প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১২ম সংখ্যা, জুন ২০১৬, শাবান-রমাদান ১৪৩৭ হিজরী, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

শবে কদর, ইতিকাফ ও ফিতরা

রামাদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শেষ দশ রাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদানের প্রথম ২০ রাতে কিয়ামুল্লাইল করার আগে বা পরে কিছু সময় ঘুমাতেন। কিন্তু রামাদানের শেষ দশ রাতে তিনি সারারাত বা প্রায় সারারাত জাগ্রত থেকে কিয়ামুল্লাইল ও ইবাদতে রত থাকতেন।

শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন। আয়েশা (রা) বলেন: “যখন রামাদানের শেষ দশ রাত এসে যেত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রি জাগরিত থাকতেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে জাগিয়ে দিতেন, তিনি অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে ইবাদত-বন্দেগিতে রত থাকতেন এবং সাংসারিক, পারিবারিক বা দাম্পত্য কাজকর্ম বন্ধ করে দিতেন। (বুখারী, আস-সহীহ ২/৭১১; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৩২।)

রামাদানের শেষ দশ রাতের মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল ক্বাদ্র বা তাকদীর বা মর্যাদার রাত। ইমাম বাইহাকী বলেন: লাইলাতুল কাদর অর্থ হলো, এ রাত্রিতে আল্লাহ পরবর্তী বৎসরে ফিরিশতাগণ মানুষদের জন্য কি কি কর্ম করবেন তার তাকদীর বা নির্ধারণ করে দেন। (বাইহাকী, শুআবুল ঈমান ৩/৩১৯।) সূরা কাদর-এ আল্লাহ বলেন: “লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস থেকেও উত্তম।
এই রাতটি উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত। একটি রাতের ইবাদত এক হাজার মাস বা প্রায় ৮৪ বৎসর ইবাদতের চেয়েও উত্তম। কত বড় নেয়ামত! শুধু তাই নয়, এ রাত্রি কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে জাগ্রত থাকলে আল্লাহ পূর্ববর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যদি কেউ ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের খাঁটি নিয়্যাতে লাইলাতুল ক্বাদর কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে অতিবাহিত করে তবে তাঁর পূর্ববর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে।” (বুখারী, আস-সহীহ ২/৬৭২, ৭০৯; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৫২৩।)

আমরা মনে করি, ২৭শে রামাদানের রাত কদরের রাত। এই চিন্তাটি সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই বলেন নি যে, ২৭শে রমাদানের রাত কদরের রাত। তবে অনেক সাহাবী, তাবিয়ী বা আলিম বলেছেন যে, ২৭শের রাত শবে কদর হওয়ার সম্ভবানা বেশি। এজন্য আমাদের দায়িত্ব হলো রমাদানের শেষ দশ রাতের সবগুলি রাতকেই শবে কদর হিসাবে ইবাদত করব। ২৭শের রাতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত করব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরীকাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম তরীকা। এতেই আমাদের নাজাত। তিনি নিজে লাইলাতুল ক্বাদর লাভ করার জন্য রমাদানের শেষ দশ রাত সবগুলিই ইবাদতের ও তাহাজ্জুদে জাগ্রত থেকেছেন এবং এরূপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যদি কেউ লাইলাতুল ক্বাদর খুঁজতে চায় তবে সে যেন তা রামাদানের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮২৩।)

এ অর্থে আরো অনেকগুলি হাদীস রয়েছে। এ সকল হাদীসে তিনি রমাাদানের শেষ দশ রাত্রির সকল রাত্রিকেই শবে কদর ভেবে ইবাদত করতে বলেছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন: “তোমরা রামাদানের শেষ দশ রাত্রিতে লাইলাতুল কাদর সন্ধান করবে। যদি কেউ একান্তই দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে অন্তত শেষ ৭ রাতের ব্যাপারে যেন কোনোভাবেই দুর্বলতা প্রকাশ না করে।” (বুখারী, আস-সহীহ ২/৭১১; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮২৩।)

