প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১২ম সংখ্যা, জুন ২০১৭, শাবান-রমজান ১৪৩৮ হিজরী, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
* সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে ইচ্ছাকৃতভাবে পান, আহার ও যৌন তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে রোযা বলা হয়। প্রত্যেক আক্কেল (বোধ সম্পন্ন), বালেগ (বয়সপ্রাপ্ত) ও সুস্থ্য নর-নারীর উপর রমযানের রোযা রাখা ফরয।
* ছেলে মেয়ে দশ বছরের হয়ে গেলে তাদের দ্বারা (শাস্তি দিয়ে হলেও) রোযা রাখানো কর্তব্য। এর পূর্বেও শক্তি হলে রোযা রাখার অভ্যাস করানো উচিত।
রোযার নিয়তের মাসায়েল ঃ
* রমযানের রোযার জন্য নিয়ত করা ফরয। নিয়ত ব্যতীত সারাদিন পানাহার ও যৌনতৃপ্তি থেকে বিরত থাকলেও রোযা হবে না।
* মুখে নিয়ত করা সুন্নত নয়। অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে।
* সূর্য ঢলার দেড় ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত রমযানের রোযার নিয়ত করা দুরস্ত আছে, তবে রাতেই নিয়ত করে নেয়া উত্তম।
* রমযান মাসে অন্য যে কোন প্রকার রোযা বা কাযা রোযার নিয়ত করলেও এই রমযানের রোযা আদায় হবে- অন্য যে রোযার নিয়ত করবে সেটা আদায় হবে না।
* রাতে নিয়ত করার পরও সুব্হে সাদেকের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার ও যৌনকর্ম জায়েয। নিয়ত করার সাথে সাথেই রোযা শুরু হয় না, বরং রোযা শুরু হয় সুব্হে সাদেক থেকে।
সেহ্রীর মাসায়েল ঃ
* সেহ্রী খাওয়া জরুরি নয় তবে সেহ্রী খাওয়া সুন্নাত, অনেক ফযীলতের আমল, তাই ক্ষুধা না লাগলে বা খেতে ইচ্ছে না করলেও সেহ্রীর ফযীলত হাছিল করার নিয়তে যা-ই হোক কিছু পানাহার করে নিবে।
* নিদ্রার কারণে সেহ্রী খেতে না পারলেও রোযা রাখতে হবে। সেহ্রী না খেতে পারায় রোযা না রাখা অত্যন্ত পাপ।
* সেহ্রী-র সময় আছে বা নেই নিয়ে সন্দেহ হলে সেহ্রী না খাওয়া উচিত। এরূপ সময়ে খেলে রোযা কাযা করা ভাল। আর যদি পরে নিশ্চিত-ভাবে জানা যায় যে, তখন সেহ্রীর সময় ছিল না, তাহলে কাযা করা ওয়াজিব।
* সেহ্রীর সময় আছে মনে করে পানাহার করল অথচ পরে জানা গেল যে, তখন সেহ্রীর সময় ছিল না, তাহলে রোযা হবে না; তবে সারাদিন তাকে রোযাদারের ন্যায় থাকতে হবে এবং রমযানের পর ঐ দিনের রোযা কাযা করতে হবে।
* বিলম্বে সেহ্রী খাওয়া উত্তম। আগে খাওয়া হয়ে গেলেও শেষ সময় নাগাদ কিছু চা-পানি ইত্যাদি করতে থাকলেও বিলম্বে সেহ্রী করার ফযীলত অর্জিত হবে।
ইফতার-এর মাসায়েল ঃ
* সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মোস্তাহাব। বিলম্বে ইফতার করা মাকরূহ।
* মেঘের দিনে কিছু দেরী করে ইফতার করা ভাল। মেঘের দিনে ঈমানদার ব্যক্তির অন্তরে সূর্য অস্ত গিয়েছে বলে সাক্ষ্য না দেয়া পর্যন্ত ছবর করা ভাল। শুধু ঘড়ি বা আযানের উপর নির্ভর করা ভাল নয়, কারণ তাতে ভুলও হতে পারে।
* সূর্য অস্ত যাওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকা পর্যন্ত ইফতার করা দুরস্ত নেই।
* সবচেয়ে উত্তম হল খোরমার দ্বারা ইফতার করা, তারপর কোন মিষ্টি জিনিস দ্বারা, তারপর পানি দ্বারা।
* লবণ দ্বারা ইফতার শুরু করা উত্তম-এই আকীদা ভুল।
* ইফতার করার পূর্বে নিম্নোক্ত দু’আ পাঠ করবে। দু’আ পাঠ করা মোস্তাহাব।
ইফতার করার পর নিম্নের দু’আ পাঠ করবে-
* ইফতার-এর সময় দু’আ করা হয়, তাই ইফতারের পূর্বে বা কিছু ইফতার করে বা ইফতার থেকে সম্পূর্ণ ফারেগ হয়ে দু’আ করা মোস্তাহাব।
