প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
আবাহনী/আবাহন
মন্ত্রোচ্চারণ দ্বারা দেবতাকে আমন্ত্রণ হচ্ছে আবাহন। দেবতাকে আবাহন করার নিমিত্ত করপুট ও অঙুলীর কৃত ও স্তব বা গান। মুসলিম সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে কোন মুসলিম ক্রীড়াচক্রের বা দলের নাম তা হতে পারে না, যে দলে শতকরা ৯৮ জন রয়েছেন মুসলমান খেলোয়াড়।
উৎসর্গ
উৎসর্গ সংস্কৃত ভাষার একটি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ অর্পণ। এ অর্পণ স্বত্বত্যাগ করে অর্পণ। এ অর্পণ দেবতাকে অর্পণ। উৎসর্গ যখন জীবন দানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়, তখনও এ উৎসর্গে দেবতার ছায়া থাকে, আমেজ থাকে। ধনদৌলত উৎসর্গের প্রেক্ষাপটও তাই। সংস্কৃত ভাষায় এমন কতিপয় শব্দ আছে, যেগুলো শুধু ধর্মীয় কারনে ব্যবহার হয়, উৎসর্গ তন্মধ্যে একটি। হিন্দু ধর্মে আছে, মানুষের অন্তুরে নারায়নের আসন। এ জন্য তাদের শাস্ত্রীয় পণ্ডিতের অভিমত হচ্ছে এই, নারায়ন-প্রেম অন্তরে নিয়ে কোন মানুষকে কিছু দান করলেও তা উৎসর্গ হয়ে যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই শাস্ত্রীয় বিধান সীমাবদ্ধ থাকার কথা।
অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ এবং ইসলামী সংস্কৃতি-সচেতন ব্যক্তিত্ব হিন্দুদের শাস্ত্রীয় নারায়ন-দর্শনের বেখেয়াল ও অসচেতন অনুসরণ করতে গিয়ে নিজেদের লেখা বই তাদের স্ব স্ব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বা স্নেহভাজন স্বজনকে উৎসর্গ করে থাকেন। খুব ভালো কথা, সে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখাতে পারেন, কিন্তু উৎসর্গ শব্দ ব্যবহার করে কেন তা করা হয়? এ শব্দ ব্যবহারে সবই যে বরবাদ হয়ে যায়। দেবতার জন্য যে শব্দটি নির্ধারিত, তাতে মুসলমানরা কেন হাত বাড়ান? দেবতাপন্থীরা তো মুসলমানদের থেকে কিছু নেয় না, মুসলমানদের শব্দ ভাণ্ডার থেকে তারা পারতপক্ষে কোন শব্দ আহরণ করে না।
মুসলমানরা হিন্দু ধর্মের শব্দ ভাণ্ডার থেকে উৎসর্গের মতো শব্দ গ্রহণ ও ব্যবহার করেন কেন, তা বুঝলাম না। মুসলমানদের শব্দ ভাণ্ডারে শব্দের কি এতই আকাল চলছে যে, উৎসর্গ শব্দের কোন বিকল্প বা প্রতিশব্দ নেই? যদি না থাকে তাহলে ভিন্ন কথা আর যদি থাকে তাহলে কেন ভিক্ষুকের মত তা হাত বাড়িয়ে অপর থেকে গ্রহণ করেন?
বাংলাদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক ইসলামের অর্থনীতির ওপর এক পুস্তক লিখে উৎসর্গ করেছেন নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। স্বীকার করি, অধ্যাপক সাহেবের নবী-প্রেম অত্যন্ত প্রগাঢ়। নতুন রেওয়াজের প্রবর্তন করেছেন। কিন্তু আবেগ তার এতো বেশি যে, দেবতার জন্য যে শব্দ অন্য ধর্মাবলম্বীরা ব্যবহার করে থাকেন, তিনি সেই শব্দ ব্যবহার করেছেন নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলায়। এ ক্ষেত্রে তিনি স্বকীয় সংস্কৃতির বিধি বিধান লংঘন করেছেন। আবেগের খুব বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না?
