প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

কীর্তন

গুণ বর্ণনা ও যশঃ প্রচার অর্থে কীর্তন শব্দ ব্যবহার করে থাকেন অনেক মুসলিম লেখক। কিন্তু তারা জানেন কিনা যে, কীর্তন শব্দটির উদ্ভবের প্রেক্ষাপট ধর্মীয়। রাধাকৃষ্ণে লীলা বিষয়ক গানই হলো কীর্তন। রাধা কৃষ্ণের লীলা বিষয়ক কীর্তন যারা করে, তাদের বলে কীর্তক। কীতন গানের সুর হচ্ছে কীর্তনাঙ্গ। মুসলমানদের মধ্যে যারা আলাপ-আলোচনায়, লেখায় কীর্তন শব্দ ব্যবহার করেন, তারা ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে কতটুকু যোগ্য ব্যবহার করেন, তা ভেবে দেখার অনুরোধ রাখছি। প্রশংসা, সুখ্যাতি, তারিফ ইত্যাদি শব্দ যখন কীর্তন-এর বিকল্প শব্দ আমাদের ভান্ডারে আছে, তখন রাধা কৃষ্ণে লীলা বিষয়ক কীর্তন কে নিয়ে মুসলমানরা কেন টানাটানি করেন? অন্য ধর্মের সাংস্কৃতিক শব্দ ব্যবহার আইনত দিক দিয়ে যেমন অনাধিকার হস্তক্ষেপ, অপরদিকে তা হয়ে যাচ্ছে অপসংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং আমল ও অনুশীলন। কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন এ কথা আমরা কৌতুকে, উপহাসে, ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপে বলে থাকি এবং লিখেও থাকি। এমন ব্যবহারে হয়তো গভীরতা ততো নেই, তাই এড়িয়ে চলা যায়, কিন্তু ভারী কথায় যেন এ শব্দের ব্যবহার কখনো করা না হয়, সে দিকে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত অবশ্যই।

জয়ন্তী

জয়ন্তী অর্থ পতাকা, ইন্দ্রকন্যা, দুর্গা; শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথি বা জন্ম রাত্রি। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয় ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষীয় অমীর রাতে। হিন্দুরাই শ্রী কৃষ্ণের জন্ম স্মরণে জন্মমীতে জন্মামী পূজা করেন এই তারিখে। এরই জের ধরে চালু হয় জন্ম জয়ন্তী অনুষ্ঠান। হিন্দু সম্প্রদায় জন্মামীর অনুসরণে তাদের বিশি ব্যক্তিদের জন্ম দিন স্মরণে উৎসব অনুষ্ঠান করেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জয়ন্তী অনুষ্ঠানের উৎস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথি থেকে। এই ধারাবাহিকতার ঐতিহ্য রক্ষা করে আমরাও রবীন্দ্র জয়ন্তী ও নজরুল জয়ন্তী উৎসব অনুস্থান করে থাকি। ইন্দ্রকন্যা, দুর্গা ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মের স্মৃতিবাহী জন্ম জয়ন্তী উৎসব অনুষ্ঠান তো হিন্দু শাস্ত্র দ্বারাই প্রমাণিত। আধুনিক অভিধানে জয়ন্তী সংস্কৃতিকে বাংলা ভাষাভাষী অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য জন্মদিনের উৎসব (Birthday celebration) বা জুবিলী অর্থও করা হয়েছে। দুর্গা ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মের স্মরণে জয়ন্তী অনুান মুসলমানরা ঈমান-আক্বিদাগত কারণে পালন করতে পারেন না। মনে রাখা দরকার, জন্মদিন আর জয়ন্তীকে জোর করে একই অর্থবোধক শব্দ হিসেবে হাজির করলেও এ দুইয়ের সাংস্কৃতিক ব্যবধানে আসমান-জমিন ফারাক। এ কারণে মুসলমানদের কখনো জয়ন্তী শব্দও ব্যবহার করা উচিত নয়।

