প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো

বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সমাজে বসবাসরত অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অমুসলিম নাগরিককে কোনোভাবে কষ্ট দিলে বা জুলুম করলে তিনি স্বয়ং তার বিপক্ষে বাদী হবেন : যদি কেউ কোনো অমুসলিম নাগরিক বা প্রবাসীকে জুলুম করে, তাকে অপমান করে, তাকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব প্রদান করে বা তার ইচ্ছা ও আগ্রহ ছাড়া তার নিকট থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করে, তাহলে কেয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো। (আবু দাউদ ৩/১৭০, আলবানী, সহীহুত তারগীব ৩/৮৯)

জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না

অন্য হাদীসে তিনি বলেন : যদি কেউ কোনো অমুসলিম নাগরিক বা আগন্তুককে হত্যা করে, তবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। (বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৫৩৩)

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কোনো মানুষকে কষ্ট না দেওয়া জান্নাত লাভের অন্যতম শর্ত! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য খেয়ে জীবনাযাপন করবে, সুন্নাত অনুসারে আমল করবে এবং কোনো মানুষ তার দ্বারা কষ্ট পাবে না, সে ব্যক্তি জান্নাতী হবে। (তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৬৬৯; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/১১৭। তিরমিযী সনদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। হাকিম ও যাহাবী হাদীসটি সহীহ বলেছেন)

বদ দুআকারীদের সাথে নম্র আচরণ

হযরত আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। কয়েকজন ইহুদী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো, আস্সামু আলাইকুম (তোমার মৃত্যু হোক)! হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, আমি জবাবে বললাম, তোমাদেরই মৃত্যু হোক, তোমাদের উপর আল্লাহর লানত ও তার গযব আপতিত হোক! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : হে আয়িশা! থাম, নম্রতা অবলম্বন কর, কঠোরতা ও কটুক্তি হতে বিরত থাক। হযরত আয়িশা (রাঃ) বললেন, আপনি কি শোনেন নি তারা কী বলেছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি শোনোনি আমি তার উত্তরে কী বলেছি? (ওয়ালাইকুম-তোমাদেরই হোক) আমি তাদের কথা তাদের দিকেই ফিরিয়ে দিয়েছি। আমার বদ দুআ তাদের ব্যাপারে কবুল হবে। আর তাদের বদ দুআ আমার সম্পর্কে কবুল হবে না। (বুখারী)

অমুসলিমদের অধিকার

সমস্ত কাফের জাতি অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত, আর তারা চার শ্রেণীর: ১। যুদ্ধরত, ২। নিরাপত্তা গ্রহণকারী, ৩। চুক্তিবদ্ধ ও ৪। জিম্মী।

প্রথমত: যুদ্ধরত অমুসলিম : যারা মুলসমানদের সাথে সংগ্রাম ও বিরোধিতায় লিপ্ত তাদের সংরক্ষণ ও পৃপোষকতা মুসলিমদের উপর জরুরি নয়।

দ্বিতীয়ত : নিরাপত্তা গ্রহণকারী : যারা মুসলিম দেশে মুসলিম শাসকের নিকট নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট স্থানে নিরাপত্তা গ্রহণ করে, তাদেরকে ঐ নির্ধারিত স্থান ও সময়ে নিরাপত্তা প্রদান অপরিহার্য যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَ إِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِيْنَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتّىٰ يَسْمَعَ كَلٰمَ اللهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ

অর্থাৎ মুশরিকদের (অমুসলিমদের) মধ্যে থেকে কেউ তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করলে তুমি তাকে আশ্রয় দিবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দাও। (সূরা তাওবা: ৬)

তৃতীয়ত : চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম

যারা মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ, অতএব যতদিন পর্যন্ত তারা চুক্তির উপর অটল থাকবে, এর কোন কিছুই ভঙ্গ করবে না, মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করবে না ও ইসলাম ধর্মকে বিদ্রƒপ করবে না, ততদিন তাদের সাথে যে সময় পর্যন্ত চুক্তি করা হয়েছে সে সময় পর্যন্ত তা পূর্ণ করা অপরিহার্য। কেননা আল্লাহ তায়ালা

إِلَّا الَّذِيْنَ عَهَدتُّمْ مِّنَ الْمُشْرِكِيْنَ ثُمَّ لَمْ يَنْقُصُوْكُمْ شَيْئًا وَّ لَمْ يُظَاهِرُوْا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوْا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلٰى مُدَّتِهِمْ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِيْنَ

আহলে ইলমদের কিতাব সমূহে জিম্মী বিষয়ক বিধি-বিধান বিস্তারিত রয়েছে যার কারণে এখানে আর দীর্ঘায়িত করলাম না। (যেমন, দেখুন: ইবনে কাইয়্যোমের আহকামু আহলিজ জিম্মাহ)

وَ إِنْ نَّكَثُوْا أَيْمَا نَهُمْ مِّنْ ۢبَعْدِ عَهْدِهِمْ وَ طَعَنُوْا فِيْ دِيْنِكُمْ فَقَاتِلُوْاۤ أَئِمَّةَ الْكُفْرِ ۙ إِنَّهُمْ لَاۤ أَيْمَاَنَ لَهُمْ

অর্থাৎ আর যদি তারা অঙ্গীকার করার পর নিজেদের শপথসমূহ ভঙ্গ করে এবং তোমাদের ধর্মের প্রতি দোষারোপ করে, তবে তোমরা কুফুরের শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, এই অবস্থায় তাদের শপথ আর রইল না। (সূরা তাওবা: ১২)
যারা ইসলামী রাষ্ট্রে জিযিয়া কর দিয়ে বসবাস করে। ইসলামে এদের প্রতি অন্যান্য অমুসলিমদের চেয়ে অধিকার বেশী। কেননা তারা কর প্রদান করে অমুসলিম রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ও সংরক্ষণে বসবাস করে।

চতুর্থত : জিম্মী অমুসলিম

সুতরাং মুসলিম শাসকদের কর্তব্য হলো, তাদের জান, মাল ও ইজ্জত-সম্মানের উপর ইসলামী বিধান জারী করা এবং তারা যা কিছু হারাম মনে করে সে সব ক্ষেত্রে বিধান আরোপ ও তাদের বিপদ-আপদ ও দুঃখ দূর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে তাদের জন্য মুসলমানদের পৃথক পোশাক গ্রহণ করা জরুরি, ইসলামের মধ্যে তারা যেন খারাপ কিছু প্রকাশ না করে অথবা তাদের ধর্মের যেগুলি বিশেষ কার্যকলাপ যেমন সিঙ্গা, ঘণ্টা বাজান, ক্রুশ ব্যবহার থেকে দূরে থাকে।

অর্থাৎ তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ ও পরে যারা তোমাদের চুক্তি রক্ষায় কোন ত্র“টি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তাদের সাথে নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চুক্তি পূর্ণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সংযমশীলদেরকে পছন্দ করেন। (সূরা তাওবা: ৪) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন :