প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

তিলোত্তমা

ভালোবাসার পত্র মিতালীতে, কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে এমনকি রাজনৈতিক বক্তৃতায়ও তিলোত্তমা শব্দ ব্যবহার অনেকেই করেন। মুসলমানরাও বাদ নেই। ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র একাধিকবার তিলোত্তমা শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। তিনি ঢাকা মহানগরীকে তিলোত্তমার মতো গড়ার ওয়াদা করেছিলেন বার বার। বলা বাহুল্য, যারা তিলোত্তমা শব্দটি ব্যবহার করেন, তারা পরমা সুন্দরী অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করেন। যারা এ শব্দের ব্যবহার করেন, তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না যে, অপ্সরারই আর এক রূপ ও গুণ বিশিষ্ট হলো স্বর্গের তিলোত্তমা। হিন্দু শাস্ত্র মতে, অপ্সরার মতো তিলোত্তমাও স্বর্গের এক বেশ্যা। সুন্দ ও উপসুন্দের বধের জন্য ব্রহ্ম্যার নির্দেশে (বিম্বকর্মাকর্তৃক) তিল তিল করে সৃষ্টির যাবতীয় সৌন্দর্য আহরণ করে নির্মিতা অপ্সরা হলো তিলোত্তমা।
সুন্দ আর উপসুন্দ হচ্ছে দুই অসুর বা দানব। সুন্দ এবং উপসুন্দের লড়াইর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হচ্ছে এই, দানব ভ্রাতৃদ্বয় সুন্দ ও উপসুন্দের অদম্য প্রতাপে দেবকুল বিষম বিপাকে পড়লে ব্রহ্মা তিলোত্তমা সৃষ্টি করে ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছে প্রেরণ করেন এবং তিলোত্তমাকে লাভার্থে তারা দুজনে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করে উভয়েই নিহত হন।
মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, বেহেশতে কোনো বেশ্যা নেই, অপ্সরা বা তিলোত্তমা নামেরও কেউ নেই। বেশ্যা যতো সুন্দরী হোক না কেন, তাকে কোন পবিত্র মনের মানুষ সুন্দরের মডেল বানাতে পারেন না। অতএব কোন মুসলমান কখনো তিলোত্তমা শব্দটি লেখায় ও বক্তৃতায় সুন্দরের উপমায় আনতে পারেন না। কোন মহানগরীকে তিলোত্তমার মতো গড়া মানে সুন্দরী বেশ্যার মতো গড়ার আকাংখা ব্যক্ত করা। মুসলমানদের অবশ্যই এ শব্দ থেকে দূরে থাকা ঈমানের দাবি। কোন বেশ্যার রূপ-সৌন্দর্য অপূর্ব থাকলেও সে অপবিত্র, নাপাক, কলঙ্কে কলঙ্কিত। চরিত্রে সে পবিত্র নয়।

