প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৭, রজব-শাবান ১৪৩৮ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ….’ সংখ্যায়

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পার্থিব বিষয়ে পরিপূর্ণ যুহুদ অবলম্বনকারী, আল্লাহ ও পরকাল দিবসে যা গচ্ছিত ও সংরক্ষিত সে ব্যাপারে খুবই আকাক্সক্ষী। রাসূল, তাই, আসন্ন এবাদতকাল উপলক্ষ্যে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন এবং বিভিন্ন সময়ে রহমত-বরকত ও কল্যাণ বর্ষণ এবং অবতরণের উপলক্ষ্য ও অনুষঙ্গগুলোর কারণে ব্যাকুল হতেন। কোরআনে এসেছে- আপনি বলুন, আল্লাহর ফজল ও করুণায় এ হয়েছে। এর মাধ্যমেই তারা যেন আনন্দিত হয়। তারা যা সঞ্চয় করে, সে তুলনায় তা উত্তম।(সূরা ইউনুস : আয়াত – ৫৮)

আয়াতটি প্রমাণ করে মানুষের পার্থিব অর্জিত ধন-সম্পদ বা সঞ্চিত ব্যবহার্য নয়; আনন্দের উপকরণ হল আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ কোরআন, ইসলামের ফরজ বিধি-বিধান ও আনুষঙ্গিক সম্পূরক সমূহ – যারা অন্যতম সিয়াম।(ইমাম তাবারী : জামেউল বায়ান, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৫৬৮)

আল্লামা ইমাম সাদি বলেন : ইহকালীন ও পরকালীন বিপুল নেয়ামত-রাজির সাথে পার্থিব জগতের অর্জনের কোন তুলনা নেই; পার্থিব সঞ্চয় – তা যতই অঢেল ও বিচিত্র হোক না কেন, একদিন অবশ্যই বিবর্ণ আকার ধারণ করবে, বিলুপ্ত হবে অচিরে। আল্লাহ তায়ালা তাই, তার প্রদত্ত ফজিলত ও করুণাকে আনন্দের উপকরণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন-নির্দেশ দিয়েছেন তাকে স্ফূর্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে।

কারণ, এর মাধ্যমেই আত্মার স্ফুরণ হয়, উদ্বেলিত হয় অপার এক উদ্যমে, কৃতজ্ঞতায় নতজানু হয় আল্লাহর দরবারে, সঞ্চারিত হয় তার মাঝে এক অমিত শক্তি, সূচিত হয় জান ও ঈমান প্রাপ্তির পরম আকাক্সক্ষা। সন্দেহ নেই- বান্দার এ মনোবৃত্তি প্রশংসনীয়। আনন্দ ও চিত্ত-স্ফূর্তির এ মাধ্যম খুবই গ্রহণযোগ্য।

পক্ষান্তরে, ইহকাল প্রবৃত্তি ও তার আস্বাদ জন্ম দেয় যে আনন্দের, কিংবা যে স্ফূর্তি ডাল-পালা মেলেছে অসিদ্ধ পথের বদান্যতায়, তা ঘৃণিত, বর্জনীয়। যেমন আল্লাহ তা’য়ালা কারুন গোত্রের প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন-

তুমি আনন্দিত হয়ও না, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা (অনৈতিক উপায়ে) আনন্দিতদের পছন্দ করেন না।(সূরা কাসাস : আয়াত – ৭৬)

অনুরূপ আল্লাহ তায়ালা একই উক্তি করেছেন এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে, যারা আনন্দিত হয়েছে অগ্রহণযোগ্য অনৈতিক বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করে- যা রাসূলদের আনীত বিষয়ের পূর্ব পরিপন্থী।

কোরআনে এসেছে-

রাসূলগণ যখন তাদের নিকট আগমন করলেন স্পষ্ট নির্দশনা সহকারে, তারা আনন্দ অনুভব করল তাদের নিকট যে ইলম ছিল তা নিয়ে।(সূরা গাফের : আয়াত – ৮৩) (আল্লামা সাদী : তাইসীরুল কারিমির রহমান, পৃষ্ঠা : ৩৬৭)

আল্লাহ তায়ালা নৈকট্যলাভ ও কল্যাণ-কর্মের বিভিন্ন উপলক্ষের অনুবর্তন ও তাতে সর্বস্ব নিয়োগ বান্দাকে দ্রুত আল্লাহর নিকটবর্তী করতে সহায়তা করে, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও রেজা লাভের মাধ্যমে বান্দা উন্নীত হয় উঁচু মর্যাদায়, এগিয়ে যায় দ্রুত সম্মুখ-পানে। নৈকট্য ও কল্যাণ-কর্মের মৌসুমগুলোর উত্তম অনুবর্তনের ফলে সবকিছুই হয় ফলদায়ক, আত্মায় ও দেহে, অন্তর ও বাহ্য সম্পর্কের যাবতীয় সজাগ অনুভূতি নিয়োগ করে আল্লাহর আনুগত্যে সে নিজেকে বিলীন করে দেয়।

