প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭, জমা.সানি-রজব ১৪৩৮ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২৩-২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

৮০। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে কোন প্রকারে কষ্ট দেয়া কুফরী

যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কোন প্রকার কষ্ট দেয়, তার সত্তা অথবা গুণাবলীতে, প্রকাশ্য অথবা ইঙ্গিতে কোন দোষ বের করে, সে কাফের হয়ে যায়। আলোচ্য আয়াত দৃষ্টে তার প্রতি আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাদ ইহকালেও হবে এবং পরকালেও। (তাফসীর মাযহারী)

وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا

সূরা আহযাবের ৫৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে কোন মুসলমানকে কষ্ট ও মিথ্যা অপবাদ দেয়া হারাম-যদি তারা আইনতঃ এর যোগ্য না হয়। সাধারণ মুসলমানদের ক্ষেত্রে এ কথাটি যুক্ত করার কারণ এই যে, তাদের মধ্যে কারও কোন অপকর্মে জড়িত হওয়ারও সম্ভাবনা আছে, যার প্রতিফলস্বরূপ তাকে কষ্ট দেয়া শরীয়তের আইনে জায়েয। প্রথম আয়াতে আল্লাহ ও রসূলকে কষ্ট দেয়ার ব্যাপার ছিল। তাই তাতে উপরোক্ত শর্ত যুক্ত করা হয়নি। কারণ সেখানে কষ্টদান বৈধ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

৮১। কোন মুসলমানকে শরীয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে কষ্ট দেয়া হারাম

আয়াত দ্বারা কোন মুসলমানকে শরীয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে কষ্টদানের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘কেবল সে-ই মুসলমান, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে; কেউ কষ্ট না পায় আর কেবল সে-ই মুমিন, যার কাছ থেকে মানুষ রক্ত ও ধন সম্পদের ব্যাপারে নিরুদ্বেগ থাকে। (মাযহারী) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, সাধারণ মুসলমান নারী ও পুরুষকে কষ্ট দেয়া হারাম ও মহাপাপ এবং বিশেষ করে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয়া কুফর ও অভিসম্পাতের কারণ

وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ۖ فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّهِ ۚ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَىٰ أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَىٰ أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

অনুবাদ ঃ যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন।মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতবএ, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে।মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম। (হুজুরাত, আয়াত-৯, ১০, ১১)

সূরা হুজরাতের শুরুতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হক ও আদব, অতঃপর সাধারণ মুসলমানদের পারস্পরিক হক ও সামাজিক রীতি-নীতি বর্ণিত হয়েছে। এর পূর্ববর্তী দুই আয়াতে মুসলমানদের দলগত সংশোধনের বিধান উল্লেখিত হয়েছে। (এক) কোন মুসলমানকে ঠাট্টা ও উপহাস করা, (দুই) কাউকে দোষারোপ করা এবং (তিন) কাউকে অপমান, অপদস্ত করা অথবা পীড়াদায়ক নামে ডাকা।

কুরতুবী বলেনঃ কোন ব্যক্তিকে হেয় ও অপমান করার জন্য তার কোন দোষ এমনভাবে উল্লেখ করা, যাতে শ্রোতারা হাসতে থাকে, তাকে বলা হয়। এটা যেমন মুখে সম্পন্ন হয়, তেমনি হস্তপদ ইত্যাদি দ্বারা ব্যঙ্গ অথবা, ইঙ্গিতের মাধ্যমেও সম্পন্ন হয়ে থাকে। কারও কথা শুনে অপমানের ভঙ্গিতে বিদ্রƒপ করার মাধ্যমেও হতে পারে। কেউ কেউ বলেন ঃ শ্রোতাদের হাসির উদ্রেক করে, এমন ভাবে কারও সম্পর্কে আলোচনা করাকে ও বলা হয়। কুরআনের বর্ণনা মতে এগুলো সব হারাম।

কুরআন পাক এত গুরুত্ব সহকারে সুখরিয়্যা তথা উপহাস নিষিদ্ধ করেছে যে, এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী জাতিকে পৃথকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। পুরুষদের জন্য কওম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, অভিধানে এ শব্দটি পুরুষদের জন্যই নির্ধারিত, যদিও রূপকভঙ্গিতে নারীদেরকেও শামিল করা হয়ে থাকে। কুরআন পাক সাধারণত পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য কওম শব্দ ব্যবহার করেছে। কিন্তু কুরআন এখানে কওম শব্দটি বিশেষভাবে পুরুষদের জন্য ব্যবহার করেছে এবং এর বিপরীতে নিসা শব্দের মাধ্যমে নারীদের কথা উল্লেখ করেছে।

উভয়কে বলা হয়েছে যে, যে পুরুষ অপর পুরুষকে উপহাস করে, সে আল্লাহর কাছে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। কোরআনে পুরুষ পুরুষকে এবং নারী নারীকে উপহাস করা ও তা হারাম হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; অথচ কোন পুরুষ নারীকে এবং কোন নারী পুরুষকে উপহাস করলে তা-ও হারাম। কিন্তু একথা উল্লেখ না করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নারী ও পুরুষের মেলামেশাই শরীয়তে নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয়। মেলামেশা না হলে উপহাসের প্রশ্নই উঠে না।

