প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
(২য় সংখ্যার পর)
তৃতীয় দোষ : পরনিন্দা
আলকোরআনে পরনিন্দার সম্বন্ধে বর্ণিত আছেঃ তোমাদের একজন যেন অন্যের নিন্দাবাদ না করে, তোমাদের একজন কি নিজের মৃত ভ্রাতার গোশ্ত ভক্ষণ পছন্দ করে? অন্তত তোমরা উহা না পছন্দ করিয়া থাক।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা তোমারা মন্দ ধারণা হইতে বিরত থাক, কোন না মন্দ ধারণা অতি মিথ্যা হইয়া থাকে। তোমরা পরছিদ্র অনুসন্ধান করিও না, লোককে কলহ করিতে উত্তেজিত করিও না। পরস্পর দ্বেষ, হিংসা করিও না এবং পরনিন্দা করিও না। তোমরা খোদাতায়ালার সেবক, একে অন্যের ভ্রাতা হইয়া যাও।
ইমাম মোছলেমের বর্ণনা এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই, যেন একে অন্যের উপর অত্যাচার না করে, একে অন্যের সাহায্য করিতে ক্রটি না করে এবং একে অন্যকে ঘৃণা না করে। হযরত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুকের দিকে তিনবার ইশারা করিয়া বলিলেন যে, এই স্থলে পরহেজগারী। মনুষ্যের মন্দ হইবার ইহাই যথে লক্ষণ যে, সে আপন মুসলমান ভ্রাতাকে ঘৃণা করে। মুসলমানের রক্তপাত করা এবং অর্থ ও সন্ত্রম ন করা প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে হারাম।
হযরত বলিলেন তোমরা কি জান যে, গিবত (পরনিন্দা) কাহাকে বলে? তাঁহারা বলিলেন, খোদা ও রছুল অধিক জানেন। ইহাতে তিনি বলিলেন, যাহা তোমার ভ্রাতা না পছন্দ করে, তাহা তাহার অনুপস্থিতিতে বলিলে গিবত করা হয়। কেহ বলিলেন যাহা আমি বলি তাহা যদি আমার ভ্রাতার মধ্যে থাকে তবে কি উহা গিবত হইবে? হযরত বলিলেন, যাহা আমি বলি তাহা যদি আমার ভ্রাতার মধ্যে থাকে তবে কি উহা গিবত হইবে? আর যাহা তোমার ভ্রাতার মধ্যে না থাকে যদি তুমি তাহা বল, তবে তুমি বোহতান (মিথ্যা অপবাদ) করিলে।
আবু দাউদের বর্ণনা, হযরত বলিয়াছেন, একজন ছাহাবা অন্য হইতে কোন কথা যেন আমার নিকট উপস্থিত না করেন; কেননা আমি উদার চিত্তে তোমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাসনা করি।
আবু দাউদ ও তিরমিজির বর্ণনা হযরত আয়শা (রঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলিয়াছিলাম যে, ইহা আপনার পক্ষে যথে কলঙ্কের বিষয় যে আপনার স্ত্রী ছুফিয়া এইরূপু বেঁটে। তৎশ্রবণে হুজুর বলিলেন, তুমি এরূপ কথা বলিয়াছ যে, যদি উহা সমুদ্রের সহিত মিশ্রিত করিতে, তবে উহা সমুদ্রকে বিস্বাদ করিয়া দিত।
তিরমিজির বর্ণনা, যদিও আমার এত পার্থিব সম্পদ হয়, তথাপি আমি একজনের অবস্থার প্রতি বিদ্রুপ করিতে ভালবাসি না।
তুমি তোমার ভ্রাতার দুঃখের উপর আনন্দ প্রকাশ করিও না, কেন না খোদা তোমাকে বিপন্ন করিবেন এবং তোমার ভ্রাতার উপর অনুগ্রহ প্রকাশ করিবেন। আবু দাউদের বর্ণনা, যে ব্যক্তি একজন নিন্দুকের আক্রমণ হইতে কোন মুসলমানের সন্ত্রমকে রক্ষা করে, খোদাতায়ালা একজন ফেরেশ্তাকে প্রেরণা করিবেন যেন তাহার গোশ্তকে দোজখের অগ্নি হইতে রক্ষা করেন। যে ব্যক্তি একজন মুসলমানের লাঞ্ছনার উদ্দেশ্যে তাহার অযথা অপবাদ প্রচার করে, খোদাতায়ালা তাহাকে দোজখের সেতুর উপর আবদ্ধ করিয়া রাখিবেন যতক্ষণ না সে উহার প্রতিফল ভোগ করে।
