প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

পাঠক, এখন জিহ্বার অন্যান্য দোষের কথা শুনুন। সহীহ বোখারি ও মুসলিমে আছে, যদি একজন লোক অন্য লোককে ফাসেক (পাপী) কিম্বা কাফের বলিয়া গালি দেয়, ঐ ক্ষেত্রে যদি দ্বিতীয় ব্যক্তি তদ্রুপ না হয়, তবে উক্ত কথা প্রথম ব্যক্তির উপর পতিত হইবে।
আলমগীরীতে আছে, যদি একজন লোক কোন মুসলমান ভ্রাতাকে কাফের বলে এবং এই দ্বিতীয় লোকটি কোন উত্তর প্রদান না করে, তবে ফকিহ আবুবকর আ’মাশ বারাখির মতে প্রথম ব্যক্তিই কাফের হইবে। বালাখের অন্যান্য এমামগণ বলেন যে, প্রথম ব্যক্তি কাফের হইবে না। ফৎওয়া গ্রাহ্যমতে যদি এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি তাহাকে কাফের ধারণা না করিয়া থাকে, বরং গালি দেওয়া ধারণায় ঐরূপ বলিয়া থাকে, তবে সে (গোনাহাগার) হইবে, কাফের হইবে না, আর যদি তাহাকে কাফের হইবার ধারণায় এরূপ বলিয়া থাকে, তেবে সে কাফের হইয়া যাইবে।-জখিরা।
আবু দাউদ ও তিরমিযী এই হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন, তোমরা কোন লোককে অভিসম্পাত প্রদান করিও না, আল্লাহর কোপ ও দোজখের অভিশাপ দিও না।

সহীহ বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, কাহাকে আল্লাহর শত্রু বলিও না। মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসিকি কার্য (গোনাহ)।

দোর্রে মোখতারে আছে,-‘যদি কেহ কোন মুসলমানকে পিশাচ, ফাসেক, চোর, বিশ্বাসঘাতক, নির্বোধ, ডাকাত, কোটনা, ভেড়–য়া, মদ্যপায়ী, কুশীদজীবি (সুদখোর), বেশ্যাপত্র, কাফেরপুত্র, জারজ, গর্ধভ, কুকুর, শূকর, বানর, বলদ ও সর্প ইত্যাদি বলিয়া গালি দেয়, তবে এইরূপ কটুভাষা প্রয়োগকারীকে তিন হইতে ৩৯ বেত মারিতে হইবে।’
তিরমিযী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন, ‘ঈমানদার ব্যক্তি নিন্দাকারী, অভিসম্পাত প্রদানকারী, কটুভাষী ও অশ্লীল ভাষা প্রয়োগকারী হইবে না।

আবু দাউদের বর্ণনা,-যখন কোন ব্যক্তি কোন বস্তুর উপর অভিসম্পাত (লানত) প্রদান করে, তখন উক্ত অভিসম্পাত আকাশের দিকে উত্থিত হইতে থাকে, আকাশের দ্বারসমূহ রুদ্ধ হইয়া যায়, অনন্তর উক্ত অভিসম্পাত ভূমির দিকে অবতীর্ণ হয়, তখন ভূমির ছিদ্রসমূহ বন্ধ হইয়া যায়, সে সময়ে উহার ডাইন ও বাম দিক ভ্রমণ করিতে থাকে, যখন কোনপ্রবেশ-পথ প্রাপ্ত না হয়, যাহার প্রতি অভিসম্পাত করা হইয়াছে, তাহার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যদি সে ব্যক্তি উপযুক্ত হয় তবে তাহার উপর পতিত হয়, নচেৎ উহা অভিসম্পাত প্রদানকারীর উপর পতিত হয়।

