার পরিজন ও মাল অপেক্ষাও বড় উত্তম।

মালিক (রহ.) বলেন : সফরকাল (যেই সফরে নামায কসর পড়িতে হয় সেইরূপ সফর) যাহার নামাযের সময় উপস্থিত হইয়াছে, সে যদি ভুলে অথবা ব্যস্ততাবশত নামায পড়িতে বিলম্ব করে এবং এই অবস্থায় নিজের পরিজনের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, তবে সে যদি নামাযের সময় থাকিতে পরিজনের নিকট প্রত্যাবর্তন করে সে মুকীমের নামায পড়িবে, আর যদি নামাযের সময় চলিয়া যাওয়ার পর প্রত্যাবর্তন করে, সে মুসাফিরের নামায পড়িবে। কারণ তাহার উপর ফরয হইয়াছিল সেইরূপ সে কাযা পড়িবে।
মালিক (রহ.) বলেন : আমাদের নগরীর লোকজন ও আহলে ইলমকে আমি ইহার উপরই পাইয়াছি (অর্থাৎ তাঁহাদের আমল ও অভিমতও ঐরূপই ছিল)।

মালিক (রহ.) বলেন : অস্তাচলে যে লালিমা দুষ্ট হয় উহাই শফক। লালিমা চলিয়া গেলে ইশার নামায ওয়াজিব হইল এবং তুমি মাগরিবের সময় হইতে বাহির হইলে। (ইমাম মালিক, শাফিয়ী, আহমদ, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ (রহ.)-এর মাযহাব অনুরূপ। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন : লালিয়া অস্ত যাওয়ার পর সাদা বর্ণ দেখা যায়, উহাই শফক : ইহা অদৃশ্য হইলে ইশার নামাযের সময় আরম্ভ হয়। ইশার সময় আরম্ভ না হওয়া পর্যন্ত মাগরিবের সময় থাকে।)

২৪. নাফি’ (রহ.) হইতে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) একবার সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলিলেন। (হুশ ফিরিয়া আসার পর) তিনি আর নামাযের কাযা আদায় করিলেন না।
মালিক (রহ.) বলেন : আমাদের মতে ইহা এজন্য যে, নামাযের সময় চলিয়া গিয়াছিল। আর নামাযের সময় থাকিতে যে সংজ্ঞা ফিরিয়া পায় সে নামায আদায় করিবে (আল্লাহ সর্বজ্ঞ)।

২৫. সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহ.) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বর হইতে প্রত্যাবর্তন করার সময় রাত্রিবেলা পথ চলিলেন; যখন রাত্রির শেষ সময় হইল তিনি (নিদ্রার জন্য) অবতরণ করিলেন এবং বিলাল (রা.)-কে বলিলেন : তুমি প্রত্যুষের প্রতি লক্ষ রাখ (ভোর হইলে আমাদিগকে জাগাইয়া দিবে)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁহার সাহাবীগণ ঘুমাইয়া পড়িলেন। বিলাল (রা.) যথাসাধ্য লক্ষ রাখিতে লাগিলেন। অতঃপর উটের হাওদার সাথে ঠেস দিয়া ভোরের আলোর উদয়ের স্থানকে সম্মুখে রাখিয়া বসিলেন। হঠাৎ তাঁহার উপর নিদ্রা ভর করিল।

এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বিলাল এবং কাফিলার অন্য কেউ জাগ্রত হইলেন না যতক্ষণ না সূর্যকিরণ তাঁহাদের উপর পতিত হইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘাবড়াইলেন; তারপর বলিলেন : বিলাল ইহা কি? বিলাল বলিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনাকে যিনি ঘুম পাড়াইয়াছেন তিনি আমাকেও ঘুম পাড়াইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন : তোমরা উট চালিত কর (এবং স্থানান্তরিত হও) তাঁহারা উটগুলোকে উঠাইলেন এবং কিছুদুর চলিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলালকে নির্দেশ দিলেন (ইকামত বলার জন্য)। তিনি ইকামত বলিলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁহাদিগকে ফজরের নামায পড়াইলেন। নামায সমাপ্ত করার পর তিনি বলিলেন : যে নামাযকে ভুলিয়া যায় (অর্থাৎ নামায হইতে গাফিল হয় নিদ্রা অথবা ভুলের দরুন) নামাযের কথা স্মরণ হইলে পর সে উহা পড়িয়া নিবে। কারণ আল্লাহতা’আলা বলিয়াছেন “আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর।”

