প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
বিয়ে-শাদীতে প্রচলিত অধিকাংশ বরং প্রায় সকল রীতি-নীতিই কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই সকল কুপ্রথার চর্চা চলে। এমনকি অনেক বড় বড় প্রভাবশালী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিবর্গকেও সমাজে প্রচলিত এসব কুসংস্কারে গা ভাসিয়ে দিতে দেখা যায়। সাধারণ লোকজনের ধারণা এসবে তো গোনাহর কিছুই নেই। নারী-পুরুষ একই অনুানে সম্মিলিত হয়ে খাওয়া-দাওয়া, আদান-প্রদান ইত্যাদি করে থাকে, এতে শরীয়ত বিরোধী তো কিছু নেই, গান-বাজনাও হয় না, তাহলে এসবকে নিষেধ করার কি কারণ থাকতে পারে ?
এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণার একমাত্র কারণ হচ্ছে, সমাজের রক্তে মাংসে মিশে যাওয়া এসব কুপ্রথা চিন্তা ও বোধশক্তিকে খর্ব করে দিচ্ছে। আপাতদৃেিত বৈধ কিছু কিছু কাজের প্রতি লক্ষ্য করে এসবের আড়ালে যেসব অনাসৃি ও অপকারিতা বিদ্যমান, সেগুলোর দিকে নজর পড়ে না। উদাহরণত বলা যায়, কোন অবুঝ শিশু মিরি স্বাদ ও রঙে মুগ্ধ হয়ে মনে করে এটাতো বড়ই ভালো জিনিস। আর যেসব অন্তর্নিহিত ক্ষতিকারক দিকগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে তার পিতা-মাতা তাকে মিি খেতে নিষেধ করেন সেদিকে সে খেয়ালই করে না, বরং কল্যাণকামীদের সে দুশমন ভাবে। অথচ এসব রসুমে যেসকল অপকারিতা বিদ্যমান তা খুব একটা বেশি গোপনীয় নয়, বরং এসবের ক্ষতি সম্পর্কে অধিকাংশ লোকই পূর্ণ অবহিত, অনেক ক্ষেত্রে স্বীকারও করেন অনেকে এবং এ কারণে অনেক সময় অনেক দুর্ভোগও পোহাতে হয়। তারপরও আগুনে পতঙ্গ পতনের মত সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে এসবে লিপ্ত হয় এবং সৎ উপদেশ দানকারীগণ প্রায়ই তাদের কাছে উপেক্ষিত হন। সন্তান জন্মগ্রহণের সময়কার একটি রীতিও এই পর্যায়যুক্ত। এর নিম্নলিখিত দূষণীয় দিকগুলো সহজেই লক্ষ্যণীয়।
এক. প্রথম বাচ্চা প্রসব করার সময় পিতার বাড়িতে থাকার যথাসাধ্য চো করা বর্তমানে অবশ্য করণীয় বলে মনে করা হয়। অনেক সময় দেখা যায় প্রসবের সময় একেবারে ঘনিয়ে আসলে শ্বশুরালয় বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সন্তান সম্ভবা মহিলা সেই ভ্রমণ ক সহ্য করতে পারবে কিনা সেদিকে একটুও লক্ষ্য করা হয় না। এতে করে গর্ভবতী আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি গর্ভস্থিত সন্তানেরও ক্ষতি হয়। অনেক সময় তা দীর্ঘদিন যাবৎ মা ও সন্তানের রোগভোগের কারণ হয়। গর্ভাবস্থায় অসাবধানতার দরুন অধিকাংশ শিশু রোগাক্রান্ত হয় বলে অভিজ্ঞ মহল মত প্রকাশ করেছেন। মোটকথা, এ অযথা পরিশ্রমের ফলে একসাথে দুটি জীবন বিপদাপন্ন হয়। অধিকন্তু এ অনাবশ্যক রীতিকে এমনভাবে অনুসরণ করা হয় যে, তা যেন এক অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য-স্বউদ্ভাবিত এক নতুন শরীয়ত। বিশেষ করে, এ কাজের পেছনে যখন এমন বিশ্বাস ক্রিয়া করে যে, একে লঙ্ঘন করলে কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে বা বদনাম হবে। ক্ষতি হয়ে যাওয়ার বিশ্বাস তো শিরকের অন্তর্ভুক্ত, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কাউকে উপকারী বা অপকারী বলে বিশ্বাস করার শামিল। এ কারণেই হাদীস শরীফে স্প ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে কুলক্ষণ বলতে কোন কিছুই নেই। অপর এক হাদীসে টুটকাকে শিরক বলা হয়েছে। সমাজের কাছে সুনাম ক্ষুন্ন হবে বলে আশঙ্কা করা একপ্রকার অহংকার। কোরআন ও হাদীসে অহংকার হারাম বলে স্প ঘোষণা রয়েছে। মানসিকভাবে ক্ষতি বা অপবাদের আশঙ্কায় শংকিত হওয়ার দরূন অনেক অশান্তি ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