আবু দাউদ ও তিরমিযীর বর্ণনা-এক ব্যক্তি বায়ুর উপর অভিসম্পাত প্রয়োগ করিয়াছিল, তৎশ্রবণে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছিলেন যে, বায়ুকে অভিসম্পাদ করিও না, কেননা, উহা আল্লাহর হুকুমে প্রবাহিত হয়, যে ব্যক্তি কোন নির্দোষ বস্তুর প্রতি অভিসম্পাত প্রদান করে, সে নিজেই অভিসম্পাতগ্রস্ত হইয়া যায়।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা-‘লোকে যে ব্যক্তিকে তাহার অশ্লীল ভাষার ভয়ে পরিত্যাগ করে, সে ব্যক্তি বিচার দিবসে আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হইবে।’

মিথ্যা বাক্য বলা
তোমরা সত্য কথা বল, কেননা, সত্য কথা তোমাদিগকে (নেকীর) পথ প্রদর্শন করিবে এবং (নেকী) তোমাদিগকে বেহেশতের পথ প্রদর্শন করিবে। মানুষ সর্বদা সত্য কথা বলিতে থাকে এবং সত্য কথা বলার প্রয়াস পাইতে থাকে, এমন কি, আল্লাহ তায়ালার নিকট সত্যবাদী বলিয়া লিখিত হয়। তোমরা মিথ্যাকথা হইতে বিরত থাক, কেননা, মিথ্যা তোমাদিগকে অসৎকার্যের পথ প্রদর্শন করে এবং অসৎকার্য তোমাদিগকে দোজখের পথ প্রদর্শন করে। মনুষ্য সর্বদা মিথ্যা কথা বলিতে থাকে এবং মিথ্যা কথা বলিতে প্রয়াস পাইতে থাকে, এমন কি আল্লাহর নিকট মিথ্যাবাদী নামে অভিহিত হয়।’

ইমাম তিরমিযীর বর্ণনা;-যে ব্যক্তি বাতিল মিথ্যা বাক্য ত্যাগ করে, তাহার জন্য বেহেশতের এক পার্শ্বে অট্টালিকা নির্মাণ করা হইবে, আর যে ব্যক্তি সত্যপরায়ণ হইয়াও কলহ করা ত্যাগ করে, তাহার জন্য বেহেশতের মধ্যদেশে প্রাসাদ (বালাখানা) প্রস্তুত করা হইবে, আর যে ব্যক্তি চরিত্র গঠন করে, তাহার জন্য বেহেশতের উচ্চ স্থানে গৃহ নির্মাণ করা হইবে।’

‘যখন মনুষ্য মিথ্যা বাক্য বলে, তখন উক্ত মিথ্যা বাক্যের দুর্গন্ধে ফেরেশতা এক মাইল দূরে চলিয়া যান।’
ইমাম আহমদের বর্ণনা-বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যা ব্যতীত মুসলমানের সকল প্রকার চরিত্র হইতে পারে।
ইমাম মালেকের বর্ণনা- হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, ঈমানদার ব্যক্তি কি ভীরু হইয়া থাকে? তদুত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, হ্যাঁ হইতে পারে, তৎপরে তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, ঈমানদার ব্যক্তি কি মিথ্যাবাদী হইতে পারে? তিনি বলিয়াছেন যে, না।’

ইমাম মুসলিমের বর্ণনা-আল্লাহ কেয়ামতের দিবস যে তিন ব্যক্তির সহিত কথা বলিবেন না, যাহাদিগকে গোনাহ মুক্ত করিবেন না এবং যাহাদের দিকে দৃষ্টিপাত করিবেন না, তাহাদের মধ্যে মিথ্যাবাদী বাদশাহ একজন।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা-যে ব্যক্তির মধ্যে চারিটি রীতি থাকে, সে বিশুদ্ধ মোনাফেক (কপট), যাহার মধ্যে উহার একটি রীতি আছে, তাহার মধ্যে মোনাফেকের একটি চিত্র আছে, তাহার নিকট কোন বস্তু গচ্ছিত রাখিলে সে উহা নষ্ট করে, কথা বলিতে গেলে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করিলে উহা পূর্ণ করে না এবং বচসা করলে অশ্লীল কথা বলে।

