প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ক্রোধ বা রাগ সুন্দর আচরণ ও সচ্চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট অন্তরায়। ক্রোধ মানুষের হিতাহিত জ্ঞানকে তিরোহিত করে দেয়। ক্রোধ মানুষকে পাপাচার ও অনাচারে লিপ্ত করে। ক্রোধ বা রাগকে অবদমিত করে সহনশীলতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে পারা আদর্শবান মানুষের একটি বিশেষ গুণ। কুরআন ও হাদীসে ক্রোধ বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সহনশীলতা, ধৈর্য ও কোমলতার নীতি অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে : তাদের (মুমিনদের) বৈশিষ্ট্য হল তাঁরা ক্রোধকে হজম করে এবং লোকদের সাথে ক্ষমার নীতি অবলম্বন করে। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪ আয়াত)
আল্লাহতায়ালা মুত্তাকী লোকদের প্রশংসা করে ইরশাদ করেন এবং যখন তারা ক্রোধান্বিত হয় তখন তারা মাফ করে দেয়। (সূরা আশ শুরা : ৩৭ আয়াত)
হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো: আমায় কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন : রাগ করো না। লোকটি (একে যথেষ্ট মনে না করে) কথাটির কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করল। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার শুধু বললেন : রাগ করো না। (বুখারী)
অকারণে বা অযথা রাগ করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : রাগ মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দেয়। যেমনিভাবে তিক্ত ফল মধুকে নষ্ট করে দেয়। (বায়হাকী)
ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ করা ঈমানের অন্যতম দিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে অপরকে মল্লযুদ্ধে -পরাজিত করতে পারে সেই প্রকৃত বীর নয়, প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২২৬৭; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০১৪)
ইবনু উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে আল্লাহ তার মর্যাদা রক্ষা করবেন ও দোষত্র“টি গোপন রাখবেন। বিরক্তি ও ক্রোধ উত্তেজিত অবস্থায় যদি কেউ রাগ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সম্বরণ করে, তবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার হৃদয়কে পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি দ্বারা পূর্ণ করবেন।(হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/১৯১; আলবানী সহীহুল জামি ১/৯৭)
হযরত মুয়ায (রা) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ক্রোধ পূর্ণ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে নেয় (অর্থাৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যার উপর ক্রোধ তাকে কোনো রকম শাস্তি না দেয়) আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে সমস্ত মাখলুকের সামনে ডাকবেন এবং অধিকার দিবেন যে, জান্নাতের হুরদের মধ্যে যে হুরকে ইচ্ছা পছন্দ করে নেয়। (আবু দাউদ)
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জবানকে বিরত রাখে, আল্লাহতায়ালা তার দোষত্র“টি গোপন রাখেন। যে নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি হতে নিজের আযাবকে ফিরিয়ে রাখবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নিকট ওজর পেশ করে অর্থাৎ ক্ষমা চায়, আল্লাহ তার ওজর কবুল করে নেন। (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : বান্দা এমন কোনো কিছু পান করে না যা আল্লাহতায়ালার নিকট ক্রোধ পান করা (নিয়ন্ত্রণ করা) অপেক্ষা বেশি উত্তম; যা শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সে পান করে থাকে। (মুসনাদে আহমাদ)
ক্রোধের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যার কারণে ক্রোধের উদ্রেক হয়েছে বা যে কষ্ট দিয়েছে তাকে ক্ষমা করতে ও তার সাথে উত্তম আচরণ করতে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কুরআন ও হাদীসে। বিশেষত যাকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব সেইরূপ ব্যক্তিকে ক্ষমা করা অতীব প্রয়োজন।
ক্রোধ সম্বরণ করা ও ক্রোধের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, তন্মধ্যে রয়েছে, (১) ক্রোধান্বিত হলে আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম পাঠ করা, (২) আল্লাহর ক্রোধের কথা স্মরণ করা, (৩) উত্তেজিত অবস্থায় কথা না বলে চুপ করে থাকা, (৪) মুখে-মাথায় ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা, (৫) ওজু করা, (৬) দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে শয়ন করা ইত্যাদি। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)
হযরত আবুযর (রা) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্য হতে কারো ক্রোধ বা রাগ উৎপন্ন হয়, তবে সে যদি দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে, তখন তার উচিত সে যেন বসে পড়ে। বসে পড়লে যদি রাগ চলে যায় তবে ভাল কথা। নচেৎ তার উচিৎ, সে যেন শুয়ে পড়ে। (আবু দাউদ)
হযরত আতিয়া (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রাগ শয়তানের আছরে হয়ে থাকে। শয়তানের সৃষ্টি আগুন হতে, আর আগুনকে পানি দ্বারা নিভানো হয়। অতএব তোমাদের মধ্যে যখন কারো রাগ আসে, তখন তার উচিত সে যেন ওযু করে নেয়। (আবু দাউদ)