নৈকট্য লাভের বিবিধ মাহেন্দ্রক্ষণ এবং রমজানের সদব্যবহারের উত্তম প্রমাণ হল এ ব্যাপারে রাসূলের সর্বাত্মক প্রস্তুতি, মানসিক ও আত্মিকভাবে রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্যাকুলতা; যেন তা পূর্ণাঙ্গভাবে কল্যাণব্রতী হয়, উদ্যমী হয় আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা উত্তরণের, সময়গুলো কাজে লাগে পূর্ণাঙ্গভাবে।

এভাবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি উভয় জগতের নেতা, রমজান-পূর্ব সময় যাপন করতেন, সমাধা করতেন প্রস্তুতির নানা পর্ব। নিম্নে তার প্রস্তুতির উল্লেখযোগ্য কিছু উদাহরণ পেশ করা হল

অন্যান্য সময়ের তুলনায় শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা রাখা

রমজানে দীর্ঘদিন রোজা রাখার দৈহিক ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য তিনি শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা পালন করতেন।(শাবান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক রোজা পালনের হিকমত কি ছিল? -এ ব্যাপারে তত্ত্বানুসন্ধানকারী উলামাদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। উল্লেখিত মতটি তার অন্যতম। ভিন্ন একটি মত হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালন করতেন, এ মাসে তার কাযাগুলো আদায় করতেন। ভিন্ন কারো মত এই যে, তার স্ত্রীগণ রমজানের কাযা রোজাগুলো এ মাসে পালন করতেন, তাই তিনিও তাদের সাথে রোজা রাখতেন। ইবনে হাজার তার ফাতহ গ্রন্থে (খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ২৫৩) বলেন, এ ব্যাপারে সর্বোত্তম ব্যাখ্যা এই যে, উসামা বিন যায়েদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! শাবান মাসে আপনি যে পরিমাণ রোজা পালন করেন, অন্য কোন মাসে এতটা পালন করতে দেখি না! রাসূল উত্তর করলেন, রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস হওয়ার কারণে মানুষ এ মাসের ব্যাপারে উদাসীন থাকে।

এ এমন মাস, যে মাসে রবের নিকট আমল তুলে ধরা হয়। আমি চাই যে, রোজা পালনরত অবস্থায় আমার আমল তার নিকট পেশ করা হোক। হাদিসটি নাসায়ি বর্ণনা করেছেন (২৩৫৭) হাদিসটি হাসান। উল্লেখিত বিভিন্ন মতামতের মাঝে একটি মতকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয়া যায় না।) আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত একটি হাদীস বিষয়টির প্রমাণ বহন করে। হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) বলেন-

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো এমনভাবে রোজা পালন করতেন যে আমাদের মতে হত, তিনি রোজা ত্যাগ করবেন না। আর কখনো এত দীর্ঘ সময় রোজা ত্যাগ করতেন যে, আমাদের মনে হত তিনি তার রোজা পালন করবেন না। রমজান মাস ব্যতীত পূর্ণ কোন মাস তাকে আমি রোজা পালন করতে দেখিনি। এবং শাবানের তুলনায় ভিন্ন কোন মাসে এত রোজা পালন করতেও দেখিনি।(বুখারী : ১৯৬৯)

অন্য হাদীসে এসেছে-

শাবানের তুলনায় অন্য কোন মাসে আমি তাকে এত অধিক-হারে রোজা পালন করতে দেখিনি। তিনি শাবানের প্রায় পুরোটাই রোজায় অতিবাহিত করতেন। কিছু অংশ ব্যতীত তিনি পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন।(মুসলিম : ১১৫৬)

সুতরাং, উক্ত হাদীসের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ধর্মপ্রাণ মুসলমান মাত্ররই কর্তব্য, শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা পালন করা। বিদগ্ধ উলামাদের মতামত এই যে- শাবানের রোজা হচ্ছে ফরজ সালাতের আগে ও পরে পালিত সুন্নতে মোয়াক্কাদার অনুরূপ এবং তা রমজান মাসের ভূমিকাতুল্য। অর্থাৎ, তা যেন রমজানের পূর্বে পালিত প্রস্তুতিমূলক এবাদত। এ কারণেই শাবান মাসে রোজা পালন সুন্নত করা হয়েছে। এবং সুন্নত করা হয়েছে শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। ফরজ নামাজের পূর্বের ও পরের সুন্নতের অনুরূপ।(মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২২, ২৩)

সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বর্তমান পরিস্থিতির সানুপুঙ্খ বিচারক মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন- নববী এই আদর্শ বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে সমাজ হতে, গুটি কয় ব্যক্তি ব্যতীত এর উপস্থিতি কোনভাবেই নজরে পড়ে না আমাদের। নববী পদাঙ্ক অনুসরণ করে যারা আরোহণ করতে ব্যাকুল-আগ্রহী উচ্চ সম্মানের স্তরে, রাত্রি-দিন যে ব্যক্তি পরকালীন সাফল্য লাভের ধ্যানে মজ্জামান, নিজেকে এর জন্য গড়ে নিচ্ছে নিপুণভাবে, কোথায় সে মহা পুরুষগণ! জীবনের সবগুলো বসন্তের অনুরূপ, হারিয়ে যাবে এক সময় বরকতময় কল্যাণ লাভের এ মাস – রমজান মাস। আল্লাহ আমাদেরকে এক পুরো সার গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন।

সাহাবীগণকে রমজান আগমনের সুসংবাদ প্রদান

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীগণকে রমজানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত-উদ্দীপিত করতেন, পরামর্শ প্রদান করতেন সর্বস্ব নিয়োগ করে তাতে কল্যাণ আহরণের জন্য আত্মনিয়োগের। এ বিষয়ে নানা হাদীস করেছে- যেমন :

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন –

যখন রমজান মাস আগত হয়, আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের কপাটগুলো এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয় শৃঙ্খলে।(বুখারী : ১৮৯৯)

অপর হাদীসে এসেছে-

রমজানের প্রথম রাত্রিতে শয়তান ও দুষ্ট জ্বীনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের কপাটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়- তার একটি দরজাও খোলা হয় না। একজন আহ্বানকারী আহ্বান জানিয়ে বলেন : হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও। আর যে অকল্যাণের প্রত্যাশী, বিরত হও। আল্লাহ জাহান্নাম হতে অনেককে মুক্তি দিবেন, এবং তা প্রতি রাতেই।’(তিরমিজি : ৬৮৩, হাদীসটি সহি)

ভিন্ন এক হাদীসে এসেছে-

রমজান-বরকতময় মাস-তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোজা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। দুষ্ট শয়তানদের এ মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ হতে বঞ্চিত হল, সে বঞ্চিত হল (মহা কল্যাণ হতে)।(নাসায়ী : ২১০৬)

হাদীসে এসেছে-

জান্নাতের একটি দরজা রয়েছে রইয়ান নামে। কেয়ামত দিবসে রোজাদারগণ উক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবিষ্ট হবেন; তারা ব্যতীত কেউ তা দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ পাবে না। বলা হবে : রোজাদারগণ কোথায়? তখন তারা দণ্ডায়মান হবেন, তারা ব্যতীত এ দরজা দিয়ে অপর কেউ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবিষ্ট হওয়ার পর সে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অপর কেউ তাতে প্রবেশের সুযোগ পাবে না।(বুখারী : ১৭৯৭)

সত্য পথের আহ্বানকারী যারা, যারা সর্বক্ষণে, সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ ও ফজিলত পিয়াসি, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল : এ মহান সুন্নত চৌদিকে ছড়িয়ে দেয়া, মানুষের মাঝে এর কল্যাণ বিস্তারে আত্মনিয়োগ করা। তাদের দায়িত্ব হল, মানুষকে তারা রমজানের সুসংবাদ প্রদান করবে, তার ফজিলত ও বরকত সম্পর্কে অবগত করাবে, সময়ের সর্বোত্তম ও উপযোগী ব্যবহার ও উপকার হাদীসের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার পথ বাতলে দেবে। সুসংবাদ ও সৌভাগ্যের বাণী-মাধুর্যে বিধৌত করবে মানুষের মন-মানস। রমজান যাপনের মাধ্যমে উদ্বেল হবে একে-অপরে, আবদ্ধ হবে সম্প্রীতির বন্ধনে। যে কোন বিষয়ের তুলনায় এর জন্য অধিক প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।

কি উপায়ে সর্বাত্মক কল্যাণ আহরণ হয় এবং ভরিয়ে তোলা যায় আত্মাকে অনুসন্ধান করবে এ বিষয়ে। পার্থিব ভোগ-বিলাস ও উত্তম পানাহারকে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসবে না যে, মনে হয়, এগুলোই রমজানের একমাত্র উদ্দেশ্য। কারণ, এর মাধ্যমে রমজানের উদ্দেশ্য চূড়ান্তভাবে ব্যাহত হয়, বাধা প্রাপ্ত হয় কল্যাণ-ধারা। পরিতাপের বিষয় এই যে, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই রমজান অতিবাহিত হয় তার অগোচর-সন্তর্পণে। আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন, প্রদান করুন সঠিক পথের দিশা।

