প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

এই বইয়ের বিস্তারিত পরিসরে আমরা দেখেছি, করআন-হাদীস থেকে প্রতিভাত হয় যে, মানুষের মূল দায়িত্ব দুটি ও পাপের সূত্রও দুটি। প্রথম দায়িত্ব, মানুষ তার মহান প্রভুর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস, অগাধ ভালবাসা ও আস্থা পোষণ করবে এবং এই আস্থা, বিশ্বাস ও ভালবাসা বৃদ্ধি পায় এমন সকল কর্ম আল্লাহর মনোনীত রাসূলের শিক্ষা অনুসারে পালন করবে। আর এই দায়িত্বে অবহেলা সৃষ্টি করে এমন সকল কর্ম বা চিন্তা চেতনাই প্রথম পর্যায়ের পাপ।

মানুষের দ্বিতীয় দায়িত্ব, এই পৃথিবীকে সুন্দর বসবাসযোগ্য করতে তার আশেপাশে সকল মানুষ ও জীবকে তারই মতো ভালোভাবে বাঁচতে সাহায্য করা। আর এই দায়িত্বের অবহেলাজনিত কর্মই দ্বিতীয় পর্যায়ের পাপ। আল্লাহর সৃষ্টির কষ্ট প্রদান, ক্ষতি করা, শান্তি বিনষ্ট করা বা অধিকার নষ্ট করাই মূলত সবচেয়ে কঠিন অপরাধ। এ জাতীয় পাপগুলিকে কুরআন বা হাদীসে বেশি আলোচনা করা হয়েছে, বেশি বিশ্লেষণ ও ভাগ করা হয়েছে। একই জাতীয় পাপের শাখা প্রশাখাকে বিশেষভাবে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এর তালিকাও অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। ইতোপূর্বে বান্দার হক বা সৃষ্টির অধিকার নষ্ট হয় এমন অসংখ্য বিষয় আমরা পাঠকগণের খেদমতে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি যাতে তারা এসব বিষয় থেকে সতর্কভাবে বিরত থাকতে পারেন। এখানে এ সংক্রান্ত আরো কিছু গুণাহর তালিকা সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরা হল।

(১) রাষ্ট্রপ্রধান, প্রশাসক বা বিচারক কর্তৃক জনগণের দায়িত্ব, সম্পদ বা আমানত আদায়ের অবহেলা বা ফাঁকি দেওয়া। (২) নাগরিক কর্তৃক রাষ্ট্রপ্রধান, শাসক, প্রশাসক বা প্রধানকে ধোকা দেওয়া বা রাষ্ট্রের ক্ষতিকর কিছু করা। (৩) রাষ্ট্র বা সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা সশস্ত্র বিদ্রোহ। (৪) অন্যায় দেখেও সাধ্যমতো প্রতিকার বা প্রতিবাদ না করা। (৫) রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের বাইরে থেকে মৃত্যুবরণ করা। (৬) রাষ্ট্র প্রশাসনের অন্যায় বা জুলুম সমর্থন বা সহযোগিতা করা। (৭) বিচারকের জন্য ন্যায় বিচারে একনিষ্ট না হওয়া বা বিচার্য বিষয়ের বাইরে কোনো কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিচার করা। (৮) আইন প্রয়োগকারীর জন্য আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা ও আপনজনদের জন্য হালকাভাবে শাস্তি প্রয়োগ করা। (৯) ইসলাম নির্ধারিত শাস্তিযোগ্য অপরাধে অপরাধীর (চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি) শাস্তি মওকুফের জন্য সুপারিশ বা চেষ্টা করা। (১০) রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ, দখল বা ভোগ করা, তা যত সামান্যই হোক। (১১) মুনাফিককে নেতা বলা। (১২) জিহাদের মাঠ থেকে পালিয়ে আসা। (১৩) জুলুম, যবরদস্তি, মিথ্যা মামলা বা অবৈধভাবে কোনো মানুষ থেকে কিছু গ্রহণ করা। (১৪) হাটবাজার, রাস্তাঘাটে টোল আদায় করা বা চাঁদাবাজি করা। (১৫) যে কোনো মানুষকে কষ্ট দেওয়াই কঠিন পাপ। তবে হাদীস শরীফে বিশেষ করে সমাজের দুর্বল শ্রেণীগুলির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ নির্দেশনা তো আছেই। (১৬) আল্লাহর প্রিয় ধার্মিক বান্দাগণকে কষ্ট প্রদান বা তাদের সাথে শত্রুতা করা। (১৭) কেউ আল্লাহর নামে শপথ করে সাহায্য বা ক্ষমা চাইলেও তার প্রতি বিরক্ত থাকা অথবা তাকে ক্ষমা বা সাহায্য না করা। (১৮) যা কিছু শোনা হয় বিচার বিশ্লেষণ ও সত্যাসত্য নির্ধারণ না করে তা বলা। (১৯) বঞ্চিত ও দরিদ্রদেরকে খাদ্য প্রদানে ও সাহায্য দানে উৎসাহ না দেওয়া। (২০) ব্যভিচার, সমকামিতা বা যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা। (২১) নিরপরাধ মানুষকে, বিশেষত মহিলাকে ৪ জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর স্পষ্ট সাক্ষ্য ছাড়া ব্যভিচার বা অনৈতিকভাবে অপবাদ দেওয়া। (২২) মুসলিম সমাজে অশ্লীলতা প্রসার করতে পারে এমন কোনো গল্পগুজব বা কথাবার্তা বলা বা প্রচার করা। এর মধ্যে সকল পর্নোগ্রাফি, ছবি, অশ্লীল উপন্যাস ও গল্প অন্তর্ভুক্ত। এগুলির প্রচার, বিক্রয়, আদান-প্রদান সবই কবীরা গুনাহ। (২৩) নিজের পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলা। (২৪) জেদাজেদি, ঝগড়া, বিতর্ক, কলহ বা কোন্দল। (২৫) কোনো উপকারীর উপকার অস্বীকার করা বা অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। (২৬) নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অন্যকে প্রদান থেকে বিরত থাকা। (২৭) জুয়া খেলা। (২৮) জমির সীমানা পরিবর্তন করা। (২৯) মহান সাহাবীগণকে গালি দেওয়া। (৩০) আনসারগণকে গালি দেওয়া। (৩১) পাপ বা বিভ্রান্তির দিকে বা খারাপ রীতির দিকে আহ্বান করা। (৩২) কারো প্রতি অস্ত্র জাতীয় কিছু উঠান বা হুমকি প্রদান। (৩৩) স্বামীর জন্য স্ত্রীর টাকা বা সম্পদ তার ইচ্ছার বাইরে ভোগ বা দখল করা। (৩৪) হীলা বিবাহ করা বা করানো। (৩৫) কোনো মানুষের উপকার করে পরে খোটা দেয়া। (৩৬) কারো স্ত্রী বা চাকর বাকর ফুসলিয়ে সরিয়ে দেওয়া। (৩৭) কোনো মুসলিমের দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে কিছু অর্থলাভ করা।