আবু দাউদের বর্ণনা;-‘আবদুল্লাহ নামক একটি লোক হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর সহিত ক্রয়-বিক্রয় করিয়া বলিয়াছিল যে, আপনি এই স্থানে দণ্ডায়মান হউন, আমি আসিতেছি। আবদুল্লাহ তিন দিবস হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা ভুলিয়াছিল, তৎপরে সেইস্থানে আসিয়া হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তথায় দেখিল, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তুমি আমাকে কষ্টে নিক্ষেপ করিয়াছিলে।

এস্থলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অঙ্গীকার পূর্ণ করার চূড়ান্ত নিদর্শন প্রদর্শন করিয়াছেন।
তিরমিযীর বর্ণনা, ‘ইবনে আমের বলেন, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের গৃহে উপবেশন করিয়াছিলেন, এমতাবস্থায় আমার মাতা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, এস, তোমাকে কিছু দিব। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তুমি কি দিবার ইচ্ছা করিয়াছিলে? তিনি বলিলেন, একটি খোরমা দিবার ইচ্ছা করিয়াছিলাম? তিনি বলিলেন, যদি তুমি তোমার পুত্রকে উহা প্রদান না কর, তবে তোমার জন্য একটি মিথ্যা কথার গোনাহ লেখা যাইবে।’

আবু দাউদ ও তিরমিযীর বর্ণনা,- যে ব্যক্তি তাহার ভ্রাতার সহিত অঙ্গীকার করে এবং অঙ্গীকার পূর্ণ করার তাহার একান্ত ইচ্ছা থাকে, (কোন আপত্তি বশতঃ) নির্দিষ্ট সময়ে উহার পূর্ণ করিতে পারিল না, এক্ষেত্রে তাহার গোনাহ হইবে না।’
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা-‘হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, আমার সময় তাবিয়িদিগের সময় ও তাবা-তাবিয়িদিগের সময় উত্তম; তৎপরে একদল লোক হইবে-তাহারা সাক্ষ্য প্রদান করিবে অথচ তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হইবে না, তাহারা শপথ করিবে অথচ তাহাদের শপথ গ্রাহ্য করা হইবে না।’

‘যে ব্যক্তি শপথ করিয়া মুসলমান ভ্রাতার স্বত্ব (হক) নষ্ট করে, আল্লাহ তায়ালা তাহার জন্য বেহেশত হারাম করিবেন।’
ইমাম বোখারীর বর্ণনা,-‘ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ফেরেশতার হস্তে একখণ্ড লৌহের আকর্ষণী দেখিয়া ছিলেন, তিনি উহা একজন লোকের মুখের একদিকে প্রবেশ করাইয়া দিয়া উহা কর্তন করিয়া গ্রীবাদেশ পর্যন্ত লইয়া যাইতেছিলেন, তৎপরে অন্য দিকে ঐরূপ করিতেছিলেন। একদিক কর্তন করিয়া ফেলিলে তৎক্ষণাৎ উহা সুস্থ হইয়া যাইতেছিল, এইরূপ কিয়ামত পর্যন্ত করিতে থাকিবেন। এই ব্যক্তি মিথ্যা বাক্য বলিত এবং তাহার এই মিথ্যা দেশময় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল।’

‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথাকে আমার হাদীস বলিয়া ‘প্রকাশ করে, সে যেন দোজখে নিজের স্থান নির্দেশ করিয়া রাখে।’-হাদিস।

ইমাম মুসলিমের বর্ণনা- যে ব্যক্তি যাহা শ্রবণ করে, এবং তাহাই প্রকাশ করে, সেই ব্যক্তিও মিথ্যাবাদীদের দলভুক্ত। -হাদীস

যে ব্যক্তি জ্ঞানগোচরে জাল কথাকে আমার হাদীস বলিয়া প্রকাশ করে, সে ব্যক্তিও মিথ্যাবাদী।-হাদীস।
মনে রাখিবেন, উপদেষ্টা বিদ্বানগণ যেন বিশ্বাসযোগ্য কেতাব বা সনদ ব্যতীত যে সে কেতাবের কিম্বা বিনা সনদের হাদীস প্রকাশ করিয়া জাহান্নামী না হন।