প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। হযরত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তিকালের পূর্বেই একে পরিপূর্ণতা দান করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَ اَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِىْ وَ رَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ্ঙ্গা করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব কেউ এতে নতুন কিছু সংযোজন করবে এটা ধারণাতীত ব্যাপার। কেননা নতুন সংযোজন আল্লাহ তা’য়ালার মধ্যে দুর্বলতার প্রমাণ বহন করে যা সংযোজনকারী পূরণ করেছে। উপরন্তু তা দ্বারা বুঝা যায়, শরিয়ত অপূর্ণ রয়ে গেছে। যা আয়াতের মর্মের পরিপন্থী।
২. ইমাম মালিক (রহ) বলেন:
مَنِ ابْتَدَعَ فِى الْاِسْلَامِ بِدْعَةً يَّرَاهَا حَسَنَةً فَقَدْ زَعَمَ اَنَّ مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ خَانَ الرِّسٰلَةِ
যে লোক ইসলামে কোন বিদ’আত উদ্ভাবন করবে এবং তাকে ভাল ও উত্তম মনে করবে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালাত ও নবুওতের দায়িত্ব পালন করেননি, খেয়ানত করেছেন। কেননা তিনি যদি তা করেই থাকেন, তাহলে ইসলাম ও সুন্নত ছাড়া আর তো কিছুর প্রয়োজন হয় না। সব ভালই তো তাতে রয়েছে। (আল ইতেসাম : ৭/২৭)
৩. আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
وَ اَنَّ هٰذَا صِرَاطِىْ مُسْتَقِيْمًا فَا تَّبِعُوْهُ وَ لَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيْلِهٖ
নিঃসন্দেহে এটি আমার সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তাহলে সে সব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এ আয়াতে সামগ্রিকভাবে সকল বিদ’আতীর নিন্দা করা হয়েছে। কুরআনে এ ধরনের আরো আয়াত রয়েছে।
৪. হযরত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামগ্রিকভাবে বিদ’আতের নিন্দায় অসংখ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে ইরবাদ ইবনু সারিয়া (রা:) বর্ণিত হাদীসটি অন্যতম। তিনি বলেন : একদিন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে ভাবগর্ভ উপদেশ দিলেন। এতে আমাদের চোখ অশ্রু সজল ও অন্তকরণ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তখন এক ব্যক্তি বললেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন বিদায়কালীন উপদেশ! আপনি আমাদের কি নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমাদের প্রতি আমার অসিয়ত হলো: তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে এবং শাসকদের কথা শুনবে ও মেনে চলবে যদিও তিনি হাবশী গোলাম হন। তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা অচিরেই অসংখ্য মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নত ও সঠিক পথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত অনুসরণ করা এবং তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। আর তোমরা নতুন উদ্ভাবিত বিষয়াবলী থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা নতুন উদ্ভাবিত প্রতিটি বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই গুমরাহি।
বিদ’আতের ভয়াবহতা
(১) মহান আল্লাহতা’য়ালা বলেন,
فَاِنْ تَنَازَعْتُمْ فِىْ شَيْءٍ فَرُدُّوْهُ اِلَى اللهِ وَ الرَّسُوْلِ .
যদি তোমরা কোন ব্যাপারে পরস্পর মতবিরোধ কর তবে সে ব্যাপারটা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। (সূরা নিসা : ৫৯)
হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এমন কোন নতুন বিষয় উদ্ভাবন করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। (বুখারী ও মুসলিম)
(২) যারা নিজেকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করতে পারেনি। যারা নিজেদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুগত করতে পারেনি তারাই বিদ’আত করে থাকে। বস্তুত বিদ’আতের উৎস হচ্ছে নফসের খায়েশ, স্বেচ্ছাচারিতা, লালসা ও অবাধ্যতা। যারা আল্লাহর ফায়সালা ও রাসূলের পথ প্রদর্শনকে নফসের খায়েশ পূরনের পথে বাধা স্বরূপ মনে করে, তারাই দ্বীনের মধ্যে নিজেদের ইচ্ছামত হ্রাস-বৃদ্ধি করে। এই হ্রাস বৃদ্ধির পর যা হয় তাকেই তারা দ্বীনের মর্যাদা দিয়ে বসে। আর যেহেতু এ কাজকেও দ্বীনি কাজই মনে করা হয়, সে জন্য এ কাজ যে ভুল ও মারাত্মক তা তাদের চোখে ধরা পড়ে না। এ কারণেই বিদ’আতিরা কখনও বিদ’আত থেকে তওবা করার সুযোগ পায় না। এ বিদ’আত এমনই এক মারাত্মক জিনিস, যা শরীয়াতের ফরজ ওয়াজিবকে পর্যন্ত বিকৃত করে দেয়। শরীয়াতের ফরজ ওয়াজিবের প্রতি অন্তরে থাকে না কোন মান্যতা গণ্যতার ভাবধারা। শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করার অভ্যাস হতে হতে লোকদের স্বাভাবিক প্রকৃতিই বিগড়ে যায় আর মন মগজ এতোই বাঁকা হয়ে যায় যে, অত:পর শরীয়তের সমস্ত সীমা সহৃদয় চূর্ণ করে ফেলতেও কোন দ্বীধা, কোন কুণ্ঠা জাগে না তাদের মনে। শরিয়ত বিরোধী কাজগুলোকে তখন মনে হতে থাকে খুবই উত্তম।
