প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ
فَإِنْ زَلَلْتُمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْكُمُ الْبَيِّنَاتُ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অর্থ : (২০৮) হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (২০৯) অতঃপর তোমাদের মাঝে পরিষ্কার নির্দেশ এসে গেছে বলে জানার পরেও যদি তোমরা পদঙ্খলিত হও, তা হলে নিশ্চিত জেনে রেখো, আল্লাহ পরাক্রমশালী বিজ্ঞ।
(সূরা বাকারা, আয়াত : ২০৮ – ২০৯)

যোগসূত্র : পূর্ববর্তী আয়াতে নিষ্ঠাবানদের প্রশংসা করা হয়েছিল। অনেক সময় এই নিষ্ঠার মধ্যেও ভুলবশত বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। যদিও উদ্দেশ্য থাকে অধিক আনুগত্য, কিন্তু সে আনুগত্য শরীয়ত ও সুন্নাতের সীমারেখা অতিক্রম করে বিদ’আতে পরিণত হয়। যেমন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযি.) প্রমুখ ইহুদী আলিম ছিলেন এবং সে ধর্মমত অনুযায়ী শনিবার ছিল সপ্তাহের পবিত্র দিন, আর উটের গোশত ছিল হারাম। ইসলাম গ্রহণের পর সে সাহাবীর ধারণা হয় যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম-এর ধর্মে শনিবারকে পবিত্র দিন হিসাবে সম্মান করা ছিল ওয়াজিব। কিন্তু মুহাম্মদী শরীআতে তার অসম্মান করা ওয়াজিব নয়। তেমনিভাবে মূসা আলাইহিস সালাম- এর শরীআতে উটের গোশত ছিল হারাম, কিন্তু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীআতে তা ভক্ষণ করা ফরয নয়। সুতরাং আমরা যদি যথারীতি শনিবারে প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে থাকি এবং উটের গোশত হালাল জেনেও কার্যত তা বর্জন করি, তা হলে তো দু-কূলই রক্ষা পায়; মূসা আলাইহিস সালামের শরীয়তের প্রতিও আস্থা রইল, অথচ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীয়তেরও কোনো বিরোধীতা হলো না। পক্ষান্তরে এতে আল্লহর অধিকতর আনুগত্য এবং ধর্মের ব্যাপারে বেশি বিনয় প্রকাশ পাবে বলে মনে হয়। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারেই এ ধারণার সংশোধনী উচ্চারণ করেছেন। তারই সার-সংক্ষেপ হচ্ছে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান! আর ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা তখনই সাধিত হবে, যখন এমন কোনো বিষয়কে ধর্ম হিসাবে পালন করা না হবে, যা ইসলামে পালনযোগ্য নয়। বস্তুত এমন সব বিষয়কে ধর্ম হিসাবে গণ্য করা হলো একটি শয়তানী প্রতারণাজনিত পদঙ্খলন। আর পাপ হিসাবে তার শাস্তি কঠোরতর হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। (ইহুদি ধর্মেরও কিছুটা পক্ষপাতিত্ব করবে এমন নয়) এবং (এমন কোনো ধারণার বশবর্তী হয়ে) শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে মনের উপর এমন পট্টি পরিয়ে দেয়, যাতে কোনো কোনো বিষয় আপাতদৃষ্টিতে যথার্থ ধর্ম বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সম্পূর্ণ ধর্মবিরোধী হয়ে থাকে)। বস্তুত তোমাদের কাছে ইসলামী সংবিধানের প্রকৃষ্ট যথার্থ ধর্ম বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সম্পূর্ণ ধর্মবিরোধী হয়ে থাকে)। বস্তুত তোমাদের কাছে ইসলামী সংবিধানের প্রকৃষ্ট প্রমাণাদি উপস্থিত হওয়ার পরেও যদি সিরাতে মুস্তাকীম বা সরল পথ থেকে) তোমাদের পদঙ্খলন ঘটে, তা হলে নিশ্চিত জেনো, আল্লাহ তাআলা (বড়ই) পরাক্রমশালী, তোমাদের কঠিন শাস্তি দেবেন, অবশ্য শাস্তি যদি কিছুকালে না-ও দেন,তাতে তোমরা ধোঁকায় পড়ো না। কারণ) তিনি বিজ্ঞ বটে (বিশেষ কারণেও অনেক সময় শাস্তি দানে বিলম্ব করেন)।

