প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

১. হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে,
قَالَ النَّبِىْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِاِمْرَاَةٍ ، وَلَا تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ اِلَّا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ ، فَقَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُوْلَ اللهِ! اكتُتِبْتُ فِىْ غَزْوَةٍ كَذَا وَكَذَا وَخَرَجَتْ امْرَتِىْ حَاجَّةٍ ، قَالَ اذْهَبْ فَاحْجُجْ مَعَ امْرَأَتِكَ ـ

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কোন পুরুষ যেন কোন নারীর সাথে নির্জনে বা একাকীত্বে অবস্থান না করে। আর নারী যেন মাহরাম ছাড়া একাকী সফর না করে। (একথা শুনে) জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! অমুক অমুক যুদ্ধে আমার নাম লেখানো হয়েছে। এ দিকে আমার স্ত্রী হজ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যাও তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ কর। (বুখারী, মুসলিম)

২. উল্লেখিত হাদীসটিতে কাছে বা দূরে নির্বিশেষে, এমনকি দু’এক মাইলের সফরেও মাহরাম ছাড়া বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। আর সতর্কতা ও মঙ্গল এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তবে যেহেতু এতে অতিরিক্ত কষ্ট সৃষ্টি হতে পারে, সেজন্য অন্যান্য হাদীসে দূরত্বের পরিমাণ নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এ নির্ধারিত পরিমাণ দূরত্ব মাহরাম ছাড়াও বের হতে পারবে। তার চেয়ে বেশী দূরত্বের সফর হলে তার অনুমতি নেই।

৩. আল্লামা শামী (রহ.) কিতাবুল হজ্জে এ দূরত্বের পরিমাণ তিন দিন তিন রাতের সফর (অর্থাৎ ৪৮মাইল) লিখেছেন। অতঃপর তিনি লিখেছেন, ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আবু ইউসূফ (রহ.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, তাঁরা এক দিনের দূরত্বের জন্যও মাহরাম অথবা স্বামী ছাড়া সফরে বের হওয়া মাকরূহ বলতেন। অতঃপর তিনি লিখেছেন,
وينبغى ان يكن الفتو ى عليه لفساد الزمان (شرحا لباب) ويؤيده حديث الصحيحين ، لا يحل لامرأة تؤمن بالله و اليوم الاخر ان تسافر مسيرة يوم و ليلة الا مع ذى محرم عليها ، وفى لفظ مسلم مسيرة ليلة ، وفى لفظ يوم ـ

আর এ ফিতনা ফাসাদের যুগে উপরোক্ত মতের উপরই ফতোয়া হওয়া উচিত। (অর্থাৎ এক দিনের জন্যও মহিলারা মাহরাম ছাড়া সফরে বের হতে পারবে না।) (শরহে লুবাব)

৪. আর বুখারী মুসলিমের একটি বর্ণনাও এর সমর্থন করে। বর্ণনাটি হল- আল্লাহ এবং ক্বিয়ামত দিবসে বিশ্বাসী কোন স্ত্রীলোকের জন্য এক দিন এক রাতের দূরত্বের জন্য (অর্থাৎ ১৬ মাইল) মাহরাম ছাড়া সফর করা হালাল হবে না। মুসলিম শরীফের অন্য এক রেওয়ায়েতে এক দিন এক রাতের পরিবর্তে শুধু এক রাতের দূরত্ব, এবং অন্য এক রিওয়ায়েতে একদিনের দূরত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। আর এর মধ্যেই সতর্কতা রয়েছে যে, মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সামান্য দূরত্বও সফর করবে না। চাই ধর্মীয় সফর হোক বা পার্থিব সফর হোক। যদি ফরজ সফর না হয়, তবে ৪৮ মাইলের কমের সফরের জন্যও মাহরাম ছাড়া যাওয়া থেকে বাধা দেয়া উচিত; যার প্রমাণ রিওয়ায়েতের বিভিন্ন শব্দ থেকে পাওয়া যায়। আর ফরজ হজ্জের জন্য যদি ৪৮ মাইলের কম দূরত্ব হয়, তবে মাহরাম ছাড়া যাওয়া থেকে বাধা দেওয়ার অধিকার থাকবে না।

