প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৭, রজব-শাবান ১৪৩৮ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ….’ সংখ্যায়

সূরা আলে ইমরানের ১৩নং রুকুর ১৩০তম আয়াতটি এই :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা সুদ খেয়ো না দ্বিগুণ, চতুর্গুণ এবং আল্লাহকে ভয় করো। আশা করা যায় যে, তোমরা সফল হবে।
এ আয়াত অবতরণের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট রয়েছে। জাহিলিয়াতের আমলের আরবে সুদ গ্রহণের সাধারণ নীতি ছিল এই যে, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সুদের উপর বাকি দেওয়া হতো। মেয়াদ এসে গেলে দেনাদার যদি দেনা শোধ করতে অক্ষম হতো, তবে সুদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার শর্তে তাকে আরও সময় দেওয়া হতো।

এমনিভাবে দ্বিতীয় মেয়াদেও যদি দেনা শোধ করতে অক্ষম হতো,তবে সুদের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হতো। সাধারণ তাফসীর গ্রন্থসমূহের এবং বিশেষভাবে ‘লুবাবুন্নকুল’ গ্রন্থে মুজাহিদের রেওয়াতেক্রমে বিবরণ উল্লেখিত আছে। জাহিলিয়াতের যুগের সে সর্বনাশা প্রথা বিলোপ করার জন্যই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এ কারণেই আয়াতে أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً (অর্থাৎ কয়েকগুণ অতিরিক্ত) বলে তাদের প্রচলিত পদ্ধতির নিন্দা এবং অপরের চরম সর্বনাশ সাধন করে স্বার্থ উদ্ধার করার ঘৃণ্য মানসিকতা সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে একে হারাম করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, কয়েকগুণ অতিরিক্ত না হলে সুদ হারাম হবে না। কেননা, সূরা বাকারা ও সূরা নিসায় যে কোনো ধরণের সুদের অবৈধতা পরিষ্কার বর্ণিত হয়েছে ; কয়েকগুণ বেশি হোক বা না হোক। এর দৃষ্টান্ত যেমন কুরআনের স্থানে স্থানে বলা হয়েছে :

” আমার আয়াতের বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করো না “। এতে ‘অল্প মূল্য’ বলার কারণ এই যে, খোদায়ী আয়াতের বিনিময়ে যদি সপ্তরাজ্যও গ্রহণ করা হয়, তবে অল্প মূল্যই হবে। এর অর্থ এই নয় যে, কুরআনের আয়াতের বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করা তো হারাম, বেশি মূল্য হারাম নয়। এমনিভাবে এ আয়াতে أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً শব্দটি তাদের লজ্জাকর পদ্ধতি সম্পর্কে চিন্তা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এটি অবৈধতার শর্ত নয়।

সুদের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে চিন্তা করলে একথাও বলা যায় যে, সুদের অভ্যাস গড়ে উঠলে সুদ শুধু সুদই থাকে না, বরং অপরিহার্যভাবে দ্বিগুণ-চতুর্থগুণ হয়ে ক্রমবর্ধিত অস্তিত্ব পেয়ে যায়। কারণ, সুদের যে টাকা সুদখোরের মালের অন্তর্ভুক্ত হয়, সে অতিরিক্ত টাকাটিও পুনর্বার সুদেই খাটানো হয়। ফলে সুদ কয়েকগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ম অব্যাহত থাকলে সুদের টাকা অর্থাৎ কয়েকগুণেরও কয়েকগুণ হয়ে যায়। এমনিভাবে প্রত্যেক সুদ পরিমাণে দ্বিগুণ-চতুর্থগুণই হয়। সুদ সম্পর্কে সূরা নিসার দুটি আয়াত এই :

فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا

وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ ۚ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

