প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

১. যখন কোন ব্যক্তির নিকট সাক্ষাৎ করতে বা কিছু বলতে যাও, আর তার কোন ব্যস্ততার কারণে সুযোগ না থাকে- যেমন, সে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করছে, বা ওযীফা পাঠ করছে, বা নির্জনে বসে কিছু লিখছে, বা শোয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে, বা লক্ষণের ভিত্তিতে এ ধরনের অন্য কোন অবস্থা জানতে পারো, যার দ্বারা বোঝা যায় যে, ঐ ব্যক্তির নিকট্ গেলে বা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে যথাসম্ভব তার ক্ষতি হবে, বা সে বিরক্ত হবে বা পেরেশান হবে- তাহলে এমন সময় তার সাথে সালাম-কালাম করো না। বরং ফিরে চলে যাও। আর যদি খুব বেশী জরুরী কথা থাকে, তাহলে আগে তাকে জিজ্ঞাসা করে নাও যে, আমি কিছু বলতে চাই। তারপর অনুমতিক্রমে কথা বলো। এতে বিরক্তি বা কষ্ট হয় না। আর না হয় অবসর সময়ের জন্য অপেক্ষা করো। যখন তাকে অবসর দেখতে পাও, তখন তার সাথে সাক্ষাত করো।

২. কারো অপেক্ষায় বসতে হলে এমন জায়গায় এবং এমনভাবে বসো না যে, সে জানতে পারে যে, তুমি তার জন্য অপেক্ষা করছো। এতে অনর্থক তার অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং তার একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটে। বরং তার থেকে দূরে এবং তার দৃষ্টির আড়ালে বসো।

৩. এমন সময় মুসাফাহা করো না, যখন অন্যের হাত এমন কাজে আটকা থাকে যে, হাত খালি করতে তার কষ্ট হবে। বরং সালাম করেই ক্ষান্ত হও। এমনিভাবে ব্যস্ততার সময় বসার জন্য অনুমতির অপেক্ষায় থেকো না, বরং নিজের থেকেই বসে যাও।

৪. কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা পরিষ্কারভাবে কথা বলে না। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে ও ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলাকে আদব মনে করে। এতে করে সম্বোধিত ব্যক্তি অনেক সময় কথা বুঝতে পারে না বা ভুল বোঝে। ফলে তখন বা পরবর্তীতে পেরেশানী হয়। কথা খুব স্পষ্ট করে বলা উচিত।

৫. কোন কোন লোক বিনা প্রয়োজনে অন্য লোকের পিছনে গিয়ে বসে। এতে মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। বা পিছনে নামাযের নিয়ত বাঁধে। এমতাবস্থায় সে নিজের জায়গা থেকে উঠতে চাইলে পিছনে নামায আদায়কারীর কারণে উঠতে পারে না। আটকে যায়। ফলে তার মনঃকষ্ট ও বিরক্তি হয়। এটা ঠিক নয়।

৬. কেউ কেউ মসজিদে এমন জায়গায় নামাযের নিয়ত করে যে, অতিক্রমকারীদের পথ বন্ধ হয়ে যায়। যেমন, দরজার সামনে বা পূর্ব দেওয়ালের সাথে একেবারে ঘেষে দাঁড়ায়। ফলে পিঠের দিক থেকে বের হওয়ারও সুযোগ থাকে না। সামনের দিক দিয়েও গুনাহের কারণে বের হতে পারে না। তাই এমন করবে না। বরং কেবলার দিকের দেওয়ালের নিকটে এক কোণায় নামায পড়বে।

৭. কারো নিকট গেলে সালাম দিয়ে, কথা বলে, সামনাসামনি বসে বা যে কোন উপায়ে তাকে তোমার আগমনের কথা জানিয়ে দাও। তাকে না জানিয়ে আড়ালে এমন জায়গায় বসো না যে, সে তোমার আগমন সম্পর্কে জানতে না পারে। কারণ, হতে পারে যে, সে এমন কোন কথা বলতে চায়, যা তোমাকে জানাতে চায় না। তার সম্পতি ছাড়া তার গোপন বিষয় অবগত হওয়া গুনাহের কাজ। বরং কোন কথার সময় যদি এরূপ সম্ভাবনা থাকে যে, তুমি জানছো না মনে করে সে কথা বলছে, তাহলে তুমি সাথে সাথে সে জায়গা ছেড়ে চলে যাও। বা যদি তোমাকে ঘুমন্ত মনে করে এমন কথা বলতে আরম্ভ করে তাহলে অনতিবিলম্বে তোমার জেগে থাকার কথা প্রকাশ করে দাও। তবে হাঁ, যদি তোমার বা অন্য কোন মুসলমানের ক্ষতি করার কোন কথা হতে থাকে, তাহলে তা যে কোনভাবে শোনা জায়েয আছে। যাতে করে ক্ষতি থেকে বাঁচা সম্ভব হয়।

