প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

হত্যাযজ্ঞ

হত্যাযজ্ঞ তো একটা সাধারণ শব্দ হিসেবে বাংলা ভাষী হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান সকলেই ব্যবহার করেন। যজ্ঞ হচ্ছে দেবতার উদ্দেশ্যে দ্রব্য ত্যাগের অনুষ্ঠান। যজ্ঞ শব্দটি সম্পূর্ণভাবে হিন্দুদের পূজার শব্দ। যজ্ঞ থেকেই যজ্ঞকুণ্ড (হোমাগ্নি জ্বালাবার জন্য যজ্ঞস্থলে যে গর্ত খনন করা হয়), যজ্ঞ ধূম (হোমাগ্নির ধোঁয়া), যজ্ঞ পশু (যজ্ঞে বলি দেয়ার উপযোগী প্রাণী), যজ্ঞ পাত্র (যজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় বাসন-কোসন), যজ্ঞেশ্বর (নারায়ণ বিষ্ণু), যজ্ঞবেদী (যজ্ঞস্থলে যে উচ্চ বেদী প্রস্তুত করা হয়), যজ্ঞ ভূমি ইত্যাদি শব্দের উদ্ভব। আমরা হত্যাযজ্ঞ বর্জন করে হত্যাকাণ্ড ব্যবহার করতে পারি।

হন্যা বা হন্যে

কোন বিশেষ প্রয়োজনে যখন একজন অন্যজনকে এদিক-ওদিক তালাশ করেও পায় না, তখন তৃতীয় ব্যক্তির জিজ্ঞাসার জবাবে বলে, আর বলো না ভাই, আমি মফিজকে হন্যে হয়ে খুঁজছি।

হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজির এমন বাক্য আমাদের সমাজে বেশ চালু। কিন্তু তারা জানেন না, এই হন্যে শব্দের উদ্ভব ও উৎস কি, যে ভাষার শব্দ এটি, তার জন্ম ইতিহাস ভিন্ন। যারা হন্যে শব্দ প্রয়োগ করে বাক্য তৈরি করে লেখেন বা বলেন, তারা এ শব্দকে পেরেশান অর্থ গ্রহণ করেন। কিন্তু এই পেরেশানীর মূল কি, তাতো জানতে হবে।

হন্যে শব্দটি সংস্কৃত ভাষার একটি শব্দ। এই শব্দের জন্ম হয়েছে কুকুর-কুকুরীর যৌন অস্থিরতার এক বিশেষ পর্যায়কে বুঝাবার জন্য। কুকুর যখন কুকুরীর পিছনে যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে দৌড় দেয় এবং কুকুরী খেলাচ্ছলে হোক বা ধরা না দেয়ার কারণে হোক দৌড়াতে থাকে অথবা কুকুরী কোথাও লুকিয়ে আছে, কুকুর এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে, খুঁজে পাচ্ছে না, খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে পড়েছে, কুকুরের এই অবস্থাকেও হন্যা বা হন্যে বলে।

হন্যা বা হন্যের সাধারণ অর্থ হয় এই, হনন বা আক্রমণ করার জন্য ক্ষিপ্তভাবে ইতস্তত ধাবমান, খেপা কুকুর। এক ভাই অন্য ভাইকে খুঁজছে একটি সুসংবাদ দেয়ার জন্য, এখানেও ‘হন্যে হয়ে খোঁজার’ প্রয়োগ কেমন করে হতে পারে? ‘হন্যে’ কুকুরের বা দুশমনের জন্য শব্দ মানুষের বা বন্ধুত্বের কোন শব্দ নয়। পশু-পাখীর বিভিন্ন ডাক বা আওয়াজের যেমন পৃথক পৃথক নাম আছে, তেমনি তাদের জীবন ধারার কোন কোন অবস্থাও বিশেষ বিশেষ শব্দে বিশেষিত হয়ে থাকে। হায়না ও কুকুরের জন্য হন্যা বা হন্যেও তদ্রুপ একটি শব্দ, এ শুধু তাদের জন্য। মানুষ তা ব্যবহার করলে ঐ পশু প্রকৃতির অনুসরণ হয়ে যায়।

তিনটি শব্দের ভুল ব্যবহার :

উৎসারিত, প্রেক্ষিত ও ফলশ্রুতি

শব্দগুলো অপসংস্কৃতিমূলক শব্দ নয়, তবে অপপ্রয়োগের কারণে শব্দের অর্থ বিকৃতি ঘটছে। আমি এখানে তিনটি শব্দ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

উৎসারিত

আমাদের মধ্যে অনেক লেখক আছেন, তারা ‘উৎস’ শব্দটি লেখার দরকার মনে করলে এর সাথে মিল রেখে ‘উৎসারিত’ শব্দ ব্যবহার করবেনই। উৎসের সঙ্গে উৎসারিত শব্দের একটা ছন্দ-মিলন আছে, তাই উৎসের সঙ্গে উৎসারিত শব্দের মধু মিলন ঘটিয়ে থাকেন। যারা এমন করেন, তারা জানেনই না, ‘উৎসারিত’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?

