প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

নামাজ- রোজা করি না, তাহাজ্জুদ পড়ি না, দাড়ি-টুপির খবর নেই-অথচ দুধু, মধু , কদু খাচ্ছি আর বলছি- সুন্নত আদায় করছি। সুদ-ঘুষ, চুরি-বাটপারীতে লিপ্ত রয়েছে। তাতে কি? আল্লাহপাক বলেছেন- হজ্জ্ব করলে গোনাহ মাফ হয়ে যায়। সুতরাং হারাম টাকা দিয়ে একবার হজ্জ্ব করে নিলেই হ’ল – ব্যাস, জীবনের হারামীগুলো সব হালাল হয়ে গেল আর কি?

নামাজ পড়ার সময় হয় না, রোজা রাখতে পারিনা, ফরজ হজ্জ্ব করি নাই, যাকাত দেই না- কিন্তু বৎসরে একবার মহা ধূমধামের সাথে মিলাদ পড়াই। এমন একটা ভাব যেন ‘শর্ট – কাটে’ সারা বছরের কাফফারা একসাথে আদায় করছি।

সুখে থাকলে আল্লাহপাককে স্মরণ হয় না, কিন্তু বিপদে-আপদে, রোগে- শোকে স্মরণ করি। তাও আবার নামাজ পড়ে; মুনাজাত করে নয়-বরং কোন পীরের দরবারে দৌড়ে বা আজমীর শরীফ গিয়ে। দু’হাত দূরে মসজিদে যাওয়ার সময় হয় না, অথচ হাজার হাজার টাকা খরচ করে আজমীর যেতে আমাদের কোন কষ্ট হয় না।

সারা জীবন পর্দার খবর নেই, অথচ মৃত্যুর পরে পর্দার কি বাহার! কাফন পড়িয়ে তার উপর চাদর ইত্যাদি দিয়ে খাস পর্দার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি কেউ যাতে চাদরের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতে না পারে- সে ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। সারা জীবন বেপর্দায় চলেছে, অথচ তখন কেউ ঐ লাশের দিকে ফিরেও তাঁকাবে না- তখন কিনা পর্দা করানোর জন্য আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

‘শর্ট – কাটে’ কাজ সাড়া আর কি!

সাড়া জীবন ‘বুশ বাবুর মিল্লাতে’ থেকে মরার পর কবরে নামানোর সময় বলে ‘মিল্লাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’। সারা জীবন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের সমস্ত আদর্শের গলায় ছুরি চালিয়ে ইহুদী-নাসারাদের আদর্শে জীবন কাটালাম আর মরার পরে ‘মিল্লাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – বলে কবরে শুইয়ে দিলাম- তা’হলে কি কাজ হবে? ইহুদী-নাসা’রাদের ‘মিল্লাতে’ থাকলে মরার পরও ‘মিল্লাতে নাসারা বলতে হবে। ‘শর্ট – কাটে’ ‘মিল্লাতে রাসূলুল্লাহ’ বললেই কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিল্লাত হওয়া যাবে।

সারা জীবন সার্ট, প্যান্ট, কোট, টাই পরে কাটিয়ে গেছে অথচ মরার পর সুন্নতী পোষাক ‘কাফন’ পড়ানো হয়। মরার আগে সুন্নতী পোষাক দেখলে ভ্রƒ কোচকাতো; আর মরার পর তাকে তার অপছন্দীয় সুন্নতী পোষাক পড়ানো কি ঠিক হচ্ছে? বেচে থাকলে সে কিছুতেই সুন্নতী পোষাক পড়াতে দিত না। সুতরাং আমার মতে ঐ মৃত ব্যক্তির হিতাকাঙ্খিদের উচিত জোড় করে ব্যাচারার অপছন্দনীয় সুন্নতী কাফন তাকে না পড়ায়ে সুট- কোট, শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায়ই তাকে কবর দেয়া হোক!

সারা জীবন চুরি-বাটপারী করে, পরের হক মেরে খায় আর মৃত্যুর পর তাঁর আত্মীয়রা কবর দেয়ার আগে চিল্লিয়ে জিজ্ঞেস করে- ‘এ লোকটা কেমন মানুষ ছিল?’ মৃতের প্রতি সমবেদনার খাতিরে বাধ্য হ’য়ে কিছু লোক উত্তরে বলে-‘ভাল ছিল’। ব্যাস, কুল্লে মাৎ! এ শর্ট কাট ‘ভাল ছিল’ কথাতেই কি লোকটি ভাল হয়ে গেল?

