প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

১১. প্রকৃত বীর-পুরুষ

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বাহাদুর সে নয় সে কুস্তিতে জয়লাভ করে বরং সেই ব্যক্তি বাহাদুর যে ক্রোধের সময় নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। (বুখারী ও মুসলিম)

১২. চেহারার মধ্যে আঘাত করা উচিত নয়

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্য হতে যখন কেউ মারামারি করে সে যেন চেহারায় আঘাত করা থেকে বিরত থাকে। (মুসলিম)

১৩. প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ ও তাদের অধিকার

হযরত আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, সর্বদা জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশির (হক) সম্পর্কে ওসীয়ত করতেন, এমনকি আমার ধারণা হত যে, হয়ত আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মিরাসের অধিকারী বানাবেন। (বুখারী ও মুসলিম)

১৪. বৈধ কাজে সুপারিশ করা মুস্তাহাব

হযরত আবূ মূসা (রা) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন কোন ভিক্ষুক আসত অথবা তার কাছে কেউ কোন চাহিদা বা প্রয়োজনের কথা বলত তখন তিনি (সাহাবাদেরকে লক্ষ্য করে) বলতেন, তোমরা সুপারিশ কর, তাহলে তোমরা প্রতিদান পাবে। আর আল্লাহ তায়ালা যা চান স্বীয় নবীর যবান মুবারকে তা ফয়সালা করেন। (বুখারী ও মুসলিম)

১৫. সৎ-সঙ্গ স্বর্গেবাস, অসৎ-সঙ্গ সর্বনাশ

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! পুরুষরা আপনার সমস্ত হাদীস (বক্তব্য) শ্রবণ করে পূণ্য নিয়ে গেছে। আমাদের জন্যও বিশেষ একটি দিন নির্ধারণ করে দিন যেদিন আমরা আপনার কাছে আসব। আর আপনি আমাদেরকে আল্লাহর দেয়া বিধান শিক্ষা দিবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অমুক দিন অমুক জায়গায় সকলেই সেখানে গমন করলেন। অতঃপর, তারা একত্রিত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে গমন করলেন। অতঃপর আল্লাহর দেয়া বিধান তাদেরকে শিক্ষা দিলেন। অতঃপর বললেন, তোমাদের মধ্য হতে যে কোন ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় তার তিনটি সন্তান আগে পাঠিয়ে দেয় (অর্থাৎ, তাদের মৃত্যু হয়ে যায়) তাহলে তার জন্য দোযখ থেকে মুক্তির কারণ হবে। এ কথা শুনে অপর একজন মহিলা বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! দুজন হলে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ বাক্যগুলো আবারও বললেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দুই দুই দুই (অর্থাৎ দুজন হলেও সে মহিলার জন্য তা জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে)। (মুসলিম)

১৬. আল্লাহ তায়ালা কাউকে ভালোবাসলে মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দেন

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাঈল (আ.)-কে ডেকে বলেন, আল্লাহ তায়ালা অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাস। জিবরাঈল (আ.) তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) আকাশে ঘোষণা করেন, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাস। ফলে আকাশবাসীও তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। অতঃপর জগতবাসীদের নিকট তার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক হয়ে যায়। (বুখারী ও মুসলিম)

১৭. আল্লাহ ও তার রাসূলের ভালোবাসার প্রতিদান

হযরত আনাস (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, কোন একজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কিয়ামত কবে হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার জন্য তুমি কি প্রস্তুতি নিয়েছ? তিনি বলেন, আমি তার ব্যাপারে কোন অতিরিক্ত নামায, রোজা বা সদকার মাধ্যমে প্রস্তুতি নেইনি তবে আমি আল্লাহ ও তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তুমি (কিয়ামত দিবসে তাদের সাথে থাকবে) যাদের সাথে তুমি ভালোবাসা রাখতে। (বুখারী ও মুসলিম)

১৮. আল্লাহ প্রেমিকদের ভালোবাসার প্রতিদান

হযরত আবূ মূসা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, মানুষ মানুষকে ভালোবাসে, যখন তাদের সাথে মিলিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (কিয়ামত দিবসে) মানুষ তার সাথেই উত্থিত হবে যার সাথে সে ভালোবাসা রাখত। (বুখারী ও মুসলিম)

১৯. ঐ ব্যক্তি লাঞ্ছিত যার পিতামাতা তাকে জান্নাতে পৌঁছাতে পারল না

হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে উঠে বলেন, আমিন, আমিন, আমিন। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কিসের উপর আমিন উচ্চারণ করলেন? তিনি বলেন, আমার নিকট জিবরাঈল আমিন এসেছিল। তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হয়েছে, অথচ সে দরুদ পাঠ করেনি। সুতরাং আপপিন বলেন, আমিন। তখন আমি বললাম আমিন। তিনি পুনরায় বলেন, তার নিকট রমযান উপস্থিত হলো তারপর তা অতিবাহিত হলো অথচ তাকে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না, বলেন, আমিন। আমি বললাম আমিন। ঐ ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য যে পিতামাতা উভয়কে বা তাদের একজনকে পেয়েছে অথচ জান্নাতে প্রবেশের ব্যবস্থা করে নিতে সক্ষম হয়নি। বলেন, আমিন। তখন আমি বললাম, আমিন।

