প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭ হিজরী, অগ্র-পৌষ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ছোটদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আজ আবু সুফিয়ানের গৃহে যে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ ।আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণে হযরত আব্বাস (রাযি.) বড়ো খুশি হলেন । এই খুশির প্রকাশ ঘটলো এভাবে- হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান একজন সম্ভ্রান্ত লোক। সম্মান ও মর্যাদাকে সে বড়ো ভালোবাসে। আপনি যদি তাঁর সম্মানের কোনো ব্যবস্থা করতেন!
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসালাম তখন মৃদু হেসে বললেন : হ্যা, আজ আবু সুফিয়ানের গৃহে যে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ। যে দরজা বন্ধ করে রাখবে সেও নিরাপদ। যারা কাবায় আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।
নবীজীর এই ঘোষনায় আবু সুফিয়ান বড়ো খুশি হলেন। আবার তিনি মহান রাসূলের মহানুভবতা ও ভালোবাসার কাছে নত হলেন। আবার বিস্ময়ে হতবাক হলেন।এ অস্ত্র দিয়েই বুঝি আল-আমীন জয় করেছেন! আজ জয় করবেন মক্কা!
তারপর এই বিজয়ধারা এবং ইসলামের এই আলোর ফোয়ারা ছুটে যাবে দিক-দিগন্তে।আরব থেকে আজমে!!অমন ভালোবাসার নবীর জয় কে ঠেকাবে?তিনি যে দেশ জয় করার আগে মন জয় করেন !!রণ ছন্দের তালে তালে বীরত্বের ঐ ঝলক দেখো ! পরদিন সকালে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম-এর নির্দেশে দশ হাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করতে লাগলো। হযরত আব্বাস (রাযি.) আবু সুফিয়ানকে নিয়ে দাঁড়ালেন একটু উঁচু টিলায়। সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো সাহাবায়ে কেরামের মক্কা প্রবেশের জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণিল চিত্র।
ইসলামী লশকর ছিলো গোত্রে গোত্রে বিভক্ত। শ্রেষ্ঠ রণ-সাজে সজ্জিত। লৌহ-শিরস্ত্রান পরিহিত। বীরদর্পে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গোত্রের পর গোত্র। রণ-ছন্দের তালে তালে। বীরত্বের ঝলক ছড়াতে ছড়াতে। আবু সুফিয়ান মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। বারবার জিজ্ঞাসা করলেন: এরা কারা? কোন্ গোত্রের লোক! হযরত আব্বাস (রাযি.) তখন একে একে সব গোত্রের পরিচয়ই তাঁর সামনে তুলে ধরতে লাগলেন- বলিষ্ঠ ও আনন্দ-প্লাবিত কন্ঠে।
ইসলামের শ্রেষ্ঠ সন্তান আনসার-মুহাজিরদের কাফেলা নিয়ে যখন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করছিলেন, তখন আবু সুফিয়ানের বিস্ময়-বিমুগ্ধতার কোনো সীমা-পরিসীমা রইলো না। তিনি বলে উঠলেন: আবুল ফজল! তোমার ভাতিজার রাজত্ব এতো শান-শওকতপূর্ণ!
হযরত আব্বাস (রাযি.) মৃদু প্রতিবাদ করে বললেন: ভুল বললে আবু সুফিয়ান! এ মোটেই রাজত্ব নয়- এ হলো শানে নবুওয়ত!
যাও, তোমরা মুক্ত!
শানে নবুওয়ত দেখার পর এবার আবু সুফিয়ান ছুটে গেলেন গৃহ থেকে গৃহে। ঘোষনা করতে করতে , হে কুরাইশ সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম এসে পড়ছেন । সঙ্গে আছে তাঁর বিশাল বাহিনী। অসম্ভব তাঁকে প্রতিরোধ করা। তবে যারা নিরাপত্তা চাও, তারা কান পেতে শোনো- আজ যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ। আজ যারা নিজের ঘরে বসে থাকবে দরোজা আটকে তারাও নিরাপদ। যারা কাবায় গিয়ে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।
আবু সুফিয়ানের ঘোষনা শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে গেলো ছুটোছুটি। কেউ ছুটে গেলো আবু সুফিয়ানের গৃহের দিকে, কেউ ছুটে গেলা কাবার দিকে। কেউ ছুটে গেলো নিজের গৃহের দিকে। বসে থাকলো দরোজা বন্ধ করে। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম প্রবেশ করলেন মক্কায়-বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে। ইসলামী রণ-কৌশল ও যুদ্ধ-নীতির ঝলক ছড়াতে ছড়াতে। আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে করতে।
মক্কায় এসেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম সাতবার কাবা তাওয়াফ করলেন। সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের বিশাল বাহিনী। মুহূর্তেই কাবা চত্বর মুখরিত হয়ে উঠলো হাজার হাজার কন্ঠের তাকবীর-ধ্বনিতে। আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি- ধ্বনিতে।
এরপর আল্লাহর নবী, রহমতের নবী, করুনার নবী দাঁড়ালেন কাবার দরজায়! তাকালেন দয়াভরা, মায়াঝরা দৃষ্টিতে-সমবেত জনতার দিকে! ছোট্ট নীরবতার পর বললেন আবেগ-মথিত কন্ঠে, দয়াভরা কন্ঠে, মমতাঝরা কন্ঠে, কুরাইশ সম্প্রদায়! কী মনে হয় তোমাদের? আজ আমি কেমন আচরন করবো তোমাদের সাথে?
