প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১২ম সংখ্যা, জুন ২০১৬, শাবান-রমাদান ১৪৩৭ হিজরী, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

দৈনিক সমকাল
১৩ মে ২০১৬

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদিস বিভাগের অধ্যাপক, জনপ্রিয় টিভি আলোচক ড. খোন্দকার আ ন ম আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর গত বুধবার (১১ মে) মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)।

ড. জাহাঙ্গীর ঝিনাইদহ জেলার ধোপাঘাট গোবিন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম খোন্দকার আনওয়ারুজ্জামান ও মা বেগম লুৎফুন্নাহার। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৭৩ সালে দাখিল, ১৯৭৫ সালে আলিম ১৯৭৭ সালে ফাজিল ও ১৯৭৯ সালে হাদীস বিভাগ থেকে কামিল পাস করেন। তার বিশেষ শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মিয়া মুহাম্মদ কাসেম ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সাবেক খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.)। এরপর তিনি সৌদি আরবের রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে অনার্স, ১৯৯২ সালে মাস্টার্স ও ১৯৯৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় তিনি বর্তমান সৌদি বাদশাহ ও তৎকালীন রিয়াদের গভর্ণর সালমানের হাত থেকে দুবার সেরা ছাত্রের পুরষ্কার গ্রহণ করেন।

সৌদিতে তিনি শায়খ বিন বায, বিন উসায়মিন, আল জিবরিন ও আল ফাউজানসহ বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের সান্নিধ্যে থেকে ইলমে হাদিসের ওপর বিশেষ শিক্ষা অর্জন করেন। বর্তমান সৌদি আরবের অনেক বড় আলেম ও ইসলামী স্কলার তার সহপাঠী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামী সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে প্রায় ৩ বছর কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তিনি ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইসলামী বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর সৌদি আরবে শিক্ষা শেষে বড় বড় পদে চাকরির প্রস্তাব উপেক্ষা করে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। বৈবাহিক জীবনে ফুরফুরা শরিফের পীর আবদুল কাহ্হার সিদ্দিকীর মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের চার সন্তান। রিয়াদের আল ইমাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত একমাত্র ছেলে উসামা ছাড়াও তিন মেয়ে রয়েছে।

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর দেশে এসে ইসলাম প্রচারসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট প্রতিা করেন। পেশায় তিনি ছিলেন শিক্ষক। ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক ষ্টাডিজ বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালে তিনি একই বিভাগে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। পাশাপাশি তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দারুস সালাম মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন শায়খুল হাদিস হিসেবে সহিহ বোখারির র্দস দিতেন। এর বাইরে তিনি ছিলেন ওয়াজ মাহফিলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আলোচক। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তিনি মানুষকে শোনাতেন শাশ্বত ইসলামের বিশুদ্ধ বাণী। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের শীর্ষ জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক ছিলেন তিনি।
বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সমাজ সংস্কার, গবেষণা ও শিক্ষামূলক ৫০-এর অধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তার লিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো- এহয়াউস সুনান, রাহে বেলায়েত, হাদিসের নামে জালিয়াতি, ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ইত্যাদি।
মরহুম আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সদালাপী, বিনয়ী, উম্মাহর জন্য দরদি, মুখলিস, পরমত সম্মানকারী, যুগসচেতন, ভারসাম্যপূর্ণ, উম্মাহর ঐক্য ভাবনায় বিভোর, প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিত হিসেবে সব মহলে সমাদৃত ছিলেন। দেশজুড়ে তার হাজার হাজার গুণগ্রাহী ও ভক্ত রয়েছেন।

মহান রবের কাছে দোয়া করি, তিনি যেন এই মহান কর্মবীর ও আমাদের চোখে মহৎ ব্যক্তিকে আপন মাগফিরাত ও রহমতের চাঁদরে ঢেকে নেন। তার বিকল্প এই উম্মাহকে দান করুন। তার ভালো গুণগুলো দিয়ে আমরা যেন নিজেদের সাজাতে পারি – সেই সৌভাগ্য হোক সবার।

লেখক–
মাওলানা আহমাদুল্লাহ সাবেক মাদ্রাসা শিক্ষক ও ইমাম, বর্তমান ফিচার অ্যান্ড ট্রান্সলেটর, পশ্চিম দাম্মাম ইসলামী সেন্টার, সৌদি আরব