কোনো কোনো হাদীসে তিনি বেজোড় রাত্রিগুলির বেশি গুরুত্ব দিতে বলেছেন। তিনি বলেন: “আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলিতে তা খোঁজ করবে।” (বুখারী, আস-সহীহ ২/৭০৯; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮২৩।)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কাদরের উদ্দেশ্যে রামাদানের শেষ কয়েক বেজোড় রাত্রিতে সাহাবীদের নিয়ে জামাতে তারাবীহ বা কিয়ামুল্লাইল আদায় করেন। আবূ যার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৩শে রামাদানের রাত্রিতে আমাদের নিয়ে কিয়ামুল্লাইল করলেন রাত্রির এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। এরপর বলেন, তোমরা যা খুঁজছ তা মনে হয় সামনে। এরপর ২৫শের রাত্রিতে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত কিয়াম করলেন। এরপর বলেন, তোমরা যা খুঁজছ তা বোধহয় সামনে। এরপর ২৭শের রাত্রিতে তিনি নিজের স্ত্রীগণ, পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ সবাইকে ডেকে আমাদেরকে নিয়ে প্রভাত পর্যন্ত জামাতে কিয়ামুল্লাইল করলেন, এমনকি আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে, সাহরী খাওয়ার সময় পাওয়া যাবে না।” (তিরমিযী, আস-সুনান ৩/১৬৯; ইবনু খুযাইমা, আস-সহীহ ৩/৩৩৭; আহমদ, আল-মুসনাদ ৫/১৮০। হাদীসটি হাসান সহীহ।)
আমরা অনেক সময় মনে করি তারাবীহ বা কিয়ামুল্লাইল বোধ হয় বিশ রাকাতের বেশি পড়া যায় না বা জামাতে পড়া যায় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞতাই এর কারণ। রামাদানের কিয়ামুল্লাইল ইশার পরে বা মধ্য রাতে বা শেষ রাতে যে কোনো সময়ে ২০ রাকাত বা তার বেশি জামাতে আদায় করা যায়। সাহাবী-তাবিয়ীগণ অনেকেই শেষ দশ রাত্রিতে অতিরিক্ত ৪ বা ৮ রাকাআত কিয়ামুল্লাইল আদায় করতেন। আমাদের দায়িত্ব হলো, রামাদানের শেষ দশ রাত্রির প্রতি রাত্রিতে ইশা ও তারাবীহ-এর পরে প্রয়োজন মত কিছু সময় ঘুমিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হবে। এরপর সেহেরী পর্যন্ত বাকী সময় লাইলাতুল কদর- এর নামায, তিলাওয়াত, দোয়া, দরুদ ইত্যাদি ইবাদতে সময় কাটাতে হবে। যদি মহল্লার মসজিদে কোনো ভাল হাফেজ পাওয়া যায়, তবে এ রাতগুলিতে রাত ১২/১টা থেকে ৩/৪ টা পর্যন্ত ৩/৪ ঘন্টা লম্বা কিরাআত ও দীর্ঘ রুকু সাজদা সহকারে জামাতে লাইলাতুল কাদর-এর উদ্দেশ্যে কিয়ামুল্লাইল আদায় করতে হবে এবং বেশি বেশি করে দোয়া করতে হবে। তা সম্ভব না হলে, প্রত্যেকে নিজের সুবিধা মত বেশি বেশি কিয়ামুল্লাইল বা শবে কদরের নামায আদায় করতে হবে। বেজোড় রাতগুলিকে এবং বিশেষ করে ২৭শের রাত্রি বেশি কষ্ট করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরীকায় সাহাবী, তাবিয়ী ও পরবর্তী বুজুর্গগণও এভাবে রামাদানের শেষ দশ রাত পালন করতেন। তাঁরা অনেকেই রামাদানের প্রথম ২০ রাতে ৩/৪ রাতে কুরআন খতম করতেন। আর শেষ দশ রাতে প্রতি রাতে ১০/১২ পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন নামাযের মধ্যে।