উৎসারণ অর্থ দূরীকৃত, দূরীকরণ, ঊর্ধ্ব উৎক্ষেপণ চালন। উৎসারিত (বিশ) অর্থ দূরীকৃত, উৎক্ষিপ্ত, চালিত। শব্দের অর্থ না জানার কারণে অনেকে নির্গত, উৎপাদন, জন্মলাভ অর্থে উৎসারণ বা উৎসারিত শব্দের ব্যবহার করে থাকেন। দূরীকরণ, অপনয়ন, উৎক্ষেপণ-এর যে অর্থ তা কি নির্গত, উৎপাদন আর জন্মলাভ শব্দের একই অর্থ? দূরীকৃত আর নির্গত যদি একই অর্থবোধক হতো, তাহলে উৎস থেকে উৎসারিত অর্থ শব্দের যথপোযুক্ত প্রয়োগ হতো। বরং উৎসাদন আর উৎসারণ প্রায় একই অর্থ বহন করে। সুতরাং উৎস থেকে উৎসারিত যারা লেখেন নির্গত অর্থে, তারা উৎসারণের ভুল প্রয়োগ করেন।

প্রেক্ষিত

প্রেক্ষিত (বিণ) অর্থ প্রেক্ষণ বা দর্শন করা হয়েছে এমন। (সংস্কৃত, প্র+ঈক্ষ্+ত = প্রেক্ষিত)। প্রেক্ষিত শব্দের এই একটি মাত্র অর্থ অভিধানে আছে, দ্বিতীয়টি নেই।
এই শব্দ থেকে যতো শব্দ হতে পারে, সব শব্দেরই একই অর্থ ‘দর্শন’। যেমন প্রেক্ষক অর্থ দর্শন, প্রেক্ষণ অর্থ দর্শন, দৃষ্টি ও চক্ষু। প্রেক্ষণীয়-দেখিবার যোগ্য, প্রেক্ষা অর্থও দর্শন, পর্যবেক্ষণ। প্রেক্ষালয় বা প্রেক্ষাগৃহ, ছায়াছবি দেখার ঘর, রঙ্গালয়।

যারা পরিপ্রেক্ষিত অর্থে ‘পরি’ বাদ দিয়ে সংক্ষেপে ‘প্রেক্ষিত’ করেন, তারা মূল শব্দটির সংক্ষেপ অংশ ব্যবহার করতে গিয়ে ভিন্ন অর্থের দিকে যে চলে যান, তা কি তারা লক্ষ্য করেছেন? তারা বলবেন, ‘প্রেক্ষিত’ আমরা ব্যবহার করে থানি পরিপ্রেক্ষিতের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসাবে। তাদের কাছে আমার বক্তব্য হচ্ছে, সব শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ হয় না। সংক্ষিপ্ত করতে গেলে মূল শব্দের অর্থ থাকে না। প্রেক্ষিত আর পরিপ্রেক্ষিত শব্দ দিয়েই তো বুঝতে পারলেন। পরিপ্রেক্ষিত শব্দের অর্থ হলো পটভূমি, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, চবৎংঢ়বপঃরাব। এ সব অর্থ তো প্রেক্ষিতে নেই। সুতরাং আমরা পটভূমি অর্থে যে ‘প্রেক্ষিত’ ব্যবহার করি, তা ভুল এবং অশুদ্ধ ব্যবহার করি।

ফলশ্রুতি

চেষ্টা, সাধনা, অধ্যবসায় ও কর্মের যে ফল বা ফলাফল তা শ্রবণ করা। শ্রুতি অর্থ শ্রবণ। ফলশ্রুতি অর্থ যে ফল শ্রবণ করা হয়। যেমন জনশ্রুতি। যারা ফলাফল বা ইংরেজি জবংঁষঃ অর্থে ফলশ্রুতি শব্দটি ব্যবহার করেন, তাদের ব্যবহার ভুল। ধাতুগত অর্থে, সাধারণ অর্থে এবং আভিধানিক অর্থেও তারা ভুল ও অশুদ্ধ ব্যবহার করেন। এ শব্দ বিশুদ্ধ অর্থে ব্যবহার হওয়া উচিত।

উপসংহার

এমন কিছু শব্দ আছে যা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন ধারা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা জিয়াফত, দাওয়াত বাদ দিয়ে নিমন্ত্রণ খেতে যাই। গোশত শব্দের ব্যবহার তো হারিয়েই যাচ্ছে। গোশতের পরিবর্তে মাংস ব্যবহার হচ্ছে। এক সময় রান্না তরকারীর নাম ছিলো ছালন বা ছালুন, তাও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় দোকানে গিয়ে বলতাম, বয়দা বা আন্ডা আছে কি? দোকানী বুঝতো কি চাই। এখন ডিম চালু হয়েছে। বয়দা হচ্ছে আরবী বাইদাতুন শব্দের বাঙালি উচ্চারণ। মাসের তারিখ আমরা আগে লিখতাম ১লা (পহেলা) ২রা (দোসরা), ৩রা (তেসরা), ৪ঠা (চৌঠা), ৫ই (পাঁচই), ২০শে, ৩০শে এভাবে। এই রীতির লেখা বা বলার মধ্যে মুসলমানী গন্ধ থাকার কারণে এখন কলিকাতার বাবুরা চালু করেছেন ১ জানুয়ারি, ২ জানুয়ারি, ৩ জানুয়ারি ইত্যাদি কায়দায় লেখার নিয়ম। আমরা তা অনুসরণ করছি। আশীর্বাদে অভিশাপ দখল করছে দোয়া বদদোয়ার জায়গা।