মৃত বাবা-,মার জন্যে নিজে দোয়া করার সময় পাইনা। বছরে-দু’বছরে একবার মৌলবী-মুন্সী দাওয়াত দিয়ে বেপর্দা আত্মীয়-স্বজন ঘরে এনে মিলাদ পড়াই, চল্লিশা করি। যেখানে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর তাঁদের জন্য দোয়া করা কর্তব্য, সেখানে বার্ষিকভাবে একবার রেছমি মিলাদ পড়িয়ে অন্য একজনকে দিয়ে দোয়া করিয়ে ‘শর্ট-কাটে’ দায়িত্ব শেষ করে দেই।

ছেলে- মেয়েদেরকে দ্বীনি শিক্ষা দেয়া বাবা-মার কর্তব্য। সে কর্তব্যও তো আদায় করা দরকার, কিন্তু কিভাবে? সকাল ৭টার থেকে ৮টা পর্যন্ত গানের মাষ্টারের কাছে গান শিখে। মাষ্টারের বেতন ২০০০/- টাকা। ৮টা হতে ৯টা পর্যন্ত বাংলা ইংরেজীর শিক্ষকের কাছে পড়ে। বেতন ২৫০০/- টাকা। সুতরাং কুরআন শরীফ আর পড়বে কখন? ঠিক আছে, হুজুর রেখে দাও। সকালে গান শেখার আগে ১৫ মিনিট কুরআনটা একটু পড়ে নিবে। কুরআনের শিক্ষক হুজুরকে কত বেতন দেয়া হয়? এই ধরেন- ২০০ টাকার মধ্যে ‘শর্ট-কাটে’ দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল।

ভাল ছেলে- মেয়েদেরকে মাদ্রাসায় পড়তে দেয়া হয় না। তাদেরকে দেয়া হয়- স্কুল-কলেজে। আর যে ছেলেটা বোকা, বুদ্ধি কম, অংক-ইংরেজী মাথায় ঢোকে না- তাকে এনে ঢুকানো হয় মাদ্রাসায়। যার কোন গতি নেই, তার গতি মাদ্রাসা-এমন একটা ভাব আর কি!

যৌবনকালই ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়। অথচ আমরা যৌবনকে যেন-তেনভাবে আনন্দ-ফূর্তি আর আড্ডাবাজিতে কাটিয়ে দেই। নামাজ- রোজার কথা বললে বলি এখনও নামাজ- রোজা করার বহু সময় আছে। যৌবনকালে ওসব করে সময় নষ্ট (?) করা যাবে না (নাউযু বিল্লাহ)। বার্ধক্যের অবসরে দেখা যাবে!

যুবতী মেয়ে ও বৃদ্ধা মা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। যুবতীর বুক- পেট সব খোলা আর বৃদ্ধার চোখটা পর্যন্ত নেকাব দিয়ে ঢাকা! এখানেও সেই ‘শর্ট-কাট’ চিন্তা-ভাবনা-সাড়া জীবন খোলামেলা থেকে আনন্দ করে নেই, বৃদ্ধ বয়সে সব পুশিয়ে দেব!

নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতের কোন খবর নেই, অথচ ইশকে রাসূলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেওয়ানা হয়ে নারী-পুরুষ বেপর্দা হয়ে এক সাথে মিছিল করছে, মিলাদ পড়ছে। ‘শর্ট-কাটে’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাজী করার কি অভিনব পন্থা।

‘শেরে খাজা’ ‘খাজা বাবার খাদেম’ ‘খাজা বাবার ভক্ত’ — অথচ নামাজ নেই, রোজা নেই, পর্দা-পুশিদা কিছুই নেই। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ)-এর কোন আদর্শ তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না-অথচ সে ‘খাজার ভক্ত’। এদের ‘শর্ট-কাট’ ব্যবস্থা-
“খাজা বাবার ওরশে যাও,
তাঁর মাজারে সিজদা দাও।
মসজিদে গিয়ে কি হবে?
আজমীর গেলে সব পাবে।”