শবে কদরের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দুআ শিখিয়েছেন। আয়েশা (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, যদি আমি লাইলাতুল কাদর পাই তাহলে আমি কি বলব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি বলবে:

হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল মর্যাদাময়, আপনি ক্ষমা করতে ভালবাসেন, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৫৩৪; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১২৬৫। হাদীসটি হাসান সহীহ।)

এ দুআটি মুখস্থ করে অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে এ দশ রাত্রির নামাযের সাজদায়, নামাযের পরে, এবং সর্বাবস্থায় বেশি বেশি করে পাঠ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দিন। আমীন।

রামাদানের শেষ দশ দিনের অন্যতম ইবাদত হলো ইতিকাফ করা। ইতিকাফের অর্থ হলো সার্বক্ষণিকভাবে মসজিদে অবস্থান করা। ওযূ, ইসতিনজা, পানাহার ইত্যাদি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের না হওয়া। মসজিদে অবস্থানকালে ঘুমানো, বসে থাকা বা কথাবার্তা বলা যায়। তবে ইতিকাফরত অবস্থায় যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে, সকল জাগতিক চিন্তা, কথাবার্তা ও মেলামেশা বাদ দিয়ে সাধ্যমত আল্লাহর যিক্র ও ইবাদত বন্দেগিতে রত থাকা। না হলে নীরব থাকা।
ইতিকাফ মূলতই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তদুপরি লাইলাতুল কাদর-এর ফযীলত লাভের জন্যই এ সময়ে ইতিকাফের গুরুত্ব বাড়ে। আয়েশা (রা) বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তিনি তাঁর ওফাত পর্যন্ত এভাবে ইতিকাফ করেন। অতঃপর তাঁর স্ত্রীগণ তার পরে ইতিকাফ করেন।” (বুখারী, আস-সহীহ ২/৭১৩, ৭১৯; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৩০, ৮৩১।)

আমাদের সকলেরই চেষ্টা করা দরকার রামাদানের শেষ দশদিন সুন্নাত ইতিকাফ আদায় করার। না হলে নফল-মুস্তাহাব হিসেবে দু-এক দিনের জন্যও ইতিকাফ করা যায়। যদি পুরো দশ দিন না পারি তবে দু-এক দিনের জন্য হলেও ইতিকাফ করা দরকার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে: “যদি কেউ তার ভাইয়ের প্রয়োজন মেটাতে হাঁটে তবে তা তার জন্য দশ বৎসর ইতিকাফ করার চেয়েও উত্তম। আর যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইতিকাফ করবে আল্লাহ তার ও জাহান্নামের মধ্যে তিনটি পরিখার দুরত্ব সৃষ্টি করবেন, প্রত্যেক পরিখার প্রশস্ততা দুই দিগন্তের চেয়েও বেশি।” (হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/৩০০; মুনযিরী, আত-তারগীব ৩/২৬৩; তাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/১৯২; আলবানী, যয়ীফুত তারগীব ১/১৬৭। হাকিম, মুনযিরী ও হাইসামী হাদীসটির সনদ শক্তিশালী বলেছেন। পক্ষান্তরে ইবনুল জাওযী ও আলবানী হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন।)