* পশ্চিম দিকে প্লেনে সফর শুরু করার কারণে যদি দিন লম্বা হয়ে যায় তাহলে সুবহে সাদেক থেকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সূর্যাস্ত না ঘটলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইফতার বিলম্ব করতে হবে, আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও সূর্যাস্ত না ঘটলে ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার সামান্য কিছু পূর্বে ইফতার করে নিবে।
* পূর্ব দিকে প্লেনে সফর করলে যখনই সূর্যাস্ত পাবে তখনই ইফতার করবে।
যে সব কারণে রোযা ভাঙ্গে না এবং মাকরূহও হয় না
১। মেসওয়াক করা। যে কোন সময় হোক, কাঁচা হোক বা শুষ্ক।
২। শরীর বা মাথা বা দাড়ি গোঁপে তেল লাগানো।
৩। চোখে সুরমা লাগানো বা কোন ওষুধ দেয়া।
৪। খুশবু লাগানো বা তার ঘ্রাণ নেয়া।
৫। ভুলে কিছু পান করা বা আহার করা বা স্ত্রী সম্ভোগ করা।
৬। গরম বা পিপাসার কারণে গোসল করা বা বারবার কুলি করা।
৭। অনিচ্ছা বশতঃ গলার মধ্যে ধোঁয়া, ধুলাবালি বা মাছি ইত্যাদি প্রবেশ করা।
৮। কানে পানি দেয়া বা অনিচ্ছাবশতঃ চলে যাওয়ার কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে দিলে সতর্কতা হল সে রোযা কাযা করে নেয়া। (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
৯। অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হওয়া। ইচ্ছাকৃতভাবে অল্প বমি করলে মাকরূহ হয় না, তবে এরূপ করা ঠিক নয়।
১০। স্বপ্ন দোষ হওয়া।
১১। মুখে থুথু আসলে গিলে ফেলা।
১২। যে কোন ধরনের ইনজেকশন বা টীকা লাগানো। তবে রোযার কষ্ট যেন বোধ না হয়-এ উদ্দেশ্যে শক্তির ইনজেকশন বা স্যালাইন লাগানো মাকরূহ।
১৩। রোযা অবস্থায় দাঁত উঠালে এবং রক্ত পেটে না গেলে।
১৪। পাইরিয়া রোগের কারণে যে সামান্য রক্ত সব সময় বের হতে থাকে এবং গলার মধ্যে যায় তার কারণে।
১৫। সাপ ইত্যাদিতে দংশন করলে।
১৬। পান খাওয়ার পর ভালভাবে কুলি করা সত্ত্বেও যদি থুথুতে লালভাব থেকে যায়।
১৭। শাহওয়াতের সাথে শুধু নজর করার কারণেই যদি বীর্যপাত ঘটে যায় তাহলে রোযা ফাসেদ হয় না।
১৮। রোযা অবস্থায় শরীর থেকে ইনজেকশনের সাহায্যে রক্ত বের করলে রোযা ভাঙ্গে না এবং এতে রোযা রাখার শক্তি চলে যাওয়ার মত দুর্বল হয়ে পড়ার আশংকা না থাকলে মাকরূহও হয় না।
যে সব কারণে রোযা ভাঙ্গে না তবে মাকরূহ হয়ে যায়
১। বিনা প্রয়োজনে কোন জিনিস চিবানো।
২। তরকারী ইত্যাদির লবণ চেখে ফেলে দেয়া। তবে কোন চাকরের মুনিব বা কোন নারীর স্বামী বদ মেজাজী হলে জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে লবণ চেখে তা ফেলে দিলে এতটুকুর অবকাশ আছে।
৩। কোন ধরনের মাজন, কয়লা, গুল বা টুথপেস্ট ব্যবহার করা মাকরূহ। আর এর কিছু সামান্য পরিমাণও গলার মধ্যে চলে গেলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
৪। গোসল ফরয-এ অবস্থায় সারা দিন অতিবাহিত করা।
৫। কোন রোগীর জন্য নিজের রক্ত দেয়া।
৬। গীবত করা, চোগলখুরী করা, অনর্থক কথাবার্তা বলা, মিথ্যা বলা।
৭। ঝগড়া ফ্যাসাদ করা, গালি-গালাজ করা।
৮। ক্ষুধা বা পিপাসার কারণে অস্থিরতা প্রকাশ করা।
৯। মুখে অধিক পরিমাণ থুথু একত্র করে গিলে ফেলা।
১০। দাঁতে ছোলা বুটের চেয়ে ছোট কোন বস্তু আটকে থাকলে তা বের করে মুখের ভিতর থাকা অবস্থায় গিলে ফেলা।
১১। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না-এরূপ মনে হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে চুম্বন করা ও আলিঙ্গন করা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণের আস্থা থাকলে ক্ষতি নেই, তবে যুবকদের এহেন অবস্থা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। আর রোযা অবস্থায় স্ত্রীর ঠোঁট মুখে নেয়া সর্বাবস্থায় মাকরূহ।