তিরমিজির বর্ণনাঃ তোমরা মুসলমানদিগকে ক দিও না, তাহাদিগকে ভৎসনা করিও না এবং তাহাদের ছিদ্রানুসন্ধান করিও না;কেননা যে ব্যক্তি আপন মুসলমান ভ্রাতার ছিদ্রানুসন্ধান করে। খোদাতায়ালা তাহার ছিদ্রানুসন্ধান করেন এবং খোদাতায়ালা তাহার ছিদ্রনুসন্ধান করেন তাহাকে লাঞ্ছিত করেন।
আবু দাউদের বর্ণনা হযরত বলিয়াছেন, যে সময় আমার প্রতিপালক আমাকে মেরাজে উত্থাপন করিয়াছিলেন। সেই সময় আমি একদল লোকের নিকট উপস্থিত হইয়াছিলাম। তাহাদের নখগুলি তাম্রের ছিল, তাহারা তদ্বারা আপন আপন মুখমণ্ডল ও বক্ষের গোশ্ত ছিন্ন করিতেছিল, আমি তাহাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলাম। হযরত জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন যে, ইহারা মনুষ্যের নিন্দাবাদ ও সম্ভ্রম ন করিত।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা, হযরত দুইটি গোরের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, এই দুইটি লোক শাস্তি ভোগ করিতেছে। তাঁহারা বলিলেন কি জন্য? হুজুর বলিলেন, একজন এক পক্ষের কথা অন্য পক্ষের নিকট প্রকাশ করতঃ কলহের সৃি করিয়া দিত এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রস্রাব হইতে পরিচ্ছন্ন থাকিত না।
ইমাম বায়হকির বর্ণনা তোমরা পরনিন্দা হইতে বিরত থাক; কেননা পরনিন্দা ব্যভিচার হইতে কঠিনতর কেননা মনুষ্য ব্যভিচার করিয়া তওবা করিলে খোদাতায়ালা উহা মার্জনা করেন, কিন্তু পরনিন্দুক যাহার নিন্দা করে, যতক্ষণ সে ব্যক্তি তাহাকে ক্ষমা না করে, ততক্ষণ খোদা তাহাকে ক্ষমা করেন না।
ইমাম গাজ্জালী বর্ণনা করিয়াছিলেন, এক দেরহাম সুদ গ্রহণ করা খোদার নিকট ৩৬ বার ব্যভিচার করা অপেক্ষা কঠিনতর গোনাহ এবং মুসলমানদের সম্ভ্রম ন করা সুদ অপেক্ষা কঠিনতম গোনাহ্!
একজন লোক হযরতের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিল যে, হুজুর আমার পরিজনের মধ্যে দুইটি যুবতী স্ত্রীলোক রোজা রাখিয়াছিল, তাহারা আপনার নিকট উপস্থিত হইতে লজ্জা বোধ করিতেছে, আপনি তাহাদের উভয়কে ইফতার করিতে অনুমতি দিন। হযরত তাহার কথা অগ্রাহ্য করিলেন, তৎপরে সে ব্যক্তি পুনরায় আবেদন করিল, হুজুর এবারও তাহার কথা অগ্রাহ্য করিলেন। তৎপরে সে ব্যক্তি হযরতের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল যে, তাহারা মরণাপন্ন হইয়াছে। তখন হযরত বলিলেন, তাহাদের দুইজনকে দুইটি পাত্রে বমি করিতে বল, তাহারা পুজ ও রক্ত বমি করিল। হযরত বলিলেন, ইহারা পরনিন্দা করিয়াছে, সেই হেতু এই রক্ত গোশ্ত বমি করিয়াছে। যদি উহা তাদের পেটে থাকিত, তবে তাহাদিগকে দোজখের অগ্নি দগ্ধীভূত করিত।