দুই. কোন কোন স্থানে বিপদ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে প্রসবের আগে কুলা-ডালায় কিছু পরিমাণ তরি-তরকারী ও পাঁচ সিকি পয়সা রাখা হয়, ইহা প্রকাশ্য শিরকী কর্মকাণ্ড।
তিন. সন্তান ভূমি হবার পর পরিবারের সদস্যগণ ছাড়াও মহল্লাবাসী মহিলাগণ চাঁদা আদায়ের মত কিছু জিনিসপত্র সংগ্রহ করে ধাত্রীকে দিয়ে থাকে। তা আবার ধাত্রীর হাতে না দিয়ে টুকরীতে ঢেলে দেওয়ার নিয়ম। হাতে না দিয়ে টুকরীতে দেওয়ায় এ নিয়মটি যে কি ধরণের বুদ্ধির কাজ তা বুঝা মুশকিল। মনে করলাম টুকরীতে না দিয়ে হাতেই দিল, কিন্তু তবুও তো ব্যাপারটা বড়ই ঘোলাটে যে, দানকারিণীগণ এ কাজ কি উদ্দেশ্যে করে থাকে? যখন এ কুপ্রথার প্রচলন শুরু হয় তখনকার কথাতো জানা নেই কেন কি উপকার লাভের জন্য একাজ করা হতো? হতে পারে, নবজাতকের আগমনে আত্মীয়-স্বজন সবাই খুশী হয়ে ধাত্রীকে কিছু পুরস্কার দেওয়ার রীতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে একথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে যে, শিশুর জন্ম উপলক্ষে কেউ উল্লাসিত হোক আর নাই হোক, তাতে কিছু আসে যায় না, ধাত্রীকে এনাম দিতেই হবে। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কোন কোন মহিলা নিতান্ত অসচ্ছল ও অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে এনাম নিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়। কোন অজুহাতে তা থেকে অনুপস্থিত থাকলে তো সারা জীবন এর জন্য কথা শুনতে হয়। আর উপস্থিত হলেও সামান্য জিনিস সাথে করে নেওয়া মহিলাদের কাছে অত্যন্ত অপমানকর ও লজ্জাকর ব্যাপার। অর্থাৎ, যেতে তো হবেই, সাথে সাথে মোটা অংকের দানও করতে বাধ্য। দাওয়াত দিয়ে বাড়িতে নিয়ে লুণ্ঠন করা-এ তো প্রকাশ্য অত্যাচার। খুশীর পরিবর্তে অনেক সময় তা অনেকের উপর ভার-বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তবু এ টেক্স ফাঁকি দেওয়ার জো নেই। সরকারি কর আদায়ে অনেক সময় মাসেক দেরী হয়ে থাকে কিন্তু এ কর আদায়ে এক মিনিটও ধৈর্য ধরা হয় না। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগেই তা আদায় করা ওয়াজিব। এভাবে, এ উদ্দেশ্যে সম্পদ ব্যয় করা, সংগ্রহকারী বা পরিবারের সদস্যবৃন্দ কর্তৃক এসব জিনিস গ্রহণ ও দান করা ইত্যাদি কতটুকু সঙ্গত হবে ভেবে দেখেছেন কি? এ ক্ষেত্রে দাতাদের উদ্দেশ্য থাকে লোকের প্রশংসা কুড়ানো এবং সম্মান ও প্রতিপত্তি দেখানো।
এ ব্যাপারে হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি সুনাম কুড়ানোর উদ্দেশ্যে কাপড় পরবে আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত দিবসে অপমানকর পোশাক পরিধান করাবেন। এ থেকে বুঝা গেল, সুনামের উদ্দেশ্যে কোন কাজ করা জায়েয নয়। বলাবাহুল্য, এই কাজে তো নিয়ত একটাই থাকে যে, দর্শকগণ আমার দান দেখে আমার প্রশংসা করে বলবে অমুক এটা দিয়েছেন। নতুবা, বদনাম হবে, লোকে বলবে, এমন সামান্য জিনিস নিয়ে আসার কি প্রয়োজন ছিল?