১২। নিজের মুখ দিয়ে চিবিয়ে কোন বস্তু শিশুর মুখে দেয়া। তবে অনন্যোপায় অবস্থায় এরূপ করলে অসুবিধা নেই।
১৩। পায়খানার রাস্তা পানি দ্বারা এত বেশি ধৌত করা যে, ভিতরে পানি পৌঁছে যাওয়ার সন্দেহ হয়-এরূপ করা মাকরূহ। আর প্রকৃত পক্ষে পানি পৌঁছে গেলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। এ জন্য রোযা অবস্থায় পানি দ্বারা ধৌত করার পর কোন কাপড় দ্বারা বা হাত দ্বারা পানি পরিষ্কার করে ফেলা নিয়ম।
১৪। ঠোটে লিপিষ্টিক লাগালে যদি মুখের ভিতর চলে যাওয়ার আশংকা হয় তাহলে তা মাকরূহ।
যে সব কারণে রোযা ভেঙ্গে যায় এবং শুধু কাযা ওয়াজিব হয়
১। কানে বা নাকে ওষুধ দিলে।
২। ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে বা অল্প বমি আসার পর তা গিলে ফেললে।
৩। কুলি করার সময় অনিচ্ছাবশতঃ কণ্ঠনালীতে পানি চলে গেলে।
৪। স্ত্রী বা কোন নারীকে শুধু স্পর্শ প্রভৃতি করার কারণেই বীর্যপাত হয়ে গেলে।
৫। এমন কোন জিনিস খেলে যা সাধারণতঃ খাওয়া হয় না। যেমন কাঠ, লোহা, কাগজ, পাথর, মাটি, কয়লা ইত্যাদি।
৬। বিড়ি, সিগারেট বা হুক্কা সেবন করলে।
৭। আগরবাতি প্রভৃতির ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে বা হলকে পৌঁছালে।
৮। ভুল পানাহার করার পর রোযা ভেঙ্গে গেছে মনে করে আবার ইচ্ছাকৃতভাবে কোন কিছু পানাহার করলে।
৯। রাত আছে মনে করে সুবহে সাদেকের পরে সেহ্রী খেলে।
১০। ইফতারীর সময় হয়নি, দিন রয়ে গেছে অথচ সময় হয়ে গেছে-এই মনে করে ইফতারি করলে।
১১। দুপুরের পরে রোযার নিয়ত করলে।
১২। দাঁত দিয়ে রক্ত বের হলে তা যদি থুথুর চেয়ে পরিমাণে বেশি হয় এবং কণ্ঠনালীর নিচে চলে যায়।
১৩। কেউ জোর পূর্বক রোযাদারের মুখে কোন কিছু দিলে এবং তা কণ্ঠনালীতে পৌঁছে গেলে।
১৪। দাঁতে কোন খাদ্য-টুকরা আঁটকে ছিল এবং সুবহে সাদেকের পর তা যদি পেটে চলে যায় তবে সে টুকরা ছোলা বুটের চেয়ে ছোট হলে রোযা ভেঙ্গে যায় না, তবে এরূপ করা মাকরূহ। কিন্তু মুখ থেকে বের করার পর গিলে ফেললে তা যতই ছোট হোক না কেন রোযা কাযা করতে হবে।
১৫। হস্ত মৈথুন করলে যদি বীর্যপাত হয়।
১৬। পেশাবের রাস্তায় বা স্ত্রীর যোনিতে কোন ওষুধ প্রবেশ করালে।
১৭। পানি বা তেল দ্বারা ভিজা আঙ্গুল যোনিতে বা পায়খানার রাস্তায় প্রবেশ করালে।
১৮। শুকনো আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে পুরোটা বা কিছুটা বের করে আবার প্রবেশ করালে। আর যদি শুকনো আঙ্গুল একবার প্রবেশ করিয়ে একবারেই পুরোটা বের করে নেয়-আবার প্রবেশ না করায়, তাহলে রোযার অসুবিধা হয় না।
১৯। মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে গেলে এবং এ অবস্থায় সুবহে সাদেক হয়ে গেলে।
২০। নস্যি গ্রহণ করলে বা কানে তেল ঢাললে।
২১। কেউ রোযার নিয়তই যদি না করে তাহলেও শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।
২২। স্ত্রীর বেহুঁশ থাকা অবস্থায় কিংবা যে-খবর ঘুমন্ত অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা হলে ঐ স্ত্রীর উপর শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
২৩। রমযান ব্যতীত অন্য নফল রোযা ভঙ্গ হলে শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।
২৪। এক দেশে রোযা শুরু করার পর অন্য দেশে চলে গেলে সেখানে যদি নিজের দেশের তুলনায় আগে ঈদ হয়ে যায় তাহলে নিজের দেশের হিসেবে যে কয়টা রোযা বাদ গিয়েছে তার কাযা করতে হবে। আর যদি সেখানে গিয়ে রোযা এক দুটো বেড়ে যায় তাহলে তা রাখতে হবে।
যে সব কারণে রোযা ভেঙ্গে যায় এবং কাযা, কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হয়