রমজানের বিধান বর্ণনা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে সাহাবীদের নানা বিধান সম্পর্কে অবগত করাতেন, সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে ঋজু পথ আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করতেন। বক্ষ্যমান নিবন্ধে উল্লেখিত অনেক হাদীস ও হাদীসাংশ এ বিষয়ের উত্তম প্রমাণ।

বর্তমান সময়ে, রাসূলের উক্ত কর্মপন্থা অনুসারে, আমাদের দায়িত্ব হল : যারা উম্মতের মহান আলেম ও বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, সম্মানিত দায়ী, তারা সাধারণ মানুষকে রমজানের যাবতীয় হুকুম সম্পর্কে জ্ঞাত করাবেন, রমজান-পূর্ব ও মধ্যবর্তী সময়ে মানুষের মাঝে ব্যাপক দাওয়াতি কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। প্রত্যেকে সাধ্য ও সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যয় করবেন, যে উপায়ে বিষয়টির বাস্তবায়ন সম্ভব, অবলম্বন করবেন সে সকল উপায়। কারণ, মানুষের মাঝে মূর্খতা ছড়িয়ে পড়েছে, দ্বীনের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকট অভাব গোচরীভূত হচ্ছে সাধারণ মুসলমান-কখনো কখনো বিশেষ শ্রেণির মাঝে ও সমাজে।

সাধারণ মুসলমান নারী হোক কিংবা পুরুষ নির্বিশেষে, সকলের কর্তব্য; পবিত্র রমজানে পালিত যাবতীয় এবাদত ও জিকির-আজকার বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করা। সুতরাং, তারা রমজান বিষয়ক বই-পত্র অধ্যয়ন করবে, অডিও প্রোগ্রাম শ্রবণ করে স্বচ্ছ ধারণা লাভে প্রয়াস চালাবে। হাজির হবে ইলম ও জ্ঞানের মজলিসসমূহে।

কারণ, যে কোন বিষয়ের মৌলিক খুঁটি হচ্ছে সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করা এবং পরবর্তীতে সে অনুসারে আমল করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত নয় – এমন আমল পরিত্যাজ্য সর্বার্থে। গ্রহণযোগ্য কেবল সে আমলই, যার ভিত্তি অতি মজবুত, যার আচরিত কর্মপন্থা সঠিক ও নির্ভুল।

ইলম, আমল ও দাওয়াতি ক্ষেত্রে যে রাসূলের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, গ্রহণযোগ্য কেবল তার আমলই।
পূর্ণ শাবান অতিবাহিত হওয়া ব্যতীত রোজা পালন আরম্ভ না করা

রমজান মাসের চাঁদ দেখেছে, এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য, কিংবা পূর্ণ শাবান মাস অতিবাহিত হওয়া ব্যতীত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান পালনের সূচনা করতেন না। চাঁদ দেখা ইসলাম ধর্মের একটি বিশেষ নিদর্শন ও সময় অতিবাহনের প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত; যে কোন সময় ও স্থান হতেই যা চি‎িহ্নত করা সম্ভব। সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ যে কোন বিষয়কে স্বীকৃতি প্রদানের কুণ্ঠা বোধ করে না, প্রকাশ্য মাধ্যমকে কবুল করে নেয় অতিসহজে, তাই ইসলাম একে প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত : তিনি বলেন, মানুষ সম্মিলিতভাবে চাঁদ দেখল, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ প্রদান করলাম যে, আমি চাঁদ দেখেছি। রাসূল, তাই, রোজা রাখলেন এবং সকলকে নির্দেশ দিলেন রোজা পালনের।(আবু দাউদ : ২৩৪২; হাদীসটি সহি)

ইবনে আব্বাস হতেও এ জাতীয় এক হাদীসের উল্লেখ পাওয়া যায়; তিনি বলেন :

এক গ্রাম্য স্বজন রাসূলের দরবারে আগমন করে আরজ করল : আমি রমজানের চাঁদ দেখেছি। রাসূল বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য প্রদান কর যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই? লোকটি উত্তর দিল : হ্যাঁ। রাসূল বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য প্রদান কর যে, মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল? উত্তর দিল : হ্যাঁ। রাসূল অতঃপর বেলাল (রাঃ)-এর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন : হে বেলাল! মানুষকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামীকাল রোজা রাখে।(আবু দাউদ : ২৩৪০)

