প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
সুন্দর আচরণ ও সচ্চরিত্রের অন্যতম দিক ক্ষমা বা মাফ করা। আরবী আফ্উ শব্দের অর্থ ক্ষমা করা। ইসলামী পরিভাষায় আফ্উ হলো পরিশোধ গ্রহনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করে দেয়া। মহান আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ব্যক্তিকে ভালবাসেন। ক্ষমা করা মহত্ত্বের লক্ষণ। অজ্ঞ মূর্খদেরকেও অহরহ ক্ষমা করতেই হবে। ক্ষমা করা নিঃসন্দেহে উচ্চমানের সাহসিকতাপূর্ণ কাজের অন্যতম। ক্ষমা করা দৃঢ় সংকল্প ব্যক্তিত্বের চিহ্ন। ক্ষমা ব্যতীত এ জগৎ সংসার অচল হতে বাধ্য। মনিব তার চাকর-বাকরকে, মালিক তার শ্রমিককে, কর্তা ব্যক্তি তার অধীনস্থদেরকে ক্ষমা করতেই হবে। এমনকি পশু-পাখি, জীব-জন্তুর প্রতি দয়াপরবশ হয়েও ক্ষমা করতে হয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহর হুকুম হচ্ছে : আপনি ক্ষমা করুন, সৎ কাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞ বা মূর্খ ব্যক্তিদেরকে এড়িয়ে চলুন। (সূরা আল আরাফ: ১৯৯) আর তাদের উচিত তাদেরকে ক্ষমা করা এবং তাদের দোষ-ত্রটি উপেক্ষা করা। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আন নূর: ২২) তারা (মুমিনরা) লোকদেরকে ক্ষমা করে থাকে। আল্লাহ্ সৎ কর্মশীলদের ভালবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪) যে লোক ধৈর্যধারণ করবে ও ক্ষমা করবে, নিঃসন্দেহে এটা বড় উচ্চ মানের সাহসিকতাপূর্ণ কাজের অন্যতম। (সূরা আশ শুরা: ৪৩) অতএব আপনি (হে নবী) তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে ক্ষমা কে নবী-রাসূলগণের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন : অতএব আপনি ধৈর্য্যধারণ করুন,যেমন ধৈর্য্যধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। (সূরা আল আহ্কাফ : ৩৫)
প্রতিটি মানুষের জন্য দয়া ক্ষমার গুণে শুণান্বিত হওয়া অবশ্য কর্তব্য। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর ঘোষণা : আর তোমরা যদি ওদের মার্জনা কর, ওদের দোষ-ত্রটি উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর, তবে জেনে রেখো, আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আত তাগাবুন : ১৪)
দয়া-মায়া ও ক্ষমা প্রদর্শনের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নীতি ও নির্দেশ অনুসরণ করা আবশ্যক। মানুষ ভুল-ত্রটি মুক্ত নয়। কোনো কাজে ত্রটি-বিচ্যুতি হওয়া তার পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। কাজেই সাধারণ ভুল-ভ্রান্তি ও ত্রটি বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা করাই শ্রেয়।
এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী :
তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে ধাববান হও যার প্রশস্ততা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর ন্যায়। যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী আর মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ্ নেক্কার লোকদের ভালবাসেন। (সূরা আলে ইমরান, ০৩ : ১৩৩-১৩৪)
অন্যায়কারীর অপরাধ ক্ষমা করা তাক্ওয়া লাভের উপায় এবং ক্ষমা তাওয়ার নিকটবর্তী গুণ। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন : আর মাফ করে দেয়াই তাক্ওয়ার নিকটতর। (সূরা আল বাকারা, ০২ : ২৩৭)
হযরত আবু হোরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হযরত মুসা সইবনে ইমরান (আ) আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, হে আমার রব! আপনার বান্দাদের মধ্যে আপনার নিকট বেশি ইজ্জতওয়ালা কে? আল্লাহ বললেন, ঐ বান্দা যে প্রতিশোধ নিতে পারে, তবু সে মাফ করে দেয়। (বায়হাকী)
মিসতাহ ইবনু আসাসাহ (রা) হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) এর আত্মীয় ও নিঃস্ব ছিলেন। আবুবকর (রা) তাকে আর্থিক সাহায্য করতেন। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) -এর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার ঘটনার সাথে তাঁর জড়িত থাকার কথা যখন প্রমাণিত হল, তখন কন্যা-বৎসল পিতা হযরত আবুবকর সিদ্দিক কন্যাকে এমন কষ্ট দানের কারণে স্বাভাবিকভাবেই মিসতাহ (রা) এর প্রতি ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি কসম খেয়ে বসলেন, ভবিষ্যতে তাকে কোনোরূপ আর্থিক সাহায্য করবেন না। বলাবাহুল্য কোনো বিশেষ ফকির বা অভাবগ্রস্থকে আর্থিক সাহায্য করা নির্দিষ্টভাবে কোনো মুসলমানের উপর ওয়াজিব নয়। কেউ কাউকে আর্থিক সাহায্য করার পরে যদি বন্ধ করে দেয়, তবে গোনাহর কোনো কারণ নেই। হযরত মিসতাহকে আর্থিক সাহায্য করা হযরত আবুবকরের দায়িত্ব বা ওয়াজিব কর্তব্য ছিল না।
তথাপি আল্লাহপাক এ ঘটনায় ওহী নাজেল করলেন :
তোমাদের মধ্যে যারা উচ্চমর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন কসম না খায় যে, তারা আত্মীয়স্বজনকে, অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না। তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষত্রটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা করনা যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুনাময়। (সূরা আন-নূর : ২২ নং আয়াত)
এ আয়াত শুনে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) তৎক্ষণাৎ বলে উঠেন : আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে মাফ করুন, আমি অবশ্যই তা পছন্দ করি। এরপর তিনি হযরত মিস্তাহ (রাঃ) এর সাহায্য পুনর্বহাল করে দেন এবং বলেন : এ সাহায্য কোনো দিন বন্ধ হবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