৮. এমন কোন ব্যক্তির নিকট কিছু চেয়ো না, যার ব্যাপারে লক্ষণ দেখে নিশ্চিত বিশ্বাস হয় যে, তার কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও না করতে পারবে না। যদিও তা ধাররূপেই চাওয়া হোক না কেন। হাঁ, তবে যদি এ বিশ্বাস হয় যে, তার কষ্ট হবে না, বা কষ্ট হলে সে স্বাধীনভাবে না করে দিবে, তাহলে চাওয়ায় সামস্যা নেই। এই একই বিশ্লেষণ প্রযোজ্য হবে, কোন কাজে বলার ক্ষেত্রে বা কোন ফরমায়েশ করার ক্ষেত্রে বা কারো নিকট কারো পক্ষে সুপারিশ করার ক্ষেত্রে। বর্তমানে অনেকেই এতে লিপ্ত।

৯. কোন বুযুর্গের জুতা উঠাতে চাইলে পা থেকে জুতা খোলার সময় জুতা হাত দিয়ে ধরো না। এতে অনেক সময় ঐ ব্যক্তি পড়ে যায়।

১০. কোন কোন সময় কিছু কিছু খেদমত অন্যের দ্বারা নেওয়া পছন্দ হয় না। তখন এরকম খেদমত করার জন্য পীড়াপীড়ি করা উচিত নয়। এতে যার খেদমত করা হয়, তার কষ্ট হয়ে থাকে। আর কোন খেদমত অন্যের দ্বারা নেওয়া পছন্দ নয়, তা যার খেদমত করা হবে, তার পরিষ্কার নিষেধ করার দ্বারা বা লক্ষণ দেখে জানা যাবে।

১১. কারো পাশে বসতে হলে এতো গা ঘেঁষে বসো না যে, তার মন বিচলিত হতে থাকে, আবার এতো দূরেও বসো না যে, কথাবার্তা বলতে কষ্ট হয়।

১২. কর্মরত ব্যক্তির নিকট বসে তার দিকে তাকিয়ে থেকো না। কারণ, এতে মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এবং মনের উপর চাপ অনুভব হয়। বরং এমন ব্যক্তির দিকে মুখ দিয়েও বসো না।

মেহমান হওয়ার আদব

১৩. যদি কারো নিকট মেহমান হও, আর তোমার খানা খাওয়ার ইচ্ছা না থাকে- তুমি খানা খেয়েছো, বা রোযা রেখেছো বা যে কোন কারণে খাওয়ার ইচ্ছা নেই- তাহলে সেখানে গিয়েই তাকে জানিয়ে দাও যে, আমি এখন খানা খাবো না। এমন যেন না হয় যে, সে খাবারের আয়োজন করলো। এজন্য সে কষ্টও করালো। তারপর খাওয়ার সময় হলে তুমি জানালে যে, খাবার খাবে না। তাহলে সমস্ত আয়োজন ও খাবার বৃথা নষ্ট হলো।

১৪. একইভাবে মেযবানের অনুমতি না নিয়ে মেহমানের জন্য অন্য কারো দাওয়াত গ্রহণ করা উচিত নয়।
১৫. মেহমানের উচিত কোথাও গেলে মেযবানকে জানিয়ে যাওয়া, যাতে খানা খাওয়ার সময় তাকে তালাশ করতে গিয়ে পেরেশানী না হয়।

১৬. কোন প্রয়োজনে কোথাও গেলে সুযোগ পাওয়া মাত্র সে প্রয়োজনের কথা বলে দিবে। দেরী করবে না। কোন কোন লোক আছে, যারা জিজ্ঞাসা করলে বলে যে, এমনি দেখা করতে এসেছি। যখন ঐ ব্যক্তি নিশ্চিন্ত হয়ে অন্য কাজে লিপ্ত হয় এবং কথা বলার সুযোগ না থাকে, তখন বলে যে, আমার কিছু বলার ছিলো। এতে খুব কষ্ট হয়।

১৭. যখন কথা বলবে, সম্মুখে বসে কথা বলবে। পিছনে থেকে কথা বলায় কষ্ট হয়।

১৮. কোন জিনিস একাধিক লোকের ব্যবহারের হলে কাজ শেষে তা পূর্বের জায়গায় রেখে দিবে। এ বিষয়টির প্রতি খুব গুরুত্ব দিবে।

