প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
পায়জামা-লুঙ্গি ইত্যাদি টাখনুর নীচে নামিয়ে পরা, অত্যধিক লম্বা হাতওয়ালা জামা পরা, অথবা অন্যদিক লম্বা শিমলা রেখে পাগড়ী পরা নাজায়েয। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, নির্ধারিত সীমার নীচে নামিয়ে ইযার (কোমর থেকে নিম্নদেশে পরিধানের বস্তু) পরিধানকারীর প্রতি আল্লাহ তাআলা কৃপাদৃষ্টি করবেন না। অন্য হাদীসে এই সীমা নির্ধারণ করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, টাখনুর নীচে পরিহিত ইযার দোযখের ইন্ধন হবে। সহীহ বুখারীতে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজার বর্ণিত তৃতীয় এক হাদীসে অন্যান্য পোশাকের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করাকে হারাম বলা হয়েছে।
রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, পায়জামা, জামা ও পাগড়ী সবকিছুই সীমাতিরিক্ত লম্বা করে পরা নিষিদ্ধ। যে কোন বস্তু অহংকারের সাথে সীমাতিরিক্ত লম্বা করে পরবে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি কৃপাদৃষ্টি করবেন না। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত অপর এক হাদীসে এরই সমর্থন পাওয়া যায়। যাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি অহংকার ভরে লম্বা করে পোশাক পরবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে তার প্রতি অনুগ্রহের দৃষ্টিপাত করবেন না। এই হাদীসে সাধারণভাবে সকল কাপড়কেই বুঝানো হয়েছে; তন্মধ্যে ইযার দীর্ঘায়িত করার সীমা তো আগেই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। অন্যান্য পোশাক সম্পর্কে তত্ত্বজ্ঞানী আলেমগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, জামার আস্তিন হাতের আঙ্গুল পেরিয়ে যাওয়া, পাগড়ীর শিমলা পিঠের অর্ধেকের নীচে নামা নিষিদ্ধ। দুষ্টু বুদ্ধির লোকেরা বলে, হাদীসে তো অহংকারের সাথে পরতে নিষেধ এসেছে আমরা অহংকার করি না, কাজেই আমাদের জন্য জায়েয হবে। তাদের একথা ভালো করে বুঝে নিতে হবে যে, আমরা অহংকার করি না একথা বলা ভুল। আচ্ছা, তাহলে কেন তা করতে আগ্রহী হন? সুন্নতি লেবাস কেন পরেন না? একে গ্রহণ করতে মন সায় দেয় না কেন? কেনই বা টাখনুর উপরে পায়জামা পরাকে হাস্যকর ভাবেন? এত কিছু পরেও তা অহংকার নয়তো কি? দ্বিতীয়তঃ অহংকার থেকে বেঁচে থাকার জন্যই কি হাদীসে এ শর্তারোপ করা হয়েছে? অহংকার না থাকলেও এ কাজ নিষিদ্ধ।
এই অনুচ্ছেদের শুরুতে দ্বিতীয় যে হাদীসখানি উল্লেখ করা হয়েছে তাতে অহংকারের কায়েদ বাড়ানো হয়নি। এ হাদীসে শর্তহীনভাবে টাখনু পর্যন্ত ইযার পরিধানের সীমা নির্ধারণ করে এ কথাই বুঝানো হয়েছে যে, অহংকার থাক আর না-ই থাক সর্বাবস্থায় এ সীমা অতিক্রম করা নিষিদ্ধ। তবে সীমাতিক্রমের সাথে অহংকারের গোনাহ মিলে আরো বেশি গোনাহ হয় এবং অহংকারবিহীন অবস্থায় সীমাতিক্রমের গোনাহ তো থেকেই যাবে। এ কাজের বৈধতা প্রমাণ করে গোনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় নেই।
