প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৭, রবি আউঃ-রবি সানী ১৪৩৮ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
অর্থ : হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ করো না। সে ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধনসম্পদ লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর উপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ঐ বস্তুর কোনো সওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৬৪)
সংক্ষিপ্ত তাফসীর
হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অনুগ্রহ প্রকাশ করে কিংবা কষ্ট দিয়ে স্বীয় খয়রাত (এর সওয়াব বৃদ্ধি)-কে বরবাদ করো না; সে ব্যক্তির মতো যে (শুধু) লোকদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে স্বীয় ধনসম্পদ ব্যয় করে (এবং স্বয়ং দান-খয়রাতের মূল সওয়াবকে বরবাদ করে দেয়) আর আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না (বিশ্বাস স্থাপন করার ধরন থেকে বোঝা যায় যে, এ ব্যক্তি মুনাফিক) অতএব, এ ব্যক্তির অবস্থা একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার উপর (মনে করো) কিছু মাটি (জমেছে এবং মাটিতে কিছু তৃণলতাও শিকড় গেড়েছে। অতঃপর তার উপর মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়) অনন্তর তাকে (যেমন ছিল, তেমনি) সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দেয়। (এমনিভাবে এ মুনাফিকের হাত থেকে যেন আল্লাহর পথে কিছু খরচ হয়ে গেলে বাহ্যত একে একটি সৎকর্ম বলে মনে হয় এবং এতে মনের মধ্যে সওয়াবের আশাও জাগে। কিন্তু তার নেফাক বা কপটতা তাকে সওয়াব থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। সে মতে কিয়ামাতে) তারা স্বীয় উপার্জন সামান্যও হস্তগত করতে সক্ষম হবে না। (কেননা, উপার্জন অর্থ সৎকর্ম। তা হস্তগত হওয়া, অর্থ সওয়াব পাওয়া এবং সওয়াব পাওয়ার জন্য বিশ্বাস ও আন্তরিকতা শর্ত। অথচ এগুলো তাদের মাঝে নেই। কারণ, তারা যেমন রিয়াকার, তেমনি কাফির।) আর আল্লাহ তায়ালা কাফিরদেরকে (কিয়ামাতের দিন সওয়াবের গৃহ অর্থাৎ জান্নাতের) পথ প্রদর্শন করবেন না। (কেননা, কুফরের কারণে, তাদের কোনো কর্মই গ্রহণীয় হয় না। গ্রহণীয় হলে এর সওয়াব পরকালে সঞ্চিত হতো এবং সেখানে পৌঁছে এর বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশাধিকার পেত।)
বিস্তারিত জ্ঞাতব্য বিষয়
দান-সাদকাকে বাতিল করো না
এতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দান-খয়রাতের পর অনুগ্রহ প্রকাশ কিংবা গ্রহীতাকে কষ্ট দেওয়ার মতো কোনো কাজ করা হয়, তা বাতিল এবং না করার শামিল। এরূপ দান-খয়রাতে কোনো সওয়াব নেই। এ আয়াতে দান কবুল হওয়ার আরও একটি শর্ত বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি লোক-দেখানো ও নাম-যশের উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস রাখে না, তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোনো মসৃণ পাথরের উপর মাটি জমে যায় এবং তাতে কেউ বীজ বপন করে। অতঃপর এর উপর মুষলধারে বারিপাত হয়। ফলে মাটি কেটে গিয়ে পাথরটি সম্পূর্ণ মসৃণ হয়ে যায়। এরূপ লোক স্বীয় উপার্জন হস্তগত করতে সক্ষম হবে না এবং আল্লাহ তায়ালা কাফিরদেরকে পথপ্রদর্শন করবেন না। এতে সদকা-খয়রাত কবুল হওয়ার এ শর্ত জানা গেল যে, নির্ভেজালভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালের সওয়াবের নিয়তে ব্যয় করতে হবে লোক দেখানো কিংবা নাম-যশের নিয়ত করা যাবে না। নাম-যশের নিয়তে ব্যয় করা ধনসম্পদ পানিতে ফেলে দেওয়ারই নামান্তর। যদি পরকালে বিশ্বাসী মুমিনও নাম-যশের উদ্দেশ্যে কোনো দান-খয়রাত করে, তবে তার অবস্থাও তদ্রপ হবে এবং বিনিময়ে কোনো সওয়াবই সে পাবে না।
ঈমানদার রিয়া করে না
এমতাবস্থায় এখানে যোগ করে সম্ভবত ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, লোক-দেখানো ও নাম-যশের উদ্দেশ্যে কাজ করা আল্লাহ তায়ালা ও কিয়ামতে বিশ্বাসী ব্যক্তির পক্ষে অকল্পনীয়। লোক-দেখানো কাজ করা বিশ্বাসে ত্রুটির লক্ষণ।
কাফিরদের পথ-প্রদর্শন না করার ব্যাখ্যা
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে : আল্লাহ তায়ালা কাফিরদেরকে পথ-প্রদর্শন করবেন না। এর তাৎপর্য এই যে, আল্লাহ তায়ালার হেদায়েত ও আয়াত সব মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছে। কিন্তু কাফিররা এ সবের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না বরং ঠাট্টা-বিদ্রপ করে। এর পরিণতিতে আল্লাহ তায়ালা তাদের তাওফীক তথা সৎকাজের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে দেন। ফলে তারা কোনো হেদায়েত কবুল করে না।
(সূত্র : তাফসীর মাআরেফুল কুরআন, ১ম খ-, পৃষ্ঠা : ৬২৬-৬৩৩)