জয়ন্তীর আর এক নাম দেয়া হয়েছে জুবিলী। শব্দ সংস্কৃতি নিয়ে কি যে এক চক্রান্ত চলছে, তা লক্ষ্য করলে বোঝা যায়। ষড়যন্ত্রকারীরা জয়ন্তীর আগে রৌপ্য, স্বর্ণ, হীরকযুক্ত করে নতুন শব্দ ্সৃষ্টি করেছেন। যেমন রৌপ্য জয়ন্তী বা রজতজয়ন্তী, সুবর্ণ বা স্বর্ণজয়ন্তী এবং হীরক জয়ন্তী। ইংরেজিতে নামগুলো যথাক্রমে Silver jubilee, Golden jubilee এবং Diamond jubilee। জয়ন্তী আর জুবিলী অর্থ জন্মানুান করা হলেও প্রকৃতপক্ষে জুবলী অর্থ ভিন্ন। জন্মদিনের সাথে কোন মিল নেই। যদিও দূরতম অর্থে মিল ঘটানো হয়েছে।

jubilee শব্দের উদ্ভব ঘটেছে যেভাবে, আগে সে দিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত। ফরাসী ভাষায় jubilee, ল্যাটিন ভাষায় jubiaeus এবং হিবরু ভাষায় yobel এই তিনের অর্থ যা, ইংরেজি jubilee অর্থও তাই। প্রামাণ্য ইংরেজি অভিধানে জুবেলী অর্থ করা হয়েছে Tha blast of a trumpet । Blast অর্থ প্রবল বাত্যা, ঝঞ্ঝা, বিস্ফোরণ আর trumpet অর্থ ভেঁপু, ভেরিধ্বনি ইত্যাদি। আভিধানিক অর্থকে সামনে রেখে জুবিলী অর্থ হয় মহোৎসব, মহাআনন্দ উৎসব ইত্যাদি। রজত, সুবর্ণ ও হীরক জয়ন্তীর ইতিহাস যতটুতু জানা যায়, তা হচ্ছে এই:-

সিলভার জুবিলী : রোমান ক্যাথলিক গীর্জাগুলোর প্রতি পঁচিশ বছর পর জাঁকজমকের সাথে ধর্মীয় অনুান উৎসব পালন করে থাকে। এ উৎসবের নাম তারা করেছে সিলভার জুবিলী (Roman catholic church celebration of a twenty fifth anniversary)

গোল্ডেন জুবিলী : পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়ার উপলক্ষে ইহুদিগণ কর্তৃক পালনীয় উৎসব বিশেষ। এ সময়ে তারা ক্রীতদাসদের এবং ঋণদাতাদের মুক্ত করে পূণ্য লাভ করে। দীন-দুঃখীদেরও দান করে। (The jewish celebration of arnfitieth anniversary)। ইহুদীরা এই অনুষ্ঠানকে মনে করে পাপ মুক্তির অনুষ্ঠান, অন্যদিকে তারা আনন্দ অনুষ্ঠান ও মনে করে।

ডায়মন্ড জুবিলী : ষাট বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে আনন্দানুষ্ঠান। প্রথমে এক শ্রেণির খৃষ্টান (সম্ভবত প্রোটোন্ট) যাদের বয়স ষাট বছর পূর্ণ হতো, তারা হীরক জয়ন্তী পালন করতো। পরবর্তী সময়ে প্রতিানের বয়স ষাট বছর হলে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠান পালন করতে থাকে। এ প্রথা এখনও প্রচলিত। লক্ষ্যণীয়, এই তিনটি জুবলী অনুষ্ঠানের সাথে মুসলমানদের কোনো সম্পর্ক নেই। একটি রোমান ক্যাথলিকদের অনুষ্ঠান, অপরটি ইহুদীদের অনুষ্ঠান, তৃতীয়টিও খৃষ্টান অনুষ্ঠান। তিনটিরই উদ্ভব ঘটেছে ধর্মীয় উৎস থেকে। মুসলমানদের মধ্যে যারা রজতজয়ন্তী, সুবর্ণ জয়ন্তী আর হীরক জয়ন্তী পালন করি, তাহলে তাদের উদ্দেশ্যে শুধু বলবো, জনাবরা, আপনারা কি জানেন যে, জয়ন্তীও আপনাদের নয়, জুবিলীও আপনাদের নয়। জয়ন্তীর সাথে দুর্গা ও শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্ক আর জুবিলীর সাথে খৃষ্টান ইহুদিদের সম্পর্ক। আপনারা অপরের একান্ত ধর্মীয় শব্দ ও অনুান নিয়ে কেন টানাটানি করেন? আপনারা জয়ন্তী জুবিলীতে না গিয়ে ২৫/৫০/৬০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান কি করতে পারেন না? নিজের ঐতিহ্য সংস্কৃতিভিত্তিক বহু শব্দ আছে, তা তালাশ করে কাজে লাগান।