বই লিখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে উৎসর্গের মানেটা কি? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি দুনিয়ার প্রথাগত সম্মান ও শ্রদ্ধার মুখাপেক্ষী? সমাজের আর দশজনের মতো তাকে সম্মান প্রদর্শন কি সঠিক হলো? অন্য কেউ হয়তো এই অধ্যাপকের অনুসরন করতে গিয়ে তার বই আল্লাহর নামে প্রথাগত ধারায় উৎসর্গও করতে পারেন। যদিও এই সিলসিলা চালু হয়ে যায়, তাহলে অবস্থাটা আখেরে কি দাঁড়াবে? এ আবেগ যদি নেক আবেগ, কিন্তু তা প্রকাশের একটা চৌহদ্দি তো থাকবে, একটি বিধি থাকবে। কিন্তু এই অধ্যাপকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শুধু আবেগ আর তার নেক নিয়ত, কিন্তু চৌহদ্দি বা আবেগ প্রকাশের বিধি-মান্যতাকে দেখা যাচ্ছে না। এই অধ্যাপক সাহেব বড় অক্ষরে উৎসর্গ লিখে এর নিচে লিখেছেন, মানবতার মুক্তিদূত মহানবী মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। তিনি এ স্থানে লেখতে পারতেন যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত অর্থ ব্যবস্থা বিশ্বে প্রবর্তনের জন্য নিরন্তর সংগ্রামে রত, এই পুস্তকখানা তাদেরই স্মরণে নিবেদিত, অথবা অনুরূপ কিছু লিখতে পারতেন।
প্রথম কথা হলো, তিনি অর্থাৎ এই অধ্যাপক সাহেব উৎসর্গ -এর যে ধারা চালু করেছেন, তা ইসলামী ঈমান-আক্বিদা সমর্থিত কিনা? দ্বিতীয় কথা হলো, দেবতার জন্য উৎসর্গ শব্দের যে ব্যবহার তা নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলায় ব্যবহার করা যায় কিনা। ইসলামসহ বিশ্বের প্রধান কয়েকটি ধর্মের নিজস্ব পরিভাষা আছে। হিন্দু ধর্মেরও নিজস্ব পরিভাষা আছে, উৎসর্গ তন্মধ্যে একটি। যেমন ইসলামের অযু, শুধু মুসলমানদের পবিত্রতার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়, অন্য ধর্মাবলম্বীরা এই অযু ব্যবহারের কোন সুযোগ বা ব্যবস্থাই নেই। সুতরাং উৎসর্গ প্রসঙ্গে তাই বলা যায়, দেবতার জন্য যে শব্দ, তা নবী মোস্তফার ক্ষেত্রে কি ব্যবহার করা যায়? তৃতীয় কথা হলো, উৎসর্গ শব্দটি তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে ব্যবহার করে কি বেয়াদবী করেননি?
শেষ কথা হলো, উৎসর্গ পৃায় নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরুদ ও সালাম পেশ করলে কি সবচেয়ে ভালো হতো না? অধ্যাপক সাহেব অবশ্য জানেন, দেবতাকে যা উৎসর্গ করা হয়, তা ফিরিয়ে নেয়ার বিধান নেই এবং ফিরিয়ে নেয়াও হয় না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেবতা নন, তিনি রাসূল এবং সর্বশ্রে রাসূল, সর্বশ্রে মানুষ। এই সর্বশ্রে নবীকে তিনি যা উৎসর্গ করলেন, তা তিনি বাজারজাতও করেছেন, বই বিক্রয়লব্ধ অর্থও নিচ্ছেন, বইখানা ফি সাবিলিল্লাহ বিতরণ করছেন না। অতএব বলা যায়, তার উৎসর্গ শব্দের স্বত্ব ত্যাগের অর্থে ও লক্ষ্যে প্রয়োগও হয়নি। তাহলে তিনি কি করলেন? দেবতার ফুল হাতে নিয়ে তিনি নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে প্রকারান্তরে নবীকে কি অসম্মান করলেন না? সত্যকে আবেগের ঊর্ধে উঠে বোঝার তওফিক আল্লাহ তাকে দিন, তার জন্য আমার এই মোনাজাত।
উৎসর্গ শব্দের পরিবর্তে আমাদের শব্দ ভাণ্ডারে অনেক শব্দ আছে। আমরা নজরানা শব্দ ব্যবহার করতে পারি। নজরানা আরবী শব্দ। এর ইংরেজি তরজমা হচ্ছে A Present to superiors। আমরা ব্যবহার করতে পারি তোহফা ও হাদিয়া শব্দ।
মুসলমানদের জন্য উৎসর্গ শব্দটি অপসংস্কৃতিমূলক শব্দ। সাধারণ অর্থে এর ব্যবহার শুধু আপত্তিকর নয়, কবীরা গুনাহও বটে। নজরানা, তোহফা, হাদীয়া এসব শব্দ ব্যবহার যদি ভালো না লাগে, এসব শব্দে যদি মৌলবাদী গন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে উৎসর্গ পৃায় আমরা লেখতে পারি, শ্রদ্ধা বা স্নেহের নিদর্শণ স্বরূপ…, অমুকের দস্ত মুবারকে বা অমুকের স্মৃতির স্মরণে ইত্যাদি। যার বেলা যেটা প্রযোজ্য তা আমরা ব্যবহার করতে পারি। উৎসর্গ শব্দটি শুধু ঈমান-আক্বিদা বিরোধীই নয়, এ শব্দকে স্বীকার করে নেয়া মানে সেই শব্দ-সংস্কৃতির জাত-গোীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া। কলিকাতার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কয়েকটি উপন্যাসে দেখলাম, স্মরণে শব্দ ব্যবহার, উৎসর্গ ব্যবহার করেননি তিনি।
ত্যাগের ক্ষেত্রে যখন উৎসর্গ শব্দ ব্যবহারের আবেগ আসবে, তখন আমরা কুরবান বা কুরবানী শব্দ ব্যবহার করতে পারি। জীবন উৎসর্গ করা আর জীবন কুরআন করা মোটেই এক অর্থবোধক নয়। দেবতার উদ্দেশে জীবন উৎসর্গ করা মানে বলি হওয়া আর আল্লাহর রাহে জীবন কুরবান করা মানে শহীদ হওয়া। মৃত্যু মতো উভয় ক্ষেত্রে অবধারিত, কিন্তু ষ্টেটাসে আসমান-জমিন ফারাক। উৎসর্গ শব্দ ব্যবহারে এখন থেকে আমরা যেন সতর্ক হই।