আয়াতের সারমর্ম এই যে, কোন ব্যক্তির দেহে, আকার-আকৃতিতে অথবা গঠন প্রকৃতিতে কোন দোষ দৃষ্টিগোচর হলে তা নিয়ে কারও হাসাহাসি অথবা উপহাস করা উচিত নয়। কেননা, তার জানা নেই যে, সম্ভবতঃ এই ব্যক্তি সততা, আন্তরিকতা ইত্যাদির কারণে আল্লাহর কাছে তার চাইতে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। এ আয়াত পূর্ববর্তী বুযুর্গ ও মনীষীদের অন্তরে অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। আমর ইবনে শোরাহবিল (রা.) বলেন ঃ কোন ব্যক্তিকে বকরীর স্তনে মুখ লাগিয়ে দুধ পান করতে দেখে যদি আমার হাসির উদ্রেক হয়, তবে আমি আশংকা করতে থাকি যে, কোথাও আমিও এরূপই না হয়ে যাই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন ঃ কুকুরকেও উপহাস করতে আমার ভয় লাগে, আমি যদি কুকুর হয়ে যাই। (কুরতুবী)

সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এর রেওয়ায়েতক্রমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের আকার-আকৃতি ও ধন-দৌলতের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তাদের অন্তর ও কাজকর্ম দেখেন। কুরতুবী বলেন: এই হাদীস থেকে এই বিধি ও মূলনীতি জানা যায় যে, কোন ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাকে নিশ্চিতরূপে ভাল অথবা মন্দ বলে দেয়া জায়েয নয়। কারণ, যে ব্যক্তির বাহ্যিক ক্রিয়াকর্মকে আমরা খুব ভাল মনে করছি, সে আল্লাহর কাছে নিন্দনীয় হতে পারে। কেননা, আল্লাহ তার আভ্যন্তরীণ অবস্থা ও অন্তরগত গুণাগুণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত আছেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থা ও ক্রিয়াকর্ম মন্দ, তার আভ্যন্তরীণ অবস্থা ও অন্তরগত গুণাগুণ তার কুকর্মের কাফফারা (পরিপূরক) হয়ে যেতে পারে। তাই যে ব্যক্তিকে মন্দ অবস্থা ও কুকর্মে লিপ্ত দেখ, তার এই অবস্থাকে মন্দ মনে কর; কিন্তু তাকে হেয় ও লাঞ্ছিত মনে করার অনুমতি নেই।

আয়াতে দ্বিতীয় নিষিদ্ধ বিষয় হচ্ছে, কারও দোষ বের করা, দোষ প্রকাশ করা এবং দোষের কারণে ভর্ৎসনা করা। এরশাদ হয়েছে অলা তালমিযু আনফুসাকুম অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের দোষ বের করো না। এই বাক্যটি অলা তাকতুলু আনফুসাকুম এর মতই, যার অর্থ তোমরা পরস্পরে একে অন্যকে হত্যা করো না এবং নিজেদের দোষ বের করার অর্থ এই যে, একে অন্যের দোষ বের করো না। এরূপ ভঙ্গিতে দোষ ব্যক্ত করার রহস্য একথা বলা যে, অপরকে হত্যা করা একদিক দিয়ে নিজেকেই হত্যা করার শামিল। কেননা, প্রায়ই তো এরূপ হয়েই যায় যে, একজন অন্যজনকে হত্যা করলে নিহত ব্যক্তির সমর্থকরা তাকেও হত্যা করে। এটা না হলেও প্রকৃত সত্য এই যে, মুসলমান সব ভাই ভাই। ভাইকে হত্যা করা যেন নিজেকে হত্যা করা এবং হস্তপদ বিহীন করে দেয়া, অলা তালমিযু আনফুসাকুম এর অর্থ তা-ই। অর্থাৎ, তোমরা অন্যের দোষ বের করলে, সেও তোমাদের দোষ বের করবে। কারণ, দোষ থেকে কোন মানুষ মুক্ত নয়। জনৈক আলিম বলেন ঃ অ ফি-কা উয়ুবুন অলিন নাসি উয়ুনুন অর্থাৎ, তোমার মধ্যেও দোষ আছে এবং মানুষেরও চক্ষু আছে। তারা দোষ দেখে। তুমি কারও দোষ বের করলে সেও তোমার দোষ বের করবে। যদি সে সবর করে, তবে সে কথাই বলতে হবে যে, মুসলমান ভাইয়ের দুর্নাম নিজেরই দুর্নাম।

আয়াতে নিষিদ্ধ তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, অপরকে মন্দ নামে ডাকা, যদ্দরুন সে অসন্তুষ্ট হয়। উদাহরণঃ কাউকে খঞ্জ, খোঁড়া অথবা অন্ধ বলে ডাকা অথবা অপমানজনক নামে সম্বোধন করা। হযরত আবু জুবায়ের আনসারী (রা.) বলেনঃ এই আয়াত আমাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন আমাদের অধিকাংশ ব্যক্তিকে লজ্জা দেয়া ও লাঞ্ছিত করার জন্য লোকেরা খ্যাত করেছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন না। তাই মাঝে মাঝে সেই মন্দ নাম ধরে তিনিও সম্বোধন করতেন। তখন সাহাবায়ে কেরাম বলতেনঃ ইয়া রসূলুল্লাহ, সে এই নাম শুনলে অসন্তুষ্ট হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হয়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন ঃ অলা তানা বাযু বিল আলকব। এর অর্থ হচ্ছে কেউ কোন গোনাহ অথবা মন্দকাজ করে তওবা করার পরও তাকে সেই মন্দকাজের নামে ডাকা। উদাহরণতঃ চোর, ব্যভিচারী অথবা শরাবী বলে সম্বোধন করা। যে ব্যক্তি চুরি, যেনা, শরাব ইত্যাদি থেকে তওবা করে নেয়, তাকে অতীত কুকর্ম দ্বারা লজ্জা দেয়া ও হেয় করা হারাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে এমন গোনাহ দ্বারা লজ্জা দেয়, যা থেকে সে তওবা করেছে, তাকে সেই গোনাহে লিপ্ত করে ইহকাল ও পরকালে লাঞ্ছিত করার দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন। (কুরতুবী)