হাদীসটি ইসলাম ধর্মের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরছে; বিশেষত: যারা সাধারণ মানুষের সাথে কাজ করেন এমন দায়ি ও সংস্কারকদের জন্য বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে : ন্যয়পরতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলে, কিংবা ইঙ্গিত করে জ্ঞানগত দৌর্বল্যের প্রতি, ব্যক্তি স্বার্থের দ্বারা কলুষিত করে- এমন অবস্থা ব্যতীত সাধারণ মানুষের প্রতি আস্থা রাখা, তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা বিধিসম্মত। কারণ, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে যাকে রুকনের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে – সাধারণ এক গ্রাম্য ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন।

রমজান মাসের চাঁদ দৃষ্টিগোচর না হলে শাবান মাস পূর্ণ করা সংক্রান্ত হাদীস নিম্নরূপ : চাঁদ দেখার প্রতি নির্ভর করা এবং মাস গণনার ক্ষেত্রে হিসাবের প্রতি গুরুত্ব প্রদান না করার নির্দেশ করে রাসূল বলেন-

তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ, চাঁদ দেখেই ভঙ্গ কর। চাঁদ দেখাকে অভ্যাসে পরিণত কর। যদি চাঁদ না দেখা যায়, তবে ত্রিশ দিন পূরণ কর। যদি দু’ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করে, তবে তোমরা রোজা রাখ, এবং রোজা ভঙ্গ কর।(নাসায়ী : ২১১৬, হাদীসটি সহী)
অপর হাদীসে এসেছে-

মাস হল ২৯ রাত্রি। তবে, চাঁদ না দেখে তোমরা রোজা রেখ না। যদি চাঁদ না দেখা যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।(বুখারী : ১৮০৮)

শরিয়ত বিষয়টিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর এ সংক্রান্ত অতি সাবধানতার পদ্ধতি অবলম্বন নিঃপ্রয়োজন। তাই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহের দিনে রোজা পালন করে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বনের ব্যাপারে নিষেধ করে এরশাদ করেছেন-

তোমরা রমজান আগমনের পূর্বে রোজা পালন কর না, চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং ভঙ্গ কর। যদি মেঘে ঢেকে যায়, তবে ত্রিশ পূর্ণ কর।(নাসায়ী : ২১৩০, হাদীসটি সহি) অপর স্থানে এসেছে-

রমজান-পূর্ব শেষ দিবসগুলোতে তোমরা একদিন, কিংবা দু দিন রোজা রেখ না, তবে এমন ব্যক্তির জন্য তা বৈধ, যে পূর্ব হতেই কোন রোজা রাখছিল।(মুসলিম : ২০৮২)

সন্দেহের দিন রোজা রাখা- যেমন অতিরিক্ত সতর্কতা বশত: কেউ কেউ করে থাকে- নিষিদ্ধ।(সন্দেহের দিন রোজা রাখা আলেমদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, তা নিষিদ্ধ। তবে যারা নিষিদ্ধ বলেছেন- নিষেধটি কি হারাম ও মাকরূহ? এ নিয়ে তাদের মাঝে বিরোধ রয়েছে। কোন কোন হাম্বলী ইমাম এ দিন রোজা রাখা ওয়াজিব বলেছেন। অপর কেউ বলেন, সতর্কতামূলক এ দিন রোজা পালন করা জায়েজ। ইমাম আবু হানিফা এ মত অবলম্বন করেছেন। ইমাম আহমদ থেকেও এই মত পাওয়া যায়। সাহাবী ও তাবেইনের বৃহৎ একটি দল, কিংবা তাদের অধিকাংশের মত এরূপই। ইবনে তাইমিয়া একই মত পোষণ করেছেন। দ্র: মাজমুউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ৯৮-১০০) কারণ, হাদীসে স্পষ্টভাবে চাঁদ দেখা কিংবা শাবান মাস পূর্ণ করার উপর বিষয়টিকে নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। আম্মার ইবনে য়াসার, তাই, বলতেন। মানুষের কাছে সংশয়পূর্ণ দিবসে যে ব্যক্তি রোজা পালন করবে, সে নিশ্চয় আবুল কাশেম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যতায় লিপ্ত হল।(তিরমিজি : ৬৮৬; হাদীসটি সহি)

কিন্তু যে ব্যক্তি চাঁদ দেখতে সক্ষম হয়নি; কিংবা যে অনুসন্ধান করেছে- সম্ভব হয়নি তার জন্য অপেক্ষা করা এবং রোজা পালন করেছে এক ধরনের দোদুল্যমান নিয়ত নিয়ে- যেমন- যদি দিনটি রমজানভুক্ত হিসেবে প্রমাণ হয়, তবে আমি রমজানেরই রোজা হিসেবে তা পালন করলাম, অন্যথায় নয়; তবে তা তার জন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতানুসারে- যথেষ্ট হবে। কারণ, নিয়ত ইলম বা জানার অনুবর্তী। যদি সে জেনে থাকে যে, আগামীকাল রোজা, তবে তাকে নির্দিষ্ট করে নিয়ত করতে হবে। যদি সে নিয়ত করে নফল রোজা রাখার, কিংবা নিয়তকে মুক্ত রাখে, তবে তার জন্য তা যথেষ্ট হবে না। কারণ, আল্লাহ তাকে আদায়ের ইচ্ছা করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওয়াজিব হচ্ছে রমজান মাস, যার ওজুর সম্পর্কে সে জ্ঞাত হয়েছে। যদি সে ওয়াজিব পালন না করে, তবে দায় থেকে মুক্ত হবে না।