রামাদানের শেষে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিত্র ফরয করেছেন, যেন সিয়াম পালনকারী বাজে কথ, অশ্লীল কথা (ইত্যাদি ছোটখাট অপরাধ) থেকে পবিত্রতা লাভ করে এবং দরিদ্র মানুষেরা যেন খাদ্য লাভ করে। যে ব্যক্তি সালাতুল ঈদের আগে তা আদায় করবে তার জন্য তা কবুলকৃত যাকাত বলে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতুল ঈদের পরে তা আদায় করবে, তার জন্য তা একটি সাধারণ দান বলে গণ্য হবে।” (আবু দাউদ, আস-সুনান ২/১১১; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৫৮৫; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/২৬৩। হাদীসটি হাসান।)
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে আমরা এক সা খাদ্য, অথবা এক সা যব, অথবা এক সা খেজুর, অথবা এক সা পনির, অথবা এক সা কিশমিশ যাকাতুল ফিতরা হিসেবে প্রদান করতাম।” (বুখারী, আস-সহীহ ২/৫৪৮; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৬৭৮-৬৭৯।)

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে আমরা যাকাতুল ফিত্র আদায় করতাম দুই মুদ্দ গম দিয়ে।” (আহমদ, আল-মুসনাদ ৬/৩৫৫। হাদীসটি সহীহ। বিস্তারিত দেখুন, তাহাবী, শারহু মুশকিলিল আসার ৯/১৬-৪২।)
এক সা হলো চার মুদ্দ। তাহলে দুই মুদ্দ হলো অর্ধ সা। সা-এর পরিমাপ নিয়ে ফকীগণের মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফার (রাহ) মতে এক সা হলো প্রায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। ইমাম আবূ ইউসূফ ও অন্য তিন ইমামের মতে এক সা হলো প্রায় ২ কেজি ২০০ গ্রাম।

তাহলে আমরা দেখছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সা খাদ্য ফিতরা দিতে বলেছেন। খেজুর, কিসমিস, পনির এবং যব এই চার প্রকার খাদ্য থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ফিতরা দিতে হবে। আর একটি বর্ণনায় আমরা দেখছি যে, গম বা আটার ক্ষেত্রে এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম হিসাবে ফিত্রা দিলে চলবে। আমাদের দেশে এ পাঁচ প্রকার খাদ্যের কোনোটি মূল খাদ্য নয়। এক্ষেত্রে ইসলামী মূলনীতি হলো, দান গ্রহণকারী দরিদ্রগণের সুবিধা ও কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রাখা। এ জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো, খেজুর বা খেজুরের মূল্য প্রদান করা। কারণ সাহাবীগণ খেজুর প্রদান করতে ভালবাসতেন। এছাড়া দরিদ্রের জন্য তা অধিকতর উপকারী। তবে আমাদের দেশে সাধারণত ফিতরা-দাতাদের সুবিধার দিকে তাকিয়ে আটার মূল্য হিসেবে ফিতরা প্রদান করা হয়। এ হিসাবে বাজারের উত্তম আটা পরিবারের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম করে ফিতরা প্রদান করতে হবে। যাদের সচ্ছলতা আছে তারা মাথাপ্রতি ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম খেজুর প্রদানের চেষ্টা করবেন। এতে ফিতরা আদায় ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের একটি অতিরিক্ত সুন্নাত পালন করা হবে।

ঈদের দিন নামাযের আগে অথবা তার আগে রামাদানের শেষ কয়েক দিনের মধ্যে ফিতরা আদায় করতে হবে। একজনের ফিতরা কয়েকজনকে এবং কয়েকজনের ফিতরা একজনকে দেওয়া যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “জিবরাঈল (আ) আমার নিকট উপস্থিত হন। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি রামাদান মাস পেল, অথচ তার গোনাহ ক্ষমা করা হলো না সে বিতাড়িত হোক। আমি বললাম: আমীন। তিনি বলেন: যার নিকট আপনার কথা বলা হলো, অথচ সে আপনার উপর সালাম পাঠ করলো না সে বিতাড়িত হোক। আমি বললাম: আমীন। তিনি বললেন: পিতামাতা বা একজন তার নিকট বৃদ্ধ হলেন, কিন্তু তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন না সে বিতাড়িত হোক। আমি বললাম: আমীন।” (হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/১৭০; আলবানী, সাহীহুত তারগীব ১/২৪০। হাদীসটি সহীহ।)

