প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল। চারিপাশের মানুষগুলোই মূলত তার মানসিকতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। এজন্য সহচর ও বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা মূলত ঈমান সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির সতর্কতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি মুমিন ছাড়া আর কারো সাথে মিশবে না এবং তোমার খাদ্য মুত্তাকী ব্যক্তি ছাড়া কেউ যেন না খায়।” (হাদীসটি হাসান। তিরমিযী, (৩৭-যুহদ, ৫৫-সুহবাতুল মুমিন) ৪/৫১৯, নং ২৩৯৫ (ভা ২/৬৫): আলবানী, সহীহুত তারগীব ৩/৯৫) অন্য হাদীসে আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “বন্ধুর ধর্মই মানুষের ধর্ম; কাজেই তোমাদের কেউ কারো সাথে বন্ধুত্ব করলে সে যেন দেখেশুনে বিবেচনা করে তা করে।”
(হাদীসটি হাসান। তিরমিযী (৩৭-যুহদ, ৪৫-বাব) ৪/৫৮৯, নং ২৩৭৮ (ভারতীয় ২/৬৩)
আবু মুসা আশআরী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সৎ সহচর ও অসৎ সহচরের উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপর। আতর বিক্রেতা তোমাকে আতর দিবে, অথবা তুমি আতর ক্রয় করবে, অথবা তার কাছে তুমি সুন্দর গন্ধ পাবে। আর হাপরের ফুঁকদাতা তোমার শরীর অথবা পোশাকে আগুন লাগাবে অথবা তুমি দুর্গন্ধ পাবে।” (বুখারী (৭৫-যাবায়িহ ওয়াস সাইদ, ৩১-মিসক) ৫/২১০৪; মুসলিম (বিরর ওয়াস সিলাহ, মুজালাসাতিস সালিহীন…) ৪/২০২৬ নং ২৬২৮।) পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে আমরা সাধারণত যাচাই করতে পারি না। ভাল ও মন্দ সকলের সাথেই আমাদের সম্পর্ক রাখতে হয়। তবে বন্ধুত্ব ও সাহচর্যের ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। শিরক, বিদআত, কুফর ও পাপাচারে লিপ্ত কোনো মানুষের সাথে বন্ধুত্ব সতর্কতার সাথে বর্জন করতে হবে। এরূপ মানুষদের সাথে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একত্রে অবস্থান ও আড্ডা বর্জন করতে হবে। কারণ এতে নিজের ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পাপের বিষবাষ্প মুমিনের হৃদয়ে প্রবেশ করে। যে মুমিন নিজে পাপে লিপ্ত, তারও দায়িত্ব অন্য পাপীদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক না রাখা। এতে তিনি অন্যান্য পাপে লিপ্ত হওয়ার থেকে রক্ষা পাবেন এবং নিজের পাপ থেকে তাওবা করা তার জন্য সহজ হবে।
পাপীদের সাহচর্য ও বন্ধুত্ব বর্জন করার পাশাপাশি নেককার মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব এবং সাহচর্যের সম্পর্ক গড়ে তোলা খুবই জরুরী। এক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিত: সাহচর্য চার পর্যায়ের: (১) আল্লাহর সাহচর্য, (২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য (৩) সাহাবীগণের সাহচর্য ও (৪) নেককার মানুষদের সাহচর্য।
মহান আল্লাহ বলেছেন: ‘তিনি তোমাদের সাথে তোমরা যেখানেই থাক না কেন (হাদীদ: ৪), ‘আল্লাহ মুমিনদের সাথে’ (আনফাল: ১৯), ‘আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে’ (বাকারা: ১৯৪, তাওবা ৩৬, ১২৩), ‘যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা নেককর্মশীল আল্লাহ তাদের সাথে’ (নাহল: ২৮), ‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে’ (বাকারা; ১৫৩, আনফাল: ৪৬)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘ইহসান (সৌন্দর্য, পূর্ণতা বা ইখলাস) এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ; কারণ তুমি তাঁকে না দেখলেও তিনি তোমাকে দেখছেন। (সহীহ বুখারী ১/২৭. ৪/১৭৯৩ (ভা ১/১২) সহীহ মুসলিম ১/৩৭, ৩৯, ৪০ (ভা ১/২৭-২৮) মহান আল্লাহর এ সাহচর্য সর্বদা অনুভবের গভীরতা-ই আল্লাহর নৈকট্য বা বেলায়াতের গভীরতা। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন ও সার্বক্ষণিক যিকর-এর মাধ্যমে এ ঈমান গভীর হয়। এভাবেই মুমিন ইহসান বা সৌন্দর্য, পূর্ণতা ও ইখলাসের চূড়ায় পৌঁছান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য লাভের জন্য আমাদের একমাত্র উপায় তাঁর হাদীস, সীরাত ও শামাইল অধ্যয়ন, আলোচনা, তাঁর প্রতি দরুদ-সালাম পাঠে যথাসম্ভব বেশি সময় কাটানো এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাত জানা ও মানার জন্য সচেষ্ট থাকা। সাহাবীগণের সাহচর্য লাভের জন্য আমাদের সহীহ সনদনির্ভর সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন ও আলোচনা করা দরকার। উপরের তিন প্রকার সাহচর্য একদিকে সহজ; কারণ অন্য কোনো মানুষের সহযোগিতা ছাড়াই মুমিন ইবাদত-বন্দেগি, যিকর, দুআ, কুরআন, তাফসীর, হাদীস, সীরাত, সাহাবীচরিত ইত্যাদি বইপত্র কিনে ও পড়ে এ সাহচর্য লাভ করতে পারেন। পাশাপাশি এরূপ সাহচর্য লাভ করা কঠিন; কারণ মানবীয় দুর্বলতার কারণে একাকী এ সকল ইবাদত করা কঠিন ও ক্লান্তিকর মনে হয়। সাধারণত মুমিন অল্পতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নেককার মানুষদের আল্লাহর জন্য ভালবাসা এবং তাদের সাহচর্যে কিছু সময় কাটানো উপরের সকল প্রকারের সাহচর্য সহজ ও গভীর করে।
প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব নিজের চারিপাশে একটি ঈমানী পরিমণ্ডল তৈরি করা। আল্লাহর জন্য ভালবাসা ও বন্ধুত্ব নিয়ে পরস্পরের সাক্ষাত করা, কিছু সময় একত্রে কাটানো, দীনী আলোচনা বা আল্লাহর যিকরে কিছু সময় রত থাকা মুমিনের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এতে ঈমান উজ্জীবিত হয়, মন আখিরাতমুখি হয়, পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আবেগ তৈরি হয় এবং ইলম বৃদ্ধি পায়। এজন্য হাদীস শরীফে এরূপ সাক্ষাত, সাহচর্য ও মাজলিসের বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মুআয ইবনু জাবাল (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলেন: “যারা আমার জন্যই একে অপরকে ভালবাসে, আমার জন্যই একে অপরের সাথে সাক্ষাত করে, আমার জন্যই একে অপরের জন্য খরচ করে এবং আমার জন্যই একে অপরের সাথে বৈঠক বা মাজলিস করে তাদের জন্য আমার মহব্বত ওয়াজিব হয়ে যায়।” (হাদীসটি সহীহ। মালিক, আল-মুআত্তা ২/৯৫৩; আহমদ আল-মুসনাদ ৫/২২৯, ২৩৩; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/১৮৬; আলবানী, সহীহুত তারগীব ৩/৯২।)