চতুর্থ দোষ : চোগলখুরি
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা যে কপট এক দলকে একরূপ কথা বলে, অন্য দলকে তদ্বিপরীত কথা বলে, তুমি কেয়ামতে তাহাকে সর্বাপেক্ষা নিকৃ করিবে।
যে ব্যক্তি দুই দলের মধ্যে দুই প্রকার কথা বলিয়া বিসম্বাদের সৃি করাইয়া দেয়া, এরূপ ব্যক্তি (বিচারান্তে) বেহেশ্তে প্রবেশ করিবে না।
যে ব্যক্তি দুই প্রকার কথা বলিয়া দুই দলের বিরোধ ভঞ্জন করিয়া দেয়, সে ব্যক্তি দোষী হইবে না।
দরমির বর্ণনা যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কপটতা প্রকাশ করে, বিচার দিবসে তাহার দুইটি অগ্নিময় জিহ্বা হইবে। ইমাম আহমদের বর্ণনা যাহারা দুই দলের মধ্যে বিসম্বাদ সৃি করণার্থে এক স্থানের কথা অন্য স্থানে লইয়া যায়, বন্ধুগণের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাইয়া দেয় এবং নির্দোষ লোকদের উপর অপবাদ প্রয়োগ করে, তাহারাই মনুষ্য কুলের মধ্যে নিকৃতম।
পঞ্চম দোষ : বিদ্রুপ করা
কোরআনপাকে আছে একদল লোক যেন অন্য দলের বিদ্রুপ না করে; ইহারা তাহাদের অপেক্ষা উত্তম হইতে পারে এবং একদল স্ত্রীলোক যেন অন্য স্ত্রীলোকদের উপর বিদ্রুপ না করে। ইহারা তাহাদের অপেক্ষা উত্তম হইতে পারে। আমি তোমাদিগকে শ্রেণী শ্রেণী দল দল এজন্য করিয়াছি যে তোমরা পরস্পরের পরিচয় লাভ করিতে পারিবে। নিশ্চয় খোদাতায়ালার নিকট অধিকতর ধার্মিক ব্যক্তিই শ্রেতর শরীফ (ভদ্র)।
ইমাম গাজ্জালী লিখিয়াছেন যাহারা মুসলমানদিগের উপর বিদ্রুপ করে, কেয়ামতে তাহাদের জন্য বেহেশ্তের প্রথম দ্বার উদঘাটন করা হইবে। তৎপরে তাহাদিগকে বলা হইবে যে, তোমরা বেহেশ্তের মধ্যে প্রবেশ কর। যখন তাহারা উক্ত দ্বারের অতি সন্নিকট হইবে, তখন উক্ত দ্বার রুদ্ধ করা হইবে। পুনরায় দ্বিতীয় দ্বার তাহাদের জন্য উদঘাটন করিয়া তাহাদিগকে বেহেশ্তের মধ্যে প্রবেশ করিতে বলা হইবে এবং পরক্ষণেই উহা বন্ধ করা হইবে। এইরূপ প্রত্যেক দ্বারের অবস্থা হইবে। তখন তাহারা বলিবে, হে খোদাতায়ালা কি জন্য এরূপ হইল? তদুত্তরে তিনি বলিবেন, যেমন তোমরা পৃথিবীতে মুসলমানদিগের উপর বিদ্রুপ করিয়াছিলে। তেমনি কেয়ামতে আমি তোমাদের সহিত বিদ্রুপ করিলাম।
ষষ্ঠ দোষ : লোক হাসানো
ইমাম তিমমিজি ও আবু দাউদের বর্ণনাট যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলিয়া একদল লোককে হাসাইবার চেষ্টা করে, তাহাদের জন্য কঠিন শাস্তি আছে।
ইমাম বায়হাকির বর্ণন যে ব্যক্তি লোককে হাসাইবার উদ্দেশ্যে কথা বলিতে অভ্যস্ত হইয়াছে, সে ব্যক্তি আকাশ ও ভুখণ্ডের দূরত্ব অপেক্ষা অধিকতর (দোজখের দিকে) অদোগামী হয়, নিশ্চয় মনুষ্যের পদস্খলন অপেক্ষা মুখ নিঃসৃত বাক্যের দোষ গুরুতর।
সপ্তম দোষ : তোষামোদ
ইমাম বায়হাকির বর্ণনা যে সময় কোন ফাছেকের (পাপিরে) প্রসংশা করা হয়, খোদাতায়ালা ক্রোধান্বিত হন এবং তজ্জন্য আরশ বিকম্পিত হইতে থাকে।