১। রোযার নিয়ত (রাতে) করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে।
২। রোযার নিয়ত করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সম্ভোগ করলে। স্ত্রীর উপরও কাযা কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে। স্ত্রী যোনির মধ্যে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ প্রবেশ করালেই কাযা ও কাফ্ফারা ওয়াজিব হয়ে যাবে, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক।
৩। রোযার নিয়ত করার পর (পাপ হওয়া সত্ত্বেও) যদি পুরুষ তার পুরুষাঙ্গ স্ত্রীর পায়খানার রাস্তায় প্রবেশ করায় এবং অগ্রভাগ ভিতরে প্রবেশ করে (চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক) তাহলেও পুরুষ স্ত্রী উভয়ের উপর কাযা এবং কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
৪। রোযা অবস্থায় কোন বৈধ কাজ করল যেমন স্ত্রীকে চুম্বন দিল কিংবা মাথায় তেল দিল তা সত্ত্বেও সে মনে করল যে, রোযা নষ্ট হয়ে গিয়েছে; আর তার পরে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ইত্যাদি করল, তাহলেও কাযা কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
যে সব কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে
১। যদি কেউ শরী’আত সম্মত সফরে থাকে তাহলে তার জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে; পরে কাযা করে নিতে হবে। কিন্তু সফরে যদি কষ্ট না হয়, তাহলে রোযা রাখাই উত্তম। আর যদি কোন ব্যক্তি রোযা রাখার নিয়ত করার পর সফর শুরু করে তাহলে সে দিনের রোযা রাখা জরুরি।
২। কোন রোগী ব্যক্তি রোযা রাখলে যদি তার রোগ বেড়ে যাওয়ার আশংকা হয় অথবা অন্য কোন নতুন রোগ দেখা দেয়ার আশংকা হয় অথবা রোগ বিলম্বিত হওয়ার আশংকা হয়, তাহলে রোযা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি আছে। সুস্থ হওয়ার পর কাযা করে নিতে হবে। তবে অসুস্থ অবস্থায় রোযা ছাড়তে হলে কোন দ্বীনদার পারহেযগার চিকিৎসকের পরামর্শ থাকা শর্ত, কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে হবে, শুধু নিজের কাল্পনিক খেয়ালের বশীভুত হয়ে আশংকাবোধ করে রোজা ছাড়া দুরস্ত হবে না। তাহলে কাযা কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
৩। রোগ মুক্তির পর যে দুর্বলতা থাকে তখন রোযা রাখলে যদি পুনরায় রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশংকা হয় তাহলে তখন রোযা না রাখার অনুমতি আছে, পরে কাযা করে নিতে হবে।
৪। গর্ভবতী বা দুগ্ধদায়িনী স্ত্রী লোক রোযা রাখলে যদি নিজের জীবনের ব্যাপারে বা সন্তানের জীবনের ব্যাপারে আশংকা বোধ করে বা রোযা রাখলে দুধ শুকিয়ে যাবে আর সন্তানের সমূহ কষ্ট হবে-এরূপ নিশ্চিত হলে তার জন্য তখন রোযা ছাড়া জায়েয, পরে কাযা করে নিতে হবে।
৫। হায়েয নেফাস অবস্থায় রোযা ছেড়ে দিতে হবে এবং পবিত্র হওয়ার পর কাযা করে নিতে হবে।
যে সব কারণে রোযা শুরু করার পর তা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি রয়েছে
১। যদি এমন পিপাসা বা ক্ষুধা লাগে যাতে প্রাণের আশংকা দেখা দেয়।
২। যদি এমন কোন রোগ বা অবস্থা দেখা দেয় যে, ওষুধ-পত্র গ্রহণ না করলে জীবনের আশা ত্যাগ করতে হয়।
৩। গর্ভবতী স্ত্রীলোকের যদি এমন অবস্থা হয় যে, নিজের বা সন্তানের প্রাণ নাশের আশংকা হয়।
৪। বেহুঁশ বা পাগল হয়ে গেলে।
* উল্লেখ্য যে, এসব অবস্থায় যে রোযা ছেড়ে দেয়া হবে তার কাযা করে নিতে হবে।
* কেউ যদি অন্যকে দিয়ে কাজ করতে পারে বা জীবিকা অর্জনের জন্য অন্য কোন কাজ করতে পারে তা সত্ত্বেও সে টাকার লোভে রোদে গিয়ে কাজ করল এবং এ কারণে অনুরূপ পিপাসায় আক্রান্ত হল কিংবা বিনা অপারগতায় আগুনের কাছে যাওয়ার কারণে পিপাসায় আক্রান্ত হল, তাহলে তার জন্যে রোযা ছাড়ার অনুমতি নেই।
রমযান মাসের সম্মান রক্ষার মাসায়েল
* রমযান মাসে দিনের বেলায় লোকদের পানাহারের উদ্দেশ্যে হোটেল রেস্তোরাঁ প্রভৃতি খাবার দোকান খোলা রাখা রমযানের অবমাননা বিধায় তা পাপ। অন্য ধর্মাবলম্বী বা মা’যূর ব্যক্তিদের খাতিরে খোলা রাখার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।
* কোন কারণ বশতঃ রোযা ভেঙ্গে গেলেও বাকী দিনটুকু পানাহার পরিত্যাগ করে রোযাদারের ন্যায় থাকা ওয়াজিব। (বেহেশতী জেওর)
* দুর্ভাগ্য বশতঃ কেউ যদি রোযা না রাখে তবুও অন্যের সামনে পানাহার করা বা প্রকাশ করা যে, আমি রোযা রাখিনি-এতে দ্বিগুণ পাপ হয়, প্রথম হল রোযা না রাখার পাপ, দ্বিতীয় হল গোনাহ প্রকাশ করার পাপ।
রোযার কাযার মাসায়েল
* রমযানের রোযা কাযা হয়ে গেলে রমযানের পর যথাশীঘ্র কাযা করে নিতে হবে। বিনা কারণে কাযা রোযা রাখতে দেরী করা গোনাহ।
* কাযা রোযার জন্যে সুবহে সাদেকের পূর্বেই নিয়ত করতে হবে, অন্যথায় কাযা রোযা সহীহ হবে না। সুবহে সাদেকের পর নিয়ত করলে সে রোযা নফল হয়ে যাবে।
* ঘটনাক্রমে একাধিক রমযানের কাযা রোযা একত্রিত হয়ে গেলে নির্দিষ্ট করে নিয়ত করতে হবে যে, আজ অমুক বছরের রমযানের রোযা আদায় করছি।
* যে কয়টি রোযা কাযা হয়েছে তা একাধারে রাখা মোস্তাহাব। বিভিন্ন সময়ে রাখাও দুরস্ত আছে।
* কাযা শেষ করার পূর্বেই নতুন রমযান এসে গেলে তখন ঐ রমযানের রোযাই রাখতে হবে। কাযা পরে আদায় করে নিতে হবে।
রোযার কাফ্ফারা-র মাসায়েল
* একটি রোযার কাফ্ফারা ৬০টি রোযা (একটি কাযা বাদেও)। এই ৬০টি রোযা একাধারে রাখতে হবে। মাঝখানে ছুটে গেলে আবার পুনরায় পূর্ণ ৬০টি একাধারে রাখতে হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে নেফাস বা রমযানের মাস এসে যাওয়ার কারণে বিরতি হলেও কাফ্ফারা আদায় হবে না।
* কাফ্ফারার রোযা এমন দিন থেকে শুরু করবে যেন মাঝখানে কোন নিষিদ্ধ দিন এসে না যায়। উল্লেখ্য, যে পাঁচ দিন রোযা রাখা নিষিদ্ধ বা হারাম তা হল দুই ঈদের দিন এবং ঈদুল আযহার পরের তিন দিন।
* কাফ্ফারার রোযা রাখার মধ্যে হায়েযের দিন (নেফাসের নয়) এসে গেলেও যে কয়দিন সে হায়েযের কারণে বিরতি যাবে তাতে অসুবিধে নেই।
* কাযা রোযার ন্যায় কাফ্ফারার রোযার নিয়তও সুবহে সাদেকের পূর্বে হওয়া জরুরি।
* একই রমযানের একাধিক রোযা ছুটে গেলে কাফ্ফারা একটাই ওয়াজিব হবে। দুই রমযানের ছুটে গেলে দুই কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।
* কাফ্ফারা বাবত বিরতিহীনভাবে ৬০ দিন রোযা রাখার সামর্থ না থাকলে পূর্ণ খোরাক খেতে পারে-এমন ৬০ জন মিসকীনকে (অথবা এক জনকে ৬০ দিন) দু’বেলা পরিতৃপ্তির সাথে খাওয়াতে হবে অথবা সদকায়ে ফিত্র-এ যে পরিমাণ গম বা তার মূল্য দেয়া হয় প্রত্যেককে সে পরিমাণ দিতে হবে। এই গম ইত্যাদি বা মূল্য দেয়ার ক্ষেত্রে একজনকে ৬০ দিনেরটা এক দিনেই দিয়ে দিলে কাফ্ফারা আদায় হবেনা। তাতে মাত্র এক দিনের কাফ্ফারা ধরা হবে।
* ৬০ দিন খাওয়ানোর বা মূল্য দেয়ার মাঝে ২/১ দিন বিরতি পড়লে ক্ষতি নেই।
রোযার ফেদিয়ার মাসায়েল
* “ফেদিয়া” অর্থ ক্ষতিপূরণ। রোযা রাখতে না পারলে বা কাযা আদায় করতে না পারলে যে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় তাকে ফেদিয়া বলে। প্রতিটা রোযার পরিবর্তে সাদকায়ে ফিতর (ফিতরা) পরিমাণ পণ্য বা তার মূল্য দান করাই হল এক রোযার ফেদিয়া।
