প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

৫৩.দশটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নির্দেশ

এক হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার প্রতিপালক আমাকে নিম্নলিখিত বিষয় সংরক্ষণ ও প্রতিপালনে নির্দেশ দিয়েছেন।

যথা
১। আল্লাহ ভয়-বাহিরে ও ভিতরে অর্থাৎ অন্তরে ও বাহিরে অথবা নীরবে ও সরবে করবে।
২। ইনসাফের কথা খুশিতে ও গোস্বায় মানুষ কারো প্রতি সন্তু হলে তার সকল দোষত্র“টি গোপন রেখে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হও। পক্ষান্তরে যখন তার প্রতি গোস্বা হয় তখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দোষত্র“টি অšে¦ষণ কর। অতএব আমার প্রতি নির্দেশ সর্বাবস্থায় ভারসাম্য ও ইনসাফপূর্ণ কথা ও কাজ কর।
৩। মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর; অভাব-অনটন ও প্রশস্ত-স্বচ্ছল অবস্থায়; (দুঃখের সময় কার্পণ্য করো না এবং সুখের সময় অপচয় করো না। আবার দারিদ্রাবস্থায় অস্থির এবং ধনাঢ্যতায় গর্ব-অহংকার করো না।)।
৪। আল্লাহ আমার প্রতি এ নির্দেশও দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি আমার সাথে অসদাচরণ ও সম্পর্ক ছিন্ন করলে আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখি।
৫। কোন ব্যক্তি স্বীয় দান ও বদান্যতা থেকে আমাকে বঞ্চিত করলেও আমি তার সাথে সদাচরণ ও সদ্ব্যবহার করি।
৬। কোন ব্যক্তি আমার প্রতি অত্যাচার করলে আমি তাকে ক্ষমা করব অর্থাৎ প্রতিশোধ গ্রহণের নেশায় যেন মত্ত না হই।
৭। আমি যেন নিরব সময়ে পরকাল ও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করি।
৮। কথাবার্তায় আমি যেন আল্লাহকে স্মরণ করি অর্থাৎ তাসবীহ পাঠ বা তার বিধি-বিধান ও আদেশ-নিষেধের কথা বর্ণনা করতে থাকি।
৯। আমার দৃভিঙ্গী শিক্ষণীয় হবে অর্থাৎ আমি কোন জিনিস দেখলে যেন উপদেশের দৃেিত দেখি।
১০। আমি যেন সর্বদা সৎকাজের প্রতি আদেশ দিতে থাকি।

৫৪.হিংসুকের প্রতি দান করা উত্তম সদকা

হযরত হাকীম ইবন হাযম (রহ.) বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞাসা করল আল্লাহর নিকট উত্তম সদকা কোনটি? তিনি উত্তর দেন, স্বজনদের সাথে সদাচরণ করা। কাশিহ ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে অন্তরের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করে।

৫৫.জান্নাতে কে উঁচু মর্যাদা ও শীর্ষস্থানের অধিকারী হবে

এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নিজের জন্য উঁচুস্থান ও উঁচুমর্যাদা পাওয়ার আশা রাখে তার উচিত সে যেন কোন ব্যক্তি তার প্রতি অত্যাচার করলে তা উপেক্ষা করে। কেউ যদি তাকে তার দান ও বদান্যতা থেকে বঞ্চিত করে তবুও সে যেন তার সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে যেন তা রক্ষা করে। এক হাদীসে আছে, যখন এ আয়াত(১৯৯) আপনি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন করুন, সৎকাজের প্রতি নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন। (আরাফ : আয়াত – ১৯৯)
নাযিল হয় তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবরাঈল (আ.)-কে এর তাফসীর জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে তিনি বলেন, আমি মহাজ্ঞানী (আল্লাহ)র নিকট জিজ্ঞাসা করার পরে বলব। এ কথার পর জীবরাঈল (আ.) চলে যায়। কিছুক্ষণ পর এসে বলেন, আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আপনার প্রতি অত্যাচার করে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন। আর যে আপনাকে তার দান ও বদান্যতা থেকে বঞ্চিত করে তাকে আপনি দান করেন। আর যে সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনি তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেন।

৫৬.পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্যে উত্তম চরিত্র

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করে বলেন, মানুষ প্রকৃত ঈমান পর্যন্ত ততক্ষণ পৌঁছতে পারে না যতক্ষণ রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে মিলিত ও জড়িত না হয়, অত্যাচারকারীকে ক্ষমা না করে, গালীদাতাকে মাফ না করে এবং খারাপ আচরণকারীর সাথে ভাল আচরণ না করে।

৫৭.মাতাপিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারীর শাস্তি মৃত্যুর পূর্বেই (দুনিয়াতে) হবে