৫. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থে হজ্জে যাওয়ার শর্তাবলী আলোচনা প্রসঙ্গে আছে-
ومنها المحرم للمرأة شابة كانت او عجوزة ، اذا كان بينها و بين مكة مسيرة ثلاثة ايام ، و ان كان اقل من ذلك ججن بغير محرم ، والمحرم الزوج ومن لا يجوز مناكحتها على التابيد بقرابة ، أو رضاع أو مصاهرة ـ

আর সে সব শর্তগুলোর সাথে মহিলাদের জন্য আরেকটি শর্ত হল, যদি তার বাসস্থান ও মক্কার মাঝে তিন দিনের দূরত্ব হয় তবে চাই সে যুবতী হোক বা বৃদ্ধ হোক তার সাথে মাহরাম থাকতেই হবে। যদি তিন দিনের দূরত্বের কম হয় তবে মাহরাম ছাড়া সফর করতে পারে। আর মাহরাম হল স্বামী এবং ঐ সকল আত্মীয় যাদের সাথে ঔরসজাত সম্পর্কের কারণে অথবা দুধের সম্পর্কের কারণে অথবা শ্বশুরালয়ের আত্মীয়তার কারণে কোনো দিন বিবাহ করা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
যে মহিলা আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর ঈমান রাখে তার জন্য পিতা, ভাই, স্বামী ছেলে বা (অন্য কোন) মাহরাম ছাড়া তিন দিন অথবা তিন দিনের অধিক দূরত্বের সফর করা হালাল নয়। (বুখারী)

৬. সফরে যেহেতু বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এ জন্যই ইসলামী শরীয়তে মেয়েদেরকে স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে। যার মধ্যে অনেক হিকমত ও উপকারিতা রয়েছে। মাহরাম সাথে থাকলে মহিলাদের জান, মাল, ইজ্জত, আবরু শঙ্কামুক্ত থাকে। কিন্তু যদি মাহরাম এমন ফাসেক-ফাজের হয়, যার দ্বারা ইজ্জত আবরুর উপর হামলা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে এ জাতীয় মাহরামের সাথেও সফর করা জায়েয নেই। এ জন্যই ফুক্বাহায়ে কেরাম মাহরামের সাথে ফাসেক না হওয়ার শর্তারোপ করেছেন।

৭. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে রয়েছে:
و يجوز له ان يسافر بها اى بمحارمه ، اذا امن على نفسه فان علم انه يشتهيها أو ستهيه ان سافر بها أو خلابها ، لو كان أكبر رأيه ذلك أو شك فلا يباح له ذلك ـ

আর পুরুষদের জন্য স্বীয় মাহরাম মহিলাদের সাথে সফর করা এবং তার সাথে নির্জনে অবস্থান করা জায়েয আছে; যদি তার নিজের উপর আত্মবিশ্বাস থাকে। কিন্তু যদি সে মনে করে যে, মহিলাটির প্রতি তার অথবা তার প্রতি মহিলাটির আসক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অথবা সংশয় রয়েছে, তবে তার জন্য এই মাহরাম মহিলাকে নিয়ে সফর করা বা একাকীত্বে কাটানো জায়েয নেই।

৮. অনেকে মনে করে থাকেন যে, মাহরাম ছাড়া হয়ত শুধু ধর্মীয় সফর নিষেধ। পার্থিব সফর নিষেধ নয়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কেননা শরীয়তে উভয় সফরকেই নিষেধ করা হয়েছে।

৯. কোনো মহিলার উপর যদি হজ্জ ফরজ হয় এবং মাহরাম না পাওয়ার কারণে শেষ জীবন পর্যন্ত হজ্জ আদায় করতে না পারে তবে তার গুনাহ হবে না। কিন্তু মৃত্যুর সময় অসীয়ত করে যাওয়া তার উপর ওয়াজিব। আর মৃত্যুর পর ওয়ারিসদের উপর কর্তব্য হবে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে খরচ বহন করে কোনো এক ব্যক্তিকে তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করার জন্য পাঠানো। এর দ্বারা মৃত মহিলার দায়িত্বে যে হজ্জ ফরজ ছিল তা আদায় হয়ে যাবে। এভাবে অপরের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করাকে হজ্জে বদল বলে। বৃদ্ধা মহিলার জন্যও যেহেতু মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নেই, এ জন্যে তার ব্যাপারেও একই হুকুম।