নামাজ- রোজার বালাই নেই, অথচ বলে কিনা আমি মারফতী ফকীর, দেলে দেলে নামাজ পড়ি। মদ-গাজা খায়, জেনা করে আর বলে বেড়ায়-আল্লাহ যা’করান তাই করি। তারা বলে তরীকতের আমল করে আমরা এত উচ্চ দর্জা হাসেল করেছি যে, আমাদের জন্য নামাজ- রোজা মাফ হয়ে গেছে। এরা ‘শর্ট-কাট’ পথ খুঁজতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।

কেউ মারা গেলেই মাইক নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে- ‘ফালানা কলিমুদ্দীন গরু চোর ইন্তেকাল করিয়াছেন… ইন্নালিল্লাহি ওয়া…। পত্রিকায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছবি ছাপিয়ে বিরাট করে বিজ্ঞাপন দিয়ে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করে। ভাবখানা এরকম- আল্লাহপাক হয়তো ছবি না দেখলে চিনতেই পারবেন না যে, কে মারা গেল (নাউযুবিল্লাহ)!

বাড়ীতে টেলিভিশনের উপর কুরআন শরীফটা রাখা আছে। উপরে ‘কুরআন শরীফ’ আর নীচে ‘ টেলিভিশন শরীফ’(?)। দৈনিক ১০ ঘন্টা টেলিভিশন দেখি অথচ ১০ মিঃ কুরআন পড়ার সময় হয় না। মাসে -দুমাসে একবার কুরআন চুমু দিয়ে আবার স্বস্থানে রেখে দেই। ‘শর্ট-কাট’ ব্যবস্থা আর কি!

সারা জীবনে কলেমা পড়ার সময় পায়নি, অথচ মৃত্যুর সময় কলেমা পড়ানোর জন্য উপস্থিত সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সারা জীবন যা’ করে করুক, মরার সময় কলেমা পড়ে নিলেই হ’ল, ‘শর্ট-কাটে’ জান্নাতে পৌঁছে যাবে!

আজ দেশ শুদ্ধ মুসলমান। চার দিকে কেবল মুসলমান আর মুসলমান। এমন অনেক লোক আছে, শুয়ে উঠতে পারে না-নাম তার হিম্মত আলী। চোখে দেখে না নাম তার নজর আলী! নাম শুনে মনে হবে যেন সাচ্চা মুসলমান, কিন্তু খোঁজ করলে দেখা যাবে– তার মধ্যে মুসলমানিত্বের কিছুই নেই। কেবল নামে মুসলমান হ’লেই হবে না, কাজেও মুসলমান হতে হবে।

কুরআন পড়লেই মুসলমান হওয়া যায় না। কুরআন বুঝলেই মুসলমান হওয়া যায় না। তাই যদি হ’ত -কুরআনের অনুবাদক হিন্দু গিরিশ চন্দ্র সমস্ত বড় মুসলমান ‘হ’ত। মুসলমান হ’ল ঐ লোকটা- যে আল্লাহর মতে চলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আদর্শে নিজের জীবনকে গড়ে তোলে।

ধন-দৌলতে মুসলমান হওয়া যায় না, বংশ মর্যাদায় মুসলমান হওয়া যায় না, মুসলমান হওয়া যায় খোদায়ী স্বভাবে। মর্যাদার মাপকাঠি হল তাকওয়া বা পরহেজগারী। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু লাহাব, আবু জাহেল বংশে ভাল, চেহারায় ভাল, গতরে ভাল, সব কিছুতে ভাল হয়েও জাহান্নামী হয়ে গেছে। আর জাত গোলাম, বংশ গোলাম হযরত বেলাল (রাঃ) বেহেশতের বাগিচায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

চৌধুরী ছেলে চৌধুরী হতে পারে, পাঠানের ছেলে পাঠান হতে পারে, সৈয়দের ছেলে সৈয়দ হতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলাম অনুযায়ী না চলবে– মুসলমান হওয়া যাবে না। কাফেরের বাচ্চা ইব্রাহীম (আঃ) উলুল আজম পয়গম্বর হয়েছিলেন আর উলুল আজম পয়গম্বরের বেটা কেনান ইসলামকে ছেড়ে দিয়ে কাফের হয়ে গিয়েছিল।