অর্থাৎ ইহুদীদের এসব বড় বড় অপরাধের কারণে আমি অনেক পবিত্র বস্তু, যা তাদের জন্য হালাল ছিল, তাদের উপর হারাম করে দিয়াছি এবং তা এ কারণে যে, তারা অনেক মানুষের পথ প্রাপ্তির পথে অন্তরায় হয়ে যেত এবং তা একারণে যে, তারা সুদ গ্রহণকরত। অথচ তাদের সুদ গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা মানুষের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করত। আমি তাদের মধ্যে যারা কাফির,তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরি করে রেখেছি। (সূরা নিসা, আয়াত : ১৬০-১৬১)

এই দু-আয়াত থেকে জানা গেল যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর শরীয়তেও সুদ হারাম ছিল। ইহুদীরা যখন এর বিরুদ্ধাচরণ করে, তখন দুনিয়াতেও তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয় অর্থাৎ তারা জাগতিক লালসার বশবর্র্তী হয়ে হারাম খেতে শুরু করলে আল্লাহ তাআলা কতক পবিত্র বস্তুও তাদের জন্য হারাম করে দেন। সূরা রুমের ৪র্থ রুকুর ৩৯তম আয়াতে আছে :

وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ ۖ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ

যে বস্তু তোমরা মানুষের ধনসম্পদে পৌছে বেড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দাও, তা আল্লাহর কাছে বাড়ে না এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় যাকাত দিলে যাকাত প্রদানকারী আল্লাহর কাছে তা বাড়িয়ে নেয়। (সূরা রুম, আয়াত : ৩৯)

কোনো কোনো তাফসীরকার ‘রিবা’ শব্দ এবং বেড়ে যাওয়ার অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে এ আয়াতকে সুদের অর্থে ধরে নিয়েছেন। তাঁরা এর ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে বলেন-সুদ গ্রহণে যদিও বাহ্যত ধনসম্পদের বৃদ্ধি দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা বৃদ্ধি নয়। উদাহরণত : কারও দেহ ফুলে গেলে বাহ্যত তা দেহের বৃদ্ধি বলে মনে হলেও কোনো বৃদ্ধিমানই একে পুষ্টি ও বৃদ্ধি মনে করে আনন্দিত হয় না ; বরং একে ধ্বংসের পূর্বাভাসই মনে করে। এর বিপরীতে যাকাত ও সদকা দেওয়ার মধ্যে যদিও বাহ্যত ধনসম্পদ হ্রাস পায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহ্রাস নয়; বরং ধনসম্পদের হাজারো প্রবৃদ্ধির কারণ। কেউ কেউ পেটের দূষিত বস্তু বের করার জন্য জোলাপ ব্যবহার করে কিংবা শিঙ্গা লাগিয়ে দূষিত রক্ত বের করে নেয়। তার ফলে বাহ্যত সে ব্যক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেহে ভারশক্তির অভাব অনুভূত হয়। কিন্তু অভিজ্ঞজনের দৃষ্টিতে এ অভাব তার বল ও শক্তির-ই অগ্রদূত।

কোনো কোন তাফসীরবিদ এ আয়াতকে সুদ নিষেধাজ্ঞার অর্থে ধরেননি। তাঁদের মতে আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যে ব্যক্তি স্বীয় ধনসম্পদ অপরকে আন্তরিকতা ও সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে নয়; বরং প্রতিদানে আরও বেশি পাওয়ার নিয়তে দেয়, তা বাহ্যত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলেও আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না। উদাহরণত : অনেক সমাজে বিবাহ উপলক্ষে নিমন্ত্রিতদের পক্ষ থেকে বর-কনেকে টাকা পয়সা ও আসবাবপত্র দেওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। এগুলো উপঢোকন হিসাবে নয়, বরং প্রতিদান গ্রহণের উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়। এ দান যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং নিজ স্বার্থে হয়ে থাকে, তাই আয়াতে বলা হয়েছে যে, এভাবে ধনসম্পদ বাহ্যত ক্রমবর্ধমান হতে থাকলেও আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না। হ্যাঁ, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য যেসব যাকাত ও সদকা দেওয়া হয়, তাতে বাহ্যত ধনসম্পদ হ্রাস পেলেও আল্লাহর কাছে তা দ্বিগুণ-চতুর্থগুণ হয়ে যায়। এ তাফসীর অনুযায়ী উল্লেখিত আয়াতের বিষয়বস্তু – আয়াতের বিষয়বস্তুর অনুরূপ হয়ে যায়। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে :

وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ
আপনি প্রতিদানে অধিক ধনসম্পদ অর্জন করার নিয়তে কারও প্রতি অনুগ্রহ করবেন না।
(সূরা মুদ্দাসির, আয়াত : ৬)

সূরা রুমের আলোচ্য আয়াতে বাহ্যত দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই অগ্রগণ্য মনে হয়। প্রথম কারণ এই যে, সূরা রূম মক্কায় অবতীর্ণ। অবশ্য, এতে যদিও প্রত্যেকটি আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হওয়া জরুরী নয়; কিন্তু অন্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত মক্কায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রবল ধারণা অবশ্যই জন্মে। আয়াতটি যদি মক্কায় অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তবে একে সুদ নিষেধাজ্ঞার অর্থে ধরে নেওয়া যায় না। কেননা, সুদের নিষেধাজ্ঞা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ এই যে, এ আয়াতের পূর্বে উল্লেখিত বিষয়বস্তু দ্বারাও দ্বিতীয় ব্যাখ্যার অগ্রগণ্যতা বোঝা যায়। পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছে :

فَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, এটা তাদের জন্য উত্তম। (সূরা রুম, আয়াত : ৩৮)

এ আয়াতে শর্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে ব্যয় করা হলেই আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য ব্যয় করা সওয়াবের কাজ হবে। অতএব, এর পরবর্তী আয়াতে এ শর্তের ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে , প্রতিদানে বেশি পাওয়ার নিয়তে যদি কাউকে ধনসম্পদ দেওয়া হয়,তবে তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেওয়া হলো না। কাজেই এর সওয়াব পাওয়া যাবে না।

মোটকথা, সুদের অবৈধতার প্রশ্নে এ আয়াতটি বাদ দিলেও পূর্বেল্লিখিত আরও অনেক আয়াত বর্তমান রয়েছে। তন্মধ্যে সূরা আলে-ইমরানের এক আয়াতে দ্বিগুণ-চতুর্গুণ সুদের অবৈধতা বর্ণিত হয়েছে এবং অবশিষ্ট সব আয়াতে সর্বাবস্থায় সুদের অবৈধতা ব্যক্ত হয়েছে। এ বিবরণ থেকে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সুদ দ্বিগুণ-চতুর্গুন হোক বা চক্রবৃদ্ধি হোক কিংবা একতরফা হোক সবই হারাম এবং হারামও এমন কঠোর যে, এর বিরুদ্ধাচরণ করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শোনানো হয়েছে।

সুদ ও রিবা’র আরও কিছু ব্যাখ্যা

আজকাল সুদ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে যখন এর অবৈধতা ও নিষেধাজ্ঞা দৃষ্টিগোচর হয় এবং এর স্বরূপ বোঝা ও বোঝানো হয়, তখন সাধারণ মন-মানস এর অবৈধতা মেনে নিতে ইতস্তত করে এবং নানা রকম বাহানা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত হয়।্ তাই আলোচনাটি বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে এর প্রত্যেকটি দিক সম্পর্কে পৃথকভাবে চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ। বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি লক্ষ করেই এখানে এ সম্পর্কিত একটা ধারাবাহিক আলোচনার
সূত্রপাত করা হচ্ছে –

প্রথম : কুরআন ও সুন্নাহতে রিবা’র স্বরূপ কী এবং এর প্রকার কী কী?

দ্বিতীয় : রিবার অবৈধতা ও নিষেধাজ্ঞার রহস্য ও উপযোগিতা কী?

তৃতীয় : সুদ বা ‘রিবা’ যতই মন্দ হোক না কেন, এটি বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি ও বাণিজ্যনীতির প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। যদি কুরআনী নির্দেশ অনুযায়ী

একে পরিত্যাগ করা হয়, তবে ব্যাংক ও বাণিজ্যনীতি কীভাবে চালু থাকবে।