প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭, রমজান-শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
হজ্জ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে মক্কার প্রান্তরে “আরাফাত” নামক স্থানে অবস্থান করা ও এর আগে ও পরে কাবাঘর তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা, মিনায় অবস্থান করা, মিনার জামারাতগুলিতে কাঁকর নিক্ষেপ করা, হজ্জের কুরবানী বা হাদী জবাই করা,মাথা মুণ্ডন করা, এ সকল কর্মের মধ্যে আল্লাহর যিকির করা, দোয়া করা ইত্যাদি হলো হজ্জের কার্যসমূহ। উমরাহ হলো সংক্ষিপ্ত হজ্জ। বছরের যে কোন সময়ে নির্ধারিত স্থান থেকে ইহরাম করে মক্কায় যেয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে আল্লাহর যিকিরের সাথে কাবাঘর সাতবার তাওয়াফ করা, সাফা মারওয়ার মাঝে সাতবার সাঈ করা ও এরপর মাথায় চুল কাটা বা ছাঁটা হলো উমরা। জীবনে একবার উমরাহ আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা ওয়াজিব। এরপর নফল উমরাহ পালন করা।
একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য তৈরী প্রথম ইবাদত-গ্রহ পবিত্র কাবা ঘর। তাওহীদ বা একত্ববাদের চূড়ান্ত বিজয়ের সূচনা হয় ইবরাহীম (আ) কর্তৃক এ ঘরের নির্মাণের মধ্য দিয়ে, আর এর সমাপ্তি ঘটে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম) কর্তৃক এ ঘরের পবিত্রতা ও তাওহিদী ধর্মের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। হজ্জের মাধ্যমে আমরা এ দুই মহান রাসূলের অগণিত নিদর্শন দেখতে পাই। হজ্জের মাধ্যমে ঈমানের পরীক্ষা হয়। হজ্জের মাধ্যমে ব্যক্তির মানসিকতা প্রশস্ততা লাভ করে বৃহৎ মানব গোষ্ঠির সকল জাতি ও বর্ণের পাশাপাশি সমাবেশ ঘটে। পরস্পরে বর্ণগত, ভাষাগত, দেশগত, জাতিগত সকল হিংসা, বিদ্বেষ ও রেষারেষি হজ্জপালনকারীর হৃদয় থেকে মুছে যায়। সে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে বিশ্ব কত বড় আর সকল মুসলিম কত আপন। মুসলিম জাতির মধ্যে সাম্য, ঐক্য ও সহযোগিতার প্রবণতা সৃষ্টি হয়।
মক্কা মুকাররামাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এমন প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও মহিলার জন্য জীবনে একবার হজ্জ আদায় করা ফরজ। বারবার হজ্জ আদায় করা মুস্তাহাব। কেউ হজ্জের আবশ্যকীয়তা বা ফরয হওয়া অস্বীকার করলে তাকে মুসলিম বলে গণ্য করা হবে। আর যদি কোন সক্ষম ব্যক্তি হজ্জ ফরয মানা সত্ত্বেও তা আদায় না করেন তাহলে তিনি কঠিন পাপের মধ্যে নিপতিত হবেন এবং ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয় রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
“বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আল্লাহর জন্য হজ্জ আদায় করা ফরয।”(সূরা আল-ইমরান: ৯৭ আয়াত।)
শাওয়াল মাস শুরু হয়েছে। শাওয়াল থেকেই হজ্জের সময় শুরু। আল্লাহ বলেন:
“হজ্জের সময় নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস। অতএব এ মাসগুলিতে যে হজ্জ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তাকে হজ্জে অশ্লীলতা, পাপ-অন্যায় ও কলহ-বিবাদ থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত থাকতে হবে। আর তোমরা যা ভাল কাজ কর আল্লাহ তা জানেন। এবং তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো; আর তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি ও আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। এবং হে বিবেক সম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর।”(সূরা বাকারা: ১৯৭ আয়াত)