ইসলামের ‘শর্ট-কাট’ বলে কোন কথা নেই। আল্লাহপাক বলেছেন—

‘উদ্বখুলু ফিস সিলমী কা-ফফা’
(সূরা বাকারা, ২০৮ আয়াত)
অর্থাৎ তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখেল হও। শুধু ঈমান এনে কলেমা পড়ে বসে থাকলে বা ইসলামের কিছু নির্দেশ মানলে আর বাকীগুলো ছেড়ে দিলে কখনই খাঁটি মুসলমান হওয়া যাবে না।

আমি প্রায়ই ওয়াজে একটা গল্প বলি। এক হিন্দু ব্রা‏হ্মণ আর এক মুসলমান মৌলভী সাহেব ছিল। দুজনের গলায় গলায় ভাব। একসাথে থাকে, এক সাথে শোয়, একসাথে ঘুমোয়। হঠাৎ একদিন দুজনের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গেল। মারামারি লেগে যাবার দশা! “কি হয়েছে” লোকে জিজ্ঞেস করায় হিন্দু ব্রাক্ষণকে দেখিয়ে মৌলবী সাহেব বললেন, “ও বলে কিনা ওর হরির জোর বেশী!” আর ব্রা‏হ্মণ সাহেবও মৌলবীকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও বলে কিনা ওর খোদার জোর বেশী!” অবশেষে লোকজন ঠিক করলো পরীক্ষা হবে। চার তলা দালানের উপর থেকে ঝাপ দিতে হবে। সব ঠিক ঠাক। এখন ঝাপ দেয়ার পালা। মৌলবী বলে তুমি আগে ঝাপ দাও। ব্রা‏হ্মণ বলে, “তুমি আগে যাও।” অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো- মৌলবী সাহেব আগে ঝাপ দিবেন। মৌলবী সাহেব ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ঝাপ দিলেন। তখন ব্রা‏হ্মণ মনে মনে চিন্তা করে, “ওতো আল্লাহর নাম নিয়ে বেঁচে গেল। এখন আমি আল্লাহ নেব, না হরি নেব।” অবশেষে সে ঝাপ দিল “হরি-আল্লাহ” বলে। ব্যাস, পড়েই “ফটাশ”। আজ ইসলামকে ‘শর্ট-কাট’ করতে গিয়ে আমাদের দশা হয়েছে ঐ “হরি-আল্লাহর” মত। নাচেও আছি, গানেও আছি, সিনেমা হলেও আছি, টেলিভিশনেও আছি, মসজিদেও আছি, দানেও আছি, পীর সাহেব হুজুরের কাছেও আছি, আবার শয়তান সাব হুজুরের কাছেও আছি। গুও মাখছি আবার আতরও মাখছি। ঐ রকম করে কি হয়? “হরি-আল্লাহ” ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহকে ধরুন, নচেৎ ঐ মরণেও ‘ফটাশ’ কবরেও ‘ফটাশ’ হাশরেও ‘ফটাশ’, মিজানেও ‘ফটাশ’, পুলসিরাতেও “ফটাশ”।
সুতরাং আর ‘শর্ট-কাট’ ইসলাম (ঝযড়ৎঃ-ঈঁঃ ওংষধস) নয়। আসুন সবাই ‘কমপ্লিট’ ইসলামের (ঈড়সঢ়ষবঃব ওংষধস) অনুসারী হই।

ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা।

জীবনের সকল ক্ষেত্রে যখন আমরা পুরোপুরিভাবে ইসলামী বিধি নিষেধ মেনে চলতে সক্ষম হবো, তখনই খাঁটি মুসলমান হতে পারবো। আল্লাহপাক সবাইকে তৌফিক দ্বিন। আমীন।

অমুসলিম মনীষীদের দৃষ্টিতে আল-কুরআন
মহাত্না গান্ধী তাঁর ’ইয়ং ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লেখেনঃ

-আল কুরআন একটি ঐশী গ্রন্থ। আমি আল কুরআনের শিক্ষা ও দর্শনের উপর পড়াশোনা করেছি। একে ঐশী গ্রন্থ বলে গ্রহণ করতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। আমার কাছে এ গ্রন্থের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বা বৈশিষ্ট্য হিসাবে এ দিকটাকেই বেশী প্রতীয়মান হয়েছে যে, মানব প্রকৃতির সঙ্গে এর বিধানবলীর আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়।