পক্ষান্তরে, যদি আগামী বেলার রোজা হওয়ার ব্যাপারে সে জ্ঞাত না হয়, তবে তার জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়ত আবশ্যক নয়। না জানা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি নিয়তকে নির্দিষ্ট করার ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মত দেয়, প্রকারান্তরে সে দুটি বিপরীত বিষয়কে একীভূত করে নিয়েছে।(মাজমুউল ফাতাওয়া – ইবনে তাইমিয়া : খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ১০১) আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

মাসের সুচনা ও সমাপ্তি নির্ধারণের বিষয়টিকে যদি সকলে চাঁদ দেখা কিংবা ত্রিশ পূর্ণ করার সাথে সংশ্লিষ্ট করে নেয়- হাদীসের স্পষ্ট হেদায়েত আমাদের যে নির্দেশ প্রদান করেছে, তবে পঞ্জিকা অনুসারে সৌর বাৎসরিক হিসাব গণনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত নতুন ফেরকা ও তার ফেতরার ভয়াবহতার মুখোমুখি হতে হবে না। শরিয়ত, সন্দেহাতীতভাবে, তার ভীত হল : সাব্যস্ত ও প্রশ্নাতীত শরয়ি বর্ণনার অনুসরণ ও তা মান্য করা। শরয়ি নস বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট করেছে চাঁদ দেখার সাথে, পঞ্জিকার সাথে নয়। যখন চাঁদ দেখা যাবে, যদিও তা দৃষ্ট হয় নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ-কেন্দ্র হতে, তবে সে অনুসারে আমল করা আবশ্যক হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, বিষয়টি তখন রাসূলের ব্যাপক উক্তি – ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ কিংবা ভঙ্গ কর’-র আওতাভুক্ত হবে। যদি না দেখা যায়, তবে ত্রিশ পূর্ণ করা ওয়াজিব।

চাঁদ দেখার জন্য দুরবিন ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়; তবে, ব্যবহার আবশ্যকও নয়। কারণ, হাদীসের বাহ্য বর্ণনা দ্বারা আমরা অবগত হই যে, স্বাভাবিক দৃষ্টির উপর ভরসা করাই যথেষ্ট।(ইবনে উসাইমিন : মাজমূউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ৩৬-৩৭)) সম্মিলিতভাবে, চাঁদ দেখা উচিৎ। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

পক্ষান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি-

যেদিন তোমরা সকলে রোজা পালন করবে, সেদিন রোজা; যেদিন সকলে ঈদুল ফিতর পালন করবে, সেদিন ঈদুল ফিতর। আর যেদিন সকলে কোরবানি পালন করবে, সেদিন ঈদুল আযহা।(তিরমিজি : ৬৯৭, হাদীসটি সহি) হাদীসটির ব্যাখ্যা এই যে, রোজা রাখা, ভঙ্গ করা, ঈদ উদযাপনের ক্ষেত্রে সকলের অনুবর্তী হওয়া এবং অধিকাংশ মানুষের মতামত গ্রহণ করাই কাম্য। এ সকল বিষয় প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতানুসারে ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব দ্বারা নির্ধারিত হবে না। জামাত-চ্যুত হওয়াও এ ক্ষেত্রে বৈধ নয়। বিষয়গুলো বরং ইমাম ও সকল মানুষের মতের অনুবর্তী করা হবে। ব্যক্তি বিশেষ ভিন্ন মতের অধিকারী হলেও সকলের অনুবর্তী হওয়াই তার জন্য ওয়াজিব।(কোন ব্যক্তি একাকী রোজার বা ঈদের চাঁদ দেখল এবং মানুষ তার কথা গ্রহণ করল না তার ক্ষেত্রে কীভাবে সমাধান প্রদান করা হবে, এ ব্যাপারে আলেমগণ তিন মতে বিভক্ত হয়েছেন। একদলের মত এই যে, সে রোজা রাখবে এবং যেহেতু সে নিচে চাঁদ প্রত্যক্ষ করেছে তাই গোপনে রোজা ভঙ্গ করবে এবং আহার করবে। অপরদলের মত : রোজা পালন করবে এবং সকলের সাথে সম্মিলিতভাবে পরদিন ঈদ পালন করবে। তৃতীয় মত হল : সে রোজা রাখবে সম্মিলিতভাবে সকলের সাথে এবং ভাঙবেও তাদের অনুসারে। এটিও উপরোক্ত হাদীসের আলোকে, উত্তম ও গ্রহণযোগ্য মত। ইবনে তাইমিয়ার মাজমুউ ফাতাওয়া দৃষ্টব্য। খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ২১৪-২১৮)

