প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
দাওয়াতে লিপ্ত মুমিন স্বভাবতই পাপে লিপ্ত মানুষদেরকে অপছন্দ করেন। এদের মধ্যে অনেকেই ক্ষমতাধর বা তাদের সামনে কিছু বলার সুযোগ তিনি পান না। এজন্য এদের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেলেই এদের বিভিন্ন দোষ বা অপরাধ আলোচনা করেন। তিনি মনে করেন, এভাবে তিনি পাপের প্রতি তাঁর ঘৃণা প্রকাশ করছেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে তিনি গীবত ও অপবাদের মাধ্যমে হারামে লিপ্ত হচ্ছেন এবং নিজের আমল ধ্বংস করছেন। “অমুক কর্ম পাপ এবং আমি তা ঘৃণা করি। যারা এতে লিপ্ত সবাই ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত”, একথা বললে পাপের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু “অমুক ব্যক্তি অমুক পাপে লিপ্ত”, একথা তার অনুপস্থিতিতে বললে সন্দেহাতীতভাবে গীবত হবে।
এই হারামকে হালাল করার জন্য একটি বানোয়াট হাদীস বলা হয় : “পাপীর গীবত নেই।” অথাৎ পাপীর দোষ পিছনে আলোচনা করলে গীবত হয় না। হাদীসটি বানোয়াট বা অত্যন্ত দুর্বল। (মুখতাসারুল মাকাসিদ, ১৬৪ পৃ, যয়ীফুল জামি, ৭০৯ পৃ)। এখানে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষণীয়:
প্রথমত
পাপীর গীবত না হলে দুনিয়াতে গীবত বলে কিছু থাকে না। আমরা সকলেই পাপী। কিছু না কিছু পাপে আমরা সকলেই জড়িত। আর গীবত তো সত্য দোষ বলা। এজন্য নিষ্পাপ মানুষের তো গীবত হবে না, অপবাদ হবে। কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য নির্দেশনা থেকে আমরা নিশ্চিত জানি যে, যে কোনো পাপীর যে কোনো প্রকারের দোষত্রুটি, যা তার অনুপস্থিতিতে আলোচিত হয়েছে জানলে তার খারাপ লাগে, তা তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করাই গীবত।
দ্বিতীয়ত
কোনো ব্যক্তির দোষত্রুটির কথা তার অনুপস্থিতিতে বলার একটিই শরীয়ত-সম্মত কারণ আছে, তা হলো, অন্য কাউকে অধিকতর ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। এক্ষেত্রেও মুমিনকে বুঝতে হবে যে, এ কাজটি একটি ঘৃণিত কাজ। একান্তই বাধ্য হয়ে তিনি তা করছেন। কাজেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই না বলা।
তৃতীয়ত
গীবত কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে হারাম করা হয়েছে। কুরআন-হাদীসে স্পষ্টভাবে গীবতকে কোনো অবস্থাতেই হালাল বলা হয় নি। শুধু কোনো মানুষ বা জনগোষ্টীকে নিশ্চিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করার একান্ত প্রয়োজনে তা বৈধ হতে পারে বলে আলেমগণ মত প্রকাশ করেছেন। এখন মুমিনের কাজ হলো কুরআন ও হাদীস যা নিষেধ করেছে তা ঘৃনাভরে পরিহার করা। এমনকি সে কর্মটি কখনো জায়েয হলেও তিনি তা সর্বদা পরিহার করার চেষ্টা করবেন। শুকুরের মাংস,মদ,রক্ত ইত্যাদি আল্লাহ হারাম করেছেন এবং প্রয়োজনে জায়েয বলে ঘোষণা করেছেন। এখন মুমিনের দায়িত্ব কী? বিভিন্ন অজুহাতে প্রয়োজন দেখিয়ে এগুলি ভক্ষণ করা? না যত কষ্ট বা প্রয়োজনই হোক তা পরিহার করার চেষ্টা করা?
গীবতও ঠিক অনুরূপ একটি হারাম কর্ম যা একান্ত প্রয়োজনে বৈধ হতে পারে। গীবত ও শুকুরের মাংসের মধ্যে দুইটি পার্থক্য। প্রথম পার্থক্য হলো শুকুরের মাংস যে প্রয়োজনে খাওয়া যেতে পারে তা কুরআনেই বলা হয়েছে, পক্ষান্তরে গীবতের ক্ষেত্রে অনুরূপ কিছু কুরআন বা সহীহ হাদীসে বলা হয়নি।
দ্বিতীয় পার্থক্য হলো, সাধারণভাবে শুকুরের মাংস ভক্ষণ করা শুধুমাত্র আল্লাহর হক্ক জনিত পাপ। সহজেই তাওবার মাধ্যমে তা ক্ষমা হতে পারে। পক্ষান্তরে গীবত বান্দার হক্ক জনিত পাপ। এর ক্ষমার জন্য সংশ্লিস্ট ব্যক্তির ক্ষমা প্রয়োজন। এজন্য মুমিনের দায়িত্ব হলো বিভিন্ন অজুহাতে বা যয়ীফ-মাউযূ হাদীসের বরাত দিয়ে এ পাপে লিপ্ত না হয়ে যথাসাধ্য একে বর্জন করা।
চতুর্থত
আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর দায়িত্ব হলো যথাসাধ্য পরিবর্তন ও সংশোধন। গীবতের মাধ্যমে কখনোই কোনো পাপের পরিবর্তন বা সংশোধন হয়নি বা হয় না। এতে শুধুমাত্র নিজের পাপ বৃদ্ধি পায়।