অপর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন তবে বান্দার বিভিন্ন ধরনের পাপ মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু মাতা-পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি ইনতিকালের পূর্বেই দিবেন। অপর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, আল্লাহ বিভিন্ন প্রকার অপরাধ ও পাপের শাস্তি পরকালে বিলম্বে দিবেন। কিন্তু মাতা-পিতার সাথে নাফরমানীর (অবাধ্যাচরণের) শাস্তি দুনিয়াতে অতি দ্রুত দিবেন।

৫৮.আরশে মুআল্লা জড়িয়ে ধরে রেহেমের নিবেদন

বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন রেহেমকে বাকশক্তি দিবেন। তখন সে আরশে মুআল্লা জড়িয়ে ধরে নিবেদন করবে, হে আল্লাহ! যে আমার সাথে মিলিত রয়েছে তুমি তাকে মিলিয়ে রাখ। আর যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তুমি তাকে ছিন্ন কর।

৫৯.রেহেম রাহমান থেকে সাধিত

একাধিক হাদীসে বর্ণিত আছে, রেহেম শব্দটি আল্লাহর নাম রহমান থেকে সাধিত (নির্গত) যে ব্যক্তি এর সাথে মিলিত থাকবে রহমান তাকে মিলিয়ে (জড়িয়ে) রাখবেন। পক্ষান্তরে যে একে সম্পর্কহীন ও পৃথক করে রাখবে রহমান তাকে ছিন্ন করে রাখবেন।

৬০.রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল কবুল হয় না

একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, ঐ সম্প্রদায়ের মধ্যে আল্লাহর রহমত নাযিল হয় না যার মধ্যে রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকে (অবস্থান করে)। অপর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, প্রতি সোমবার আল্লাহর নিকট বান্দার আমল উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারীর কোন আমল কবুল হয় না।

৬১.আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের সাথে উঠাবসাকারীরাও আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকবে

ফিকহবিদ আবুল লাইছ বলেন, রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা এমন একটি নিকৃ মহাপাপ যে, তার নিকটে উপবি ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এজন্য অতিব জরুরি হলো, প্রত্যেকে এ (রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন) থেকে অতি দ্রুত তাওবা করবে এবং সদাচরণ ও সদব্যবহারের প্রতি যথাযথভাবে গুরুত্ব দিবে।

৬২.দুনিয়াতে কিসের (কোন কাজের) প্রতিদান দ্রুত পাওয়া যায়?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রক্তের সম্পর্ক রক্ষার ন্যায় এমন কোন সৎকর্ম নেই যার প্রতিদান অতি দ্রুত দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে সম্পর্ক ছিন্ন ও অত্যাচার করার ন্যায় এমন কোন পাপ নেই যার দণ্ড পরকালের জন্য নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও দুনিয়াতেও দ্রুত দেওয়া হয়।

৬৩.আকাশের দরজা কার জন্য বন্ধ থাকবে?

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একদা ফজরের নামাযের পর বৈঠকে বসে বলেন, আমি তোমাদেরকে কসম করে বলছি, এখানে রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারী কোন ব্যক্তি থাকলে সে যেন চলে যায়। আমরা এখন আল্লাহর নিকট দুআ করতে চাই। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নকারী কোন ব্যক্তি থাকলে আকাশের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ তার দুআ আকাশ পর্যন্ত উঠবে না। তারপূর্বে দরজা বন্ধ করা হয়। যখন তার সাথে আমাদের দুআ হবে তখন আকাশের বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দুআ দুনিয়াতে থেকে যাবে; উপরে উঠবে না।

৬৪.কোন ব্যক্তি বিপদে ফেঁসে যাবে; যতই চো করুক না কেন?

এ ছাড়া আরও বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনা থেকে এবং দুনিয়ার বিভিন্ন ঘটনা থেকে স্প হয় যে, রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারী দুনিয়াতে এমন কঠিন বিপদের মধ্যে ফেঁসে যায় যে, ক্রন্দন ও হায়-হুতাশ করে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। অথচ স্বীয় নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতার কারণে এ খবর থাকে না যে, যতক্ষণ সে গোনাহ থেকে তাওবা না করবে, ক্ষতিপূরণ না দিবে, নিজের মধ্যে পরিবর্তন না আনবে, ততক্ষণ শাস্তি ও আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে; তা থেকে খালাস (মুক্তি) পাবে না; যতই (লাখো) চো করুক না কেন? তবে পার্থিব কোন আপদ-বিপদে পতিত হলে তার শাস্তি কিছুটা (রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে কিছুটা) হালকা হবে। যেমন কোন বদদ্বীন ও খারাপ পরিবেশে (আল্লাহ না করুন) লিপ্ত হলে। কেননা উক্ত ব্যাপারে তার হুশ থাকে না যে সে তাওবা করবে। আল্লাহ সকলকে স্বীয় অনুগ্রহে নিরাপদ রাখুন। (আমীন)