যারা হজ্জের নিয়্যাত করেছেন এবং হজ্জের সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এ আয়াতটি তাদের জন্যই দিক নিদের্শনা। অনেক কষ্ট করে হজ্জে যাচ্ছেন। গতানুগতিকতায় গা ভাসিয়ে দেবেন না। আল্লাহর নির্দেশ মন দিয়ে স্মরণ করুন। প্রথম বিষয় হলো সর্ব প্রকারের অশ্লীলতা বোধক চিন্তা, কর্ম, দৃষ্টি ও আচরণ থেকে সর্বোতভাবে বিমুক্ত থাকতে হবে। কারো সাথে কোনো অশোভন আচরণ করা যাবে না এবং ঝগড়া বিবাদ করা যাবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষেরভিড়ের মধ্যে হাজারো কষ্ট পেয়েও কাউকে রাগ করা যাবে না বা কারো সাথে ঝগড়া করা যাবে না। এরই নাম হজ্জ।
হজ্জ আপনাকে কি শেখাল? শেখাল আমিত্ব বর্জন করতে। আপনি লাখপতি-কোটিপতি, ধনী, ক্ষমতাবান ইত্যাদি সকল পরিচয় মুছে ফেলতে হবে। আপনি আপনার দেহ থেকে আমিত্ব খুলেছেন। ধনী, গরীব, ফকীর, ক্ষমতাবান, দুর্বল, সাদা, কাল সকলেই একই প্রকারের অতি সাধারণ কাফনের কাপড়ের মত কাপড় পরে হজ্জে সমবেত হয়েছেন। কিন্তু আপনি কি আপনার মনের মধ্য থেকে আমিত্বকে খুলে ফেলতে পেরেছেন? এটিই হলো মূল কঠিন কাজ। গায়ে কি পোশাক আছে খেয়াল থাকে না। কিন্তু আমি যে অমুক ধনী বা ক্ষমতাবান মানুষ তা আমরা ভুলতে পারি না। কেউ অন্যায় করলে বা আমাদের আমিত্বকে আহত করলে রেগে উঠতে মন চায়। সাবধান! নিজের আমিত্বকে একবারে ভুলে যান। মনে করুন, এ ময়দানে আমিই সবচেয়ে বেশি গোনাহগার, অন্য সকলেই আল্লাহর প্রিয় বান্দা। এ অনুভূতি দিয়ে সকলের খেদমতের চেষ্টা করুন এবং সকলের দেওয়া কষ্ট সহ্য করুন।
আপনারা সকলেই “হজ্জ মাবরূর” কথাটি শুনেন। “মাবরূর” অর্থ “র্বির”-ময়। আরবী র্বির অর্থ নেক আমল এবং মানুষের খিদমত ও উপকার করা। তাহলে মাবরূব মানে হলো পূণ্যময় এবং পরোপকারময়। হজ্জ কবুল হওয়ার শর্ত হলো মাবরূর হওয়া, অর্থাৎ হজ্জের মধ্যে বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে, বিশেষত মানুষের খেদমত করতে হবে এবং কারো অপকার করা যাবে না। যত কষ্টই হোক, সকলের সাথে সুন্দর আচরণ ও কথা বলতে হবে। রাসূলুল্লাহ বলেন:
“হজ্জের র্বির বা কল্যাণকর্ম হলো খাদ্য খাওয়ানো এবং সুন্দর কথা বলা”(হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৬৫৮; আলবানী, সহীহুত তারগীব ২/১। হাকিম ও যাহাবী হাদীটকে সহীহ বলেছেন।)
অন্যান্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ র্বির ও কল্যাণকর্মের বিষয়ে বলেছেন যে, মানুষের কল্যাণে কোনো কর্মকেই ছোট মনে করতে নেই। একজন মানুষকে নিজের রশির অতিরিক্ত অংশ ব্যবহার করতে দেওয়া, জুতার ফিতার মত সামান্য জিনিস প্রদান করা, নিজের বালতি বা জগ থেকে কিছু পানি ডেলে দেওয়া, হাসিমুখে কথা বলা, চিন্তাক্লিষ্টকে শান্তনা দেওয়া সবই আল্লাহর নিকট গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল।
উপরের আয়াতে আল্লাহ হাজীদের জন্য দ্বিতীয় যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা হলো, নিজের হৃদয়কে আল্লাহ-ভীতি ও তাকওয়া দিয়ে পরিপূর্ণ ভরে নিতে হবে। হজ্জের সফরে তাকওয়া হলো সবচেয়ে বড় পাথেয়। জীবনে যত গোনাহ করেছেন তা থেকে অন্তর দিয়ে তাওবা করতে থাকুন। সাগীরা-কবীরা সকল প্রকার গোনাহকে বিষের মত মনে করুন। হজ্জের পুরো সফরে এবং বিশেষ করে আরাফাতের মাঠে, মুযদালিফায়, মিনায়, তওয়াফ ও সায়ীর সময় নিজের গোনাহের কথা স্মরণ করে অনবরত অনুশোচনা করতে থাকুন। আর কখনো কোনো গোনাহ করব না বলে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