২৬. যায়দ ইবন আসলাম (রা.) হইতে বর্ণিত- মক্কার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (একবার বিশ্রাম গ্রহণের জন্য) রাত্রিতে অবতরণ করিলেন এবং বিলালকে নামাযের জন্য জাগাইয়া দেওয়ার দায়িত্বে নিযুক্ত করিলেন। তারপর বিলাল ঘুমাইলেন এবং অন্য সকলেও ঘুমাইলেন। এমন কি তাঁহারা জাগিলেন সূর্য ওঠার পর। হতচকিত অবস্থায় দলের লোকজন জাগ্রত হইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁহাদিগকে সওয়ার হওয়ার এবং সেই উপত্যকা হইতে বাহিরে চলিয়া যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আর তিনি বলিলেন : এই উপত্যকায় অবশ্যই শয়তান রহিয়াছে। তারপর তাঁহারা সওয়ার হইলেন এবং ওযু করার নির্দেশ দিলেন। আর বিলালকে নামাযের জন্য আযান অথবা ইকামত বলার হুকুম করিলেন।

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকজনকে নামায পড়াইলেন। তারপর তাঁহাদের দিকে মুখ ফিরাইলেন এবং তাঁহাদের ঘাবড়ানোর অবস্থা অনুধাবন করিলেন। তখন তিনি বলিলেন : হে লোকসমাজ! আল্লাহ্ আমাদের আত্মাসমূহকে কাবু করিয়াছিলেন, আর তিনি যদি ইচ্ছা করিতেন এই সময় ব্যতীত ভিন্ন সময়ে আত্মাসমূহকে আমাদের নিকট ফেরত দিতে পারিতেন। যদি তোমাদের কেউ নামায হইতে ঘুমাইয়া পড় অথবা উহাকে ভুলিয়া যাও, অতঃপর হঠাৎ নামাযের কথা স্মরণ হয়, তবে সেই নামাযকে উহার নির্ধারিত সময়ে যেইরূপে পড়িতে সেইভাবে পড়িবে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর (রা.)-এর দিকে দৃষ্টি করিলেন। তারপর বলিলেন : বিলাল যখন দাঁড়াইয়া নামায পরিতেছিল তখন তাঁহার কাছে শয়তান আসিল এবং তাঁহাকে ঠেস দেওয়াইয়া বসাইল এবং শিশুকে যেভাবে (থাপি দিয়া) শান্ত করা হয় ও ঘুম পাড়ানো হয় সেইভাবে তাঁহার সঙ্গে বারবার করিতে থাকিল। এমন কি (শেষ পর্যন্ত) বিলাল ঘুমাইয়া পড়িল। তাঁরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলালকে আহ্বান করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর (রা.)-কে যেরূপ বলিয়াছিলেন বিলালও অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বর্ণনা করিলেন। ইহা শুনিয়া আবু বকর (রা.) বলিলেন : আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল।

দ্বিপ্রহরে (উহার প্রখর রৌদ্রতাপে) নামায পড়া নিষেধ

২৭. আতা ইবন ইয়াসার (রহ.) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেন, জাহান্নামের মূল হইতেই প্রখর গ্রীষ্মের উৎপত্তি। তাই প্রচণ্ড গ্রীষ্মের সময় নামায দেরি করিয়া পড়। তিনি আরও বলিলেন, (জাহান্নামের) অগ্নি তাঁহার নিকট ফরিয়াদ জানাইয়া বলিল, হে রব! আমার এক অংশ অপর অংশকে খাইয়া ফেলিল। অতঃপর (আল্লাহ তা’আলা) উহাকে বৎসরে দুইবার শ্বাস ছাড়ার অনুমতি দিলেন- এক শ্বাস শীতকালে আর অপর শ্বাস গ্রীষ্মে।