(৩) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: নিশ্চয়ই আমি হাউসে কাউসারে তোমাদের অগ্রগামী হব। তোমাদের মধ্যে যে সেখানে পৌঁছাবে সেই পানি পান করবে। আর যে ব্যক্তি পান করবে সে কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। ঐ দিন আমার নিকট অনেক দলই উপস্থিত হবে, আমি তাদেরকে চিনবো, তারাও আমাকে চিনতে পারবে। অত:পর আমার ও তাদের মাঝে পর্দা পড়ে যাবে। তখন আমি বলবো, নিশ্চয়ই এসব লোক আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, নিশ্চয়ই আপনি অবগত নন যে, আপনার পর তারা কী কী বিদ’আত কাজ করেছে। আমি বলব, দূর হও, দূর হও, যারা আমার পর সুন্নাতে পরিবর্তন এনেছে। (বুখারী ও মুসলিম)
(৪) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আল্লাহতা’য়ালা বিদ’আতী ব্যক্তির নামাজ, রোযা, সদকা, খয়রাত, হজ্জ্ব, উমরা, জিহাদ এবং ফরজ ও নফল ইবাদত কিছুই কবুল করেন না। সে ইসলাম থেকে তেমনিভাবে বেরিয়ে যায় যেমন বেরিয়ে আসে আটার খামির হতে চুল।
(৫) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: বিদ’আতী যে পর্যন্ত তার বিদ’আত পরিত্যাগ না করবে, সে পর্যন্ত তার আমল কবুল করতে আল্লাহপাক অস্বীকার করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বিদ’আতীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল, সে ইসলাম ধ্বংস করার কাজে সহযোগিতা করল। (বায়হাকী)
(৬) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: অমুক সম্পর্কে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, সে কোন বিদ’আত সৃষ্টি করেছে। যদি সত্যিই সে কোন বিদ’আত সৃষ্টি করে থাকে তবে তাকে আমার সালাম পৌঁছাবে না। (আল-ই’তিসাম, আল্লামা শাতিবী (রহ.)
(৭) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: তোমরা বিদআত থেকে সতর্ক থাকবে, কারণ প্রতিটি বিদ’আতই গুমরাহি। আর প্রত্যেক গুমরাহির পরিণাম হল জাহান্নাম। (আবু দাউদ ও আহম্দ)
(৮) হযরত আবু উমামা (রা:) এর সূত্রে নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে : বিদআতীরা হচ্ছে জাহান্নামিদের কুকুর। (কানযূল উম্মাল, দারাকূতনীর বরাতে)
(৯) তাবরানী শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত আনাস (রা:) বলেন, নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আল্লাহ পাক বিদ’আতীদের জন্য তওবার দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন, অর্থাৎ সওয়াব মনে করে তারা বিদ’আতী কাজ করে বলে তাওবা করার প্রয়োজনীয়তাই বোধ করে না।
(১০) আল্লামা শাতিবী (রহ:) আল-ইতিসাম কিতাবে বিদআতের ভয়াবহতা সম্পর্কে যা লিখেছেন তা এতই মারাত্মক যে, বিদ’আতের সাথে নামাজ, রোযা, সাদকা প্রভৃতি কোন ইবাদাতই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। যারা বিদ’আতীর সঙ্গে উঠা বসা করে আল্লাহ তাদের হতে তাঁর হেফাজত উঠিয়ে নেন। এবং তাদেরকে একা ছেড়ে দেন। বিদ’আতীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআত হতে বঞ্চিত। তাদের উপর আল্লাহর গজব পতিত হতে থাকে। বিদ’আতীরা হাউযে কাউসার হতে দূরে থাকবে। মৃতুকালে তাদের বেঈমান হয়ে মরার ভয় রয়েছে। আখিরাতে বিদ’আতীর মুখ কাল হবে; আর তাদের শাস্তি হল জাহান্নামের আগুন। (আল-ইতিসাম)
(১১) হযরত আবু আমর শায়বাণী (রহ:) বলেছেন: বিদআতী ব্যক্তির জীবনে তওবা নসিব হয় না। কারণ সে তো একে গুণাহই মনে করে না। তার জন্য আবার তওবা কিসের।
(১২) হযরত সুফিয়ান ছওরী (রহ:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে বিদ’আতের গুণাহই ইবলিসের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। কেননা অন্যান্য গুনাহ থেকে তাওবা করা হয়, কিন্তু বিদ’আত থেকে তাওবা করা হয় না। (কোননা তাকে ইবাদাত মনে করা হয়।)