হুক্কুল্লাহ বিষয়ক কিছু পাপের সাথে মানুষের অধিকার জড়িত। মিথ্যা হাদীস বলা এমনিতেই ভয়ঙ্করতম পাপ। সাথে সাথে এই মিথ্যে দ্বারা যারা প্রভাবিত হয়, বিপথগামী হয়, তাদের সকলের পাপের ভাগ পেতে হয় মিথ্যাবাদীকে। যাকাত প্রদানে অবহেলা করলে একদিকে আল্লাহর অবাধ্যতা ও ইসলামের রুকন নষ্ট করা হয়। সাথে সাথে সমাজের দরিদ্রদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ইল্ম গোপন করলে সাধারণত সমাজের মানুষেরা অজ্ঞতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং এই আলিম তাদের অপরাধের জন্য দায়ী থাকেন। যাদু ও মিথ্যা বলার অভ্যাস যদি কারো কোনো ক্ষতি না করে তাহলেও কবীরা গোনাহ। পক্ষান্তরে কারো কোনো প্রকার ক্ষতি করলে তা দ্বিতীয় একটি কবীরা গুনাহে পরিণত হয়। অনুরূপভাবে অহংকার, হিংসা, কাউকে হেয় ভাবা ইত্যাদি ব্যক্তিগত কবীরা গোনাহ হলেও সাধারণত এগুলির অভিব্যক্তি ব্যক্তির বাইরে প্রকাশিত হয়ে অন্যদের কষ্ট দেয়। তখন তা আরো অনেক হুক্কুল ইবাদ সংশ্লিষ্ট কবীরা গোনাহের মধ্যে ব্যক্তিকে নিপতিত করে। কৃপণতা যদিও মানসিক পাপ ও ব্যাধি, কিন্তু সাধারণত এই ব্যধি মানুষকে বান্দার হক নষ্ট বা ক্ষতি করার অনেক পাপের দিকে প্ররোচিত করে।
উপরের সকল পাপই অত্যন্ত ক্ষতিকর। কুরআন ও হাদীসে এগুলির ভয়ঙ্কর শাস্তি ও খারাপ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো পাপ নেক আমলের ফলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। আবার কোনো কোনো পাপ সকল নেক আমলকে বিনষ্ট করে দেয়।