২৮. আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেন, যখন গ্রীষ্ম প্রখর হয় সেই সময় নামায বিলম্ব করিয়া (গ্রীষ্মের প্রচণ্ডতা যখন কমিয়া যায় তখন) পড়। কারণ গরমের প্রখরতার উৎপত্তি জাহান্নামের মূল হইতেই। তিনি (আরও) উল্লেখ করিলেন, জাহান্নাম (উহার আগুন) তাহার পরওয়ারদিগারের নিকট ফরিয়াদ জানাইল। ফলে আল্লাহ তা’আলা উহার জন্য প্রতি বৎসর দুইটি শ্বাসের অনুমতি দিলেন, একটি শ্বাস শীত মওসুমে আর একটি গ্রীষ্মকালে।

২৯. আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেন, যখন গ্রীষ্মের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধি পায় তখন তোমরা নামায দেরি করিয়া পড়িও। কারণ গ্রীষ্মের প্রখরতার উৎপত্তি জাহান্নামের মূল হইতেই।

নামাযে মুখ ঢাকিয়া রাখা এবং পিয়াজের গন্ধসহ মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ

৩০. সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহ.) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেন, যে এই উদ্ভিদ হইতে আহার করে সে আমাদের মসজিদসমূহের নিকটে যেন না আসে, পিয়াজের গন্ধ আমাদের কষ্ট দিবে।

সালিম ইবন আব্দুল্লাহ (রহ.) কোন লোককে নামাযে মুখাবৃত দেখিলে খুব জোরে কাপড় (মুখ হইতে) টানিয়া লইতেন। এমন কি মুখ হইতে ছিনাইয়া লইতেন।

পবিত্রতা অর্জন ওযুর পদ্ধতি

৩১. ইয়াহইয়া মাযনী (রহ.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন আসিম (রা.)-কে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে ওযু করিতেন আপনি আমাকে দেখাইতে পারেন কি? আবদুল্লাহ ইবন যায়দ (রা.) বলিলেন, হ্যাঁ পারি। তারপর তিনি পানি আনাইলেন এবং তাঁহার হাতের উপর পানি ঢালিলেন। তিনি দুই দুইবার তাঁহার উভয় হাত ধুইলেন, তারপর কুলি করিলেন ও নাক পরিষ্কার করিলেন তিনবার। তারপর মুখমণ্ডলকে তিনবার ধুইলেন, তারপর কনুই পর্যন্ত উভয় হাত ধুইলেন দুই দুইবার। পরে দুই হাত দ্বারা শির মসেহ করিলেন, দুই হাত দিয়া সম্মুখ হইতে আরম্ভ করিয়া পিছনের দিকে নিলেন এবং পিছনের দিক হইতে আরম্ভ করিয়া সামনের দিকে আনিলেন। মসেহ আরম্ভ করিলেন মাথার সামনের দিক হইতে। অতঃপর উভয় হাত মাথার পিছনের দিকে নিয়া গেলেন। তারপর উভয় হাত ফিরাইলেন এবং যে স্থান হইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, পুনরায় সেই স্থানেই ফিরাইয়া আনিলেন। তারপর তাঁহার দুই পা ধুইলেন।

৩২. আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেন : তোমাদের কেউ যখন ওযু করে, তখন সে যেন তাহার নাকে পানি দেয়, তারপর নাক পরিষ্কার করে, আর যে কুলুখ গ্রহণ করে সে যেন বেজোড় কুলুখ নেয়।

৩৩. আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন : যে ওযু করে সে যেন নাক পরিষ্কার করে আর সে কুলুখ নেয় সে বেজোড়া নেয়।

৩৪. ইয়াহইয়া (রা.) বলেন : আমি মালিক (রহ.)-কে বলিতে শুনিয়াছি, এক আজলা পানি দ্বারা যে কুলিও করে এবং নাকও পরিষ্কার করে, তাহার এইরূপ করাতে কোন ক্ষতি নাই।