কেউ যদি বলেন, আমরা এই হাদীসের অর্থের ব্যাপকতাকে অন্য হাদীস দ্বারা সীমিত করে নেব। তাহলে জবাবে বলবো, হানাফী মাযহাবের উসূলে ফিকাহতে যথেষ্ট যুক্তি প্রমাণ দ্বারা এ নীতি নির্ধারিত হয়েছে যে, কোন দলিলের অর্থের ব্যাপকতাকে অন্য কিছু দিয়ে সীমায়িত করা যাবে না। মোটকথা এ কাজ বৈধ হওয়ার কোন পন্থা নেই। কেউ কেউ পরহেযগারী দেখানোর জন্য নামাযের সময় পায়জামা টাখনুর উপরে উঠিয়ে নেন। নামাযের বাইরেও তো গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা ওয়াজিব। কাজেই নামাযের সময় পায়জামা উঠালে ওয়াজিব তরকের গোনাহ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। কেউ কেউ লম্বা লম্বা পায়জামা তৈরি করে টাখনুর উপরে বোতাম লাগিয়ে দেন, যাতে করে পায়জামার বেশ খানিকটা কাপড় টাখনুর উপরে অযথা ঝুলে থাকে। স্মরণ রাখা আবশ্যক, টাখনু ঢাকলো কিনা সেটা বড় কথা নয়, বরং আসল পাপ হচ্ছে কাপড় নষ্ট করার দরুন। এটাও মনে থাকা দরকার, এ ধরণের অনৈসলামিক পোশাক সেলাই করা দর্জির পক্ষেও জায়েয নয়।
কেননা, গোনাহের কাজে সহায়তা করাও গোনাহ। এ ধরণের পোশাক সেলাই করতে সরাসরি অস্বীকার করা কর্তব্য। এই কাপড় সেলাই করাই তো আর রিযিক উপার্জনের জন্য সীমাবদ্ধ নয় বরং অন্যান্য কাপড়ও তো সেলাই করার আছে।
* * * * * * *
ঘরে ছবি লাগানো এবং বিনা প্রয়োজনে কুকুর পালন করা এ ধরণের মন্দ স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনে- যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না। অন্য হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারীকে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে কটিন শাস্তি দেবেন। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বানী উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে-গবাদি পশুর রক্ষণাবেক্ষণ, শিকার ও শস্য ক্ষেতের রক্ষণাবেক্ষণ-এ তিন প্রয়োজন ভিন্ন কেউ কুকুর পালন করলে তার পুণ্য থেকে প্রতিদিন এক ক্বিরাত পরিমাণ সওয়াব হ্রাস করা হবে। পার্থিব হিসাবে এক কিরাত উহুদ পাহাড়ের সমান বলে হাদীসে উল্লেখ আছে। উক্ত হাদীসসমূহ দ্বারা ছবি প্রস্তুত, ছবি রাখা এবং বিনা প্রয়োজনে কুকুর পালন করা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে। আধুনিক সভ্য জগতের কাছে ছবি ও কুকুর অত্যাবশ্যকীয় জীবনোকরণ রূপে বিবেচিত হয়। ছবিকে ঘরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং কুকুরকে পরিবারের সদস্য গণ্য করা হয়। এতদুভয়কে ব্যাপকভাবে বরণ করে নিতে তারা বিন্দুমাত্র সংকোচিত বা দ্বিধাগ্রস্ত হয় না।
কোন কোন যুক্তি-পুজারী তো কুকুরের গুণকীর্তনে পঞ্চমুখ হয়ে শরীয়তের নিষেধাজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেন। এতে করে পরোক্ষভাবে এ দাবিকেই প্রতিতি করতে চান যে, শরীয়তের এ নির্দেশ একটা অহেতুক, অযৌক্তিক বাজে কথা। (নাউযু বিল্লাহ) কারো মনে সত্যি সত্যিই এ ধরণের কোন ধারণা বদ্ধমূল হয়ে থাকলে তার ঈমান নবায়ন করা অত্যাবশ্যক। মুসলমান হওয়ার পর শরীয়তী বিধি-বিধানে হেতু তালাশ করার কোন প্রয়োজন নেই। বস্তুনির্ভর আইনের অনেক বিধানাবলির কারণ অবোধগম্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে নির্বিবাদে স্বীকার করে নিতে পারেন, আর সত্যিকারের বিধানদাতার আইনকে বুঝি নিদ্বির্ধধায় মেনে নিতে অসুবিধা হয়। কেউ যদি বলেন, আমাদের ধর্ম তো সম্পূর্ণ বুদ্ধিগ্রাহ্য, তাহলে বলবো, বুদ্ধিগ্রাহ্য তো বটেই, তবে বুদ্ধি সে পর্যন্ত পৌঁছা অত্যাবশ্যক নয়। যেমন, অনেক কিছুই দর্শনেন্দ্রিয়ের সাহায্যে বুঝার রয়েছে, কিন্তু অন্ধরা তো সেগুলো বুঝতে পারে না। শরয়ী বিধানাবলির হেতু বুদ্ধিমানদের কাজ। নবীগণ, কামেল ওলীগণ এবং অভিজ্ঞ আলেমগণকে এ বুদ্ধি দান করা হয়েছে। সাধারণ লোকের বুদ্ধিতে সে মুক্তি নেই, আর কোন সনদ বা ডিগ্রি নিলেই সাধারণ মানুষের গণ্ডী থেকে উত্তীর্ণ হয়ে অসাধারণ হওয়া যায় না। দ্বীনের মুলনীতিসমুহ বুদ্ধিগ্রাহ্য। অর্থাৎ যে কোরআন-হাদীসকে মানে না তাকে বুদ্ধিগত প্রমাণ দিয়ে তওহীদ ও রিসালত বুঝানো যেতে পারে। বাকী রইল, দ্বীনের শাখা-প্রশাখার কথা। যেমন, অমুক জিনিস হারাম কেন? অমুকটা হালাল কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর বুদ্ধিমাফিক হওয়া এ অর্থে জরুরি নয়। বরং এসব বিধি-বিধানকে শরীয়তের প্রমাণ সাপেক্ষে মেনে নিতে হবে। আর বিবেকও তো বলে, বাদশাহকে বাদশাহ বলে স্বীকার করে নেওয়ার জন্য ঐহী ও বুদ্ধিগত সব ধরণের প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে, তবে বাদশাহকে স্বীকার করে নেওয়ার পর তার প্রতিটি আদেশ-নিষেধের প্রমাণ তালাশ করা স্পষ্ট বিদ্রোহ বৈ নয়। আমি ভালোর জন্যই বলছি, প্রত্যেক হুকুমের হেতু খোঁজা এবং কারণ না জানা পর্যন্ত কোন হুকুম না মানা ধর্মঘর থেকে বেরিয়ে যাবার প্রধান ফটক। এ সমস্ত অশুভ মানসিকতা থেকে আল্লাহর শরণাপন্ন হচ্ছি।
মোট কথা শরয়ী বিধি-বিধানকে বিনাদ্বিধায় স্বীকার করে নেওয়া ওয়াজিব। হুকুমকে মেনে নেওয়ার পর তা থেকে উপকার গ্রহণের উদ্দেশ্যে মূল রহস্য উদঘাটনে প্রবৃত্ত হলে তার হেতু এমনিতেই বেরিয়ে আসে।
কোন এক রেল ভ্রমণে এক যুবকের সাথে আমার দেখা হয়। যুবকটি তার কুকুর সাথে নিয়ে যাচ্ছিল। কথায় কথায় যুবকটি কুকুরের নানা উপকারিতা বর্ণনা করে একই প্রশ্নের অবতারণা করলো। আমি তাকে বললাম, কুকুরের মধ্যে এতসব গুণ তো আছে ঠিকই, তবে তার একটা দোষ সমস্ত গুণাবলিকে বিনষ্ট করে দিয়েছে, আর সে কারণেই ইসলামী শরীয়তে তাকে অপবিত্র বলা হয়েছে। যুবকটি সেই দোষ সম্পর্কে জানতে চাইলে আমি বললাম, তাদের মধ্যে জাতীয় সহানুভূতি মোটেই নেই, স্বজাতীয়কে দেখে সে যে কি রূপ ধারণ করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতক্ষণ যাবৎ ইসলামী বিধানকে নিয়ে যুবকটি যে হাসি-ঠাট্টা করছিল তার উপযুক্ত ও বিশুদ্ধ জবাব পেয়ে সে ঠাণ্ডা হয়ে গেল এবং খুশি হয়ে আমার সাথে একমত হয়ে গেল। অনেকে জবরদস্তিমূলকভাবে প্রয়োজন সৃষ্টি করে নিয়ে বলেন আমার বাড়ি পাহারার জন্য কুকুর পালন করি। জনাব! আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরের খবর রাখেন। নিছক চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যে পেলে মনগড়া প্রয়োজনের দোহাই পাড়লে তা বৈধ হয়ে যায় না। চাকর-বাকর, দারোয়ান-পাহাড়াদার না থাকলে তো কুকুরের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এক-একটা কাজের জন্য যেখানে কয়েকজন করে চাকর রাখা হয় সেখানে কুকুর পালনের প্রয়োজনটা কোথায়? তেমনিভাবে শিকারের যাবতীয় অস্ত্র বন্দুক, তীর-ধনুক ইত্যাদি সহজ লভ্য হওয়া সত্ত্বেও কুকুর কেন পালতে যাবেন?