রমজানে সঞ্চয় যাই হোক না হোক, সবচেয়ে বড় কথা হলো ক্ষমা লাভ করা। তাই এ কদিন বেশি বেশি করে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে। হাদীস শরীফে এসেছে, মুমিন ব্যক্তি তাঁর পাপকে খুব বড় করে দেখেন, যেন তিনি পাহাড়ের নিচে বসে আছেন, ভয় পাচ্ছেন, যে কোনো সময় পাহাড়টি ভেঙ্গে তাঁর উপর পড়ে যাবে। আর পাপী মানুষ তার পাপকে খুবই হালকাভাবে দেখেন, যেন একটি উড়ন্ত মাছি তার নাকের ডগায় বসেছে, হাত নাড়ালেই উড়ে যায়।” (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২৩২৪; নং ৫৯৪৯, তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৬৫৮, নং ২৪৯৭।)

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, পাপের জন্য মনের মধ্যে ওযর তৈরি করা। আমি তো অনেক ভাল কাজই করি, শুধু এ কাজটি বাধ্য হয়ে করছি…. অথবা অমুক কারণে এটা করা যেতে পারে। পাপের পক্ষে এরূপ যুক্তি তৈরি করার অর্থ শয়তানের শতভাগ সফলতা ও তাওবার দরজা বন্দ হওয়া। কাজেই কোনো পাপের পক্ষে যুক্তি দিবেন না বা কোনো পাপকে ছোট মনে করবেন না। মুমিনের কর্ম হলো সকল পাপকে বড় ও কঠিন মনে করে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করা। পাপ হয়ে গেলে তাওবা করা। এতে মুুমিনের দুটি লাভ: প্রথমত পাপ কম হয়। দ্বিতীয়ত পাপ হয়ে গেলে তাওবা করতে আগ্রহ হয়। আর পাপকে ছোট মনে করলে মুমিন ধ্বংস হয়ে যান। কারণ এতে পাপ বেশি হতে থাকে এবং তাওবার আগ্রহ থাকে না। ফলে এক সময় হৃদয়টা পচে যায়। তাওবার অর্থ হলো ফিরে আসা। তাওবার শর্ত তিনটি: (১) পাপের কারণে মনের মধ্যে অনুশোচনা বোধ করা, (২) আর কখনো এ পাপ করব না বলে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং (৩) এ অনুশোচনা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

রামাদানের এ মুবারক সময়ে আসুন আমাদের জীবনের সকল পাপের কথা স্মরণ করে আল্লাহ কাছে তাওবা করি। সকল পাপ থেকেই তাওবা করা দরকার। এরপরও যদি একান্ত অসুবিধা হয় তবে কিছু পাপ থেকে তাওবা করা যায়। যেমন, আল্লাহ আমি নামায কাযা করতাম, সিনেমা দেখতাম এবং দাড়ি কাটতাম। দাড়ি কাটা এখন বাদ দিতে পারছি না। আল্লাহ আমি নামায কাজা করা ও সিনেমা দেখা থেকে তাওবা করছি, আল্লাহ আমি আর কোনোদিন এ কাজ করব না। আল্লাহ আপনি আমার অতীত পাপ ক্ষমা করে দেন এবং ভবিষ্যতে এ পাপ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দেন।

সকল পাপ থেকেই তাওবা করুন। কোনো পাপেই কোনো মঙ্গল নেই। সাময়িক অস্থিরতা এবং চিরস্থায়ী ক্রন্দন। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, রামাদান উপলক্ষ্যে আল্লাহ অগণিত বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দেন। আসুন আমরা সকল গোনাহ থেকে তাওবা করে এ সকল মুক্তিপ্রাপ্তদের দলে নিজেদের নাম লিখিয়ে নিই।