৩৫. মালিক (রহ.)-এর নিকট রেওয়ায়েত পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী আয়িশা (রা.)-এর নিকট আবদুর রহমান ইবন আবু বকর (রা.) উপস্থিত হইলেন, যেদিন সা’দ ইবন আবু ওয়াককাস (রা.) ইন্তিকাল করিয়াছেন সেদিন। তারপর তিনি ওযুর পানি চাহিলেন। আয়িশা (রা.) তাঁহাকে বলিলেন, পূর্ণরূপে ওযু কর, কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলিতে শুনিয়াছি “পায়ের গিটসমূহের জন্য ধ্বংস নরকাগ্নির।” (অর্থাৎ যে ব্যক্তি ওযুতে পায়ের গিট ধৌত করে না তাহাকে নরকাগ্নির ভয় দেখানো হইয়াছে)

৩৬. আবদুর রহমান (রহ.) বর্ণনা করেন যে, তিনি শুনিয়াছেন উমর ইবন খাত্তাব (রা.) পানি দ্বারা তাঁহার ইযার-এর (পায়জামা বা লুঙ্গী) নিচে ধুইতেন।

৩৭. মালিক (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হইল এমন এক লোক সম্পর্কে যে ওযু করিয়াছে এবং ভুলে কুলি করার পূর্বে মুখমণ্ডল ধুইয়া ফেলিয়াছে অথবা মুখমণ্ডল ধোয়ার পূর্বে ধুইয়াছে দুই হাত। তিনি (উত্তরে) বলিলেন : কুলি করার আগে যে ব্যক্তি মুখমণ্ডল ধুইয়াছে সে কুলি করিয়া লইবে এবং পুনরায় আর মুখমণ্ডল ধুইবে না। আর যে ব্যক্তি মুখমণ্ডল ধোয়ার পূর্বে তাঁহার হস্তদ্বয় ধুইয়াছে সে মুখমণ্ডল ধুইবে এবং পুনর্বার উভয় হাত ধুইবে, যেন হস্তদ্বয় ধোয়ার কাজ মুখমণ্ডল ধোয়ার পরে হয়। তবে ইহা তখন করিবে যখন সে ওযুর স্থানে অথবা উহার নিকটবর্তী স্থানে থাকে।

৩৮. মালিক (রহ.)-কে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইল, যে ব্যক্তি ভুলবশত কুলি করে নাই অথবা নাক পরিষ্কার করে নাই, এই অবস্থায় সে নামায পড়িয়াছে। উত্তরে তিনি বলিলেন : সে লোকের পক্ষে নামায পুনরায় পড়িতে হইবে না। সে পরে অন্য নামায পড়িতে ইচ্ছা করিলে তবে কুলি করিয়া লইবে এনং নাক পরিষ্কার করিবে। (হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হইবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করিবে এবং তোমাদের মাথা মসেহ করিবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করিবে।)

নিদ্রা হইতে জাগার পর ওযু করিয়া নামায পড়িতে ইচ্ছা করিলে

৩৯. আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন : তোমাদের কেউ ঘুম হইতে জাগ্রত হইলে ওযুর পাত্রে হাত দেওয়ার পূর্বে তাঁহার হাত ধুইয়া লইবে, কেননা সে অবগত নহে তাহার হাত কোথায় রাত্রি যাপন করিয়াছে।

৪০. উমর ইবনু খাত্তাব (রা.) বলেন : তোমাদের কেউ কোন বস্তুর সাথে ঠেস দিয়া ঘুমাইলে ওযু করিবে।
যায়দ ইবন আসলাম (রা.) এই আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে বলেন : ইহা সেই সময়, যখন শয্যা অর্থাৎ নিদ্রা হইতে তোমরা ওঠ।

৪১. মালিক (রহ.) বলেন : আমাদের ফয়সালা এই- নাক দিয়া রক্ত প্রবাহিত হইলে, শরীর হইতে খুন নির্গত হইলে এবং পুঁজ বহির্গত হইলে ওযু করিতে হইবে না। (হানাফী মতে রক্ত বা পুঁজ নিজ স্থান হইতে বহিয়া পড়িলে ওযু করিতে হইবে।- আওজায) হাদস যাহাতে ওযু নষ্ট হয়, এর কারণে ওযু করিতে হইবে; যাহা বাহির হয় গুহ্যদ্বার অথবা জননেন্দ্রীয় হইতে অথবা নিদ্রার কারণে।
নাফি’ (রহ.) হইতে বর্ণিত- ইবন উমর (রা.) বসা অবস্থায় ঘুমাইতেন। অতঃপর ওযু না করিয়া নামায পড়িতেন।