করমর্দন মানে হাত মর্দন। ‘কর’ অর্থ হাত। আমরা তো হাত মিলাই, একে অন্যের হাত তো মর্দন করি না। তবুও বলা হয় করমর্দন। তবে একজন অন্যজনের হ্যান্ডাস্যাক (হাত ঝাকুনি) দিয়ে থাকেন। তাই হ্যান্ডাস্যাক বলা হয়। করমর্দনের চেয়ে হ্যান্ডাস্যাক অর্থের দিক দিয়ে অনেক সুস্পষ্ট। মুসলমানরা মুসাফাহ করলে মুসাফাহ হাত বুকে লাগালে মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যায়। করমর্দন সংস্কৃতি আর হ্যান্ডাস্যাক বা হাত ঝাকুনি সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে আমরা আমাদের মুসাফাহ সংস্কৃতিতে প্রত্যাবর্তন করা কি উত্তম নয়? সমাজে নিমকহারাম শব্দ চালু থাকলেও নিমক উচ্চারণই নেই, নিমকদামও নেই। এরপরও নিমকপুরী আছে, নিমকী আছে, নিমকহালাল কথাও আছে, কিন্তু শুধু নিমক নেই।

আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলার মুসলিম সমাজে হিন্দু সম্বোধন-সংস্কৃতির প্রভাব এতো বেশি যে, দু’পর্যায়ে স্বাধীনতা লাভের অর্থ শতাধিক বছর পরও ছোট চাচা, বড় চাচা, বুবু-বুবুজান সম্বোধনের পরিবর্তে কাকা-জেঠা, দিদি, বড়দা, ছোটদা সম্বোধন এখনো চালু আছে। মুসলিম শিশুর নামকরণে এখন তো হিন্দু দেব-দেবীর নাম এবং সংস্কৃত ভাষার যে সব নাম হিন্দুরা তাদের শিশুদের নাম রাখে, এসব নাম রাখছেন মুসলিম মা-বাবারা। এখনো শিশুর বাবার নাম জানলে বোঝা যায়, শিশুটির ধর্ম-পরিচয়, কিন্তু ৪০/৫০ বছর পর এই শিশু যখন বাবা বা মা হবে, তখন তাদের সন্তানের নামও তাদের নামকরণের ঐতিহ্যে রাখা হবে। সে সময় শিশুর জাত পরিচয় জানতে হলে দাদার নাম জানতে হবে।

অনেক অপসংস্কৃতিমূলক শব্দ মুসলিম সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। শুধু প্রবেশই করেনি, আমাদের বলার ও লেখার ভাষায় মিশে আছে। আমাদের বলার ও লেখার ভাষাকে যদি আমরা আমাদের ঈমান-আক্বিদা অনুযায়ী পরিশুদ্ধ করতে চাই, তাহলে এসব শব্দ আমাদের অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজনে বাদ দিতে হবে এবং আমাদের শব্দ ভাণ্ডার থেকে শব্দ এনে যেখানে যে শব্দের স্থান শূন্য হবে, তা পূরণ করতে হবে। এদিক দিয়ে বিপ্লবী ভূমিকা রেখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং ফররুখ আহমদ। তাদের পর বাংলা সাহিত্যে তৃতীয় জনের আবির্ভাব এখনো ঘটেনি। আমি মোটামুটিভাবে একটা হিসাব কষে দেখেছি, ৫০/৬০টি শব্দের ব্যবহারে যদি আমরা ঈমানী সচেতনতার পরিচয় দিতে পারি, তাহলে শব্দ সংস্কৃতির লেখক, বক্তা ও শিক্ষিতজনরা যদি নিজস্ব পরিভাষা ব্যবহারে আন্তরিকতার সাথে যত্নবান হন, তাহলে বরং বিভিন্ন ভাষাভাষী ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সম্প্রীতি আরো মজবুত ও মধুর হবে এবং মুসলমানরাও ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ছোট-বড় অনেক গুণাহ থেকে বেঁচে যাবেন।

আল্লাহ আমাদের সে তৌফিক যেন দেন, তার কাছে রইলো এই মোনাজাত। তবে বান্দাহ যদি নেক নিয়তে সচেতনতার ভূমিকা রাখে, তাহলে আল্লাহর মদদও আসে।