স্যার উইলিয়াম ম্যুর বলেছেন ঃ

আল কুরআন অপরিবর্তনীয়। এর কোন অংশ, কোন পরিচ্ছেদ, এমনকি কোন কোন সংকলক একে বাদ দিয়েছেন কিংবা কেউ এর মধ্যে কোন নতুন শব্দ বা বাক্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন এমন নজির কোথাত্ত পাত্তয়া যাবে না।

বিশিষ্ট গবেষক জর্জ বিল লিখেছেন ঃ

আল কুরআন অলৌকিক গ্রন্থ। নিঃসন্দেহে আল কুরআন আরবী ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। কোন মহামানবের জ্ঞান ও মেধা এই ধরনের গ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম নয়। মৃত প্রাণীকে জীবিত করার চেয়েও কঠিন -দুঃসাধ্য ও অলৌকিক এই গ্রন্থ।

খৃস্টান ঐতিহাসিক মিঃ বাডলে বলেনঃ

আল কুরআন বিতর্কের উর্ধ্বে। এটাই একমাত্র গ্রন্থ যার মধ্যে তেরশ’ বছরেও কোন পরিবর্তন -পরিবর্ধন সংঘটিত হয়নি। আল কুরআনের সামনে উপস্থাপন করার মত কোন জ্ঞান ইয়াহুদী এবং খৃষ্টধর্মে নেই।

জার্মান গবেষক আইকাম কী বলভ লিখেনঃ
আল কুরআন পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের শিক্ষা দেয়। এর উপর আমল করলে যাবতীয় রোগ-ব্যাধি এবং জীবাণু সংক্রামণ থেকে রক্ষা পাত্তয়া যায়।

প্রফেসর টমাস কারলাইল লিখেছেন

আমার নিকট এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, কুরআনের মধ্যে সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার গুনাবলী সর্বযুগেই সমভাবে বিদ্যমান এবং এ কথাটি দিবালোকের মত সত্য যে, পৃথিবীতে যদি সুন্দর এবং কল্যাণকর কিছু সৃষ্টি হয়, তা কুরআন থেকেই হতে পারে।

ডঃ আরনল্ড টোয়াইন তাঁর ‘প্রেসিং অব ইসলাম’ গ্রন্থে লিখেছেন ঃ

আল কুরআন পূর্ণাঙ্গ বিধানের সমষ্টি। যে বিধান সমূহ কুরআনে বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলো আপন জায়গায় সার্থক ও পূণাঙ্গ।

পাদ্রী রেভারেন্ড জি এম এডয়েল লিখেনঃ

আল কুরআনের শিক্ষা মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ করেছে। বস্তুতান্ত্রিকতার রাহু থেকে মানুষকে দিয়েছে মুক্তি। একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত এবং তাঁর দাসত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

মানুষকে রেহাই দিয়েছে শিশু হত্যার মত নৃশংস ও অমানবিক প্রথার কালো অধ্যায় থেকে। মাদকদ্রব্যকে করেছে হারাম। চুরি-ডাকাতি, খুন-ব্যভিচার ইত্যাদি দমনে এমন শাস্তির বিধান দিয়েছে যে, কোন লোক এসব অপরাধ করার মত সাহসই খুঁজে পায় না।

দি উইজডম অব দ্যা কুরআন গ্রন্থে বলা হয়েছে ঃ

প্রাচীন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ আল কুরআন সৌন্দর্য ও হৃদয় গ্রাহিতার এক মনোরম ক্ষেত্র। এর বর্ণনা শৈলী অত্যন্ত নিখুঁত এবং মনোমুগ্ধকর। ছোট ছোট বাক্যগুলোতে যেন ছ্ন্দ ও কবিতার বিচিত্র সব উদাহরণের সমাহার। পাশাপাশি রয়েছে গযব বা শাস্তির ভয়াবহ ঘোষণা আর বিস্ময়কর নানা ঘটনার বর্ণনা। মোট কথা, কুরআনের সঠিক মর্ম ও তাৎপর্যকে কোন ভাষায় সীমিত গন্ডিতে ধারন করা সত্যই কঠিন।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ঃ