তুলসী পাতা/ধোয়া তুলসী পাতা

তুলসী পাতার রস কফ-কাশিতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। ইউনানী ও কবিরাজী শাস্ত্র মতে তুলসী পাতার ওষধী গুণ বহুমুখী। তুলসী গাছকে হিন্দুরা পবিত্র জ্ঞান করেন। অনেক হিন্দু পরিবারের ঘরের কোণায় বা উঠানের মধ্যস্থলে তুলসী গাছ দেখা যায়। হিন্দুরা যে মাটির ওপর তুলসী গাছ রোপণ করে নিত্য পূজা করেন, এই মাটির ঢিপিকে তুলসী বেদী বলা হয়। হিন্দুদের মতে, তুলসী গাছ অতি পবিত্র, বিভিন্ন পূজার জন্য এর ব্যবহার অপরিহার্য। তুলসী গাছের পাতাও পূজার উপকরণ হিসেবে অত্যাবশ্যকীয়। নারায়ণের প্রসন্নতা লাভের জন্য তার চরণে ধোয়া তুলসী পাতা দেয়া হয়। একে তো তুলসী পাতা পবিত্র, উপরোক্ত ধোয়া তুলসী পাতা আরো পবিত্র। হিন্দু লেখকদের মাধ্যমে ধোয়া তুলসী পাতাক সাহিত্যে ও মুখের ভাষায়ও এসেছে। অনেক মুসলিম লেখক কোন ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই ধোয়া তুলসী পাতার ইতিহাস না জেনেই ব্যবহার করেন। মুসলমানরা এ শব্দ ব্যবহারে বিরত থাকা উচিত। ধোয়া তুলসী পাতা অমলিন কলঙ্কবিহীন চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু আশ্চর্য, এই নধোয়া তুলসী পাতা বাক্যাংশটি লেখায় বা আলাপচারিতায় পজিটিভ অর্থে খুবই কম ব্যবহার হয়। যখনই ব্যবহারে আসে তখনই একটি প্রশ্নবোধক বা বিস্ময়সূচক চিহ্ন যোগ হয়। যেমন আরে ভাই রাখেন তো তার কথা, তিনি কি ধোয়া তুলসী পাতা? অথবা প্রার্থী-সমর্থকদের প্রচারের ভাষা শোনে মনে হয় যে, তাদের প্রার্থীর চরিত্র যেন ধোয়া তুলসী পাতা তুল্য। তবে পজিটিভ বা নেগেটিভ বা সন্দেহ-সংশয়সূচক যে অর্থেই তা ব্যবহার করা হোক না কেন, তুলসী পাতা যে পবিত্র এবং তা ধোয়া হলে আরো পবিত্র থাকে, এর স্বীকৃতি কিন্তু প্রতি বাক্যে থাকছে। মুসলমানরা কখনো তুলসী পাতাকে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না। তুলসী পাতা-সংস্কৃতি মুসলমানের জন্য নয়, এটাই শেষ কথা। উপমায় এর ব্যবহার শিরক তুল্য অপরাধ।

দৈববাণী

দৈব শব্দকে সাধারণত অদৃষ্ট বা ভাগ্য অর্থে ব্যবহার করা হলেও শব্দটি দেব সম্পর্কিত। দৈব দুর্ঘটনা মানে যে ঘটনার পিছনে থাকে দেবতার হাত। দেবতা যখন ঘটনার নায়ক হন, তখন তা দৈব ঘটনাই হয়ে থাকে। দুর্বিপাক-এর অর্থও অনুরূপ। যে দুর্ঘটনার জন্য মানুষ দায়ী নয়, দেবতা সৃষ্ট দুর্ঘটনা, তাই দুর্বিপাক। দৈববাণী আসে অদৃশ্য থেকে, অদৃশ্য থেকে দেবতা যে বাণী শুনিয়ে থাকেন বা শোনা যায়, তাই দৈববাণী। দৈবাদেশ হচ্ছে দেবতার আদেশ। দিব্যি, বিদ্য, দৈবাৎ, দৈবক্রমে, দুর্দৈব সবই দেবতা সম্বন্ধীয়, দেবতা থেকে সৃষ্ট। মুসলিম সমাজে এসব শব্দ বেশ প্রচলিত। পবিত্র কোরআন শরীফের এক তফসীরে দেখেছি এই বাক্যটি হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেরা গিরী গুহায় দৈববাণী শুনলেন, পড় তোমার স্রষ্টার নামে…। কুফরী ও শিরকী এই শব্দ মুসলিম সমাজে প্রায়ই লেখায় বা কথাবার্তায় ব্যবহার হচ্ছে। যারা দেবতা সম্পর্কীয় শব্দ ব্যবহার করেন, তারা শব্দগুলোর বুৎপত্তিগত অর্থের কোন খবরই রাখেন না। মুসলমানদের কোন দেবতা নেই, আছেন লা-শরীক এক আল্লাহ। তার অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও ঝরে না, মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোনো শস্য কণাও অংকুরিত হয় না। এ হচ্ছে কোরআনের শিক্ষা। যদি তাতে আমাদের ঈমান থাকে, তাহলে দেবতাকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করতে পারি? রাব্বুল আলামীনের কুদরতী শক্তির নিয়ন্ত্রণের বাহিরে আসমান-জামিনে ও পাতালে কিছুই নেই। তাই আর কখনো দৈববাণী নয়, নয় ঐশীবাণী। আল্লাহ সর্বশক্তিমান।