২০. পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী স্বীয় সন্তান কর্তৃক সদ্ব্যবহারপ্রাপ্ত হবে

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা অন্য মানুষের স্ত্রীদের থেকে সংযত হয়ে পবিত্র থাক। এরূপ করার ফলে তোমাদের স্ত্রীরাও পবিত্র থাকবে এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। এরূপ করলে তোমাদের সন্তানরাও তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে এবং যে ব্যক্তির কাছে তার মুসলমান ভাই ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে আসে তাকে ক্ষমা করে দিও, চাই তা সত্য হোক অথবা মিথ্যা। যদি এরূপ না করে (ক্ষমা না করে) তাহলে সে যেন আমার হাউজে (কাউসার) এর কাছে না আসে। (মুস্তাদরাক হাকীম, ১৫৪ পৃ. ৪র্থ খণ্ড)

ফায়দা : এই হাদীসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা বলা হয়েছে

(১) যদি তুমি পবিত্র থাক তবে অন্যদের স্ত্রীদের দিকে কুপ্রবৃত্তির সাথে দৃষ্টিপাত না কর তাহলে যেহেতু তুমি অন্যদের স্ত্রীদের থেকে নিজেকে হেফাজত করেছ সেহেতু আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এই কাজের পুরস্কার পাবে। তোমাদের স্ত্রীরাও পূতঃপবিত্র থাকবে। তাদের দিকেও কুপ্রবৃত্তির দৃষ্টিতে কেউ দৃষ্টিপাত করবে না এবং স্ত্রীরাও নিজেদের স্বামী ছাড়া অন্য কারো প্রতি দৃষ্টিপাত করবে না।

(২) যদি তোমরা তোমাদের পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর তাহলে তোমাদের সন্তানরাও তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।
এর প্রকাশ্য কারণ তো সুস্পষ্ট। যখন তোমার সন্তান তোমাকে দেখবে যে, তুমি তোমার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করছ, জান মাল দিয়ে তাদের খেদমত করছ। তখন তোমার সন্তান এগুলো দেখে এই শিক্ষা অর্জন করবে যে, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা আমাদের সমাজের অংশ। আমাদেরকে আমাদের পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে, যেরূপ আমাদের পিতা-মাতা তাদের পিতা মাতার সাথে করছে। কথায় বলে, যেমন কর্ম তেমন ফল। সুতরাং এ অনুযায়ী যখন তুমি তোমার পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে তখন এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সন্তানদেরকেও তোমাদের খেদমতের প্রতি মনোযোগী করে দিবেন। সন্তানের অন্তরে পিতা-মাতার প্রতি ইজ্জত-সম্মান ও মায়া মহব্বত ঢেলে দিবেন।
পক্ষান্তরে এর বিপরীত অবস্থাটাও বুঝে নাও। যদি তুমি তোমার পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণ কর, তাহলে তোমার সন্তানরাও তা শিখবে এবং যখন তাদের পালা আসবে, তখন তোমাদের সাথে অনুরূপ ব্যবহার করবে, যা তোমরা তোমাদের পিতা মাতার সাথে করেছিলে।
ঘটনা : এক ব্যক্তি তার বৃদ্ধ পিতাকে চাদর দিয়ে গাট্টির ন্যায় বাঁধল অতঃপর তাকে কূয়ার কাছে গিয়ে ফেলে দিতে মনস্থ করল, তখন পিতা বলল, হে ছেলে! এই কূয়াতে নিক্ষেপ কর না, অন্য কোন কূয়াতে নিক্ষেপ কর। কেননা এর মধ্যে আমি আমার পিতাকে নিক্ষেপ করেছিলাম। একথা শুনে ছেলের বুদ্ধি ফিরে এলো। তাই সে গাট্টি খুলে পৃথক হয়ে দাঁড়াল। অতঃপর পিতাকে সম্মানের সাথে ঘরে নিয়ে এলো (তার নিজের পরিণতির কথা চিন্তা করে)।

(৩) যদি কোন মুসলমানের সাথে কোন ব্যাপারে মনোমালিন্য হয়। তারপর সে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দিবে। ক্ষমা করতে গিয়ে এটা চিন্তা করো না যে, সে ভুল করেছিল বা সে ভুলের উপর ছিল। বরং তোমার ভুল হলে তুমি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও এবং তার কোন ক্ষতি করে থাকলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দাও।

এই হাদীসে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের নিকট আপত্তি করল অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা করল। যদি তার আপত্তি কবুল না করে তাহলে তার সে পরিমাণ গোনাহ হবে, অন্যায়ভাবে ট্যাক্স আদায় করলে যে গোনাহ হয়। (মিশকাত ৪৪৯ পৃ.)