হজ্জ দীর্ঘ সময়ের ইবাদত। অধিকাংশ সময় হাজি সাহেব কিছু ইবাদত বন্দেগি, তাওয়াফ, সায়ী, দোয়া-মুনাজাত করেন। এরপর মানবীয় প্রকৃতি অনুসারে সাথীদের সাথে গল্পগুজব ও কথাবর্তায় রত হয়ে পড়েন। কার হজ্জ কেমন হলো, দেশের রাজনীতি কেমন চলছে, কে কোন ক্যাম্পে আছে ইত্যাদি খোজ খবর নিতে ও গল্প গুজবে সময় কাটান। আর গল্প ও কথাবার্তার অর্থই হলো অকারণ বাজে কথায় সময় নষ্ট করা অথবা অনুপস্থিত কোনো মানুষের আলোচনা-সমালোচনা করে গীবত ও অপবাদের মত ভয়ঙ্কর পাপে লিপ্ত হওয়া। গল্প-গুজবের মধ্যে এ দুটি ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ নেই। কেউবা বাজারে ঘুরাঘুরি করে সময নষ্ট করেন অথবা পাপময় দৃশ্য দেখে পাপ কামায় করেন।
দেশ, রাজনীতি, বাজার ইত্যাদির সুযোগ অনেক পাবেন। কিন্তু মক্কা, মদীনা, মীনা, আরাফা জীবনে বারবার আসবে না। আল্লাহ দয়া করে তাঁর পবিত্র ভূমিতে নিয়ে গিয়েছেন। প্রতিটি মুহূর্তকে মহামূল্যবান বলে মনে করে আল্লাহর যিক্র ও তাওবা-ইসতিগফারে কাটান। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম করুন। তাহলে বিশ্রামও ইবাদতে পরিণত হবে। কিন্তু হজ্জকে টুরিজম মনে করে দেখে শুনে, বেড়িয়ে, গল্প করে পবিত্রভূমির মহামূল্যবান সময়গুলি নষ্ট করবেন না। বিশেষ করে গীবত ও পরর্চচা করা বা শোনা, টেলিভিশনে বা বাস্তবে অসুন্দর, তাকওয়াবিহীন বা আপত্তিকর দৃশ্য দেখা বা গল্প করা বা আল্লাহর ভয় ও যিক্র মন থেকে সরিয়ে দেয় এমন গল্পগুজব থেকে যথাসাধ্য আত্মরক্ষা করুন।
হজ্জের আহকামগুলি সুন্দরভাবে জেনে নেবেন। বিশেষ করে সুন্নাত জানার ও মানার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করবেন। অমুক কাজ জায়েয, ভাল ইত্যাদি বিষয় দেখবেন না। বরং দেখবেন যে, রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ কিভাবে কোন কাজটি করেছেন। তাঁরা যে কর্ম যেভাবে করেছেন হুবহু সেভাবে তা পালন করুন। তারা যা করেন নি তা বর্জন করুন। এভাবে হুবহু রাসূলুল্লাহ -এর তরীকা অনুসারে ইবাদত পালন করতে পারা সৌভাগ্যের লক্ষণ। এতেই রয়েছে কবুলিয়্যাতের নিশ্চয়তা।
বিশেষত মদীনা শরীফে ইবাদত-বন্দেগী, যিয়ারাত, দুআ ইত্যাদি সকল বিষয়ে অবশ্যই হুবহু সুন্নাতের মধ্যে থাকবেন। বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য ইমাম সংকলিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন:
“আইর থেকে অমুকস্থান পর্যন্ত মদীনার সমস্ত এলাকা মহাসম্মানিত হারাম বা পবিত্রস্থান। এ স্থানের মধ্যে যদি কেউ নব-উদ্ভাবিত কোনো কর্ম করে, অথবা কোনো নব-উদ্ভাবককে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় তাহলে তার উপর আল্লাহর লানত, ফিরিশতাগণের লানত এবং সকল মানুষের লানত। তার থেকে তাওবা, কাফফারা বা ফরয-নফল কোনো ইবাদতই কবুল করা হবে না।”(বুখারী, আস-সহীহ ২/৬৬১, ৬/২৪৮২; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৯৯৫, ১১৪৭।)