ইমাম মোছলেমের বর্ণনা যে সময় তোমরা প্রশংসাকারীদিগকে দর্শন কর, (সেই সময়) তাহাদের মুখমণ্ডলে মৃত্তিকা নিক্ষেপ কর। যাহারা তোষামোদ ভাবে সত্য মিথ্যা কথা দ্বারা লোকের প্রশংসা করতঃ অর্থ সংগ্রহ করার স্বভাব করিয়া লইয়াছে, তাহাদের জন্য এই হাদীসটি কথিত হইয়াছে।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা এক ব্যক্তি হযরতের সাক্ষাতে অন্য ব্যক্তির প্রশংসা করিয়াছিল, তৎশ্রবণে হযরত বলিয়াছিলেন যে তুমি তোমার ভ্রাতার মুণ্ডপাত করিলে। যদি কেহ অগত্যা তোমাদের কোন লোকের প্রশংসা করিতে চাহে তবে যেন এইরুপ বলে যে আমি এইরূপ ধারণা করি; কিন্তু খোদাতায়ালা (প্রকৃত অবস্থা) অবগত আছেন।
অষ্টম দোষ : অনর্থক বাক্য ব্যয়
অম ইমাম মালেক ও আহমদের বর্ণনা মনুষ্যের ইসলামের সৌন্দর্য্য, অনর্থক বিষয় ত্যাগ করা।
ইমাম তিরমিজির বর্ণনা একজন সাহাবা মৃত্যপ্রাপ্ত হইছিলেন, ইহাতে এক ব্যক্তি বলিয়াছিল, তোমাদের জন্য বেহেশ্তের শুভ সংবাদ হইক, তৎশ্রবণে হযরত বলিয়াছিলেন, তুমি কি (প্রকৃত অবস্থা) অবগত আছ? হয়ত এব্যক্তি অনর্থক কথা বলিয়াছিল এবং যাহা ব্যয় করিলে তাহার ক্ষতি হইত না, তাহা ব্যয় করিতে কৃপণতা করিয়াছিল।
ইমাম বায়হাকির বর্ণনা হযরত বলিয়াছিলেন, অসচ্চরিত্রের লোক (কেয়ামতে) আমার পরম শত্র হইবে এবং আমা হইতে বহু দূরে থাকিবে। যাহারা বিস্তর কথা বলে, লোকের উপর বিদ্রুপ ও অহঙ্কার করে, (তাহারাই অসচ্চরিত্র)।
তিরমিজির বর্ণনা তোমরা খোদার জিকির ব্যতীত বিস্তর কথা বলিও না, কেননা বিস্তর কথাতে হৃদয় কঠিন হইয়া যায় এবং কঠিন হৃদয়ের ব্যক্তি খোদা হইতে দূরে থাকে।
নবম দোষ : কর্কশ কথা
ইমাম আবু দাউদের বর্ণনা কর্কশ ভাষী ও কর্কশ স্বভাব ব্যক্তি হিসাব অন্তে বেহেশ্তে প্রবেশ করিবে না।
ইমাম মোছলেমের বর্ণনা নিশ্চয় খোদাতায়ালা নরম দয়াশীল, তিনি যাহা কর্কশ ভাব বা অন্য উপায়ে প্রদান না করেন, কোমলতার জন্য তাহাও প্রদান করিয়া থাকেন। হে আয়শা (রাঃ), তুমি কোমলতা অবলম্বন কর এবং কঠোরভাব পরিত্যাগ কর, যাহার মধ্যে কোমলতা আছে, খোদা তাহাকে সৌন্দর্যশালী করেন, যাহা হইতে কোমলতা বিদূরীত হয়, খোদা তাহাকে লাঞ্ছিত করেন।
ইমাম তিরমিজির বর্ণনাঃ- কোমলস্বভাব ও মিভাষীর উপর দোজখের অগ্নি হারাম করা হয়েছে।
ইমাম বায়হাকির বর্ণনা যে ব্যক্তিকে কোমলতার অংশ প্রদত্ত হইয়াছে, সে ব্যক্তিকে দুই জগতের শ্রেতম অংশ প্রদত্ত হইয়াছে। আর যে ব্যক্তি কোমলতার অংশ হইতে বঞ্চিত হইয়াছে, সে ব্যক্তি দুই জগতের শ্রেতম অংশ হইতে বঞ্চিত হইয়াছে।
ইমাম বোখারীর বর্ণনা যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে শ্রে সচ্চরিত্র হইবে, সেই ব্যক্তি আমার শ্রে প্রিয়পাত্র হইবে। ইমাম আবু দাউদের বর্ণনা ঈমানদার ব্যক্তি সৎ চরিত্রের জন্য রাত্রি জাগরণকারীর ও দিবসে রোজা পালনকারীর পদ প্রাপ্ত হইবে।