* যার যিম্মায় কাযা রোযা রয়ে গেছে- জীবদ্দশায় আদায় হয়নি, মৃত্যুর পর তার ওয়ারিছগণ তার রোযার ফেদিয়া আদায় করবে। মৃত ব্যক্তি ওছিয়াত করে গিয়ে থাকলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে নিয়ত অনুযায়ী এই ফেদিয়া আদায় করা হবে। আর ওছিয়াত না করে থাকলেও যদি ওয়ারিছগণ নিজেদের মাল থেকে ফেদিয়া আদায় করে দেয় তবুও আশা করা যায় আল্লাহ তা কবুল করবেন এবং মৃত ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন।
* অতি বৃদ্ধ/বৃদ্ধা রোযা রাখতে না পারলে অথবা কোন ধ্বংসকারী বা দীর্ঘ মেয়াদী রোগ হলে এবং সুস্থ হওয়ার কোন আশা না থাকলে আর রোযা রাখায় ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকলে এমন লোকের জন্য প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ফেদিয়া আদায় করার অনুমতি আছে। তবে এরূপ বৃদ্ধ/বৃদ্ধা বা এরূপ রোগী পুনরায় কখনো রোযা রাখার শক্তি পেলে তাদেরকে কাযা করতে হবে এবং যে ফেদিয়া দান করেছিল তার ছওয়াব পৃথকভাবে সে পারে।
নফল রোযার মাসায়েল
* পাঁচদিন ব্যতীত সারা বছর যে কোন দিন নফল রোযা রাখা যায়। উক্ত পাঁচ দিন হল দুই ঈদের দুই দিন এবং ঈদুল আযাহার পরের তিন দিন অর্থাৎ, ১১ই, ১২ই ও ১৩ই যিলহজ্জ। এই পাঁচ দিন যে কোন রোযা রাখা হারাম।
* যে ব্যক্তি প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩ই, ১৪ই, ও ১৫ই তারিখে নফল রোযা রাখল সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। এটাকে ‘আইয়্যামে বীযের রোযা’ বলে।
* প্রত্যেক সোমবার এবং বৃহস্পতিবারও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল রোযা রাখতেন। এতেও অনেক সওয়াব আছে।
* বেলা দ্বিপ্রহরের এক ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত নফল রোযার নিয়ত করা দুরন্ত আছে।
* নফল রোযা শুরু করলে সেটা পুরো করা ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই নফল রোযার নিয়ত করার পর সেটা ভাঙ্গলে তার কাযা আদায় করা ওয়াজিব।
* স্বামী বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার বিনা অনুমতিতে স্ত্রীর জন্যে নফল রোযা রাখা দুরস্ত নয়। রাখলে স্বামী হুকুম করলে তা ভেঙ্গে দিতে হবে এবং পরে কাযা করে নিতে হবে।
* মেহমান যদি একা খেতে মনে কষ্ট পায় তাহলে তার খাতিরে মেযবান (বাড়িওয়ালা) নফল রোযা ভেঙ্গে ফেলতে পারে। ভাঙ্গলে পরে কাযা করে নিতে হবে। তবে এই ভাঙ্গার অনুমতি সূর্য ঢলার পূর্ব পর্যন্ত।
মান্নতের রোযার মাসায়েল
* যদি কেউ আল্লাহর নামে রোযা রাখার মান্নত করে তাহলে সেই রোযা রাখা ওয়াজিব হয়ে যায়। তবে কোন শর্তের ভিত্তিতে মান্নত মানলে সেই শর্ত পূরণ হওয়ার পূর্বে ওয়াজিব হয় না- শর্ত পূরণ হলেই ওয়াজিব হয়।
* কোন নির্দিষ্ট দিনে রোযা রাখার মান্নত করলে এবং সেই দিন রোযা রাখলে রাত্রেই নিয়ত করা জরুরি নয়, দুপুরের এক ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত নিয়ত করা দুরস্ত আছে।
* কোন নির্দিষ্ট দিনের রোযা রাখার মান্নত করলে এবং সেই দিন সে রোযা রাখলে মান্নতের রোযা বলে নিয়ত করুক বা শুধু রোযা বলে নিয়ত করুক বা নফল বলে নিয়ত করুক মান্নতের রোযাই আদায় হবে। তবে কাযা রোযার নিয়ত করলে কাযাই আদায় হবে-মান্নতের রোযা আদায় হবে না।
* কোন দিন তারিখ নির্দিষ্ট করে মান্নত না করলে যে কোন দিন সে মান্নতের রোযা রাখা যায়। এরূপ মান্নতের রোযার নিয়ত সুবহে সাদেকের পূর্বেই হওয়া শর্ত।
* কোন নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট তারিখে বা নির্দিষ্ট মাসে রোযা রাখার মান্নত করলে সেই নির্দিষ্ট দিনে বা তারিখে বা মাসে রোযা রাখাই জরুরি নয়-অন্য যে কোন সময় রাখলও চলবে।