দায়ীগণ যদি এ পদ্ধতি অনুসরণ করেন, নববী হেদায়েতের এ নীতিমালাকে নির্ধারণ করে নেন নিজেদের পালনীয় একমাত্রিক বিধান হিসেবে, তবে নানামুখী বিভক্ত দলগুলোর মাঝে সমতা বিধান করার কার্যকরী প্রচেষ্টা চালাতে সক্ষম হবেন, সফল হবেন পারস্পরিক দূরত্ব ও বিরোধ নিরসনে। এর জন্য যে কার্যকরী নীতিমালা অনুসরণ করা যেতে পারে, তাহল : গ্রহণযোগ্য কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, চাঁদ দেখার দায়িত্ব যার নেতৃত্বে পালিত হবে। তার নেতৃত্বে শরিয়ত সিদ্ধ পদ্ধতিতে যখন চাঁদ দেখা যাবে, সকলে রোজা রাখবে, কিংবা ঈদ পালন করবে। যদি শরিয়ত সিদ্ধ পদ্ধতিতে চাঁদ দেখা না যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে। (নানা মতের মাঝে অধিক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তব্য ও অনুসারে ও সিদ্ধান্ত) যে ভূমিতে অবস্থান করছে, সেখান থেকে যদি চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তবে অধিক নিকটবর্তী মুসলিম দেশের অনুসারে আমল করবে। সুতরাং, তাদের সময় অনুসারে রোজা পালন করবে। কারণ, এটিই তাদের জন্য সহজতর। আল্লাহ বান্দার উপর অসাধ্য কিছু চাপিয়ে দেন না।

মনে কর, মুসলমানদের সর্ববৃহৎ সামাজিক সংস্থা কিংবা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এমন সিদ্ধান্ত প্রদান করল, মাস সূচনা-সমাপ্তির ক্ষেত্রে যা খুবই দুর্বল- যেমন সৌরবাৎসরিক পঞ্জিকা মতে রোজা রাখা বা ভঙ্গ করার আদেশ জারি করল, তবে এ ক্ষেত্রে বাহ্যত: তাদের অনুসরণ করাই শ্রেয়। যারা নেতৃত্ব প্রদান করছে, তা মেনে নেয়াই কাম্য। কারণ, প্রকাশ্য আচরণীয় মতবিরোধ এড়িয়ে যাওয়া খুবই জরুরি। হাদীসে এসেছে অর্থাৎ, যেদিন সকলে রোজা পালন করবে, সেদিনই রোজা। এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে উক্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা যেতে পারে। তাছাড়া, শরিয়ত ও মানবিক যুক্তির ভিত্তিতে বলা যায়, ইসলামের এ জাতীয় অমৌলিক মাসআলার ব্যাপারে বিরোধ এড়িয়ে ঐক্যের ভিত দৃঢ় করার মাঝে কল্যাণ নিহিত।

মাসের সূচনা ও সমাপ্তির ব্যাপারে সংখ্যালঘু কিছু মুসলিম সমাজের মাঝে এ জাতীয় বিরোধ এমন একটি বিষয়, যা কোনভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। কারণ, বিষয়টি কিছুটা জটিল, অমীমাংসিত; কোথাও কোথাও অমুসলিম দেশে মুসলমানগণ মত প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে নানাভাবে দুর্বলতায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে সুষ্ঠু সুরাহা বাধা প্রাপ্ত হয় চূড়ান্তরূপে। সুতরাং, ঐক্য-মত্যের প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। যা তোমার কাছে মনে হচ্ছে গ্রহণযোগ্য ও পালনীয়, ফেতনা ও মুসলমানদের মাঝে অনৈক্য দূর করার জন্য কখনো যদি ত্যাগ করতে হয়, তুমি নির্দ্বিধায় তা কর।

তবে, মুসলিমদের কোন উপদল যদি এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে দুটি উপায়ে সমাধান প্রদান করা যেতে পারে :

প্রথমত: বিষয়টি ইজতিহাদ প্রসূত এবং নতুন বৈধ যে কোন সিদ্ধান্ত অনুসারে ব্যত্যয় আরোপের অনুকূল সকলকে এ ব্যাপারে অবগত করানো এবং জানানো যে, মাসআলাটি খুবই মতবিরোধপূর্ণ, নানাভাবে তাতে মতবিরোধ আরোপ করা যায়। মতবিরোধের সুযোগ রয়েছে এর সূত্র ধরে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা সৃষ্টি এবং সৌহার্দ্য ও স¯প্রীতি বিনষ্টের কোন মানে হয় না। শরিয়তের অনুসরণ ও অনুবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উম্মতের ঐক্য; সুতরাং সুন্নত আঁকড়ে ধরার নিমিত্তে পারস্পরিক বিভেদ তৈরির কি অর্থ থাকতে পারে?