আল কুরআন মানবজগতের সংস্কারক। আধ্যাতিক নির্দেশনা এবং জ্ঞান গর্ভ তথ্যে সমৃদ্ধ এই সংস্কার সাধন করেছে। যে সকল মনীষী এর মর্ম এবং অন্তনির্হিত তাৎপর্যের সন্ধান পেয়েছেন, তারাই এ সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন যে, কুরআন একটি পূণাঙ্গ জীবন দর্শন। মানব জীবনের যে কোন সমস্যাই এর কাছে নিয়ে যাত্তয়া হোক না কেন, কুরআন তার সমাধান বের করবেই।

মাওয়ায়েজে আনসারীয়া

* ইংরেজি পড়–ন, কিন্তু ইংরেজ হবেন না।

* মাদ্রাসায় পড়–ন, আল্লাহওয়ালা হোন।

* ইয়াকুব (আ:)-এর ছেলে হয়েও ইউছুফ (আ:)-এর ভাইয়েরা তাঁর সাথে শত্রুতা করেছিল, তাঁকে মেরে ফেলার জন্য কুয়ায় নিক্ষেপ করেছিল। নবী (আ:)-এর বেটা হয়েও ভাইয়ে ভাইয়ে মিল হয়নি। সুতরাং আমাদের ভাইয়েরাও আমাদের সাথে শত্রুতা করতে পারে-এটা আর বিচিত্র কি!

* ছোট ছোট মুস্তাহাব বিষয় নিয়ে আমরা ঝগড়া করি, অথচ মাজহাবের ইমামদের দেখুন। শাফেয়ী মাজহাবের ইমাম হানাফী মাযহাবের ইমামের পিছনে নামাজ পড়ার সময় তাঁর সম্মানে নিজেও হানাফী মাজহাবের মাসআলা অনুযায়ীই নামাজ পড়েছেন। চিন্তা করে দেখুন! তাঁরা একে অপরকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন এবং মুসলিম ঐক্যের প্রতি কতটা সতর্ক ছিলেন।

* হযরত আলী (রা:) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা:)-এর মধ্যে যখন যুদ্ধ চলছিল, তখন রোম সম্রাট হযরত মুয়াবিয়া (রা:)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠায় যে, আপনি যদি বলেন তাহলে আমি আলী (রা:)-এর বিরুদ্ধে আপনার পক্ষে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত! হযরত মুয়াবিয়া (রা:) তার জবাবে লিখলেন– ‘হে রোমের কুকুর! শুনে রেখ, যদি তুমি তোমার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আমাকে সাহায্য করার জন্য অগ্রসর হও, তবে আমি আমার ভাই আলী (রা:)-এর সাথে মিলিত হয়ে উভয়ে একত্রিতভাবে তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।’
ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে তাঁরা কতটা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন- এ ঘটনাটিই তার উজ্জল নজীর।

* মুসলমানদের একতাবদ্ধ থাকা ফরজ। এই ফরজকে বাদ দিয়ে সামান্য মুস্তাহাব বিষয় ও জুজিয়াত মাসআলা নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি করে মুসলমানদের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি করা হারাম।

* যে আমার আল্লাহকে আল্লাহ ও আমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, সে পৃথিবীর যে দেশের বা যে দলেরই হোক না কেন- সে মুসলমান, সে আমার ভাই।

* এমন কথা বলবেন না- যেন মুসুলমান কাফের হয়ে যায়। এমন কথা বলুন- যেন কাফের মুসলমান হয়।

* সর্বপ্রকার শিরক হতে বেঁচে থাকবেন। সর্বহারা হতে হলেও কখনও আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেন না।

* গায়েবের মালিক আল্লাহ। নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলিমুন গায়ব, তিনি সদা সর্বত্র হাজের-নাজের-এসবই কুফরী মতবাদ।

* রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর জাতিনূর-এই মতবাদ কুফরী মতবাদ। খৃষ্টানরা ঈসা (আ:)-কে খোদার বেটা বলেছে, আর তুমি মুসলমান হয়ে রাসূলকে আল্লাহর জাতি নূর বলছে? দুটোই একই ধরণের অপরাধ।

* দুনিয়ায় আল্লাহর দীদার লাভ করা সম্ভব নয়।

* কবর সিজদা হারাম। কোন মানুষকে সিজদা করা হারাম। পীর তো দূরের কথা, নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সিজদা করলেও কাফের হবে।

* সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। কোন জীবিত ওলী, মৃত পীর বা মাজারে শায়িত ব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া কুফরী।

* কবরে গিলাফ চাপিয়ে আলোকসজ্জা করে মানুষের ঈমানকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আপনারা কবর মুখী হবেন না, আল্লাহমুখী হন।

* আমাদের কিবলা বাইতুল্লাহ। কাবার দিকে ছাড়া অন্যদিকে সিজদা করা কুফরী। অনেকে উত্তর দিকে বোগদাদী সিজদা করেন। সাবধান ঈমান হারাবেন না।

* চৌদ্দজন ছাড়া মেয়ে পুরুষ দেখা দেয়া হারাম। বেগানা মেয়ে মানুষের জন্য স্বীয় পীরকেও দেখা দেয়া হারাম।

* ইসলামে ব্যক্তিপূজা নেই। পীর কোন দেবতা, ঈশ্বর, অবতার নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন
এত্তেবার জিনিস। এত্তেবায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছা যায়।

* আমরা পীর ধরি আল্লাহর হবার জন্য, পীরের হবার জন্য নয়। বাজার-সদায়, বিয়েশাদী ইত্যাদি যেমন দেখে শুনে করেন, পীর ধরতেও তেমনি যাঁচাই বাছাই করবেন।

* আওলাদকে আল্লাহর বানানো, হালাল রিজিক উপার্জন করা জিহাদের সওয়াব।

* যারা ওযু করবে, নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাশরে তাদের চিনতে পারবেন। কারণ তাদের চেহারা নূরের মতো চমকাতে থাকবে।

* গান, বাদ্য, সুর হারাম। গানের সুরে গজল, নাত-হামদ-এমনকি কুরআন শরীফ পড়াও হারাম। বাদ্যসহ জিকির করা হারাম।

* যে মেয়েলোক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে, পর্দার সাথে থাকে, স্বামীর খেদমত করে তার জন্য বেহেশতের আটটি দরজাই খোলা থাকবে।

* নামে মুসলমান হয়েও ব্যক্তি জীবনে যে ইসলামের আইন মেনে চললো না, সে মুনাফিক।

* দুনিয়ায় যাদেরকে মসজিদে পাওয়া যাবে, আখেরাতে তাদেরকে জান্নাতে পাওয়া যাবে।

* পণ নিয়ে বিয়ে করা হারাম।

* সবচেয়ে বড় ওলী ঐ ব্যক্তি- যিনি হালাল খানা খান এবং পরিপূর্ণ ভাবে রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অনুসরণ করে চলেন।

* হতে হয় হয়ে যান সর্বহারা, কিন্তু ঈমান হারা হবেন না। ঈমান হারার স্থায়ী নিবাস জাহান্নাম।

* মানবতা অর্জন কর। মানবতাহীন মানুষ আর পশুতে তফাৎ কি? আধুনিক বেশ ভূষায় যতই সজ্জিত হও না কেন, ভেতরে মানবতা না থাকলে বাহ্যিক সজ্জা বৃথা।

* বিড়ি-সিগারেট খাবেন না। বিড়ি-সিগারেট খানেওয়ালার দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না। কুকুরে যা খায় না, আপনি মানুষ হয়ে তা খাবেন? বিড়ি-সিগারেট খেয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে মওত হ’লে তা’ হবে হারামী মওত।

* দাড়ি, টুপি, জোব্বার আমল করুন- আপনার জন্যে জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে।

* সুন্নতের তাবেদারী নাজাতের একমাত্র উপায়।

* ইসলামের ক্ষতি কাফের মুশরিকরা যা’ না করেছে তার চেয়ে বেশী করেছে মুনাফিক মুসলমানেরা।

* ইসলাম ছাড়া যত মতবাদ কুফরী মতবাদ। ইসলাম ছাড়া যত ধর্ম মানুষের মনগড়া ধর্ম। ইসলাম মিটেনা, মিটানো যায় না, যারা মিটাতে এসেছে, তারাই মিটে গেছে।

* শুধু এলেম থাকলেই হয় না, আমল দরকার। আবার আমল থাকলেই হয় না, এখলাছ দরকার।

* আমাদের দলিল কোন সৈয়দ বা সিদ্দীক নন। আমাদের দলিল হলো- কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কেয়াস।