প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

[গত সংখ্যার পর ]

বন্দুকের চোখা গুলির বিধান : ইদানীং এরকম চোখা গুলি ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের গুলি সম্পর্কে কোনো কোনো আলিম মনে করেন যে, এসব ধারালো গুলির আঘাতে মৃত জন্তুর হুকুম তীরের আঘাতে মৃত্যুর পর্যায়ভুক্ত হবে। কিন্তু আলিমগণের সম্মিলিত অভিমত অনুযায়ী বন্দুকের গুলি চোখা এবং ধারালো হলেও তা তীরের পর্যায়ভুক্ত হয় না। কেননা, তীরের আঘাত ছুরির আঘাতের ন্যায়, অপরপক্ষে বন্দুকের গুলি চোখা হলেও গায়ে বিদ্ধ হয়ে বারুদের বিস্ফোরণ ও দাহিকাশক্তির প্রভাবে জন্তুর মৃত্যু ঘটায়। সুতরাং এরূপ গুলির দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত জানোয়ারও যবেহ করার আগে মারা গেলে তা খাওয়া হালাল হবে না।

মৃতপ্রাণী ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান : আলোচ্য আয়াতে তোমাদের জন্য মৃত হারাম বলতে মৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি এগুলোর ক্রয়-বিক্রয় ও হারাম হিসাবে বিবেচিত হবে। অপবিত্র বস্তু সম্পর্কেও সে একই বিধান প্রযোজ্য। অর্থাৎ এগুলোর ব্যবহার যেমন হারাম, তেমনি এগুলা ক্রয়-বিক্রয় করা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে এগুলো থেকে যেন কোনোভাবেই লাভবান হওয়াও হারাম। এমনকি মৃত জীবজন্তুর গোশত নিজ হাতে কোনো গৃহপালিত জন্তুকে খাওয়ানোও জায়েজ নয়। বরং সেগুলো এমন কোনো স্থানে ফেলে দিতে হবে, যেন কুকুর-বিড়ালকে খাওয়ানোও জায়েয হবে না। (জাসসাস, কুরতুবী)

মৃতপ্রাণীর পশম ও হাড়ের বিধান : মৃত শব্দটি অন্য কোনো বিশেষণ ছাড়া সাধারণভাবে ব্যবহার করাতে প্রতীয়মান হয় যে, হারামের হুকুমও ব্যাপক এবং তন্মধ্যে মৃত জন্তুর সমুদয় অংশই শামিল। কিন্তু অন্য এক আয়াতে

وَمِنْ أَصْوَافِهَا وَأَوْبَارِهَا وَأَشْعَارِهَا أَثَاثًا وَمَتَاعًا إِلَىٰ حِينٍ

শব্দ দ্বারা এ বিষয়টিও ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। তাতে বোঝা যায় যে, মৃত জন্তুর শুধু সে অংশই হারাম, যেটুকু খাওয়ার যোগ্য। সুতরাং মৃত জন্তুর হাড়, পশম প্রভৃতি যেসব অংশ খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় না সেগুলো ব্যবহার করা হারাম নয়; সম্পূর্ণ জায়েজ। কেননা, কুরআনের অন্য এক আয়াতে আছে :

আর তাদের পশম, লোম ও কেশ দ্বারা গৃহ-সামগ্রী ও এমন সব জিনিস তৈরী করেন (সূরা নাহল, আয়াত : ৮০) কিন্তু এখানে যবেহ করার শর্ত আরোপ করা হয়নি।
এতে হালাল জানোয়ারের সমূহের পশম প্রভৃতির দ্বারা ফায়দা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এখানে যবেহ করার শর্ত আরোপ করা হয়নি। (জাসসাস)

চামড়ার মধ্যে যেহেতু রক্ত প্রভৃতি নাপাকীর সংমিশ্রণ থাকে, সেহেতু মৃত জানোয়ারের চামড়া শুকিয়ে পাকা না করা পর্যন্ত নাপাক এবং ব্যবহার হারাম। কিন্তু পাকা করে নেওয়ার পর ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েয। সহীহ হাদীসে এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। (জাসাসস)

মৃতপ্রাণীর চর্বি ও তা দ্বারা প্রস্তুতকারী দ্রব্যের বিধান: মৃত জানোয়ারের চর্বি এবং তদ্বারা তৈরিকৃত যাবতীয় সামগ্রীই হারাম। এসবের ব্যবহার কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়। এমনকি এসবের ক্রয়-বিক্রয় করাও হারাম।

অমুসলিম রাষ্ট্রের উৎপাদিত সাবান ইত্যাদির বিধান : পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানীকৃত সাবান এবং অনুরূপ যেসব সামগ্রীতে জন্তুর চর্বি ব্যবহৃত হয়, সেগুলো ব্যবহার না করাই উত্তম। তবে সেগুলোয় মৃত জন্তুর চর্বি ব্যবহৃত হয় কি না – এ সম্পর্কিত নিশ্চিত তথ্য অবগত না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করা হারাম হবে না। কেননা, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর, হযরত আবূ সাঈদ খুদরী, হযরত আবু মূসা আশআরী প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবী মৃত জানোয়ারের চর্বি শুধু খাওয়া হারাম বলেছেন, তবে অন্য কাজে ব্যবহার করা জায়েয বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সে কারণে এসবের ক্রয়-বিক্রয় তাঁরা হালাল বলেছেন। (জাসসাস)

পনিরের মাসআলা : দুধের দ্বারা পনির তৈরি করার জন্য জন্তুর পেট থেকে সংগৃহীত এমন একটা উপাদান ব্যবহার করা হয়, আরবীতে যাকে নাফহা বলা হয়। এটি দুধের সাথে মেশানোর সাথে সাথেই দুধ জমে যায়। সংশ্লিষ্ট জানোয়ারটি যদি হালাল এবং আল্লাহর নামে যবেহকৃত হয় তবে তার নাফহা ব্যবহার করায় কোনো দোষ নেই। কারণ, যবেহকৃত হালাল জন্তুর গোশত-চর্বি সবই হালাল। কিন্তু সে অংশটুকু যদি অযবেহকৃত অথবা কোনো হারাম জন্তু থেকে নেওয়া হয়ে থাকে তবে তা দ্বারা প্রস্তুতকৃত পনির খাওয়া সম্পর্কে ফোকাহায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এবং ইমাম মালেক (রহ.) সে পনির ব্যবহার করা যাবে বলে মত প্রকাশ করলেও ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ এবং সুফিয়ান সওরী (রহ.) প্রমুখ একে নাজায়েয বলেছেন। (জাসসাস, কুরতুবী)

অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রস্তুতকৃত পনিরের মাসয়ালা : ইউরোপ ও অন্যান্য অমুসলিম দেশে তৈরিকৃত যেসব পনির আসে, সেগুলোতে হারাম এবং যবেহ না করা জন্তুর চর্বি বা নাফহা ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। এই পরিপ্রেক্ষিতে অধিকাংশ ফকীহর মতে এসব ব্যবহার না করাই উত্তম। অবশ্য ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম মালেক (রহ.)-এর অভিমতের ভিত্তিতে তা ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।

শূকরের চর্বি দ্বারা তৈরিকৃত পনিরের মাসআলা : তবে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানী করা যেসব পনিরে শূকরের চর্বি ব্যবহৃত হয় এবং তা যে কোনো উপায়ে জানা যায়, সেগুলো সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নাপাক।

রক্তের মাসআলা : আলোচ্য আয়াতে যেসব বস্তুসামগ্রীকে হারাম করা হয়েছে, তার দ্বিতীয়টি হচ্ছে রক্ত। এ আয়াতে শুধু রক্ত উল্লেখিত হলেও সূরা আনআমের এক আয়াতে অর্থাৎ প্রবহমান রক্ত উল্লেখিত হয়েছে। রক্তের সাথে প্রবহমান শব্দ সংযুক্ত করার ফলে শুধু সে রক্তকেই হারাম করা হয়েছে, যা যবেহ করলে বা কেটে গেলে প্রবাহিত হয়। এ কারণেই কলিজা, যকৃৎ প্রভৃতি জমাট বাঁধা রক্তে গঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফোকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী পাক ও হালাল।

গোশতের সাথে লেগে থাকা রক্তের মাসআলা: যেহেতু শুধু প্রবহমান রক্তই হারাম ও নাপাক, কাজেই যবেহ করা জন্তুর গোশতের সাথে রক্তের যে অংশ জমাট বেঁধে থেকে যায়, সেটুকুও হালাল ও পাক। ফকীহ সাহাবী ও তাবেয়ীসহ সমগ্র আলিম-সমাজ এ ব্যাপারে একমত। একই কারণে মশা, মাছি ও ছাড়পোকার রক্ত নাপাক নয়। তবে রক্ত যদি বেশি হয় এবং ছড়িয়ে যায়, তবে তা ধুয়ে ফেলা উচিত। (জাসসাদ)

রক্তের ব্যবহার ও ক্রয়-বিক্রয়ের মাসআলা : রক্ত খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি অন্য কোনো উপায়ে তা ব্যবহার করাও হারাম। অন্যান্য নাপাক বস্তুর ন্যায় রক্তের ক্রয়-বিক্রয় এবং তদ্বারা অর্জিত মুনাফা হারাম। কেননা, কুরআনের আয়াতে রক্ত শব্দটি অন্য কোনো বিশ্লেষণ ব্যতীতই ব্যবহৃত হওয়ার কারণে রক্ত বলতে যা বোঝায়, তার সম্পূর্ণটাই হারাম প্রতিপন্ন হয়ে গেছে; ফলে রক্তের দ্বারা উপকার গ্রহণ করার সবগুলো দিকই হারাম সাব্যস্ত হয়েছে।