এ তো গেল দাতাদের ব্যাপার। এখন গ্রহীতাদের প্রতি দৃি দেওয়া যাক। হাদীসে আছে, আন্তরিকভাবে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত কোন মুসলমানের সম্পদ অন্য কারো জন্য হালাল নয়। কেউ যদি অসম্মত হয়ে ও বাধ্য হয়ে কিছু দান করে তাহলে গ্রহীতার পাপ হবে। দাতা যদি সম্পদশালী হয় এবং দান করতে যদি তাকে বাধ্য করা না হয়, তবুও এ দানে যেহেতু এ ধরনের লোকের দাওয়াত বা দান গ্রহণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মসম্মান বা অহংকার প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে যে দাওয়াত দেয় তার দাওয়াত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এতে করে দাওয়াতকারীর পাপ-কর্মে সহায়তা করা হয় এবং পাপের সহায়তা করা পাপ।
মোটকথা, এ ক্ষেত্রে দান গ্রহীতাও পাপ থেকে রক্ষা পায় না। অতঃপর লক্ষণীয় বিষয় হলো, পরিবারের লোকজনও এ সমস্ত দাতাদেরকে দাওয়াত করে আনার অপরাধে পাপী হবে। মোটকথা, এটা এমন একটা রীতি যে সংশ্লি সবাইকে পাপী করে, এ রীতি সাধারণতঃ ঋণ করে হলেও পালন করতে হয়। উপরোক্তগুলো ছাড়াও এতে আরো অনেক অপকারিতা রয়েছে। আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোও মূল বিষয়ের মতো। এ নীতিভিত্তিতে বলা যায় যে, এই চাঁদা আদায়ের জন্য ঋণ করা অবৈধ। এই চাঁদা আদায় করার সময় কারো অসুবিধার প্রতি লক্ষ্য করা হয় না।
দ্বিতীয়তঃ সচ্ছল অবস্থায় কেউ যদি আগে-ভাগে আদায় করতে চায় তাহলে তা লওয়া হয় না।
তৃতীয়তঃ সমর্থ থাকুক আর না-ই থাকুক এ দান করতেই হবে। অর্থাৎ, তিন পরিস্থিতিতেই শরীয়তি আইনের বিরোধিতা করা হয়। কাজেই দানের এ প্রচলিত রীতি সম্পূর্ণ অবৈধ।
চার. অতঃপর ধাত্রী কিছু পরিমাণ তরিতরকারী কোলে নিয়ে সারা মহল্লা ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নবাগতের সালাম পৌঁছায়।যাকেই এ সংবাদ পৌঁছায় সে-ই তরি-তরকারী দান করে। এই প্রথায়ও তৃতীয় রীতির অনুরূপ ধারণা ও উদ্দেশ্য কাজ করে।
পাঁচ. বাড়িতে কাঙ্গালী ভোজ দেওয়া হয়, ছত্রিশ থাম্বা বলা হয়। কাঙ্গালদের মধ্যে পরিচালক-পরিচালিকারাও থাকে। এদেরকে অধিকার বা পুরস্কার হিসাবে খাদ্য-দ্রব্য দিলে তাতে কিছু আসে যায় না বরং এটা তো ভালো কাজ। তবে এ ক্ষেত্রেও নিজের সামর্থ্যানুযায়ী ব্যয় করতে হবে। পরের নিন্দাবাদের ভয়ে খেয়ে না খেয়ে, সুদের উপর টাকা ধার নিয়ে, সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে হলেও চাকর-বাকরদের খাওয়াতে হবে এমন তো ঠিক নয়। যে কেউ এরূপ কাজ করবে সে অহমিকা প্রকাশ, বিনা প্রয়োজনে ধার নিয়ে অপরের ধন ন করা, সুদ প্রদান যার পাপ সুদ গ্রহণের সমান, অহংকার ও আত্মগর্ব প্রকাশ করা এবং অপচয় করা ইত্যাদি যেসব কাজ অকাট্য দলীল-প্রমাণ দ্বারা নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে সেগুলি করার অপরাধে গোনাহগার হবে।
এতো গেল চাকর-বাকরদেরকে পুরস্কার দানের কথা। কোন কোন কাঙ্গাল এমন যে, তাদের দ্বারা উপকারও হয় না, না তারা কোন কাজে লাগে আর না তাদের কোন প্রয়োজন আছে তবুও তারা যেন উত্তমর্ণ সেজে অধমর্ণের নিকট থেকে ঋণের টাকা উদ্ধার করতে আসে। অন্য কেউ আহার করুক আর না করুক তাদের খাওয়াটা দিয়ে দিতে হয়। এ স্থলেও দাতা ও দান গ্রহীতা উপরে বর্ণিত কারণে গোনাহগার হবে। তাছাড়া কাঙ্গালদের উদ্দেশ্যে ভোজ দেওয়া যেহেতু ওয়াজিব নয় বরং একটা সদাচার আর কাউকে সদাচার করতে বাধ্য করা বা চাপ সৃি করা হারাম। বলা বাহুল্য, এই কুপ্রথাকে প্রচলিত রাখা হারাম কাজে সহায়তা করার নামান্তর এবং হারামের সহায়তা করাও হারাম।