বড় ভয়ঙ্কর কথা। এত কষ্ট করে সাওয়াব অর্জনের জন্য সেই পবিত্রভূমিতে যেয়ে অভিশাপ অর্জন করে আসা! আরো ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, হাজীরা মদীনায় গেলেই নব-উদ্ভাবিত কর্ম বেশি করেন। মসজিদে নববীতে, রাওযা শরীফে, বাকী গোরস্থানে, উহুদের শহীদদের গোরস্থানে, খন্দকের মসজিদগুলিতে, কুবা ও অন্যান্য মসজিদে ও অন্যান্য স্থানে যিয়ারত, সালাত, দুআ ইত্যাদি ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে হাজীগণ আবেগ ও অজ্ঞতার সংমিশ্রণে অনেকভাবে সুন্নাতের ব্যতিক্রম নব-উদ্ভাবিত পদ্ধতি অনুসরণ করেন। সাবধান হোন! যিয়ারতের সময় রাসূলুল্লাহ কি বলতেন, কিভাবে দাঁড়াতেন, কি করতেন তা সহীহ হাদীসের আলোকে জেনে নিন। কুবা, খন্দক, কিবলাতাইন ও অন্যান্য স্থানে গমন ও সালাত আদায়ে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণের হুবহু পদ্ধতি সহীহ হাদীসের আলোকে জেনে নিন। তাঁরা যা করেন নি তা বিষবৎ পরিত্যাগ করুন। সাওয়াব কামাতে গিয়ে অভিশাপ ও ধ্বংস কামাই করবেন না।
নব-উদ্ভাবিত কর্ম বা বিদআতের বিষয়ে পরবর্তী যুগের আলিমগণ কিছু মতভেদ করেছেন। কোনো কোনো বিদ’আতকে কোনো কোনো আলিম ভাল বা “হাসানা” বলেছেন। এ সকল তর্ক অন্য স্থানে করবেন। অন্তত মদীনার মাটিতে হাসানা পালন এবং সাইয়েয়াহ সকল নব-উদ্ভবিত কর্ম বিষবৎ পরিত্যাগ করুন। অন্তত রাসূলুল্লাহ -এর সম্মানে মদীনার মাটিতে প্রতিটি ইবাদতে সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করুন। বিদআতে হাসানা পালন না করলে গোনাহ হবে কেউই বলবেন না। তবে মদীনার মাটিতে নব-উদ্ভবিত কাজ করলে অভিশাপ ও ধ্বংস আসবে তা সুনিশ্চিত জানা গেল। এরপরও কি রিস্ক নিবেন? তর্ক করবেন? কেন? আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়েত নসীব করুন।
আপনাদের অনেকেই হজ্জ করেন নি। হজ্জ করার ইচ্ছাও অনেকের নেই। কারণ হজ্জ কখন কার উপর ফরয হয় তা আমরা অনেকেই ভালভাবেই জানি না। নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে মক্কা শরীঠে যাওয়ার খরচ বহনের ক্ষমতা হলেই হজ্জ ফরয হয়ে যায়। এমনকি কারো যদি নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি থাকে, যে জমির ফসল না হলেও তার বৎসর চলে যায়, অথবা অতিরিক্ত বাড়ি থাকে যে বাড়ি তার ব্যবহার করতে হয় না, বরং ভাড়া দেওয়া, অথচ যে বাড়ির ভাড়া না হলেও তার বছর চলে যায় তবে সেই জমি বা বাড়ি বিক্রয় করে হজ্জে যাওয়া ফরয হবে বলে অনেক ফকীহ সুষ্পষ্টত উল্লেখ করেছেন। তাহলে চিন্তা করুন! আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা প্রতি বৎসর প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে নতুন জমি কিনছেন, বাড়ি বানাচ্ছেন বা বিনিয়োগ করছেন, অথচ হজ্জ করছেন না। আর হজ্জ ফরয হওয়ার পরেও হজ্জ না করে মৃত্যুবরণ করাকে কোনো কোনো হাদীসে ইহূদী-খৃষ্টান হয়ে মরা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ বলেন:
“যে বান্দার শরীর আমি সুস্থ রেখেছি এবং তার জীবনযাত্রায় সচ্ছলতা দান করেছি, এভাবে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সে আমার ঘরে আগমন করল না সে সুনিশ্চিত বঞ্চিত ও হতভাগা।”(ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ৮/১৬ আলাবানী, সহীহুত তারগীব ২/২০। হাদীসটি সহীহ।)
কুরবানী ও হাদীসে অগণিত স্থানে বারংবার হজ্জের গুরুত্ব ও ফযীলতা বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলির আলোচনা সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিবেদিতভাবে, সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায় ও অশ্লীলতা মুক্ত হয়ে হজ্জ আদায় করলো, সে নবজাতক শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরল।”(সহীহ বুখারী ২/৫৫৩, ৬৪৫, ৬৪৬।)
