প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭, জমা.আউ-জমা.সানি ১৪৩৮ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
মধ্যযুগীয় বর্বরতা
‘মধ্য যুগীয় বর্বরতা’ আমাদের সমাজে লেখায়, বক্তৃতায়, আলাপচারিতায় একটি সাধারণ শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইসলামের দুশমনরা যেমন ব্যবহার করেছে, ইসলামপন্থীরাও ব্যবহার করছেন। যারা ব্যবহার করেন, তারা কি জানেন, মধ্য যুগের শরু কখন থেকে আর শেষ কখন? তারা কি জানেন, এই যুগকে কেন বর্বর যুগ বলা হয়? ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিকে একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে পর পর দু’দিন তার বিবৃতির এক স্থানে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বাধ্য হয়ে এই বিজ্ঞ লোকের অজ্ঞতার বিরুদ্ধে একটি সাপ্তাহিকীতে আমি আলোচনা করি। আসুন, আমরা প্রথমে মধ্য যুগের চৌহদ্দি নিরূপর্ণ করি, অতঃপর আলোচনা করে দেখি, এ যুগকে বর্বর যুগ কেন বলা হলো, কারা বললো? সর্বশেষে আমরা দেখবো, এই শব্দ কি মুসলমানরা ব্যবহার করতে পারেন?
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রামাণ্য ইতিহাসের ও তথ্য গাইডে মধ্য যুগের পিরীয়ডকে ইতিহাসে উল্লেখ আছে, The period from the decline of the Roman Empire in the 5th century to the revival of letters in Europe at the end of the 15th century )অর্থাৎ রোমের পতন ও ইউরোপের মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের মধ্যবর্তী সময় মধ্য যুগ। এই সংজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন সর্বজন স্বীকৃত প্রামাণ্য কয়েকটি আন্তর্জাতিক অবিধান ও বিশ্বকোষ। শুধু ডঃ এন্নানডেল তার কনসাইজ ডিকশনারীতে (৪৩৩ পৃষ্ঠায়) মধ্য যুগের সময়কালের শুরুটা ৩শ’ বছর এগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু যুগের শেষ সীমানা অপরিবর্তিত রেখেছেন। তিনি বলেছেন, (The period extending from the decline of the Roman Empire till the revival of letters in Europe or from the eighth to the meddle of the fifteenth century of the christan era.) তার মতে, মধ্য যুগের শুরু অষ্টম শতাব্দী থেকে।
আমাদের বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের ৮৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্য যুগ ১১শ’ শতাব্দী থেকে ১৭শ’ শতাব্দী পর্যন্ত। কলিকাতার সংসদ বাঙ্গালা অভিধান একই মত পোষণ করে। একটার নকল অন্যটি। সুতরাং মত অভিন্ন হওয়ার কথা। তবে এ মতের সমর্থনের আর কেউ নেই। সুতরাং এ মত গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকাস্থ ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামসের তত্ত্বাবধানের সংকলিত ও সম্পাদিত জুলাই ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত বাংলা বিশ্ব কোষের তৃতীয় খণ্ডে ৬২৮ পৃষ্ঠায় মধ্য যুগ সম্পর্কে বলা হয়েছে, পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে একটি সময় বিভাগ। এই যুগকে অন্ধকার যুগ বলা হয়। এর সঠিক সময় নির্দেশ করা সম্ভব নয়। তবে মোটামুটিভাবে ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ অর্থাৎ পশ্চিম রোমকে সাম্রাজ্যের পতন কাল থেকে শুরু করে ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দ, কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কারের সময় পর্যন্ত মধ্য যুগ বলা যায়।