ওযূর জন্য পবিত্র পানি ব্যবহার করা

৪২. মুগীরা ইব্ন আবী বুরদা (রহ.) আবূ হুরায়রা (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছেনঃ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসিয়া বলিলঃ হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা সাগরে আরোহণ করি (নৌকা বা জাহাজে আরোহণ করি) আর আমাদের সঙ্গে অল্প পানি বহন করি। যদি আমরা সেই পানি দ্বারা ওযূ করি তবে আমরা পিপাসিত থাকিব। তাই সমুদ্রের পানি দ্বারা আমরা ওযূ করিব কি? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইরশাদ করিলেনঃ সাগরের পানি অতি পবিত্র। ইহার মৃত জীব হালাল।

৪৩. কাব্সা বিনতে কাব ইব্ন মালিক (রহ.) হইতে বর্ণিত- আবূ কাতাদা (রা) তাঁহার নিকট আসিলেন। কাব্সা তাঁহার জন্য ওযূর পানি ঢালিতে ছিলেন। এমন সময় একটি বিড়াল উহা হইতে পানি পান করার জন্য আসিল। আবূ কাতাদা পানির পাত্র ইহার জন্য কাত করিলেন, বিড়াল পানি পান করিল। কাব্সা বলেনঃ তিনি আমাকে দেখিলেন আমি খুব বিস্ময়ের সহিত তাঁহার দিকে দেখিতেছি। তাই তিনি বলিলেনঃ হে ভাতিজী! তুমি কি আশ্চর্যবোধ করিতেছ? আমি (উত্তরে) বলিলাম ঃ হ্যাঁ। তারপর তিনি বলিলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলিয়াছেনঃ বিড়াল নাপাক নহে, উহা তোমাদের আশেপাশে যাঁহারা অধিক ঘোরাফেরা করে, তাহাদের অন্তর্ভুক্ত।

মালিক (রহ.) বলেনঃ বিড়ালের মুখে নাজাসত (নাপাকী) না থাকিলে উহার মুখ (পাত্রে) দেওয়াতে কোন ক্ষতি নাই।

৪৪. ইয়াহ্ইয়া ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন হাতিব (রহ.) হইতে বর্ণিত- উমর ইব্ন খাত্তাব (রা.) এক কাফেলার সহিত বাহির হইলেন। কাফেলায় ‘আমর ইব্ন ‘আস (রা.)-ও শরীক ছিলেন। তাঁহারা একটি জলাধারের নিকট অবতরণ করিলেন। জলাধারের মালিককে ‘আমর ইবন ‘আস বলিলেন ঃ হে জলাধারের মালিক! আপনার জলাধারে চতুষ্পদ জন্তু অবতরণ করে কি? উমর ইব্ন খাত্তাব (রা.) জলাধারের মালিককে বলিলেনঃ আপনি (এই বিষয়ে) আমাদিগকে খবর দিবেন না। কারণ আমরা চতুষ্পদ জন্তুসমূহের নিকট বিচরণ করি এবং তাহারাও আমাদের কাছে বিচরণ করে।

৪৫. নাফি’ (রহ.) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা.) বলিতেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে নারী-পুরুষ একত্রে ওযূ করিতেন।

যাহাতে ওযূ ওয়াজিব হয় না

৪৬. ইবরাহীম ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন ‘আউফ্ (রহ.)-এর উম্মে-ওয়ালাদ (তাঁহার নাম হুমায়দা বলা হইয়াছে) হইতে বর্ণিত- তিনি নবী করীম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী উম্মে-সালমা (রা)-এর নিকট প্রশ্ন করিলেনঃ আমি একজন স্ত্রীলোক। আমি আমার কাপড়ের ঝুল লম্বা রাখি আর আমি কোন কোন সময় চলাফেরা করি আবর্জনাযুক্ত স্থান দিয়া। উম্মে-সালমা (রা.) বলিলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেনঃ কাপড়ের ঝুলকে আবর্জনাযুক্ত রাস্তার পরবর্তী স্থান পবিত্র করিয়া দিবে।