* যদি এক মাস রোযা রাখার মান্নত করে তাহলে পুরো এক মাস লাগাতার রোযা রাখতে হবে।
* যদি কয়েক দিন রোযা রাখার মান্নত করে তাহলে একত্রে রাখার নিয়ত না থাকলে সে কয়দিন ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখলেও চলবে। আর একত্রে রাখার নিয়ত করলে একত্রেই রাখতে হবে।
সুন্নাত এ’তেকাফ-এর মাসায়েল
* এ’তেকাফ অর্থ স্থির থাকা, অবস্থান করা। পরিভাষায় জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছওয়াবের নিয়তে মসজিদে বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা ও স্থির থাকাকে এ’তেকাফ বলে।
* রমযানের শেষ দশকে এ’তেকফে করা সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কেফায়া, অর্থাৎ, বড় গ্রাম বা শহরের প্রত্যেকটা মহল্লা এবং ছোট গ্রামের পূর্ণ বসতিতে কেউ কেউ এ’তেকাফ করলে সকলেই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে- আর কেউই না করলে সকলেই সুন্নাত তরকের জন্য দায়ী হবে।
* রমযানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এ’তেকাফের সময়।
এ’তেকাফের শর্তসমূহ
এতেকাফের জন্য তিনটি শর্ত : যথা ঃ
(১) এমন মসজিদে এ’তেকাফে হতে হবে যেখানে নামাযের জামা’আত হয়। জুমুআ-র জামা’আত হোক বা না হোক। এ শর্ত পুরুষের এ’তেকাফের ক্ষেত্রে। মহিলাগণ ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে এ’তেকাফের করবে।
(২) এ’তেকাফের নিয়ত করতে হবে।
(৩) হায়েয নেফাস শুরু হলে এ’তেকাফ ছেড়ে দিবে।
যে সব কারণে এ’তেকাফ ফাসেদ তথা নষ্ট হয়ে যায় এবং কাযা করতে হয়
(১) স্ত্রী সহবাস করলে এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায়, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক, ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলে হোক। সহবাসের আনুষঙ্গিক কাজ যেমন চুম্বন, আলিংগন, ইত্যাদির কারণে বীর্যপাত হলে এতকাফ ফাসেদ হয়ে যায়। চুম্বন ইত্যাদির কারণে বীর্যপাত না হলে এ’তেকাফ বাতিল হয় না, তবে এ’তেকাফের অবস্থায় তা করা হারাম।
(২) এ’তেকাফের স্থান থেকে শরী’আত সম্মত প্রয়োজন বা স্বাভাবিক প্রয়োজন ছাড়া বের হলে এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায়। শরী’আত সম্মত প্রয়োজন হলে মসজিদের বাইরে যাওয়া যায়; যেমন সে মসজিদে জুম’আর জামা’আত না হলে জুরুআর নামাযের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া, ফরয বা সুন্নাত গোসলের জন্য বের হওয়া ইত্যাদি। আর স্বাভাবিক প্রয়োজনেও বের হওয়া যায়; যেমন পেশাব-পায়খানার জন্য বের হওয়া, খাদ্য-খাবার এনে দেয়ার লোক না থাকলে তা আনার জন্য বের হওয়া, মসজিদের ভিতর উযুর পানির ব্যবস্থা না থাকলে এবং পানি দেয়ার কেউ না থাকলে উযুর পানির জন্য বাইরে যাওয়া।
* যে কাজের জন্য বাইরে যাওয়া হবে সে কাজ সমাপ্ত করার পর সত্বর ফিরে আসবে, বিনা প্রয়োজনে কারও সাথে কথা বলবে না।
* গোসল ফরয হওয়া ছাড়াও আমরা শরীর ঠাণ্ডা করার নিয়তে বা শরীর পরিষ্কার করার নিয়তে সাধারণতঃ যে গোসল করে থাকি, শুধু এরূপ গোসলেরই উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। তবে কাউকে বলে যদি পথের মধ্যে পানির ব্যবস্থা করে রাখে বা পুকুর ইত্যাদি থাকে আর পেশাব পায়খানা থেকে ফেরার পথে অতিরিক্ত সময় না লাগিয়ে জলদি ঐ পানি গায়ে মাথায় ঢেলে বা ডুব দিয়ে গোসল সেরে চলে আসে তাহলে এ’তেকাফের ক্ষতি হবে না।
এ’তেকাফের অবস্থায় যে সব জিনিস মাকরূহ
১. এ’তেকাফ অবস্তায় চুপ থাকলে ছওয়াব হয় এই মনে করে চুপ থাকা মাকরূহ তাহরীমী।