আমার মতে ডঃ এন্নানডেলের ব্যাখ্যাই সঠিক। পঞ্চম শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময় আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ। ইসলামের অভ্যুদয়ের, প্রসারের, বিজয়ের সময়কাল মধ্যযুগের অন্তর্ভুক্ত। মুসলমানদের প্রশাসনিক পতনও ইউরোপের শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু হয় আধুনিককাল। সুতরাং মধ্যযুগকে বলা যায় ইসলামের যুগ।
ইসলামের যুগ এই মধ্যযুগকে কেন বর্বর যুগ বলা হলো এবং কারা বললো, তা আমাদের দেখতে হবে। শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইউরোপে নতুন ধারা প্রবর্তন এবং মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের সাথে সাথে মধ্যযুগের অবসান ঘটে। ইসলামের বিজয় অভিযানে খ্রীষ্টান জগত কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে পড়ে। এদিকে স্পেনে মুসলমানদের জ্ঞান চর্চা ইউরোপকে তথা খ্রীষ্টান জগতকে নাড়া দেয়। খ্রীষ্টানরা পশ্চিম ইউরোপকে কেন্দ্র করে মধ্য যুগে উত্থানের চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। মধ্য যুুগের প্রথম দিকে এমনকি মধ্যম পর্যায়েও খ্রীষ্ট ধর্ম ও খ্রীষ্টনরা ইউরোপে ভীষণ প্রতিকূল অবস্থার মধ্যদিয়ে দিন কাটাচ্ছিলো। তারা প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজছিলো। কিন্তু মধ্য যুগের ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। তখন তারা ইসলামের এই যুগকে বর্বর যুগ বলতে শরু করে। মধ্য যুগ অর্থাৎ ইসলামের আধিপত্যের যুগ শেষ হওয়ার সাথে সাথে ইউরোপে বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপে পুনর্জাগরণ ঘঠে এবং তা খ্রীষ্টনদের নেতৃত্বেই ঘটে। তারা তখন নতুন করে ইতিহাস লিখতে শুরু করে। খ্রীষ্টনদের উত্থানের যুগে শাসন দণ্ড ও কলম দু’টিই তাদের হাতে ছিলো।
মুসলমানদের কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাসকে তারা বিকৃত করতে থাকে। সে ইতিহাসই পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে পাঠ্য পুস্তক হয়ে যায়। তাদের লেখা ইতিহাস পাঠ করেই আমরা শিখলাম মধ্যযুগ বর্বর যুগ। মধ্য যুগের সব কিছুকে তারা বর্বরতার সাথে তুলনা করতে থাকে। মুসলমানরা নিজেদের ইতিহাস পাঠ ছেড়ে দেয়। ইংরেজ লেখকদের ইতিহাস থেকে পাঠ নিতে শুরু করে। তারা তখন বলতে থাকে, মধ্যযুগ ছিলো অন্ধকার যুগ। তারা একবার ভেবেও দেখে নি যে, এই মধ্যযুগে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের জন্ম হয়। হেরার রোশনী দুনিয়ার অন্ধকার দূর করে।
জাহেলিয়াতকে ধ্বংস করে জাহেলিয়াতের ধ্বংসাবশেষের ওপর ইসলামের বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করে। মধ্যযুগের ৮শ’ বছর স্পেনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে ইউরোপের খ্রীষ্ঠান জ্ঞান-পিপাসার্তরা আসতো জ্ঞান বারি পান করতে। ইবনে সিনা, আল গাজ্জালী, আল ফারাবী, ইবনে খালদুন এর তো সবই মধ্যযুগের স্বর্ণ ফসল। এম আকবর আলী ‘বিজ্ঞানে মুসলমানের দান’ পুস্তকগুলোর পৃষ্ঠা উল্টালেই বুঝতে পারবেন, মধ্য যুগ অন্ধকার না আলোকময় ছিলো।
আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক শামস উদ্দিন মিয়া (ইতিহাসে গোল্ড মেডেলিস্ট) তার Islam and the modern world পুস্তকে লিখেছেন Mediaeval age was not the dark age. That age was the age of the most civilized and enlightened nation. Mediaeval age is the mother of modern age. Ethical values of mediaeval age were so high, refined as well as logical and scientific that modern age is far behind of mediaeval standard. অর্থাৎ, মধ্যযুগ অন্ধকার যুগ ছিল না। এই যুগ ছিলো সবচেয়ে সভ্য এবং আলোকিত জাতির যুগ। মধ্যযুগ হচ্ছে আধুনিক যুগের জননী। মধ্যযুগের নৈতিক মূল্যবোধ এতো উচ্চ, পরিশীলিত এবং যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ছিলো, যার অনেক পিছনে বর্তমান যুগ রয়েছে।
স্টেনলি লেন পুল, হিট্টি, মুয়ীর, টয়েনবির মতো ঐতিহাসিকরা মধ্য যুগ সম্পর্কে একই রায় দিয়েছেন।
মধ্যযুগে যারা বর্বর জীবন-যাপন করতো, তারা মুসলমান ছিলো না। ছিলো ভিন্ন জাতি, যারা আধুনিক যুগে সভ্য হয়েছে। স্পেনের কর্ডোভায় ও আন্দালুসিয়ায় এবং নিশাপুরে লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়েছে। বর্বর মানুষ সব যুগে থাকে এবং মধ্যযুগেও ছিলো। মধ্যযুগের বর্বররা বর্বর ছিলো বটে, কিন্তু আধুনিক যুগের বর্বরদের চেয়ে অনেক অনেক সভ্য ছিলো। সে যুগের র্ববররা মানুষ খুন করে লাশকে অক্ষত রাখতো। কিন্তু আধুনিক বর্বররা খুন করে লাশকে কেটে কুটি কুটি করে বাক্সতে ভরে রাস্তায় ফেলে দেয়।
যে সব মুসলমান ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ শব্দ ব্যবহার করেন, তারা তো প্রকারান্তরে নিজেদেরই বর্বর বলছেন, তাকি তারা খেয়াল করে দেখেছেন? মধ্যযুগে আমরা যে দ্বীন, শরীয়ত, কোরআন, হাদীস, ফেকাহ পেয়েছি, তাতে উল্লেখিত বিধান অনুযায়ী আমাদের নাম, আমাদের পরিচয়, আমাদের বিবাহ, আকীকা, খতনা, নামাজ, রোজা, অযু, গোসল, সামাজিক বন্ধন সবই, আমরাই মধ্যযুগের গর্ভজাত সন্তান। এখন যদি মধ্যযুগকে আমরা বর্বর যুগ বলি, মধ্যযুগের বোধ আর মূল্যবোধকে আমরা বর্বরতা বলি, তাহলে সে যুগের গর্ভ থেকে যাদের জন্ম, সেই মূল্যবোধে যারা মানুষ, তারাও বর্বর। যিনি ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ শব্দ ব্যবহার করেন, তারাও বর্বর। তাহলে আমাদের অস্তিত্ব থাকছে কোথায়?
আমার মা যদি অসুন্দরীও হন, তবুও তিনি আমার মা। আমি পারি না, আমার মার রূপের নিন্দা করতে। যে সন্তান তা করে সে বর্বর ও কুলাঙ্গার। অথচ নিজের মা তো পরমা সুন্দরী, এই গর্ভে আমার জন্ম। এ জন্য আমার গর্ব হওয়া উচিত। তারা ইতিহাসের আয়নায় যুগের চেহারাও দেখছে না, জানছে না, কোন গর্ভ থেকে তাদের জন্ম। ওরা বড়ই বদ নসীব।
মধ্যযুগ আমাদের গৌরবের যুগ। বর্বরতা সব যুগের বর্বররাই করেছে, এখনো করছে। আগামীতেও করবে। সময়, কাল যুগকে গালি দিতে নেই। আল্লাহই মানা করেছেন। ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ এ শব্দের মানেটা কি? ইসলামের যুগকে গাল দেয়া ছাড়া আর কোনো মানে নেই।
দুশমনদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তাদের বুলি মুখে বা কলমে নিয়ে আত্মঘাতি প্রয়োগে আর যেন আগ্রহ প্রকাশ না করি। কোন কথা, কোন শব্দ আমাদের জন্য ভালো আর কোনটা মন্দ, তা বুঝার তওফিক যেন আল্লাহ আমাদের দেন।