বিস্তারিত জ্ঞাতব্য বিষয়
আয়াতের শব্দসমূহের অর্থ

শব্দটি যের ও যবরসহযোগে (সিল্ম ও সাল্ম) দুটি পৃথক পৃথক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটির অর্থ হচ্ছে শান্তি, অপরটির ইসলাম’। এখানে অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের মতে ইসলাম অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। (ইবনে কাসীর) শব্দটি পরিপূর্ণভাবে এবং সাধারণভাবে এই দুই অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ব্যাকারণের রীতি অনুযায়ী এখানে বাক্যটির গঠন হচ্ছে অবস্থাজ্ঞাপক। এতে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে, একটি হচ্ছে, (তোমরা অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও) শব্দে যে সর্বনাম রয়েছে, তার অবস্থা জ্ঞাপন করছে অথবা ইসলাম অর্থে শব্দটির অবস্থা জ্ঞাপন করছে।

প্রথম ক্ষেত্রে অনুবাদ দাঁড়াবে- তোমরা সম্পূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো অর্থাৎ তোমাদের হাত-পা, চোখ-কান, মন-মস্তিষ্ক সব কিছুই যেন ইসলামের আওতায় এবং আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে এসে যায়, এমন যেন না হয় যে, হাত-পা এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গের দ্বারা ইসলামের বিধানসমূহ পালন করে যাচ্ছে, অথচ তোমাদের মন-মস্তিষ্ক তাতে সন্তুষ্ট নয় কিংবা মন-মস্তিষ্ক ইসলামের অনুশাসনের সন্তুষ্ট বটে, কিন্তু হস্ত-পদাদি অঙ্গ-প্রতঙ্গের ক্রিয়াকলাপ তার বিরুদ্ধে।

দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আয়াতটির অনুবাদ এই যে, তোমরা পূর্ণাঙ্গ ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও অর্থাৎ এমন যাতে না হয় যে, ইসলামের কিছু বিষয় মেনে নিলে আর কিছু মানতে গিয়ে গড়িমসি করতে থাকলে। তাছাড়া কুরআন ও সুন্নাহের বর্ণিত পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধানের নামই হচ্ছে ইসলাম। কাজেই এর সম্পর্ক বিশ্বাস ও ইবাদতের সাথেই হোক কিংবা আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিকতা অথবা রাষ্ট্রের সাথেই হোক কিংবা রাজনীতির সাথে হোক, এর সম্পর্ক বাণিজ্যের সাথেই হোক কিংবা শিল্পের সাথে, ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা দিয়েছে, তোমরা তারই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।

এতদুভয় দিকের মূল প্রতিপাদ্যই মোটামুটিভাবে এই যে, ইসলামের বিধানসমূহ তা মানব জীবনের যে কোনো বিভাগের সাথেই সম্পৃক্ত হোক না কেন, যে পর্যন্ত তার সমস্ত বিধি-নিষেধের প্রতি সত্যিকারভাবে স্বীকৃতি না দেবে, সে পর্যন্ত মুসলমান বলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে না। এ আয়াতের যে শানে-নযূল উপরে বলা হয়েছে, মূলত তার মূল বক্তব্য এই যে, শুধু ইসলামের শিক্ষাই তোমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে। একে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করে নিলে সে তোমাদেরকে অন্য সমস্ত ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করে দেবে।

সতর্কতা : যারা ইসলামকে শুধু মসজিদ এবং ইবাদতের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে, সামাজিক আচার-ব্যবহারকে ইসলামী সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে না, তাদের জন্য এই আয়াতে কঠিন সর্তকবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। তথাকথিত দ্বীনদারদের মধ্যেই এ ত্রুটি বেশির ভাগ দেখা যায়। এরা দৈনন্দিন আচার-আচরণ, বিশেষ সামাজিকতার ক্ষেত্রে পারস্পারিক যে অধিকার রয়েছে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। মনে হয় এরা যেন এসব রীতিকে ইসলামের নির্দেশ বলেই বিশ্বাস করে না। তাই এগুলো জানতে-শিখতেও যেমন এদের কোনো আগ্রহ নেই, তেমনিভাবে এর অনুশীলনেও তাদের কোনো আগ্রহ নেই। নাঊযুবিল্লাহ! অন্ততপক্ষে হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) রচিত আদাবুল মুআশারাত পুস্তিকটি প্রতিটি মুসলমানের পড়ে নেওয়া উচিত।
সূত্র : তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খ-, পৃষ্ঠা : ৪৯৭-৪৯৯।