২. বিনা জরুরতে দুনিয়ারী কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহ তাহরীমী। যেমন ক্রয়-বিক্রয় করা ইত্যাদ। তবে নেহায়েত জরুরত হলে যেমন ঘরে খোরাকী নেই এবং সে ব্যতীত কোন বিশ্বস্ত লোকও নেই-এরূপ অবস্থায় মসজিদে মাল-পত্র উপস্থিত না করে কেনা- বেচার চুক্তি করতে পারে।
এ’তেকাফের মোস্তাহাব ও আদবসমূহ
১. এ’তেকাফের জন্য সর্বোত্ম মসজিদ নির্বাচন করবে। সর্বোত্তম মসজিদ হল মসজিদুল হারাম, তারপর মসজিদে নববী, তারপর বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর যে জামে মসজিদে জামা’আতের এন্তেজাম আছে, তারপর মহল্লার মসজিদ, তারপর যে মসজিদে বড় জামা’আত হয়।
২. নেক কথা ব্যতীত অন্য কথা না বলা।
৩. বেকার বসে না থেকে নফল নামায, তিলাওয়াত ও তাসবীহ তাহলীলে মশগুল থাকা উত্তম।
* এ’তেকাফে খাস কোন ইবাদত করা শর্ত নয়- যে, কোন নফল নামায, যিকির-আযকার, তিলাওয়াত, দ্বীনী কিতাব পড়া, পড়ানো বা যে ইবাদত মনে চায় করতে পারে।
* এ’তেকাফে শুরু করার পর নিজের বা অন্যের জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনন্যোপায় অবস্থায় এ’তেকাফের স্থান থেকে বের হলে গোনাহ নেই বরং তা জরুরি, তবে তাতে এ’তেকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* কোন শরী’আত সম্মত প্রয়োজনে বা স্বাভাবিক প্রয়োজনে বের হলে ইত্যবসরে কোন রোগী দেখলে বা জানাযায় শরীক হলে তাতে কোন দোষ নেই।
* পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এ’তেকাফে বসা অথবা বসানো উভয়টা না-জায়েয ও গোনাহ।
* মহিলাদের জন্য মসজিদে এ’তেকাফ করা মাকরূহ তাহরীমী। তারা ঘরে এ’তেকাফ করবে। স্বামী মওজুদ থাকলে এ’তেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। স্বামীর খেদমতের প্রয়োজন থাকলে এ’তেকাফে বসবে না। শিশুর তত্ত্বাবধান ও যুবতী কন্যার প্রতি খেয়াল রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকলে এ’তেকাফে না বসাই সমীচীন। মহিলাগণ নির্দিষ্ট কোন কামরায় বা ঘরের কোণে এক স্থানে পর্দা ঘিরে এ’তেকাফে বসবে। মহিলাদের জন্য এ’তেকাফের অন্যান্য মাসায়েল পুরুষদেরই ন্যায়।
ওয়াজিব এ’তেকাফ (মান্নতের এ’তেকাফ)-এর মাসায়েল
* এ’তেকাফের মান্নত করলে এ’তেকাফ ওয়াজিব হয়ে যায়। তবে কোন শর্তের ভিত্তিতে মান্নত করলে (যেমন আমার অমুক কাজ হয়ে গেলে এ’তেকাফ করব ইত্যাদি) শর্ত পূরণ হওয়ার পূর্বে ওয়াজিব হয় না।
* ওয়াজিব এ’তেকাফের জন্য রোযা শর্ত-যখনই এ’তেকাফ করবে রোযাও রাখতে হবে।
* ওয়াজিব এ’তেকাফ কমপক্ষে একদিন হতে হবে। বেশি দিনের নিয়ত করলে তা-ই করতে হবে।
* যদি শুধু এক দিনের এ’তেকাফের মান্নত করে তাহলে তার সঙ্গে রাত শামিল হবে না। তবে যদি রাত দিন উভয়ের নিয়ত করে বা একত্রে কয়েক দিনের মান্নত করে তাহলে রাতও শামিল হবে। দিন বাদে শুধু রাতে এ’তেকাফের মান্নত হয় না।
* উপরোল্লিখিত মাসায়েল ব্যতীত সুন্নাত এ’তেকাফের ক্ষেত্রে যে সব মাসায়েল বর্ণনা করা হয়েছে, ওয়াজিব এ’তেকাফের ক্ষেত্রেও সেগুলো প্রয়োজ্য।
মোস্তাহাব/নফল এ’তেকাফের মাসায়েল
* সুন্নাত এ’তেকাফ (রমযানের পূর্ণ শেষ দশক) ও ওয়াজিব এ’তেকাফ ব্যতীত অন্যান্য যে কোন সময়ের এ’তেকাফের জন্য কোন পরিমাণ সময় নির্ধারিত নেই-সামান্য সময়ের জন্যেও তা হতে পারে।
* যে সব জিনিস দ্বারা এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায় এবং কাযা করতে হয় সেসব দ্বারা মোস্তাহাব এ’তেকাফও নষ্ট হয়ে যাবে। তবে মোস্তাব এ’তেকাফের জন্য যেহেতু সময়ের পরিমাণ নির্ধারিত নেই, তাই তার কাযাও নেই।