৪৭. মালিক (রহ.) বলেনঃ তিনি রবী’আ ইব্ন আবদুর রহমানকে কয়েকবার উদর হইতে পানি বমি করিতে দেখিয়াছেন, তখন তিনি ছিলেন মসজিদে। তিনি অতঃপর নামায আদায় করা পর্যন্ত মসজিদ হইতে বাহিরেও যাইতেন না এবং ওযূও করিতেন না।
ইয়াহ্ইয়া (রহ.) বলেনঃ মালিক (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হইয়াছে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তি খাদ্যবস্তু বমি করিয়াছে, তাহার জন্য ওযূ ওয়াজিব হইবে কি? তিনি বলিলেনঃ তাহার জন্য ওযূ ওয়াজিব নহে, ইহার জন্য সে কুলি করিবে এবং তাহার মুখ ধুইবে।

৪৮. নাফি’ (রহ.) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা.) সাঈদ ইব্ন যায়দ-এর এক (মৃত) পুত্রকে হানূত (এক প্রকারের খোশবু, যাহা মৃত ব্যক্তিকে লাগানোর জন্য তৈয়ার করা হয়।) লাগাইলেন এবং তাঁহার লাশ বহন করিলেন, অতঃপর ওযূ না করিয়া মসজিদে প্রবেশ করিয়া। তিনি নামায পড়িলেন।

মালিক (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হইলঃ বমি করিলে ওযূ করিতে হইবে কি? তিনি বলিলেনঃ না। তবে ইহার জন্য কুলি করিবে এবং তাঁহার মুখ ধুইবে। তাহার উপর ওযূ ওয়াজিব নহে।

আগুনে জ্বাল দেওয়া বস্তু আহার করিয়া ওযূ না করা

৪৯. আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা.) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাগের কাঁধের গোশ্ত আহার করার পর ওযূ না করিয়া নামায পড়িলেন।

৫০. সুওয়ায়দ ইব্ন নুমান (রা.) হইতে বর্ণিত- তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামরে সাথে খায়বরের যুদ্ধের বৎসর বাহির হইলেন। যখন তাঁহারা সাহ্Ÿা নামক স্থানে পৌঁছিলেন- উহা খায়বরের ঢালু অংশে অবস্থিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তথায়) অবতরণ করিলেন, তারপর আসর নামায পড়িলেন। অতঃপর সফরে আহারের জন্য রাখা খাদ্যবস্তু এবং উহার পাত্রসমূহ আনিতে বলিলেন, তাঁহার নিকট ছাতু ছাড়া অন্য কিছু উপস্থিত করা হইল না। তিনি নির্দেশ দিলেন, উহা গুলান হইল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহার করিলেন, আমারাও আহার করিলাম। অতঃপর মাগরিবের নামাযের জন্য উঠিলেন এবং কুলি করিলেন, আমরাও কুলি করিলাম। তারপর তিনি নামায পড়িলেন, অথচ আর ওযূ করিলেন না।

৫১. রবী’আ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন হুদায়র (রহ.) উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)-এর সহিত সন্ধ্যাকালীন আহার করিলেন, তারপর নামায পড়িলেন, আর ওযূ করিলেন না।

৫২. উসমান ইব্ন আফ্ফান (রা.) রুটি-গোশ্ত আহার করিলেন, তারপর কুলি করিলেন, উভয় হাত ধুইলেন এবং হস্তদ্বয় দ্বারা মুখমণ্ডল মসেহ করিলেন, তারপর নামায পড়িলেন অথচ পুনরায় ওযূ করিলেন না।
মালিক (রহ.) বলেনঃ তিনি জানিতে পারিয়াছেন যে, আলী ইব্ন আবি তালিব (রা.) এবং আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) আগুণে জ্বাল দেওয়া খাদ্যবস্তু আহার করিয়া ওযূ করিতেন না।