“একবার উমরা আদায়ের পরে দ্বিতীয়বার যখন উমরা আদায় করা হয়, তখন দুই উমরার মধ্যবর্তী গোনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন। আর পুণ্যময়-পরোপকারময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত।”(সহীহ বুখারী ২/৬২৯, সহীহ মুসলিম ২/৯৮৩)
“তোমরা বারবার হজ্জ ও উমরা আদায় কর, কারণ কর্মকারের ও স্বর্ণকারের আগুন যেমন লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা মুছে ফেলে তেমনিভাবে এ দ্ইু ইবাদত দারিদ্র্য ও পাপ মুছে ফেলে। আর পুণ্যময়-পরোপকারময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত।(তিরমিযী, আস-সুনান ৩/১৭৫, ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/৯৬৪, নাসাঈ, আস-সুনান ৫/১১৫, ইবনু খুযাইমা, আস-সহীহ ৪/১৩০। হাদীসটি সহীহ।)
হজ্জের মাধ্যমে গোনাহ মাফ ছাড়াও রয়েছে অগণিত পুরস্কার ও সাওয়াব। হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, হাজী যখন বাড়ী থেকে বের হন তখন থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহ তাকে অগণিত নেকী প্রদান করেন, তার ব্যয়িত প্রতিটি টাকার বহুগুণ এমনকি ৭০০ গুণ সাওয়াব প্রদান করেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন যে, আল্লাহ হাজীর দুআ ও ইসতিগফার কবুল করেন এবং হাজী সাহেব যাদের জন্য দুআ করেন তাদেরকেও আল্লাহ ক্ষমা করেন। হজ্জের সবচেয়ে বরকতময় দিন হলো আরাফাতের দিন। বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, আরাফাতের দিনে আল্লাহ যত মানুষকে ক্ষমা করেন অন্য কোনো দিনে অত মানুষকে ক্ষমা করেন না। আরাফাতের দিনে সমবেত হাজীদের জীবনের পাপগুলি তিনি ক্ষমা করেন।
মূলত আরাফাতের দিন দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের মাঠে অবস্থান করে আল্লাহর যিকর ও দুআয় কাটানোই মূলত হজ্জ। যারা হজ্জে যাচ্ছেন তারা এ বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। ফ্রী খাবার জোগাড় করতে, হাজীদের সাথে গল্প করতে বা খাওয়া দাওয়ার পিছনে অযথা সময় নষ্ট করবেন না। যথাসাধ্য একাকী হয়ে জীবনের সকল পাপ স্মরণ করে নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে পাপী মনে করে আল্লাহর কাছে দুআ ও ইসতিগফার করুন। ক্লান্তি লাগলে আল্লাহর যিকর করুন। রাসূলুল্লাহ বলেন:
“সর্বশ্রেষ্ট দুআ হলো আরাফাতের দিনের দুআ। আর আমি এবং আমার পূর্বের নবীগণ সর্বশ্রেষ্ঠ যে কথাটি বলেছি তা হলো: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুআ আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই, তিনি একক তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই, এবং প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৫৭২; আলবানী, সহীহুত তাররীব ২/১০৬। হাদীসটি হাসান)