দ্বিতীয়: সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যারা সংখ্যালঘু, নিজেদের মতামত তারা গোপন করবে, এড়িয়ে যাবে সকলকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যারা সংখ্যাগুরু, আক্ষরিক অর্থে যাদের হাতে নেতৃত্ব, অনর্থক নিজেদের সিদ্ধান্ত পেশ করে তাদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হবে না।

দুঃখজনক হল, আমরা প্রায়শ; লক্ষ্য করি, অধিকাংশ বিরোধ উদ্ভূত দলীয় মতবিরোধ, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাবের কারণে, যারা নির্দিষ্ট একটি এলাকার পক্ষ-বলয়ের হওয়ার ফলে সে এলাকার অনুবর্তী হয়, তৎপর হয় নিজেদের মতকে সকলের তুলনায় শ্রেয়নায় হিসেবে প্রমাণ ও বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এবং জড়িয়ে পড়ে ভ্রাতৃঘাতী বিরোধে। এভাবে, অনৈতিক উপায়ে তারা নিজেদের মতকে কোন প্রকার প্রামাণ্য ভিত্তির পরোয়া না করে পরিয়ে দেয় শরিয়তের টুপি, উঁচিয়ে ধরে সকলের মাথার উপর। আল্লাহর কাছে আমাদের সকাতর প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের দ্বীনের মর্ম উপলব্ধির তওফিক দান করেন, তওফিক দান করেন মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসরণের। মুসলমানদের ঐক্য-সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যরে জন্য নিরলস কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করেন।

আল্লাহর কাছে যা গচ্ছিত ও রক্ষিত আর পরকাল দিবসে অপেক্ষা করছে যে মহান নেয়ামত তার প্রত্যাশী হে মোমিন! ভেবে দেখ একবার নিজের অবস্থা, বিচেচনা কর তোমার করণীয়। রমজানের মহান সুযোগ, সন্দেহ নেই, উম্মতের জন্য গনিমত স্বরূপ, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে যা মানুষের এবাদতের সচেতন অনুভূতিকে জাগরূক রাখে; বল দান করে স্মৃতিকে, উদ্যমী করে তার একান্ত পৃথিবী। এবাদতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করতে সাহস জোগায়। অপরদিকে ইতিবাচক এ বিষয়গুলোর পাশাপাশি, নেতিবাচক নানা অপ-চিন্তা, কর্ম ও পাপ হতে মুক্ত রাখে চিন্তা-চেতনা ও ভাবনাকে। চিত্তবৃত্তি, প্রবৃত্তিপূজা, অনর্থক চাঞ্চল্যমুক্ত রাখে ইত্যাদি হতে। তাই রমজান মাসে আমরা দেখতে পাই, মুসলমানদের এবাদতগাহগুলো লোকে লোকারণ্য আত্মায়, মননে, কর্মে ও সফেদ চিত্তবৃত্তিতে যারা পরিপূর্ণ মোমিন, পরিশুদ্ধ জাকের, আত্মশুদ্ধির পরাকাষ্ঠা অতিক্রমকারী আল্লাহ প্রেমিক। সুতরাং, হে মুসলিম ভাই! রমজানকে পূর্ণ প্রস্তুতিসহ স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নাও, সুবর্ণ সময়গুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য নিজেকে গড়ে তুল। সময়গুলো কাজে লাগাবার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে- এ সময় আত্মিক, মানসিক ও দেহগত যাবতীয় পাপ হতে কায়মনোবাক্যে তওবা করা, পবিত্র করা নিজেকে গোনাহের তাবৎ অনুষঙ্গ হতে। এবাদত হুকুম-আহকাম বিষয়ে গভীর উপলব্ধি ও জ্ঞান লাভে সচেষ্ট হওয়া। নির্দিষ্ট কর্মপন্থা ও সূচি তৈরি করে সে অনুসারে সময় ও কর্ম বিন্যাস করে সর্বাত্মক ফায়দা হাসিলে উদ্যোগী হওয়া।

হে আল্লাহ, আমাদের কল্যাণ ব্রতী হওয়ার তওফিক দান করুন, আপনার আনুগত্যে উৎসাহী ও আপনার ক্রোধের উদ্রেককারী যাবতীয় বিষয় পরিহারে আমাদের সহায়তা করুন। আমিন॥