১৯. কোন কোন সময় ঘুমানো বা বসার জন্য এমন জায়গায় চৌকি বিছানো হয়- যেখানে সবসময় চৌকি বিছানো থাকে না- তাহলে কাজ শেষ হলে সেখান থেকে চৌকি উঠিয়ে একদিকে সরিয়ে রাখবে, যেন কারো কষ্ট না হয়।

২০. অন্যের চিঠি- যা তোমার বরাবর লিখছে না- দেখো না। সামনাসামনিও না- যেমন কেউ লিখছে, আর কেউ দেখছে এবং গোপনেও না।

২১. কারো সামনে কাগজপত্র রাখা থাকলে সেগুলো উঠিয়ে দেখো না। হয়তো সে ব্যক্তি কোন কাগজ তোমার থেকে গোপন রাখতে চায় যদিও তা ছাপানো কাগজ হোক না কেন। কারণ, অনেক সময় এ কাগজ যে, তার কাছে আছে, একথা তুমি জানো- তা সে চায় না।

২২. যে ব্যক্তি খাবার খেতে যাচ্ছে বা তাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে খাওয়ার জায়গা পর্যন্ত যেয়ো না। কারণ, এমতাবস্থায় বাড়ীওয়ালা চক্ষুলজ্জার কারণে খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে, অথচ ভিতর থেকে তার অন্তর চায় না। আর অনেক লোক এমন আছে, যারা তাড়াতাড়ি সে প্রস্তাব গ্রহণ করে, এমতাবস্থায় সে বাড়ীওয়ালার আন্তরিক সম্মতি ছাড়া খাবার খেলো। আর যদি প্রস্তাব গ্রহণ না করে তাহলে বাড়ীওয়ালাকে হেয় করা হলো। তাছাড়া অতিরিক্ত লোক দেখে বাড়ীওয়ালা প্রথম ধাক্কাতেই হোঁচট খায়, এটাও কষ্ট দেওয়া।

২৩. এমন ব্যক্তি, যার নিকট একবার কোন প্রয়োজনের কথা বলেছো, তার নিকট পুনরায় ঐ প্রয়োজনের কথা বলার সময়ও কথাটি পরিপূর্ণ বলা উচিত। ইঙ্গিতের উপর বা আগে বলেছো এর উপর ভরসা করে অসম্পূর্ণ কথা বলবে না। কারণ, হতে পারে যে, ঐ লোক পূর্বের কথা ভুলে গিয়েছে। ফলে সে ভুল বুঝবে বা মোটেই বুঝবে না, ফলে সে কষ্ট পাবে।

২৪. কোন কোন লোক পিছনে বসে এ উদ্দেশ্যে গলা খাঁকারী দেয় যে, খাঁকরানির শব্দশুনে ঐ লোক আমাকে দেখবে এবং আমার সাথে কথা বলবে। এ ধরনের আচরণে মারাত্মক কষ্ট হয়ে থাকে। এর চেয়ে তো এটাই ভালো যে, সরাসরি সামনে এসে বসবে এবং যাকিছু বলার আছে বলবে। আর কর্মরত মানুষের সঙ্গে এটাও তখন করবে, যখন তীব্র প্রয়োজন দেখা দিবে। তা নাহলে উত্তম হলো, এমন জায়গায় বসে থাকবে, যাতে সে তার আগমনের কথাও জানতে না পারে। অন্যথায় এতে করেও অনেক সময় কষ্ট হয়ে থাকে। তারপর সে কাজ থেকে অবসর হলে কাছে এসে বসে যাকিছু বলার আছে বলবে এবং শুনবে।

২৫. যে ব্যক্তি দ্রুত পথ চলছে, মুসাফাহা করার জন্য তাকে আটকিও না। হতে পারে এতে তার কোন ক্ষতি হয়ে যাবে। একইভাবে এমন সময় তাকে খাড়া করে কথাও বলো না।

২৬. কতক লোক মজলিসে গিয়ে সবার সাথে পৃথক পৃথকভাবে মুসাফাহা করে। যদিও সবার সাথে তার পরিচয় না থাকে। এতে অনেক সময় ব্যয় হয়। তার মুসাফাহা শেষ হওয়া পর্যন্ত মজলিসের সমস্ত লোক আটকা পড়ে এবং পেরেশান হয়। সমীচীন হলো, যাকে উদ্দেশ্য করে এসেছে, তার সঙ্গে মুসাফাহা করে ক্ষান্ত করবে। হাঁ, অন্যদের সাথেও যদি পরিচয় থাকে, তবে সবার সাথে মুসাফাহা করায় দোষ নেই।