ছয়. সদ্যপ্রসবা মহিলার শ্বশুর বাড়িতে লোকমারফত চিঠি পাঠিয়ে নবজাত শিশুর আগমন সংবাদ জানানো হয়। অথচ এই সামান্য সংবাদের জন্য একজন মানুষ না গিয়ে একটা টেলিগ্রাম বা একখানা কার্ড লিখে পাঠিয়ে দেওয়াই যথে। শ্বশুর বাড়ির লোকজন এই সংবাদদাতাকে নানা ধরনের পুরস্কার দিয়ে থাকেন। এ পুরস্কার প্রদানকে ফরয ইবাদতের চাইতেও অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কাজেও প্রশংসিত হবার আকাক্সক্ষা এবং নিন্দিত হবার ভীতি মনে উদ্রেক হলে তা নাজায়েয হবে।
সাত. জন্মের চল্লিশতম দিনে শিশুকে গোসল করানোর সময় মহল্লাবাসি সকল মহিলা জড়ো হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে এবং রাতের বেলায় ঘরে ঘরে দুধ-চাউল বিতরণ করা হয়। কি অভিনব প্রথা! জোর করে কারো ঘরে দাওয়াত খাওয়া কি ধরনের ভদ্রতা? মেহমানদের জবরদস্তি আর মেযবানদের প্রশংসিত হবার আকাঙ্খা ও নিন্দাবাদের ভয় এই প্রথা নিষিদ্ধের কারণ হিসাবে যথে। দুধ-চাউল বিতরণ করে মহল্লার মুরুব্বীদের দুগ্ধ-পোষ্য শিশুর পর্যায়ভুক্ত করার প্রয়োজনটা কি? এ ক্ষেত্রেও সমাজে প্রভাবশালী হবার প্রবণতা ক্রিয়া করে আর এ কারণেই তা নিষিদ্ধ।
আট. বাচ্চা প্রসবের পর চল্লিশ দিন পর্যন্ত নামায পড়া বন্ধ থাকে, এমনকি নিয়মিতভাবে নামায আদায়কারিণী অনেক মহিলাকেও এ সময় নামাযের প্রতি অবহেলা করতে দেখা যায়। অথচ শরীয়তের বিধানে নেফাসের সর্বনিম্ন পর্যায় নির্ধারিত নেই। বরং বলা হয়েছে, যখনই নেফাসের প্রবাহ বন্ধ হবে তখনই গোসল করে বা গোসল ক্ষতিকারক হলে তায়াম্মুম করে নিয়ে নামায পড়া শুরু করতে হবে। শরীয়তসম্মত অজুহাত ছাড়া এক ওয়াক্ত নামায না পড়া বড়ই গোনাহর কাজ। এমন ব্যক্তি ফেরাউন, হামান ও কারূনদের সাথে দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে বলে হাদীসে উল্লেখ আছে।
নয়. কোলের শিশুকে নিয়ে বধূ যখন বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি রওয়ানা হয় তখন শ্বশুর বাড়ির সকলের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী কাপড়চোপড় ইত্যাদি নিয়ে থাকেন। শ্বশুর বাড়ি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানকার সকল মহিলাগণ বধূ কি নিয়ে আসলো তা দেখার জন্য জড়ো হয়ে এক ওয়াক্ত সে ঘরে খাওয়া-দাওয়া করে চলে যায়। এ সকল কাজ এত নিয়ম মাফিক ও রীতিবদ্ধভাবে করা হয় যে, ফরয কাজও এত গুরুত্ব দিয়ে করা হয় না। তদুপরি একাজ করলে অহমিকা প্রকাশ পায়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। শিশুর জন্মকালে সুন্নতসম্মত কার্যকলাপগুলো হলো, জন্মের পরপরই শিশুকে গোসল করিয়ে তার ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইক্বামত দেওয়া, অতঃপর কোন পরহেযগার মুরুব্বীর চর্বিত খেজুর ইত্যাদি শিশুর তালুতে লাগিয়ে দেওয়া। এছাড়া অন্যান্য যতকিছু আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে সবই অযথা, অযৌক্তিক ও মাকরূহ।
এছাড়া অন্যান্য যে অযথা প্রথাসমূহ প্রচলিত রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ উপযোগী।
* * * * * * * *