অন্তরের বেদনা, অনুশোচনা ও অনুতাপ নিয়ে তাওবা করার অর্থ অতীতের পাপের পাতা মুছে যাওয়া। আমরা অনেকে সিদ্ধান্ত নিই যে, রামাদানে অমুক অমুক পাপ করব না। রামাদানের পরে আবার পাপ করব বলেই মনের মধ্যে ধারণা থাকে। এতে তাওবা হয় না এবং অতীতের পাপের বোঝা মাথায় থাকে। শুধু রামাদান পাপটা হলো না। কিন্তু যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, রামাদান উপলক্ষে আল্লাহ তাওবা করলাম, আমি এ সকল পাপ আর করব না। তাহলে অতীতের পাপ ক্ষমা হলো এবং পাপের পাতা মুছে গেল। বান্দা নিষ্পাপ হয়ে গেলেন। এরপর যদি আবার শয়তানের প্ররোচনায় বা প্রবৃত্তির তাড়নায় আবার পাপ করেন, তবে আবারো তাওবা করবেন। এতে পূর্বের পাপ আর ফিরে আাসবে না।

পাপ যত কঠিনই হোক আন্তরিকভাবে তাওবা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন বলে ওয়াদা করেছেন। কুরআন ও হাদীসে বারংবার তা বলা হয়েছে। তবে যে পাপের সাথে বান্দার হক্ক থাকে সে পাপের বান্দার পাওনা আল্লাহ ক্ষমা করেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যদি কারো যিম্মায় অন্য কারো প্রতি কোনো জুলুম জনিত হক্ক থেকে থাকে, তা সম্মান নষ্ট করার কারণে বা অন্য যে কোনো কারণে, তবে সে যেন আজই তার থেকে বিমুক্ত হয়, সেই দিন আসার আগেই যে দিন কোনো টাকা-পয়সা দীনার দিরহাম থাকবে না। যদি তার কোনো নেক আমল থাকে তবে তা থেকে তার জুলুম বা অন্যায় অনুসারে গ্রহণ করা হবে। আর যদি তার নেক কর্ম না থাকে তবে তার সঙ্গীর (ক্ষতিগ্রস্থের বা মাজলূমের) পাপরাশী নিয়ে তার উপর চাপানো হবে।” (বুখারী, আস-সহীহ ২/৮৬৫, ৫/২৩৯৪।)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে প্রশ্ন করেন, হত-দারিদ্র দেউলিয়া কে তা কি তোমরা জান? তাঁরা বলেন, যার কোনো টাকপয়সা সহায় সম্পদ নেই সেই তো দরিদ্র দেউলিয়া। তিনি বলেন: আমার উম্মতের দেউলিয়া তো সে ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো অপবাদ ছড়িয়েছে, কারো সম্পদ ভক্ষণ করেছে, কারো রক্তপাত করেছে। তখন এদেরকে তার সাওয়াব থেকে দেওয়া হবে। পাওনা শেষ হওয়ার আগেই তার সাওয়াব ফুরিয়ে গেলে পাওনাদারদের গোনাহ নিয়ে তার উপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৯৯৭।)

বড় ভয়ঙ্কর কথা। কত কষ্ট করে আমরা সালাত, সিয়াম, যাকাত, ফিতরা ইত্যাদি ইবাদত পালন করছি। কিয়ামতের সে কঠিন দিনে যদি আমাদের সকল সাওয়াব অন্যরা নিয়ে নেয়, আর আমাদেরকে পরের পাপ নিয়ে জাহান্নামে যেতে হয় তবে এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছুই হতে পারে না। আমাদের সাবধান হওয়া দরকার। আল্লাহর কাছে যে অপরাধই করি না কেন, কোনো বান্দার হক্ক যেন আমাদের দ্বারা নষ্ট না হয়। যদি নষ্ট হয়ে থাকে তবে এখনই তা ফিরিয়ে দিয়ে বা যে কোনোভাবে ক্ষমা নিয়ে নিতে হবে। আল্লাহ আমদের সবাইকে তাওফীক দিন আমিন।