এ মহান পুরস্কার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না। অনেকে মনে করেন পিতামাতার অনুমতি ছাড়া হজ্জ করা যায় না। চিন্তাটি ভুল। পিতামাতার আনুগত্য প্রত্যেক সন্তানের উপর ফরয। কিন্তু তাদের নির্দেশে আল্লাহর ফরয-ওয়াজিব নির্দেশ পিছানো বা নষ্ট করা যাবে না। ফরয দায়িত্ব পালনে তাঁদের অনুমতির প্রয়োজন নেই। ফরয নামায আদায় এবং ফরয হজ্জ আদায়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে পিতামাতার নিকট দোয়া-এজাযত নেওয়া খুবই ভাল ও বরকতের কাজ। অনেকে পিতামাতাকে হজ্জ না করিয়ে হজ্জ করাকে অনুচিত মনে করেন। এটিও ভুল। পিতামাতার ভরণপোষণ সন্তানের উপর ফরয দায়িত্ব। তবে হজ্জ ফরয হবে যার অর্থ আছে তার উপর। যদি পিতার নিজস্ব অর্থ থাকে তবে তাকে নিজের দায়িত্বে হজ্জ করতে হবে। সন্তান তাকে সাহায্য করবেন। আর যদি সন্তান অর্থ উপার্জনের কারণে বা নিকটবর্তী কোন দেশে আগমনের কারণে তার উপর হজ্জ ফরয হয় তাহলে তাকে আগে নিজের হজ্জ পালন করতে হবে। পরে সম্ভব হলে পিতামাতাকে হজ্জ করানো খুবই ভাল কাজ।
অনেকে মনে করেন মেয়ে বিয়ে না দিয়ে বা এই জাতীয় পারিবারিক দায়িত্ব পালন না করে হজ্জে যাওয়া ঠিক না। চিন্তাটি ঠিক নয়। মেয়ে বিয়ের জন্য কি যাকাত দেওয়া বন্ধ রাখবেন? ফরয নামায বন্ধ রাখবেন? হজ্জও নামাযের মতই ফরয ইবাদত। হজ্জের টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেলে হজ্জ করুন। যদি মেয়ের বিবাহ ঠিক হয়ে থাকে তাহলে বিবাহ দিন। এরপর হজ্জের টাকা হলে হজ্জ করুন। বিয়ে ঠিক না হলে হজ্জের টাকা হলে হজ্জ করুন। এরপর যখন বিবাহের সময় হবে তখন বিবাহ তিবেন। মূল কথা হলো, আগের যুগে রাস্তার নিরাপত্তার অভাবে এদেশের মুসলমান সকল সামাজিক দায়িত্ব পালনের পরে চির বিদায় নিয়ে হজ্জে গমন করতেন। এ থেকে আমাদের দেশে এরূপ কুসংস্কার জন্ম নিয়েছে।
অনেকে মনে করেন হজ্জ বৃদ্ধ বয়সের বা শেষ জীবনের ইবাদত। হজ্জের পরে আর কোন সাংসারিক কাজ করা যায় না। অনেকে বলেন, অল্প বয়সে হজ্জ করলে রাখবে কিভাবে! এ সবই শয়তানী ওয়াসওয়াসা ও ইসলামী চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। কেউ যদি মনে করে যে, সারাজীবন কাফির থাকব, শেষ জীবনে ইমান এনে সকল গোনাহর ক্ষমা লাভ করে মৃত্যু বরণ করব, অথবা চিন্তা করে যে, সারাজীবন বেনামাযী থাকব আর শেষ জীবনে নামায পড়ে গোনাহের ক্ষমা নিয়ে মরব, তাহলে তার চিন্তা যেমন ইসলাম বিরোধী, তেমনী ইসলাম বিরোধী চিন্তা যে, হজ্জ ফরয হওয়ার পরেও তা পালন না করে ভালমন্দ সকল কাজ করতে থাকব এরপর শেষ বয়সে হজ্জ করে ক্ষমা লাভ করে মৃত্যু বরণ করব। এ সবই শয়তানী চিন্তা। যারা এভাবে পাপ জমা করে রাখে শেষে তাওবা করব বলে তাদের তওবা নসীব হয় না এবং তাদের তাওবা আল্লাহ কবুল করেন না বলে কুরআনের বলেছেন:
“তাওবা তাদের জন্য নয় যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে আমি এখন তাওবা করছি, এবং তাদের জন্যও তাওবা নয় যারা কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।”(সূরা নিসা: ১৭-১৮ আয়াত।)
নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদির মত হজ্জও একটি ফরয আঈন ইবাদত। যখন যে বয়সেই তা ফরয হোক তা যতশীঘ্র সম্ভব আদায় করতে হবে। আর সর্বাবস্থায় আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে ও আল্লাহর পথে থাকার চেষ্টা করতে হবে। প্রকৃত সত্য কথা হলো, হজ্জ যৌবনকাল ও শক্তির সময়ের ইবাদত। কোনো বৃদ্ধ মানুষ সঠিকভাবে হজ্জ আদায় করতে পারেন না। সম্পূর্ণ বৈরি আবহাওয়ায়, লক্ষলক্ষ মানুষের ভিড়ের মধ্যে মাইলের পর মাইল হাঁটা, দৌঁড়ানো, কাঁকর নিক্ষেপ করা ইত্যাদি ইবাদতের সুন্নাত পর্যায় রক্ষা করা তো দূরের কথা ওয়াজিব পর্যায় ঠিক রাখাও বৃদ্ধ ব্যক্তির জন্য কষ্টকর। এজন্য যুবক বয়সের হজ্জই প্রকৃত পরিপূর্ণ হজ্জ হতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