ছেলে-মেয়ের আক্বীকায়ও অনেক ধরনের কুপ্রথা প্রচলিত আছে। আক্বীকার দিন ছেলে হলে দুই ছাগল এবং মেয়ের জন্য এক ছাগল যবেহ করা, যবেহকৃত জন্তুর গোশত কাঁচা অথবা রান্না করে বিতরণ করা, শিশুর মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজনের সমান রৌপ্য দান-খয়রাত করা ইত্যাদি কাজ সুন্নত ও মুস্তাহাবের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া অন্যান্য প্রচলিত প্রথাসমূহ ইসলামী শরীয়তে মূল্যহীন।
এক. যে বাচ্চার আক্বীকা করা হয় তার মাথার চুল কামানোর পর মহল্লাবাসী পুরুষগণ ও বন্ধু-বান্ধবগণ মিলে একটা বাটিতে চাঁদা সংগ্রহ করেন। এ চাঁদা সংগ্রহ করে পরিবারের কর্তাকে দেওয়া হয়। এ প্রদানকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, ঐ সময় নিজের কাছে না থাকলে সুদে টাকা ঋণ নিয়ে হলেও তা আদায় করতে হয়। এ কর্তব্য পালনের বেলায় ইসলামী শরীয়তের বিধান লংঘিত হলেও যেন কিছু আসে যায় না। আসলে একাজের পেছনেও প্রশংসিত হবার লোভ আর নিন্দানীয় হওয়ার ভয় ক্রিয়া করে থাকে। ঋণ গ্রহণ ও দানের পদ্ধতিটাও অভিনব, প্রয়োজন থাক আর নাই থাক ঋণ নিতেই হবে। তা আবার যখন ইচ্ছা তখন পরিশোধও করা যায় না, বরং কেউ যদি তা শোধ করতে চায় তাহলে বলা হয় না এখনই দিতে হবে না, বরং আমাদের এখানে কোন অনুানে তা দিয়ে দেবেন। বিনা প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করাকে হাদীসে তিরস্কার করা হয়েছে, অযথা ঋণ গ্রহণ নিঃসন্দেহে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের স্প বিরোধিতা। কোন ব্যক্তি যদি অন্যের হক আদায় করে দিতে চায়, তাহলে অন্য কারো পক্ষে তাকে দায়মুক্ত হতে না দেওয়া বা অন্তরায় সৃি করা অত্যন্ত দূষণীয় কাজ। ঋণ দান ও গ্রহণের এ গর্হিত পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে উপহার প্রদানও দূষণীয় কাজ হয়ে যায়।
দুই. আক্বীকার সময় বোন-ভাগ্নিকে পুরস্কৃত করার প্রথায় কাফেরদের অনুকরণ ছাড়াও নিম্নোক্ত অপকারসমূহ রয়েছে
(ক) পুরস্কার দাতা সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় সমাজের চোখে নিন্দিত হওয়ার ভয়ে এ উপহার দিয়ে থাকে। এখানে দাতার আন্তরিকতা অনুপস্থিত। লোক দেখানো ও অহম প্রকাশের উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করা গোনাহর কাজ।
(খ) দান তো একটা সদাচার আর কাউকে দান করতে বাধ্য করা শরীয়তের খেলাফ। দান না করার কারণে কাউকে তিরস্কার করা বা বংশের সুনাম নকারী ভাবাও শরীয়তের দৃেিত বাধ্য করার শামিল। দাতা সন্তু হয়ে দিলেও এতে সুনাম অর্জনের আকাক্সক্ষা অবশ্যই বিদ্যমান থাকে যা কোরআন-হাদীসের মর্মানুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
(গ) এতেও হালুয়া-রুটি বিতরণের ব্যবস্থা করা হয় যা অযৌক্তিক এবং প্রশংসিত হবার অভিলাষ ও লোক দেখানোর ইচ্ছা থাকার কারণে অবৈধ।
বাচ্চার দাঁত উঠার সময়ও এ ধরনের কুপ্রথা পালন করা হয়। এ সময় মহল্লাবাসীদের মাঝে খাদ্য-দ্রব্য বিতরণ করা হয়। এ প্রথা পালন না করাকে ফরয-ওয়াজিব পালন না করার চেয়ে বেশি দূষণীয় মনে করা হয়। তেমনিভাবে বাচ্চার দুধ ছাড়ানোর সময় মহল্লার মহিলাগণ জড়ো হয়ে অযথা খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা, আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে খেজুর বিতরণ করা ইত্যাদি কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। এর কোনটাই শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়।
